খুঁজুন
, ,

‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

বর্ষার আগের সেই গুমট বিকেলগুলো আজও মাঝে মাঝে হঠাৎ ফিরে আসে। দূরের আকাশে কালো মেঘ জমে, তালগাছের মাথা দুলে ওঠে, আর দক্ষিণা বাতাস কেমন যেন পুরোনো দিনের গন্ধ বয়ে আনে। মনে হয়, এই তো একটু পরেই গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটে আসবে আমার সেই বন্ধুরা—রফিক, কালাম, জসিম, নুরু কিংবা ছোট্ট বাবলু। কেউ হাতে বাঁশের লাটিম, কেউবা পুরোনো ফুটবল, কেউ আবার গামছা কাঁধে নিয়ে ছুটে আসবে নদীর ঘাটে।

কিন্তু না, সময় বদলেছে। সেই বন্ধুরা আজ আর নেই। কেউ শহরের ইট-পাথরের জীবনে হারিয়ে গেছে, কেউ বিদেশের ব্যস্ততায় ডুবে আছে, কেউবা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। তবুও গ্রামের বাতাসে আজও তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসে।

আমাদের গ্রামটার নাম ছিল খোয়াড়। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে সরু মেঠোপথ, আর গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদী ‘মালঞ্চ’। ভোর হলে নদীর ঘাটে কুয়াশা নেমে আসত। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ শোনা যেত। আর আমরা তখন ঘুম ভেঙে দৌড়ে বেরিয়ে পড়তাম মাঠের দিকে।

শৈশবের দিনগুলো কত সহজ ছিল! তখন সুখ মানে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে ফুটবল খেলা। আনন্দ মানে ছিল বর্ষার জলে ভিজে বাড়ি ফেরা। কষ্ট মানে ছিল মা বকাঝকা করে খেলতে যেতে না দেওয়া।

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রফিক। খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। কিন্তু হাসতে শুরু করলে পুরো আকাশ কেঁপে উঠত। ওর বাবা ছিলেন জেলে। ভোরে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। মাঝে মাঝে রফিকও যেত বাবার সঙ্গে। স্কুলে এসে আমাদের গল্প করত—কীভাবে নদীর মাঝে জোৎস্না পড়ে চিকচিক করে, কীভাবে মাঝরাতে হঠাৎ বড় মাছ জালে ধরা পড়ে।

একদিন বর্ষাকালে আমরা সবাই মিলে নদীতে নেমেছিলাম। আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমরা কেউ কচুরিপানার ভেলায় চড়েছি, কেউ সাঁতার কাটছি। হঠাৎ রফিক বলল, —“দেখিস, একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”

তখন কথাটার মানে বুঝিনি। আজ বুঝি, নদী সত্যিই আমাদের ভুলে যায়নি। বরং আমরাই নদীকে ফেলে চলে গেছি।

বিকেল হলেই গ্রামের বটতলায় আড্ডা বসত। কালাম ছিল সবচেয়ে দুষ্টু। ও ছাড়া কোনো খেলাই জমত না। কখনো কারও গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে আনত, কখনো গোপনে কারও পুকুরে ঝাঁপ দিত। একবার মেম্বার সাহেবের বাগান থেকে লিচু পেড়ে এনে সবাইকে খাইয়েছিল। পরে ধরা পড়ে এমন দৌড় দিয়েছিল যে আমরা হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করে ফেলেছিলাম।

শীতের সকালে আমরা খেজুরের রস খেতে যেতাম। গ্রামের শেষ মাথায় ছিল ভোলা মোল্যা কাকার খেজুর গাছ। ভোরে তিনি হাঁড়ি নামাতেন। আমরা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তিনি হেসে বলতেন, —“এই পোলা-পাইনগুলা আবার আইছে!”

তারপর কাঁচা মাটির ভাঁড়ে রস ঢেলে দিতেন। সেই রসের স্বাদ আজও পৃথিবীর কোনো দামী পানীয়তে পাইনি।

আমাদের গ্রামের স্কুলটাও ছিল খুব মায়াময়। টিনের ছাউনি, সামনে বিশাল মাঠ, আর পাশে একটা পুরোনো কড়ই গাছ। গরমের দুপুরে ক্লাস করতে করতে বাইরে তাকালে দেখা যেত মাঠের ওপরে সাদা বক উড়ছে। মাঝে মাঝে মন চাইলেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমরা চলে যেতাম নদীর ধারে।

একদিন স্কুল পালিয়ে আমরা সবাই মিলে মেলায় গিয়েছিলাম। সে এক অন্যরকম আনন্দ! বাঁশির শব্দ, নাগরদোলা, বাতাসে জিলাপির গন্ধ। বাবলু একটা কাঠের বাঁশি কিনেছিল। সারাদিন সেটা বাজিয়ে পুরো গ্রাম মাথায় তুলেছিল।

