খুঁজুন
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

তেরো দিন পরে

ম্যারিনা নাসরীন
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫, ১২:১৭ পিএম
তেরো দিন পরে

পাটকাঠির ফাতনাটা একটু নড়ে আবার স্থির হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ফাতনার দিকে আবুবকরের মনঃসংযোগ বিড়ালের মতো। কোনোমতেই শিকার হাতছাড়া করতে চায় না সে। মাছ ধরা আবুবকরের শখ নয় বা প্রয়োজনও নয়। বরং বিশেষ বিশেষ সময়ে সে তার কঞ্চির তৈরি ছিপটা নিয়ে এই খালের ধারে এসে বসে। ফাতনার প্রতি গভীর মনঃসংযোগ অন্য সকল ভাবনা থেকে তাকে দূরে রাখে। আধুনিক বিজ্ঞানে এই সিস্টেমকে কী যেন বলে! আবুবকর মনে করতে পারছে না। 

খাল থেকে বাড়ির দূরত্ব মাত্র কয়েক মিটার। পরের বর্ষায় উঠোন পর্যন্ত খালের বিস্তার হয়ে যাবে হয়তো। কোন সরকারের আমলে, কোন চেয়ারম্যান এই খালের উদ্যোক্তা আবুবকর জানে না; কিন্তু বসতবাড়ির এত কাছ দিয়ে কীভাবে একটি খাল প্রবাহিত হতে পারে সেই বিষয়ে গবেষণার বিস্তর সুযোগ ছিল। মোট কথা, তার বাড়ি থেকে খাল এতটাই কাছে যে, লিপি যখন রান্নাঘরে রান্না করে, তখন হাঁড়িপাতিলের টুংটাং শব্দ সে এখানে বসেই শুনতে পায়। আজ তেরো দিন যাবত লিপির জায়গায় গৃহকর্মী খোদেজার পাশাপাশি জুলেখা রাঁধুনি হয়েছে। জুলেখা তার তেরো বছর বয়সী কন্যা। তারই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ‘জুলেখা’ নামটি আবুবকরের রাখা। যদিও এই নামে লিপির ঘোর আপত্তি ছিল। জুলেখা নাকি সেকেলে নাম। ‘লিপিকা’ নামের  তুলনায় সেকেলে বটে! কিন্তু এই নাম আবুবকরের খুব পছন্দ। ‘জুলেখা’ শব্দের অর্থ ‘উজ্জ্বল সৌন্দর্য্য’ বা ‘ন্যায্য’। ছেলেবেলায় পড়া গল্পের প্রিয় নায়িকা জুলেখা। আবুবকরের এখনো মনে আছে, গল্পটির প্রথম লাইন ছিল, ‘জুলেখা বাদশাহর মেয়ে। তার ভারী অহংকার।’

ছিপের ফাতনা মনে হলো আবার নড়ে উঠল। কি মাছ আর হবে! শোল বা  টাকি, বড়জোর মাগুর। একবারই বোয়াল উঠেছিল। নইলে সচরাচর খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হয়। আবুবকরের পাশে একটি খোলা মোটা ধরনের বইয়ের পাতা বাতাসে ফরফর করে উড়ছে। মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছর। এই বইটিও তার টেনশনের অন্য আরেকটি দাওয়া! কতবার যে পড়া হয়েছে! এখন আর ধারাবাহিকভাবে পড়ে না। মাঝেমধ্যে হাতে নিয়ে নির্দিষ্ট দুই-এক পাতায় চোখ বুলিয়ে আবার খোলা অবস্থায় রেখে দিচ্ছে। এই পাতাগুলোতে ছত্রে-ছত্রে লাল মার্কারে আন্ডারলাইন করা।

চৈত্র মাস! চোখ-ধাঁধানো রোদের ফাঁকে মরীচিকার খেলা! গনগনে ঠিক দুপুরের সেই হলকা আবুবকরের শরীরকে স্পর্শ করলেও সে ততটা অনুভব করছে না। তার দেহমনের সর্বত্র ভেঙে পড়ার নিঃশব্দ হাহাকারে বাকি কোলাহল তিরোহিত হয়েছে।

