খুঁজুন
, ,

চাষের মাছে গন্ধ হয় কেন, কী করলে গন্ধ থাকবে না?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ
চাষের মাছে গন্ধ হয় কেন, কী করলে গন্ধ থাকবে না?

মাছে-ভাতে বাঙালি’ এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয় বহন করে আসছে। বাঙালির দুপুরের তপ্ত ভাতের পাতে ধোঁয়া ওঠা মাছের ঝোল কিংবা নানা পদের সুস্বাদু রেসিপি থাকবে না, তা যেন ভাবাই যায় না।

সময়ের সাথে সাথে নদী-বিলের প্রাকৃতিক মাছের অভাব মেটাতে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশে কৃত্রিম উপায়ে মাছ চাষের পরিধি ও পরিসর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রোটিনের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মাছের উৎপাদন ও রপ্তানি দুই-ই বাড়ছে ইতিবাচক হারে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও)-এর ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে এক অনন্য গৌরব অর্জন করে পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে।

কিন্তু এই বিপুল সাফল্যের মাঝেও এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায় সবারই হচ্ছে। তাজা দেখে বাজার থেকে সাধের রুই, কাতলা, পাঙাশ বা শিং মাছ কিনে আনার পর ঘরে যখন তা কাটা ও ধোয়া হয়, কিংবা রান্নার সময় নাকে এসে লাগে এক অদ্ভুত কাদা-কাদা বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। অনেক গৃহিণীই অভিযোগ করেন, লেবু, লবণ, হলুদ কিংবা আদা-রসুন দিয়ে বারংবার ধুয়েও মাছে জমে থাকা এই দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয় না। খেতে বসেও সেই একই কাদাটে স্বাদের কারণে পুরো খাবারের তৃপ্তিই যেন মাটি হয়ে যায়।

সম্প্রতি বিবিসি নিউজ বাংলার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাষের মাছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত গন্ধের আসল বৈজ্ঞানিক কারণ এবং এটি দূর করার জন্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত অত্যন্ত কার্যকর ও জাদুকরী সমাধান।

চাষের মাছে দুর্গন্ধের আসল রহস্য: কী বলে বিজ্ঞান?

অনেকে মনে করেন চাষের মাছ কাদা বা নোংরা আবর্জনা খায় বলে এমন গন্ধ হয়। তবে আসল কারণটি লুকিয়ে রয়েছে অণুজীবের জগতে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক বিষয়টির নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, পুকুর বা জলাশয়ের বদ্ধ পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করার কারণে সেখানে প্রধানত তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া বিপুল পরিমাণে তৈরি হয়। একজিনো ব্যাকটেরিয়া, মিকজো ব্যাকটেরিয়া এবংসায়ানো ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর জীবনপ্রক্রিয়া থেকে নিঃসৃত হয় দুই ধরনের ক্ষতিকর জৈব রাসায়নিক যৌগ—জিওসমিন এবং ২-মিথাইলআইসোবোর্নিওল।

এই দুটি রাসায়নিক যৌগের কারণেই মূলত মাছে সেই তীব্র স্যাঁতসেঁতে ও কাদাটে গন্ধের সৃষ্টি হয়। অধ্যাপক হক আরও জানান, মাছের শরীরে চর্বি যেখানে থাকে অথবা মাছের দেহের উপরিভাগের চামড়া, যেখানে লাল মাংসপেশী (রেড মাসেল) আছে, সেসব জায়গায় জমে এই দুর্গন্ধটা তৈরি হয়।

ব্যাকটেরিয়ার বাড়বাড়ন্ত: যেখানে আমাদের গলদ

গবেষকদের মতে, চাষের পুকুরগুলোতে এই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিক যৌগ অবাধে বেড়ে ওঠার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ বা অনিয়ম দায়ী:

