খুঁজুন
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

এআই-নির্ভর অপতথ্য কীভাবে নির্বাচনকে বিপর্যস্ত করতে পারে?

সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৭ এএম
এআই-নির্ভর অপতথ্য কীভাবে নির্বাচনকে বিপর্যস্ত করতে পারে?

নির্বাচন শুধু ব্যালটের লড়াই নয়, এটি বিশ্বাসের পরীক্ষা। ভোটার যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তখন তিনি ধরে নেন- যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা সত্য। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্বাসটাই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে। নির্বাচনী নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে নীরবে কাঁপিয়ে দিচ্ছে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও, অডিও ও ছবি- যাকে আমরা ডিপফেক বলি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে যে অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে, তা এক কথায় উদ্বেগজনক। অপতথ্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু এআই অপতথ্যকে দিয়েছে ভয়ংকর গতি, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিস্তার। আগে একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত; এখন কয়েক মিনিটেই তা লাখো মানুষের স্ক্রিনে পৌঁছে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে ভোটার আচরণ, প্রার্থীর ভাবমূর্তি এবং পুরো নির্বাচনী পরিবেশের ওপর।

ডিপফেক মূলত ডিপ লার্নিংভিত্তিক এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, যা দেখতে ও শুনতে একদম আসল সত্যের মতো। যেমন- কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলছেন বা এমন কাজ করছেন- ভিডিওতে তা স্পষ্ট দেখা যায়- কিন্তু বাস্তবে তিনি কখনোই তা করেননি। এখানেই বিপদ। মানুষ চোখে দেখা জিনিসকে সহজে বিশ্বাস করে। লেখা বা পোস্টের তুলনায় ভিডিওর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি।

ডিপফেকের পাশাপাশি আছে চিপফেক- এআই নয়, বরং সস্তা সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি বিকৃত কনটেন্ট। সত্য ভিডিও বা ছবি কেটে-ছেঁটে, প্রসঙ্গ বদলে, ভুল ক্যাপশন জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। ফলাফল প্রায় একই- ভোটার বিভ্রান্ত হয়, সত্য আড়ালে চলে যায়।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-১ আসনের একটি ঘটনা বাংলাদেশের ডিপফেক বাস্তবতার ভয়াবহ দিকটি সামনে আনে। ভোটের দিন সকালে এক প্রার্থীর ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলতে দেখা যায়। অনেক ভোটার বিভ্রান্ত হন। নির্বাচন এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল; তার ওপর এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর অপতথ্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা- সবখানেই নির্বাচনে ডিপফেক ব্যবহারের নজির আছে। কোথাও ভোটারদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কোথাও প্রার্থীর চরিত্র হনন করা হয়েছে, কোথাও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে।

সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম এখন ভিডিও। গ্রাফিকস, ছবি বা লিখিত পোস্টের তুলনায় ভিডিও অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ ভিডিও আবেগে আঘাত করে, দ্রুত বিশ্বাস তৈরি করে এবং শেয়ার হয় বেশি। বাংলাদেশে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্যের হার চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একই মিথ্যা ভিডিও বা বক্তব্য একযোগে বহু পেইজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হচ্ছে। এটিই সংঘবদ্ধ অপপ্রচার। এখানে ব্যক্তি নয়, কাজ করছে নেটওয়ার্ক- যাকে অনেকে বলেন বটবাহিনী।

এআই অপতথ্য এতটা কার্যকর হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো ডিজিটাল লিটারেসির দুর্বলতা। বাংলাদেশের বড় অংশের মানুষ এখনো জানেন না কীভাবে অনলাইনের তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে আসল-নকল আলাদা করতে হয়। ফলে ডিপফেক বা চিপফেক সহজেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

সমস্যা আরও গভীর, যখন দেখা যায় রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি এমনকি কিছু গণমাধ্যমও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো যাচাইহীন তথ্যকে সত্য ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন বা প্রকাশ করছেন। এতে অপতথ্যের বৈধতা যেন আরো বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ তখন ধরে নেন- নেতা বা মিডিয়া বললে নিশ্চয়ই সত্য।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে মূলত দুই ধরনের গোষ্ঠী কাজ করে। একদল রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে উৎসাহিত। তাদের লক্ষ্য ক্ষমতা, প্রভাব বা প্রতিশোধ। অন্য দলটি অর্থের বিনিময়ে কাজ করে- এটি তাদের কাছে একটি ব্যবসা। এ ছাড়া রয়েছে ভুয়া পরিচয়ের অসংখ্য পেইজ ও অ্যাকাউন্ট, যেগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে। একটি মিথ্যা তথ্য আগে ছড়ানো হয়, তারপর সেটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে একই কনটেন্ট বারবার পোস্ট করা হয়। অ্যালগরিদম তখন সেটিকে ‘ট্রেন্ডিং’ মনে করে আরো ছড়িয়ে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে বসেও বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এতে দেশের ভেতরের পরিস্থিতি আরো অস্থির হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ডিপফেক এবং এআই অপতথ্যকে শুধু নির্বাচনী সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। কারণ এর মাধ্যমে—