আজ নিয়ে তেরোদিন হলো তার স্ত্রী লিপি ওরফে লিপিকা ইসলাম লাপাত্তা। কোথায় গিয়েছে, কী হয়েছে কেউ জানে না। পুলিশ এখনো খোঁজ বের করতে পারেনি। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবার কাছে খবর নিয়েছে আবুবকর। কোথাও নেই। কিন্তু লিপিকা কি আসলেই হারিয়েছে নাকি ঘর-সংসার ছেড়ে পালিয়েছে? মানুষ নিখোঁজ হলে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু যে নিজেই হারায় তাকে খুঁজবে কোথায়?

লিপিকাকে বরাবরই আবুবকর অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিল। নিজের পছন্দ-অপছন্দকে কখনো তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে লিপিকার কিছু স্বভাব আবুবকরের কাছে খুবই বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মোবাইল ফোনের প্রতি তার বাড়াবাড়ি রকমের আসক্তি। কাজের মধ্যে, হাঁটতে-হাঁটতে, খেতে-বসে, সারাক্ষণ মোবাইল স্ক্রল করছে। ছবি তুলছে, ভিডিও করছে আর সেগুলো ফেসবুক, টিকটকে আপলোড করছে। এসব ভিডিওর সব ঠিক শ্লীল সেটা নয়। মন্তব্যের ঘরে মানুষের অনেক ঘিনঘিনে বক্তব্য থাকে যেসব পড়লে মাথা গরম হয়ে যায় আবুবকরের। কিন্তু সে প্রচণ্ড অন্তর্মুখী  নিরীহ স্বভাবের মানুষ। তার ভেতরের ক্ষোভ কান্না কোনোকিছুই বাইরে থেকে দেখা যায় না। তাই কোনোরকম বিরক্তি প্রকাশ না করে সে কয়েকবার মৃদুভাবে বলার চেষ্টা করেছিল যাতে পাবলিকলি এভাবে সবকিছু পোস্ট না করে। লিপিকা অল্প কথার মানুষ এবং ঝামেলাহীন। সে ঘাড় নেড়ে বলেছিল, ‘আচ্ছা।’ কিন্তু ওই পর্যন্তই। সামাজিক মাধ্যমে লিপিকার ছবি নিয়ে কলিগ, আত্মীয়-স্বজন আড়ালে হাসাহাসি করে। বন্ধুরা টিটকারি দিয়ে বলে, ‘কী রে বন্ধু, বউয়ের ভিউ বিজনেস কেমন চলছে?’ এরপরও লিপিকাকে জোর দিয়ে সে কিছু বলতে পারে না! এমনিতে  লিপিকা ঝগড়াটে স্বভাবের স্ত্রী নয়।
সন্তান-সংসারের প্রতি তার দায়িত্ব-মায়াও কম নেই। ঝকঝকে ঘরবাড়ি, স্বাস্থ্যবান ফুটফুটে দুটো সন্তান, তাদের সাংসারিক সুখ নিয়ে কারো সন্দেহ করার কারণ নেই। কিন্তু এত গোছালো ঝকঝকে ঘরবাড়ির কোথাও আবুবকরের স্বস্তি নেই। একটা অদৃশ্য কাঁটা সারাক্ষণ শরীরে বিঁধে আছে। যার যন্ত্রণা সে নিজে ছাড়া কারো টের পাওয়ার কথা নয়, পায়ও না।