অতিরিক্ত খাদ্য সরবরাহ: অধিক ও দ্রুত উৎপাদনের আশায় মৎস্য চাষিরা প্রায়শই পুকুরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কৃত্রিম খাবার দেন। এই বাড়তি খাবার পানির নিচে পচে ব্যাকটেরিয়ার উর্বর প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে।

অতিরিক্ত ঘনত্ব: পুকুরের স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার বা আকারের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে মাছ মজুদ করা হয়।

পানি পরিবর্তন না করা: বদ্ধ জলাশয়ের পুরোনো পানি নিয়মিত পরিবর্তন না করা ব্যাকটেরিয়া বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

অধ্যাপক মাহফুজুল হকের মতে, আমাদের দেশের গ্রামীণ এলাকায় অসংখ্য পুকুর থাকলেও অনেক জায়গায় পুরোনো পানি বের করে নতুন পানি দেওয়ার প্রয়োজনীয় নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা সুযোগ নেই। আবার অনেক চাষি বাড়তি খরচের ভয়েও পানি পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নেন না। এই ধরনের উদাসীনতাকে তিনি “অ্যাকুয়াকালচার ভায়োলেন্স” বা মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে এক প্রকার সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মাঠপর্যায়ে চাষিরা মাছ চাষের এই আদর্শ নিয়ম বা স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকলগুলো সঠিকভাবে মানছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়াও, নিয়মিত পুকুর পরিষ্কার না করার ফলে সেখানে ক্ষতিকারক ভারী ধাতু জমা হতে থাকে।

গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, অন্তত প্রতি তিন বছর পর পর পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার করা উচিত। কারণ একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু চাষের মৃগেল মাছে কিডনি ও যকৃতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ভারী ধাতু ‘ক্রোমিয়ামের’ মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া গিয়েছিল! জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) বলছে, খাবারে ক্রোমিয়াম দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সহনীয়, এর বেশি হলে তা মানবদেহের কিডনি ও যকৃতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খাবারের অতৃপ্তি

মাছের এই তীব্র গন্ধ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি কতটা ক্ষতিকর? অধ্যাপক হক এই বিষয়ে কিছুটা আশ্বস্ত করে জানান যে, বাংলাদেশে আমরা সাধারণত কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ মাছ খাই না। মাছকে খুব ভালোভাবে রান্না করার ফলে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমলেও, অতিরিক্ত গন্ধের কারণে মাছ খাওয়ার যে আসল স্বাদ এবং পরম তৃপ্তি—তা অনেকটাই কমে যায়।

মুশকিল আসান: দুর্গন্ধহীন মাছ চাষের জাদুকরী প্রযুক্তি ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার’

বাঙালির পাতে আবার আগের মতো সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত মাছ ফিরিয়ে দিতে মৎস্য বিজ্ঞানীরা এক চমৎকার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন, যার নাম ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’।

এই প্রকল্পের প্রধান গবেষক মো. মনিরুজ্জামান জানান, এই প্রযুক্তিতে কোনো প্রকার কৃত্রিম রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মাছের দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি এর গন্ধ, স্বাদ এবং মান চমৎকার রাখা সম্ভব।

তলদেশ পরিষ্কার ও অক্সিজেন সরবরাহ: এই পদ্ধতিতে ট্যাংকের বা জলাধারের তলদেশ সবসময় পরিষ্কার রাখা হয়। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ‘এয়ার ব্লোয়ার’-এর সাহায্যে পানিতে সবসময় অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়।

চাপমুক্ত মাছ ও দ্রুত বৃদ্ধি: পানিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকায় মাছ যেকোনো মানসিক চাপ বা ‘স্ট্রেস’ থেকে মুক্ত থাকে এবং অতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

অবিশ্বাস্য সময় সাশ্রয়: সাধারণ পদ্ধতিতে যে ক্যাটফিশ বা শিং মাছ চাষ করতে প্রায় ৭ মাস সময় লাগে, এই বটম ক্লিন প্রযুক্তিতে মাত্র ১২০ দিনেই (৪ মাস) কোনো ওষুধ ছাড়াই তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ও আহরণের উপযোগী হয়।