• ভোটারদের ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা যায়

• সহিংসতা উসকে দেয়া যায়

• রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নষ্ট করা যায়

• নির্বাচন পরবর্তী অস্থিরতা তৈরি করা যায়

বিশ্বের কিছু দেশে ডিপফেক ও সাইবার আক্রমণের কারণে নির্বাচন পেছানোর নজিরও আছে। অর্থাৎ এটি শুধু তথ্যযুদ্ধ নয়, এটি গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে একটি নীরব যুদ্ধ।

বাংলাদেশে অপতথ্য মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে সাইবার নজরদারি, ফ্যাক্টচেকিং, বিশেষ সেল গঠন ইত্যাদি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই উদ্যোগগুলো কি বাস্তব ঝুঁকির তুলনায় যথেষ্ট? ডিপফেক প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি আমাদের সক্ষমতা বাড়ছে? অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, নজরদারি থাকলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। অপতথ্য ছড়ানোর পর ব্যবস্থা নেয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কয়েকটি বিষয় নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে-

• ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবাইকে শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে সন্দেহ করতে হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত কর্মসূচি নেয়া জরুরি।

• রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য অপতথ্যকে হাতিয়ার করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার।

• গণমাধ্যমকে আরো সতর্ক হতে হবে। সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট যাচাই ছাড়া প্রকাশ করলে মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

• আইনি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদার করতে হবে। ডিপফেক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

এআই নিজে কোনো শত্রু নয়। এটি একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। কিন্তু নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে এআই যদি অপতথ্যের অস্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। আজ যদি আমরা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিই, কাল এর ফল হবে ভয়াবহ। নির্বাচন মানে শুধু ক্ষমতা বদল নয়, এটি নাগরিকের বিশ্বাসের প্রতিফলন। সেই বিশ্বাস ভাঙলে রাষ্ট্রই দুর্বল হয়। তাই ডিপফেক এবং এআই অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর কোনো বিকল্প ইস্যু নয়- এটি গণতন্ত্র রক্ষার মূল লড়াই।

সিরাজুল ইসলাম : লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সালথা উপজেলা শাখার উদ্যোগে ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সোমবার (৯ মার্চ) বিকেলে সালথা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় মুসল্লি, আলেম-ওলামা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রমজানের তাৎপর্য ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা এবং মিলনমেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. তরিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মাওলানা আবুল ফজল মুরাদ।

আলোচনা সভায় প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা মাহে রমজানের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, রমজান কেবল রোজা পালনের মাসই নয়, এটি আত্মসংযম, ধৈর্য, ত্যাগ ও নৈতিকতার অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। রমজানের শিক্ষা ব্যক্তি জীবনকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বক্তারা আরও বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ফরিদপুর জেলা জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি মাওলানা মিজানুর রহমান, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা সোহরাব হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বকুল মিয়া, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের সুরা সদস্য ও তালমা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. এনায়েত হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা মাহবুব হোসেন, ঢাকা মহানগরীর মুহাম্মদপুর থানা জামায়াতের সুরা সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা মুহাম্মদ সাইফুর রহমান হিটু।

এ ছাড়া উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি চৌধুরী মাহবুব আলী সিদ্দিকী নসরু, সালথা প্রেসক্লাবের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে উপস্থিত সকলের অংশগ্রহণে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৪ পিএম
১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এ বিষয়ে সোমবার (৯ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার (পশ্চিম) কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তিনি বিধি অনুযায়ী সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দুটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণের গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে তিনি ফৌজদারী মামলা দুটির অভিযোগ থেকে আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে খালাস পান।

এছাড়া তার গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করায় আরোপিত চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়। তাই কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে তার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হলো এবং তিনি বিধি মোতাবেক সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

 

 

বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও লাবলু মিয়া, সালথা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৯ পিএম
বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। নেই কোনো ঘর, নেই আধুনিক সেলুনের ঝাঁ চকচকে সাজসজ্জা। তবু এই পুকুরপাড়েই প্রতিদিনের মতো বসে মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর—এই সামান্য সরঞ্জাম নিয়েই তিনি টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামেও এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য সেলুন। উন্নত চেয়ার, আয়না, বৈদ্যুতিক ট্রিমার আর সাজানো দোকান—সবই আছে সেখানে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারের এই পুকুরপাড়ে বসা বৃদ্ধ নাপিতের কাছে এখনও ভিড় করেন অনেকেই। কারণ তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের স্মৃতি, বিশ্বাস আর গ্রামীণ জীবনের এক সরল অধ্যায়।