লিপিকার সঙ্গে আবুবকরের বয়সের ফারাক প্রায় দশ বছরের। আবুবকর যে বছর উপজেলা সদরের সবচেয়ে নামকরা স্কুলে গণিতের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করলো, সে-বছরেই লিপিকার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। লিপিকার বাবা স্থানীয় বেশ প্রভাবশালী পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ী। আর আবুবকর অভিভাবকহীন হা-ঘরের ছেলে। চাকরি আর টিউশনি ছাড়া আয়ের কোনো রাস্তা নেই। বিয়ের পরে আবুবকর জানতে পারে, লিপিকা বখাটে কোনো মাদকাসক্ত ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। বিবাহ ছাড়াই কিছুদিন এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়। পরিশেষে মেয়েকে উদ্ধার করে শ^শুরমশাই আবুবকরের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের পর সেই বখাটে ছেলের মোবাইলে হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে থানায় জিডিও করতে হয়েছিল আবুবকরকে। কিন্তু এ-বিষয়ে আবুবকর কখনোই লিপিকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি বা অভিযোগ করেনি। একাই সেই গরল মনে-মনে হজম করেছিল। কি দরকার অশান্তি বাড়িয়ে!

অতীতকে লুকাতে বা অন্য কোনো কারণে যুগল জীবনের প্রথম দিন থেকেই লিপিকাও তার চারপাশে একটা অদৃশ্য দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে রেখেছিল। সেটা ভেদ করা আবুবকরের পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি। হয়তো এ-কারণেই তারা দুজন কেউ কারো কাছে ততটা পরিচিত নয় যতটা হলে একে অপরের প্রচ্ছদজুড়ে বিরাজ করতে পারে।

আজ শুক্রবার। জুমার আজান হচ্ছে। গোসল সেরে মসজিদে যাওয়া দরকার; কিন্তু আবুবকরের একদমই ইচ্ছে করছে না। অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহলের সীমা নেই মানুষের। লিপিকে নিয়ে তাদের হরেকরকমের মশলাদার প্রশ্নে জেরবার হয়ে যায় আবুবকর। সে জানে, মুখের মুখোশটা খুলে পড়লে দেখা যাবে ভেতরটাতে তারা পৈশাচিক আনন্দে  ফেটে পড়ছে। আল্লাহর ঘর তাদের বিরত রাখতে পারে না। কয়েকদিন যাবত স্কুলে কলিগদের কাছ থেকেও সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্লাসের প্রতিটি ছাত্রকে মনে হয় তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে, তারা চোখে চোখে একে অপরকে বলছে, ‘হে হে স্যারের বউ পালিয়ে গেছে।’ মানুষ যখন বাজার করে ঘরে ফেরে সেইসময় আবুবকর চোরের মতো বাজারে যায়। মোটকথা, মানুষকে তার বড় ভয়। তার মনে হয়, পরিচিত-অপরিচিত প্রতিটি মানুষ লিপির যাওয়ার গোপন তথ্যটি জেনে গেছে। তারা খবর পেয়ে গেছে, লিপি আসলে হারায়নি, পালিয়ে গেছে। অথচ আবুবকর ছাড়া লিপির গোপন বিষয়টি বাইরের কেউ কখনো আঁচ করতেই পারে না। কারণ বাইরের মানুষের কাছে লিপি ঘোর সংসারী। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে থাকা একজন আমনারী। আবুবকর বুঝতে পারে, মানুষ সম্পর্কে সে

বেশি-বেশি ভাবছে। হয়তো তারা সত্যি লিপি হারিয়ে যাওয়ার ব্যথায় ব্যথিত হয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করে।

লিপিকা মোবাইল ফোনে ভার্চুয়াল একটা জীবন তৈরি করে নিয়েছিল। সেই জীবনে তার আরেক ধরনের

ঘর-সংসার। আবুবকর কখনো স্ত্রীর মোবাইল ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করে না। একদিন আবুবকরের মোবাইলে সমস্যা থাকায় লিপির ফোনটি ব্যবহার করতে হয়েছিল। কী মনে করে সেদিন সে লিপিকার মোবাইলে ফেসবুক টিকটক ইত্যাদি সাইটে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ স্ক্রল করে আবুবকরের মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। ভেতরে ভেতরে লিপি এতটাই পার্ভার্ট! ও কি সেক্সুয়ালি আনহ্যাপি? কখনো মনে হয়নি তার। ঘৃণায় ফোন ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল আবুবকর। সেদিনের পর থেকে লিপিকার ব্যাপারে সে পুরোপুরি ভাবলেশহীন হয়ে গিয়েছিল এবং সেই থেকে তাদের মাঝের দূরত্বও যেন সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে।

