খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে আট মাস ধরে বিদ্যুৎহীন দেড় হাজার পরিবার

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে আট মাস ধরে বিদ্যুৎহীন দেড় হাজার পরিবার

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নে প্রায় আট মাস ধরে বিদ্যুৎ নেই। নদীর তলদেশ দিয়ে স্থাপন করা সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। নষ্ট হচ্ছে ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পদ্মাবেষ্টিত দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নে নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আট মাস আগে ক্যাবল ছিঁড়ে যায়। ফলে পুরো ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আট মাস পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা হয়নি। বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয়রা চরম বিপাকে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

ইউনিয়নের নন্দলালপুর গ্রামের বাসিন্দা নয়ন শেখ বলেন, আট মাস ধরে আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। দৈনন্দিন নানা কাজে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। গরমে কষ্ট হচ্ছে। আমরা অবিলম্বে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার দাবি জানাই।

একই গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। টেলিভিশন, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আট মাস ধরে এভাবে চলতে থাকায় আমরা খুব কষ্টে আছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত সমস্যার সমাধান করে আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হোক।

দিয়ারা নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন বলেন, সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আমরা চাই, দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা হোক।

সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের জানিয়েছে, পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে তলদেশে ক্যাবল লাইনে সংযোগ দিতে বিলম্ব হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর বিষয়ে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছি।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর দোহার জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) খায়রুল বাকী খান বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য স্থাপিত সাবমেরিন ক্যাবলটি অনেক পুরোনো হওয়ায় পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। নদীর তলদেশে প্রবল স্রোত থাকায় আপাতত নতুন করে ক্যাবল স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আশা করছি, আগামী নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন করে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে।

ইহকাল-পরকালে মায়ের খিদমতের উপকারিতা

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫০ অপরাহ্ণ
ইহকাল-পরকালে মায়ের খিদমতের উপকারিতা

পৃথিবীতে ব্যবহৃত সবচেয়ে মধুর শব্দ ‘মা’। যে ভাষায়ই হোক না কেন, মাকে সম্বোধন করতে মানুষ যে শব্দ ব্যবহার করে, সেটিই তার কাছে সবচেয়ে মধুর।মা মহান আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। পৃথিবীতে সন্তানের প্রতি সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ ও মমতার প্রতীক হলেন মা

ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে এত উঁচু স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে যে, আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গে মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশও দিয়েছেন। যে ব্যক্তি মায়ের খিদমত করে, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান, বরকত ও সফলতার দ্বার খুলে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না।

আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।” (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ২৩)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, “আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই।” (সুরা লুকমান, আয়াত ১৪)।

এ কারণেই ইসলামে মায়ের অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার উত্তম সঙ্গ লাভের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি বলল, ‘অতঃপর কে?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘তোমার মা।’ সে বলল, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি বলল, ‘অতঃপর কে?’ তিনি বললেন, ‘অতঃপর তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৭১)।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মায়ের খিদমত ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। মায়ের খিদমত মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধিরও মাধ্যম। ইতিহাসে বহু মনীষী ও আল্লাহর প্রিয় বান্দার জীবনে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেঈ উওয়াইস আল-কারনী (রহ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জীবিত থাকা সত্ত্বেও মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে মদিনায় এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। কিন্তু মাতৃসেবার বরকতে তিনি এমন মর্যাদা লাভ করেছিলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে তাঁর কাছে দোয়া চাইতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৪২—প্রচলিত নম্বরায়নে)।

এ থেকে বোঝা যায়, মায়ের খিদমত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। এটি দুনিয়া ও আখিরাতে সন্তানের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক। মায়ের খিদমতের অন্যতম বড় প্রতিদান হলো জান্নাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে জান্নাত।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস ৩১০৪—নম্বরায়ন সংস্করণভেদে ভিন্ন হতে পারে)।