শৈশবেই পেশায় যুক্ত:

অকিল শীলের বাড়ি পাশের নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তাঁর পিতা হরিবদন শীল ছিলেন পেশায় নাপিত। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে তিনি এই কাজ শেখেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই কৈশোরেই জীবিকার তাগিদে পেশাটিকে বেছে নিতে হয় তাকে।

প্রথমদিকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নিজেই কাজ শুরু করেন। প্রায় ৬৬ বছর আগে মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে বসেই তিনি নিজের কর্মজীবনের যাত্রা শুরু করেন। সেই শুরু থেকে আজও একই জায়গায় বসেই কাজ করে যাচ্ছেন অকিল শীল।

হাটের দিনেই জমে ওঠে সেলুন:

মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। সাধারণত হাটের দিন সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে চলে আসেন অকিল শীল। সঙ্গে থাকে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি, পুরোনো কাঁচি, ক্ষুর আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

পুকুরপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসেই শুরু হয় তাঁর দিনের কাজ। গ্রামের মানুষজন একে একে এসে বসেন তাঁর সামনে। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে থাকেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে কাঁচি চালিয়ে চুল কাটছেন তিনি। মাঝে মাঝে ক্ষুর দিয়ে দাড়িও ছেঁটে দেন।

এই পুকুরপাড়ের ছোট্ট জায়গাটিই যেন তাঁর সেলুন, আবার কর্মজীবনের স্মৃতিবহ স্থান।

গ্রাহকদের কাছে প্রিয় ‘অকিল দা’:

স্থানীয় অনেকেই এখনও আধুনিক সেলুন ছেড়ে অকিল শীলের কাছেই চুল কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বৃদ্ধ নাপিতের সঙ্গে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, “আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকে অকিল দার কাছেই চুল কাটাই। এখন বয়স হয়েছে, তবু তাঁর হাতের কাঁচির ওপর ভরসা আছে।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “ওনার কাছে ধনী-গরিব সবাই চুল কাটান। কেউ তাকে অবহেলা করে না। বরং অনেকেই গল্প করতে করতে চুল কাটান। ওনার কাছে চুল কাটাতে অন্যরকম একটা আনন্দ আছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, অকিল শীল শুধু একজন নাপিত নন, তিনি যেন বাজারের একটি জীবন্ত ইতিহাস।

সামান্য আয়েই চলে সংসার:

অকিল শীল জানান, বর্তমানে তিনি প্রতি জনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তাঁর কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই হিসেবে প্রতিদিন খুব বেশি আয় হয় না।

তবুও এই সামান্য আয়ের ওপরই ভর করে তিনি নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন অনেক সেলুন হয়েছে, তবুও পুরোনো গ্রাহকেরা আসে।”

বয়সের কারণে কাজ করা কঠিন হলেও তিনি এখনো থামতে চান না।

অকিল শীল বলেন, “বয়স তো অনেক হয়েছে। শরীরও আগের মতো শক্তি পায় না। কিন্তু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। তাই যতদিন পারি কাজ করেই যেতে চাই।”

পরিবারের কেউ নেননি পেশা:

অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে তাঁদের কেউই বাবার পেশাকে অনুসরণ করেননি। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো জোর করিনি। তারা যার যার মতো কাজ করছে। আমি আমার কাজ নিয়েই খুশি।”

তবে তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ কর্মযাত্রা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক প্রতীক:

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড় মানেই অকিল শীল। বহু বছর ধরে তিনি এই জায়গাটিকে নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একসময় গ্রামে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসে নাপিতেরা মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন। আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারে এখনও সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন অকিল শীল।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি উনি এখানে বসে চুল কাটছেন। বাজারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, দোকানপাট বেড়েছে, কিন্তু উনার জায়গা বদলায়নি।”

কাঁচির টুংটাং শব্দে লেখা জীবনের গল্প:

পুকুরপাড়ে বসে কাঁচির টুংটাং শব্দ তুলতে তুলতে যেন নিজের জীবনের গল্পই লিখে চলেছেন অকিল শীল।

গ্রামীণ জীবনের সরলতা, পরিশ্রম আর আত্মমর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। বয়সের ভার, আধুনিকতার চাপ—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

হাটের দিনগুলোতে এখনো মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে দেখা যায় সেই পরিচিত দৃশ্য—একটি ছোট পিঁড়ি, হাতে কাঁচি ও ক্ষুর, আর সামনে বসা গ্রাহক।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও, অকিল শীল যেন এখনো ধরে রেখেছেন সেই পুরোনো দিনের গল্প। তাঁর কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে গ্রামীণ বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।