আচমকা হাতে ধরা ছিপে প্রচণ্ড টান পড়ে। ফাতনা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শক্তিশালী কিছু ছিপকে টেনে নিতে চাইছে। আবুবকরের ভেতর-বাইরের মৌন শব্দগুচ্ছ মুহূর্তে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সে চিৎকার করে ডাক দেয়, ‘জুলেখা, আরিব দেখে যা।’ যাদের ডাকা হচ্ছে তারা বাড়ি থেকে সেই ডাক  শুনতে পেল কি না সেদিকে নজর না দিয়ে আবুবকর  ছিপ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঢাউস সাইজের বোয়াল মাছটি বড়শি গিলে ছিপের সঙ্গে শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে ভেঙেচুরে মুক্তি পেতে চাইছে। সে শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে ছিপটিকে ঘুরিয়ে মাছটিকে ডাঙায় ফেলে দেয়। পানির অভাবে মাছটি তড়পাতে থাকে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে মাছটিকে দেখছে আবুবকর। তার চোখ মৃত মাছের মতো ভাবলেশহীন মনে হলেও সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায় চোখের তারায় তার জান্তব সুখ খেলা করছে। মাছ নয়, সামনে সে লিপিকাকে মৃত্যুযন্ত্রণায় তড়পাতে দেখছে। ‘বাবা! কী দেখছ?’ জুলেখার শান্ত কণ্ঠ আবুবকরের মুখে চপেটাঘাত করে। মনে হতে লাগে মেয়ে বুঝি তার উল্লাসের কথা জেনে গিয়েছে। থতমত খেয়ে বলে, ‘এত বড় বোয়াল মাছ আগে কখনো দেখেছিস?’ এর চেয়েও বড় বোয়াল মাছ আগে অনেকবার দেখেছে জুলেখা। নানা কিনে এনেছেন কতবার! বাবা জানে সেটা। বাবাই হাত দিয়ে মাছ স্পর্শ করা শিখিয়েছে। ধীরস্থির গম্ভীর বাবার এই বাড়াবাড়ি প্রগলভতা স্বাভাবিক নয়, সেটা বুঝতে পারে সে। ঘাড় নেড়ে বলে, ‘না, দেখিনি।’

‘আচ্ছা আরিব কই? ওকে দেখছি না যে!’

‘ও ইকবালের সঙ্গে খেলছে।’

‘আচ্ছা যা তো মা একটা বালতি নিয়ে আয়। আচ্ছা

থাকুক, খোদেজাকে আনতে বলি।’

‘না বাবা আমি যাচ্ছি।’

জুলেখা বাড়ির দিকে যাচ্ছে। ওর হাঁটার গতি এত ধীর যে পায়ের নিচের পাতারাও মনে হয় ওর পায়ের স্পর্শ টের পাচ্ছে না। এই তেরো দিনে তেরো বছরের মেয়েটির বয়স আরো তেরো বছর বেড়ে গিয়েছে। ঝরনার মতো কলকলে ঝলমলে  মেয়েটি যেন শান্ত দীঘি, যেখানে ঢিল ছুড়লেও ঢেউ ওঠে না। ও কি ওর মায়ের গোপন বিষয়গুলো জানতো? কে জানে! মায়ের সম্পর্কে তেমন কোনো প্রশ্ন করে না জুলেখা।

আরিবের বয়স আট বছর। সে দু-একদিন মাকে খুঁজলেও এখন তেমন কিছু বলে না। ওকে বোঝানো হয়েছে মা ট্রিটমেন্টের জন্য ঢাকায় মামার বাসায় আছে। ডাক্তার তাকে রেস্টে থাকতে বলেছেন।