সন্ধ্যা নামলে গ্রামের পরিবেশ বদলে যেত। পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ত। বাড়ি বাড়ি কুপি জ্বলত। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত। আমরা তখনও মাঠে খেলতাম। মায়ের ডাক শুনেও ফিরতাম না। শেষে বাবা লাঠি হাতে বের হলে দৌড়ে বাড়ি ফিরতাম।

আমার মা প্রায়ই বলতেন, —“এই সময়গুলা একদিন আর পাইবা না।” তখন মনে হতো মা বুঝি অকারণেই এসব বলেন। কিন্তু আজ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুঝি, মা ভুল বলেননি।

সময় খুব নিঃশব্দে মানুষকে বদলে দেয়। এসএসসি পাশ করার পর একে একে সবাই ছড়িয়ে গেল। কেউ কলেজে, কেউ কাজে, কেউ দূর শহরে। গ্রামের আড্ডা ফাঁকা হতে লাগল।

প্রথমে কালাম গেল ঢাকায়। গার্মেন্টসে চাকরি নিল। কিছুদিন পর শুনলাম বিদেশে চলে গেছে। তারপর বাবলু। সে নাকি চট্টগ্রামে ব্যবসা শুরু করেছে। জসিম পুলিশে চাকরি পেল। রফিকই শুধু গ্রামে ছিল।

বহু বছর পর এক বর্ষার দিনে আমি গ্রামে ফিরলাম। চারদিকে সবকিছু যেন একই আছে, অথচ কোথাও যেন আগের সেই প্রাণ নেই। নদীর ঘাট আছে, কিন্তু সেখানে আর কিশোরদের হাসির শব্দ নেই। মাঠ আছে, কিন্তু সেখানে আর বিকেলের ফুটবল খেলা হয় না। বটগাছ আছে, কিন্তু তার নিচে আর আড্ডা বসে না।

আমি হাঁটতে হাঁটতে রফিকদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে শুনলাম, বছর দুয়েক আগে নদীতে ঝড়ের রাতে নৌকা ডুবে সে মারা গেছে।

খবরটা শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হলো, আমার শৈশবের একটা বড় অংশ যেন নদীর জলে ভেসে চলে গেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় আমি একা নদীর ধারে গিয়ে বসেছিলাম। আকাশে কালো মেঘ। দক্ষিণা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও শালিক ডাকছে। হঠাৎ মনে হলো, রফিক যেন পাশে বসে আছে।

মনে পড়ল, সেই কথাটা— “একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।

রাত বাড়তে লাগল। গ্রামের পথ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো স্কুলের দিকে। কড়ই গাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের রং উঠে গেছে। মাঠের ঘাস বড় হয়ে গেছে।

হঠাৎ মনে হলো, সময় আসলে মানুষকে একা করে দেয়। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কাটত, একসময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে যায়।
পরদিন সকালে আমি আবার বটতলায় গেলাম। সেখানে এখন একটা চায়ের দোকান। দোকানদার আমাকে চিনতে পারেনি। আমি চুপচাপ বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এলো। হাতে ফুটবল।

ছেলেটাকে দেখে মনে হলো, এ যেন আমাদেরই ছোটবেলা। আমি মুচকি হেসে বললাম, —“খেলা করিস?” সে হেসে বলল, —“জি চাচা, বিকেলে সবাই মিলে খেলি।”

তার হাসির ভেতরে আমি যেন আবার কালামদের দেখতে পেলাম। মনে হলো, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু গ্রামের শৈশব কখনো মরে না। শুধু নতুন মুখে ফিরে আসে।

বিকেলে যখন গ্রাম ছেড়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখন আকাশে হালকা বৃষ্টি নামছিল। কাঁচা রাস্তার ধুলো ভিজে মাটির গন্ধ ছড়াচ্ছিল চারদিকে। আমি শেষবারের মতো পিছনে তাকালাম।
দূরে তালগাছ দুলছে। নদীর জল চিকচিক করছে। বাতাসে কেমন এক মায়া।

মনে হলো, গ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা এখনও কোথাও আছে—হয়তো বাতাসে, হয়তো নদীর জলে, হয়তো সন্ধ্যার আজানের ধ্বনিতে।
শুধু আমরা আর আগের মতো ফিরে যেতে পারি না।

জীবন মানুষকে বড় করে দেয়, ব্যস্ত করে দেয়, দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু শৈশবের স্মৃতিগুলো কখনো পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি আপন হয়ে ওঠে।