অধিক উৎপাদন: খুব কম জায়গায় এই প্রযুক্তিতে অধিক উৎপাদন সম্ভব। যেমন—শিং মাছের ক্ষেত্রে প্রতি ট্যাংকে ৮০ থেকে সর্বোচ্চ ১৩০ কেজি পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছে কোনো ধরনের কাদা বা স্যাঁতসেঁতে দুর্গন্ধ থাকে না, মাছের গায়ের রঙ অত্যন্ত উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয় এবং স্বাদ হয় চমৎকার। ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তির সাহায্যে টেংরা, গুলশা, পাবদা ও শিং মাছ চাষ করে ব্যাপক সফলতা পাওয়া গেছে।

ছাদেই হবে দুর্গন্ধহীন মাছের চাষ!

বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার’ প্রযুক্তির পরিচালন খরচ অত্যন্ত কম এবং এটি পরিচালনা করাও বেশ সহজ। এর ফলে শুধু বাণিজ্যিক খামারেই নয়, বরং ঢাকা বা যেকোনো শহরের বাড়ির ছাদে একটি শেডের ভেতরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিজেদের খাওয়ার জন্য শতভাগ গন্ধহীন ও তাজা মাছ উৎপাদন করা সম্ভব!

খুব শীঘ্রই মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে এই চমৎকার আধুনিক চাষ পদ্ধতি মাঠপর্যায়ের মৎস্য চাষি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গবেষকরা। আশা করা যায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই মেলবন্ধনে বাঙালির পাতের মাছ আবার তার হারিয়ে যাওয়া সুবাস ও অমৃত স্বাদ ফিরে পাবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

ফরিদপুরে ভাবিকে নিয়ে দুই ভাইয়ের সংঘর্ষ, থানা গেটে নারীসহ আহত ৫

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৭:১৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ভাবিকে নিয়ে দুই ভাইয়ের সংঘর্ষ, থানা গেটে নারীসহ আহত ৫

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক নারীকে কেন্দ্র করে দুই আপন ভাইয়ের মধ্যে টানাটানি, বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। থানা প্রাঙ্গণেই দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তিতে ৩ নারীসহ অন্তত ৫ জন আহত হয়েছেন। এই সময় নিজেকে সেনা কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে খবর সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত ও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে ভাঙ্গা থানার মূল ফটকের সামনে এ তুলকালাম কাণ্ড ঘটে।

​স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আলগী ইউনিয়নের বালিয়াচরা গ্রামের আজিজুল হকের বড় ছেলে একরাম আলী পার্শ্ববর্তী গ্রামের পূর্ণিমা নামের এক নারীকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। তবে বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই একরামের ছোট ভাই আব্দুল্লাহর সঙ্গে ভাবি পূর্ণিমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে বলে পরিবার ও প্রতিবেশীদের দাবি।

​অভিযোগ রয়েছে, গত বুধবার সকালে পূর্ণিমা স্বামীর ঘর থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার নিয়ে আব্দুল্লাহর সঙ্গে সাভারে আত্মগোপন করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে শনিবার সকালে পূর্ণিমার বাবা ও ভাই সাভারের একটি বাসা থেকে তাদের উদ্ধার করে আইনি ও সামাজিক সমাধানের উদ্দেশ্যে দুপুরে ভাঙ্গা থানায় নিয়ে আসেন। সেখানে দুই পক্ষের স্বজনরাও উপস্থিত ছিলেন।

​থানা প্রাঙ্গণে পৌছালে পূর্ণিমাকে নিজেদের কাছে রাখা নিয়ে দুই ভাই ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে তীব্র তর্কাতর্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে পূর্ণিমাকে দুই দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘাত বেঁধে যায়। এতে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে ৩ নারীসহ ৫ জন আহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং তাদের থানা এলাকা থেকে বের করে দেন।