অর্থাৎ মায়ের সন্তুষ্টি ও সেবার মধ্য দিয়ে জান্নাতের পথ সুগম হয়। যে সন্তান মায়ের সেবা করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশা করতে পারে এবং তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ হওয়ার প্রত্যাশা করা যায়। তা ছাড়া মা-বাবার দোয়া সন্তানের জন্য বিশেষ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। যে সন্তান মা-বাবার হৃদয় জয় করতে পারে, সে আল্লাহর রহমত ও মানুষের ভালোবাসা লাভের আশা রাখে। সমাজে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং জীবনে বরকত আসতে পারে। অন্যদিকে মাকে কষ্ট দেওয়া, তাঁর অবাধ্য হওয়া বা তাঁর অধিকার নষ্ট করা ইসলামে গুরুতর পাপ।

আজকের ব্যস্ত ও স্বার্থকেন্দ্রিক সমাজে অনেক সময় বৃদ্ধ মায়েরা অবহেলার শিকার হন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এমন ঘটনাও ঘটে যে বৃদ্ধ মায়েরা নিজ ঘরে মৃত্যুবরণ করার পর দীর্ঘ সময় অবহেলিত পড়ে থাকেন, অথচ সন্তানদের কোনো খোঁজ থাকে না। অথচ মায়ের খিদমত শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি মহান ইবাদত। তাঁর পাশে বসা, কথা শোনা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, প্রয়োজন পূরণ করা এবং স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা—সবই সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং একজন মুমিনের উচিত মায়ের জীবদ্দশায় যথাসাধ্য তাঁর খিদমত করা এবং মৃত্যুর পর তাঁর জন্য দোয়া করা ও শরিয়তসম্মত সদকা ও নেক আমলের মাধ্যমে তাঁর উপকারের চেষ্টা করা। যে ব্যক্তি মায়ের সেবা করে, আল্লাহর কাছে তার জন্য মানুষের অন্তরে সম্মান, জীবনে বরকত এবং আখিরাতে জান্নাত লাভের আশা করা যায়। তাই মায়ের খিদমত শুধু পারিবারিক কর্তব্য নয়; এটি সম্মান, সফলতা ও নাজাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মহান আল্লাহ সবাইকে সুবুদ্ধি দান করুন। আমিন।

ফরিদপুরে গণঅধিকার পরিষদের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:১৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে গণঅধিকার পরিষদের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

ফরিদপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি)-এর ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় ফরিদপুর প্রেসক্লাবে জেলা গণঅধিকার পরিষদের উদ্যোগে কেক কাটা ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফরিদপুর জেলা গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি মো. ফরহাদ হোসেন। সঞ্চালনা করেন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুবেল শেখ।

আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জেলা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ফিরোজ শেখ, মনির চৌধুরী, জিয়া খান, আলমগীর শিকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ জাহিদ হাসান, দপ্তর সম্পাদক আলামিন হোসেন লিখন, জেলা যুব অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাইজিদ হোসেন বিপুল, জেলা শ্রমিক অধিকার পরিষদের সহসভাপতি সোহেল খান, বোয়ালমারী উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি আলিমুজ্জামান বাবলু শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মুন্না।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সালথা উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম মোল্যা (ইমরান), ফরিদপুর সদর উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সদস্যসচিব রাজু আহম্মেদসহ বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিটের নেতাকর্মীরা।

আলোচনা সভায় বক্তারা গণঅধিকার পরিষদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, আদর্শ, সাংগঠনিক অগ্রযাত্রা এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।

পরে কেক কাটার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

ফরিদপুরের দাদুড়িয়া বিলে পলো উৎসব: আনন্দ ছড়ালেও মাছে আকাল, হতাশ শিকারিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের দাদুড়িয়া বিলে পলো উৎসব: আনন্দ ছড়ালেও মাছে আকাল, হতাশ শিকারিরা