আজও যখন শহরের ব্যস্ত রাতে জানালার পাশে দাঁড়াই, দূরের আকাশে মেঘ দেখি, তখন গ্রামের কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই মেঠোপথ, সেই নদী, সেই মাঠ, আর সেই বন্ধুগুলোর কথা। যারা আজ আর নেই, কিন্তু আমার প্রতিটি স্মৃতির ভেতর এখনও বেঁচে আছে।

দখিনা বাতাস আজও কত কথা বলে। গুমট হাওয়া আজও বুকের ভেতর পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। শুধু সময়ের পালাবদলে হারিয়ে গেছে কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু বিকেল।

তবুও গ্রামের সেই শৈশব আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের ঘোষণা আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের ঘোষণা আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা, পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণ, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, কৃষকদের জন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

শনিবার (০৪ জুলাই) বিকেলে ফরিদপুর শহরের থানা রোডের ব্যাংক এশিয়া মোড়ে ফরিদপুরের নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, “পদ্মা ব্যারেজ হবে। এটি একনেকে পাস হয়েছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। দেশের পানির সমস্যা সমাধানে পদ্মা ব্যারেজের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারেজও বাস্তবায়ন করা হবে।”

তিনি বলেন, দেশের পানি সংকট মোকাবিলায় খাল খননের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফরিদপুরের উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ফরিদপুরবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা এবং ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে ফরিদপুরের জনসভায় এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আপনাদের সহযোগিতায় ফরিদপুর বিভাগ হবে এবং সিটি করপোরেশনও হবে।”

নিজের নির্বাচনী এলাকা সালথা ও নগরকান্দার কৃষকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক কৃষক উৎপাদিত পেঁয়াজ ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজ সংরক্ষণের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, “খুব শিগগিরই পেঁয়াজ চাষিদের জন্য আধুনিক স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারেন।”

ফরিদপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, “ফরিদপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে। এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। ফরিদপুরের চারজন সংসদ সদস্যই এ দাবি তুলেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। অবশ্যই ফরিদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় হবে।”

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. রফিকুল ইসলাম।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা, ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মোদাররেস আলী ইছাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিবীদ ও ব্যবসায়ীক নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ফরিদপুর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও রাজবাড়ী সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. শওকত আলী মোল্লা।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৭ অপরাহ্ণ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ দ্রুত কার্যকরের দাবিতে ফরিদপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য জোট। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা অংশ নেন। তারা দাবি করেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

শনিবার (৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জনতা ব্যাংক মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ।

সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক মাওলানা মো. বদরুদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং দলীয় মুখপাত্র মুফতি আবু নাসির আইয়ুবী ও অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের যৌথ সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য প্রফেসর আবদুত তাওয়াব।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা আমজাদ হোসাইন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক ডা. বায়েজিদ আহমাদ শাহেদ, খেলাফত আন্দোলন ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান, এলডিপি সভাপতি মো. কামরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

বক্তারা বলেন, গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের মতামত এবং জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।

নেতারা আরও বলেন, দাবি বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হলে সারাদেশে আরও বৃহত্তর ও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও তারা ঘোষণা দেন।

সমাবেশে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১১ দলীয় ঐক্য জোটের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি চলাকালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল এবং বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত স্লোগান দেন।

ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১:২৯ অপরাহ্ণ
ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে গুলিতে সুমন শেখ নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিবকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ মামলার একদিন পরই ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল।

শনিবার (৪ জুলাই) সকালে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান হত্যা মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জানা যায়, গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে ভাঙ্গা পৌরসভার হাসামদিয়া ও কাপুড়িয়া সদরদী মহল্লার বাসিন্দাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন কাপুড়িয়া সদরদী গ্রামের মিলন শেখের ছেলে সুমন শেখ (২৩)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা মিলন শেখ গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ও পূর্ব হাসামদিয়া মহল্লার বাসিন্দা সজীব মাতুব্বরকে (২৮)।

পুলিশ জানায়, মামলার পর থেকে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি সজীব মাতুব্বর এখনও পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, ঘটনার পর শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে নিহত সুমন শেখের বাড়িতে যান ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল। তিনি নিহতের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান।

সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সংসদ সদস্য বলেন, “মামলা তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। এই মামলায় কেউ কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যারা অভিযুক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আজই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।”

সংসদ সদস্যের ওই বক্তব্যের প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যেই জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হোসেন ও সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “অনিবার্য কারণবশত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, ভাঙ্গা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ৩ জুলাই থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।”

কমিটি বিলুপ্তির বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল বলেন, ভাঙ্গা উপজেলা কমিটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। সর্বশেষ কমিটির এক শীর্ষ নেতা হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি হওয়ায় এবং মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সুপারিশে উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব যেন তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব সজীব মাতুব্বরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।