​ঘটনার ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সংবাদকর্মীদের কাজে বাধা দেন সেনা কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি। তিনি স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। তবে তার আসল পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

​ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, থানা গেটের সামনে পারিবারিক কলহের জেরে হাতাহাতি হয়েছিল। পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত করে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশি তদারকি বাড়ানো হয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদপুর বদলের স্বপ্ন পলাশের, হচ্ছে ১৫ তলা ফাইভস্টার হোটেল-ক্রীড়া ভেন্যু

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৩ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর বদলের স্বপ্ন পলাশের, হচ্ছে ১৫ তলা ফাইভস্টার হোটেল-ক্রীড়া ভেন্যু

ফরিদপুর বদলের স্বপ্ন পলাশের, হচ্ছে ১৫ তলা ফাইভস্টার হোটেল-ক্রীড়া ভেন্যু। পাশাপাশি লেকপাড়ে বিনোদন পার্ক, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন, জেলা পরিষদের নিজস্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে ফরিদপুরকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর স্বপ্ন দেখছেন ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ।

দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই জেলা পরিষদের সম্ভাবনাময় বিভিন্ন সম্পদ ও উন্নয়ন প্রকল্পকে সামনে এনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তিনি। তার ভাষায়, সীমিত ক্ষমতা ও আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেও সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করা গেলে জেলা পরিষদকে মানুষের আস্থার একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের কর্মপরিকল্পনা, জেলা পরিষদের সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা এবং ফরিদপুরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন আফজাল হোসেন খান পলাশ। সেখানে উঠে আসে আধুনিক ফরিদপুর গড়ার একাধিক বড় পরিকল্পনার কথা।

জেলা পরিষদ প্রশাসক বলেন, অতীতে জেলা পরিষদের বরাদ্দ, সম্পদ এবং বিভিন্ন সুবিধা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানাশোনা ছিল সীমিত। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কী করছে এবং জনগণ কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছে, সে বিষয়েও অনেকের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন।

তার মতে, জেলা পরিষদের সম্পদ কেবল কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুবিধার জন্য নয়। এসব সম্পদ থেকে অর্জিত আয় এবং সরকারের বরাদ্দের সুফল জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ফরিদপুর জেলা পরিষদের কার্যক্রম শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়। জেলার ৮১টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কিত। তাই শহরের পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।

১৫ তলা আধুনিক ভবনের পরিকল্পনা:

ফরিদপুরের সবচেয়ে আলোচিত পরিকল্পনাগুলোর একটি হচ্ছে জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে বহুতল আধুনিক ভবন নির্মাণ। প্রস্তাবিত ১৫ তলা এই ভবনকে শুধু একটি প্রশাসনিক স্থাপনা হিসেবে নয়, বহুমুখী সুবিধাসংবলিত একটি আধুনিক কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা রয়েছে।

জেলা পরিষদ প্রশাসক জানান, প্রকল্পটির প্রাথমিক কারিগরি কাজ শুরু হয়েছে। ভবন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে সয়েল টেস্টের কার্যক্রম চলছে। এ লক্ষ্যে একটি বেসরকারি কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবনের নিচের কয়েকটি তলায় থাকবে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যালয়। পাশাপাশি কমার্শিয়াল স্পেস, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নির্ধারিত স্থান এবং আধুনিক অডিটোরিয়ামের ব্যবস্থা রাখা হবে।

উপরের অংশে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন সুবিধা। দেশি-বিদেশি অতিথি, খেলোয়াড় এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের অবস্থানের উপযোগী করে এই আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে।

আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, ফরিদপুরে বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের ক্ষেত্রে মানসম্মত আবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা। খেলাধুলার জন্য মাঠ বা ভেন্যু থাকলেও অতিথি ও খেলোয়াড়দের থাকার পর্যাপ্ত বিশ্বমানের ব্যবস্থা না থাকায় বড় আয়োজনের সুযোগ কমে যায়।