হাতে পলো, হুসা আর জাল। ভোরের আলো ফুটতেই বিলের পানিতে একসঙ্গে নেমে পড়লেন শত শত মানুষ। কারও চোখে মাছ ধরার আনন্দ, কারও মনে শৈশবের স্মৃতি। পানিতে পলো চাপিয়ে মাছ ধরার চিরচেনা দৃশ্য আর বিলপাড়ের উচ্ছ্বাসে ফিরে এসেছিল গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। তবে উৎসবের আমেজ ভরপুর থাকলেও জালে মাছ মেলেনি প্রত্যাশা অনুযায়ী। ফলে খালি হাতে ও হতাশা নিয়েই ফিরতে হয়েছে অনেক শিকারিকে।

​সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিলে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এই ‘পলো বাওয়া’ উৎসব। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা শত শত মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো বিল এলাকা। মাছ ধরার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমান কৌতূহলী দর্শনার্থীরাও।

​চতুল, ধুলপুকুরিয়া, দুর্গাপুর, তেলজুড়ি, নিধিপুর, পোয়াইল, বাবুর বাজার, শেখর, রাজাপুর, কলারণ, মধ্যেরগাতি, ছোলনা, গুনবহা, কুশাডাঙ্গা, লোকনাথ ও আঁধারকোঠাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ অংশ নেন উৎসবে। মাছ ধরার পাশাপাশি চলে হাসি-আড্ডা, স্মৃতিচারণ আর পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মেলবন্ধন।

​পলো বাওয়া কেবল মাছ ধরার একটি আয়োজন নয়; এটি গ্রামীণ জনপদের লোকজ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার এক অনন্য উপলক্ষ। প্রবীণদের কাছে এটি পুরোনো দিনের সোনালী স্মৃতির রোমন্থন, আর নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।

​আয়োজক কুশাডাঙ্গা গ্রামের ইমরান শেখ বলেন, “পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখা এবং বর্তমান প্রজন্মকে পলো বাওয়ার ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করাতেই এ আয়োজন। বিভিন্ন এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। নতুন প্রজন্ম যেন শুধু মোবাইলের পর্দায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃতি, বিল-ঝিল, দেশীয় মাছ ও গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, সেই ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগ। ভবিষ্যতেও আমরা এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই।”

​তবে উৎসবের আনন্দের মাঝেও সুর কেটেছে মাছের স্বল্পতায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিকারিদের অনেকেই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

​গুনবহা গ্রামের মিকাইল বলেন, “বাবা-দাদার সময়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পলো ও হুসা নিয়ে বিলে এসেছিলাম। তবে আশানুরূপ মাছ পাইনি। চায়না দুয়ারি জালের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে আজ দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে। এভাবে চলতে থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঐতিহ্যটি ধরে রাখা কঠিন হবে।”

​আলফাডাঙ্গা থেকে প্রায় ১৫ বছর পর দাদুড়িয়া বিলে মাছ ধরতে এসেছিলেন আজিজুল ফকির। পুরোনো দিনের স্মৃতি আর মাছ ধরার বড় প্রত্যাশা থাকলেও এবার সাফল্য মেলেনি। তার ধারণা, চায়না দুয়ারি জালের অপরিকল্পিত ব্যবহারই মাছ কমে যাওয়ার মূল কারণ।

​অন্যান্য শিকারিদের মতে, চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার, বিলের মধ্যে অপরিকল্পিত পুকুর তৈরি এবং কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োগ দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

​এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পবিত্র কুমার দাস জানান, দেশীয় মাছের সংকট নিয়ে তাঁদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো জরিপ নেই। তবে মাছের প্রজনন ও পোনা রক্ষায় সূক্ষ্ম ফাঁসের জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। লোকবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি।

​স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন কার্যকর উদ্যোগ নেবে। একইসঙ্গে মাছের প্রকৃত অবস্থা জানতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপ ও নিয়মিত নজরদারি।

​দাদুড়িয়া বিলের এই পলো উৎসব আবারও প্রমাণ করেছে, গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও আগ্রহ এখনো ফুরিয়ে যায়নি। মাছ কম পাওয়ার হতাশা থাকলেও শেকড়কে আঁকড়ে ধরে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার এই প্রত্যয়ই হয়ে উঠেছে উৎসবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।