এই সংকট দূর করার লক্ষ্যেই বহুতল ভবনে উন্নতমানের আবাসন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে ফরিদপুরের অবকাঠামোগত সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ক্রীড়ার নতুন সম্ভাবনা:

আফজাল হোসেন খান পলাশের পরিকল্পনায় ক্রীড়া উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। তিনি মনে করেন, অবকাঠামো ও আবাসন সুবিধা বাড়ানো গেলে ফরিদপুরে বড় ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তার মতে, একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন শুধু খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, পর্যটন, হোটেল ব্যবসা, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং জেলার সামগ্রিক পরিচিতির বিষয়ও জড়িত।

ফলে মানসম্মত ক্রীড়া ভেন্যু এবং আধুনিক আবাসন অবকাঠামো গড়ে উঠলে ফরিদপুরকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া আয়োজনের একটি সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনাগুলো একদিনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সরকারের সহযোগিতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা। তবে কাজ শুরু না করলে কোনো বড় স্বপ্নই বাস্তব রূপ পায় না।

লেকপাড়ে আধুনিক পার্ক:

ফরিদপুর শহরের মানুষের বিনোদনের অন্যতম বড় চাহিদা মানসম্মত উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্র। সেই প্রয়োজন বিবেচনায় লেকপাড় এলাকায় আধুনিক পার্ক নির্মাণের কাজ চলছে।

জেলা পরিষদ প্রশাসক জানান, প্রকল্পটির একটি বড় অংশের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা গেলে শিশু-কিশোর, তরুণ এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হবে।

তিনি বলেন, প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনায় বড় অঙ্কের ব্যয় নির্ধারিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের ব্যয় ও পরিসর কমানো হয়। বর্তমানে যে কাজ চলছে, সেটি সীমিত বাজেটের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পরিকল্পনা পাওয়া গেলে পার্কটিকে আরও আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তার ভাষায়, পার্কটি শুধু বিনোদনের জায়গা হবে না। সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে এখান থেকে জেলা পরিষদের রাজস্বও বাড়বে। একই সঙ্গে নগরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ বিনোদন পরিবেশ তৈরি হবে।

শহরের সৌন্দর্যবর্ধনে উদ্যোগ:

ফরিদপুর পৌর এলাকার মধ্যে জেলা পরিষদের কাজ করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। কারণ, জেলা পরিষদের অধিকাংশ উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিস্তৃত।

তবে শহরে যেসব জায়গা জেলা পরিষদের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে রয়েছে, সেগুলোকে উন্নয়ন ও আয় বৃদ্ধির কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আফজাল হোসেন খান পলাশ জানান, জেলা পরিষদের বিভিন্ন জায়গা থেকে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকায় অস্থায়ী মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ তারই অংশ।

এ ছাড়া সার্কিট হাউস, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সরকারি বাসভবনসংলগ্ন এলাকায় জেলা পরিষদের মালিকানাধীন কিছু জায়গা রয়েছে। এসব স্থানে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে এ কাজে বরাদ্দ পাওয়া গেছে বলে জানান জেলা পরিষদ প্রশাসক। সেখানে বৃক্ষরোপণ, দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তার মতে, একটি শহরের উন্নয়ন শুধু বড় বড় ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সবুজায়ন, উন্মুক্ত স্থান এবং নাগরিকদের চলাচলের উপযোগী সুন্দর পরিবেশও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জনগণের টাকা জনগণের কল্যাণে’:

জেলা পরিষদের অতীত কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান আফজাল হোসেন খান পলাশ।

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহি এবং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই তার অন্যতম অগ্রাধিকার।

তার ভাষায়, অতীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে জেলা পরিষদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কঠোর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তিনি বলেন, দুর্নীতির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ যেন সঠিকভাবে ব্যয় হয় এবং সাধারণ মানুষ যেন তার সুফল পান, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে।

প্রশাসকের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি একটি সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে তুলতে চান বলে জানান।

বড় প্রতিষ্ঠানের সীমিত ক্ষমতা:

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোয় জেলা পরিষদের ভৌগোলিক পরিধি ব্যাপক হলেও বর্তমানে এর কার্যকরী ক্ষমতা ও আর্থিক স্বাধীনতা সীমিত বলে মনে করেন আফজাল হোসেন খান পলাশ।

তিনি বলেন, ফরিদপুর জেলা পরিষদের আওতায় ৮১টি ইউনিয়ন রয়েছে। এত বিস্তৃত এলাকায় উন্নয়ন ও জনসেবা নিশ্চিত করা সহজ নয়।

অথচ অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক ছোট প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি রয়েছে। জেলা পরিষদের একটি ছোট প্রকল্পের টেন্ডার সম্পন্ন করতেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

তিনি বলেন, অতীতের অনিয়মের কারণে বর্তমানে বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ফলে জেলা পরিষদকে অনেক সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।

তার মতে, ভবিষ্যতে নির্বাচিত জেলা পরিষদ গঠিত হলে স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও ক্ষমতাসম্পন্ন করার দাবি উঠতে পারে।

একসময় ছিল বিস্তীর্ণ দায়িত্ব:

জেলা পরিষদের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ। তিনি বলেন, একসময় এই অঞ্চলের সড়ক, অবকাঠামো এবং জনসেবার বড় একটি অংশ জেলা পরিষদের আওতায় পরিচালিত হতো।

বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থা গড়ে ওঠার ফলে জেলা পরিষদের অনেক দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে গেছে।

তারপরও প্রান্তিক মানুষের সহায়তায় জেলা পরিষদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

আলফাডাঙ্গার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার মানুষ প্রতিদিন জেলা পরিষদে আসেন নানা প্রয়োজনে। কেউ আর্থিক সহায়তার জন্য, কেউ সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে, আবার কেউ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতার আশায় আসেন।

তিনি বলেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ এখনও অনেক রয়েছে। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই জনবান্ধব জেলা পরিষদ গড়ে তুলতে চান তিনি।

সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিতি:

গত ৩১ মার্চ ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন আফজাল হোসেন খান পলাশ। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নিয়মিত সময়মতো অফিসে উপস্থিত থাকার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করেন তিনি। তার মতে, একজন প্রশাসকের সময়ানুবর্তিতা অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, দায়িত্ব একটি আস্থার বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা যথাসম্ভব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাই তার লক্ষ্য।

রাজনীতিতে ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় আফজাল হোসেন খান পলাশ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যুবদল ও কৃষকদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ফরিদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্বে রয়েছেন।

রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততাকে কাজে লাগিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

তার মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের আস্থা অর্জন করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আস্থা:

আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করছেন তিনি।

ফরিদপুর জেলা পরিষদকে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি কাজ করছেন বলে জানান।

তিনি বলেন, কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার সফলতা শুধু ঘোষণা দেওয়ার মধ্যে নয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ।

১৫ তলা আধুনিক ভবন, উন্নত আবাসন, ক্রীড়া আয়োজনের পরিবেশ, লেকপাড়ে আধুনিক পার্ক, সৌন্দর্যবর্ধন এবং প্রান্তিক মানুষের সেবা—সবগুলো পরিকল্পনাই সেই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে নেওয়া হয়েছে।

আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, ফরিদপুরের উন্নয়নের সম্ভাবনা অনেক। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং সম্পদের যথাযথ ব্যবহার।

তার ভাষায়, “জেলা পরিষদের সম্পদ জনগণের সম্পদ। এই সম্পদ থেকে সাধারণ মানুষ কতটা উপকার পাচ্ছেন, সেটাই আমাদের কাজের মূল মূল্যায়ন হওয়া উচিত।”

সীমিত ক্ষমতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাই বড় স্বপ্ন দেখছেন ফরিদপুর জেলা পরিষদের এই প্রশাসক। তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ফরিদপুরে যোগ হতে পারে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, বিনোদন, ক্রীড়া এবং আতিথেয়তা খাতে নতুন সম্ভাবনা।

স্বপ্ন এখন বাস্তবতার পথে কতদূর এগোয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা। তবে দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই ফরিদপুরকে নতুনভাবে সাজানোর যে রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন, তা নিয়ে ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সালথায় ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে ১২ বসতঘরে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ

ফরিদপুর ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৫:২৭ অপরাহ্ণ
সালথায় ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে ১২ বসতঘরে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ

ফরিদপুরের সালথায় উপজেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতির নেতৃত্বে কয়েকটি গ্রামের লোকজনের বিরুদ্ধে ১০ থেকে ১২টি বসতঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের জুগিকান্দা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সালথা উপজেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি রাজিব হোসেনের নেতৃত্বে মুরাটিয়া, সজনকান্দা ও জুগিকান্দা গ্রামের লোকজন ওই হামলায় অংশ নেন। এতে কয়েকটি বসতঘর ও একটি মুদি দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। কোনো কোনো ঘরে আগুন দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

জুগিকান্দা গ্রামের বাসিন্দা ধলেনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ঘরের ভেতরে যা কিছু ছিল, সব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। আমার মেয়েকে খাটের নিচ থেকে টেনে বের করে আনা হয়েছে। আমার স্বামী অনেক দিন ধরে গ্রামছাড়া। আমি একা থাকি। এখন রাতে থাকার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই।

তিনি আরও বলেন, তাঁদের মুদি দোকান থেকেও টাকা-পয়সা ও বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর আগেও তাঁদের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। তখন ভিডিও ধারণ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

আরেক ভুক্তভোগী রওসান মাতুব্বরের স্ত্রী সোখিনা বলেন, আগের একটি বিরোধের জেরে তাঁর স্বামী বাড়িতে থাকেন না। জাহিদ নামে একজন তাঁর স্বামীকে গালিগালাজ ও বাজারে গেলে দেখে নেওয়ার হুমকি দিতেন। স্বামীকে মারধরের আশঙ্কায় তাঁকে বাড়ির বাইরে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সোখিনা বলেন, মুরাটিয়া, সজনকান্দা ও জুগিকান্দা গ্রামের লোকজন এসে বাড়িঘরে ভাঙচুর করেছে। আমার স্বামীকে মারধর করা হয়েছে। ঘরে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুর করা হয়েছে। আমার ছোট ছেলেকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় উপজেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি রাজিব হোসেনের সঙ্গে সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগের ইউনিয়ন সভাপতি হিমায়েত হোসেন, জাহিদ, রফিক ও ইবাদতসহ কয়েকজন জড়িত ছিলেন।

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, বশির মাতুব্বরের দুটি, বাবলু মাতুব্বরের একটি, আবুল খায়েরের একটি, ইদ্রিস মাতুব্বরের একটি, মিজান মাতুব্বরের একটি, আজিজুল মাতুব্বরের একটি, রওসান মাতুব্বরের একটি এবং তুরাপ মাতুব্বরের একটি বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ছাড়া মামুন মাতুব্বরের একটি ঘর ও একটি খড়ের গাদা ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সালথা উপজেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি রাজিব হোসেন বলেন, ওরা গতকালকে জামিন পেয়েছে। আমার একজন লোক খেলা দেখতে যাওয়ার পথে রওসানের বাড়ির সামনে জাহিদ তাঁকে মারধর করে। জাহিদ খবর দেওয়ার পর গ্রামের কিছু লোক এসে এই কাজ করেছে। ওই দলের নেতৃত্বে আমি আছি, এটা ঠিক। আমার নামটাই উঠবে, এটাই স্বাভাবিক।

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবলুর রহমান বলেন, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।