খোদেজা ময়মশলা মাখিয়ে বোয়াল মাছ ভাজছে। রান্নাঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আবুবকর নানা ইন্সট্রাকশন দিতে থাকে। এরপর ভাজা মাছ রান্না হবে। আবুবকর বলে, ‘খোদেজা, ঝোল কিন্তু মাখামাখা হবে বুঝতে পেরেছ? আর মশলা বেশি করে দাও। মানে ঝাল-ঝাল।’

খোদেজা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আবুবকরের দিকে তাকায়। আবুবকরের সঙ্গে খোদেজার তেমন কথা হয় না! গম্ভীর মানুষ, খোদেজা ভয় পায়। আবুবকরও ঘর-গৃহস্থালির বিষয়ে কখনো মাথা ঘামায় না। আহা বউ হারিয়ে মানুষটা কেমন হয়ে গেছে! খারাপ লাগে খোদেজার। বলে, ‘জি খালুজান।’ একটু থেমে আবার বলে, ‘খালুজান, খালাম্মার কুনু খুঁজ পাইলেন?’ আবুবকর বলে, ‘আরে, চলে আসবে তোমার খালাম্মা। বাচ্চাদের রেখে কতদিন থাকবে?’

খোদেজা আবার অবাক হয়, চলে আসবে মানে কী?

রান্না শেষে টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়েছে খোদেজা। মেয়ের অপেক্ষায় টেবিলে বসে আছে আবুবকর। জুলেখা তার নিজের ঘরে। বাবা অনেকবার ডাকার পরেও সে কোনো জবাব দেয়নি। আরিব মাছ খায় না। সে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাচ্ছে। মাকে নিয়ে সে আপাতত ভাবছে না। নতুন যে গেমস শিখেছে, সেটার বিষয়েই সে মহাউৎসাহে বাবাকে বোঝাচ্ছে। আবুবকর ছেলের কথা হাসিমুখে শুনছে কিন্তু তার মনোযোগ আসলে টেবিলে রাখা বোয়াল মাছের বিশাল হা করা মাথাটির দিকে। আবুবকরের মনে হয়, এটি একটি অনিশ্চিত অন্ধকার গুহা। যেদিকে আবুবকর প্রবলবেগে ধাবিত হচ্ছে। চট করে চোখ সরিয়ে নেয় আবুবকর। বেশ উচ্চৈঃস্বরে ডাক দেয় মেয়েকে, ‘জুলেখা আসছ না কেন? খাবার তো ঠান্ডা হয়ে যাবে।’ নাহ জুলেখার সাড়া নেই।

আবুবকর আর একটু অপেক্ষা করে জুলেখার ঘরে যায়। বিছানায় গুটিসুটি হয়ে বসে আছে মেয়ে। ওর চোখ মোবাইলের দিকে। সেটা তো সবসময় থাকে। কিন্তু আবুবকর দেখলো জুলেখার চোখ থেকে পানি পড়ছে টপটপ করে। সে দ্রুত তার হাত থেকে মোবাইলটা নিজের হাতে নেয়। জুলেখা বাবার দিকে তাকায় না।

এটি লিপির পুরনো মোবাইল। আবুবকর দেখলো স্ক্রিনে একটি ভিডিও চলছে। কোনো একটি বিচে একজন সুদর্শন পুরুষের হাত ধরে হাঁটছে লিপি। ভিডিওতে প্রচণ্ড সুখী দেখাচ্ছে ওদেরকে। আবুবকর মোবাইলটি বিছানায় রেখে মেয়ের দিকে তাকায়। জুলেখা আগের মতোই মুখ নিচু করে আছে। তবে এখন সম্ভবত চোখ থেকে পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। আবুবকর খাবার টেবিলে গিয়ে বোয়াল মাছের মাথাটি পাতে তুলে নেয়। এখন সে মাথাটিকে চিবিয়ে চিবিয়ে তৃপ্তিসহকারে খাচ্ছে।

দুই

বারবার নিষেধ সত্ত্বেও সবজিওয়ালা তিনটা বেগুনের মধ্যে একটা বেগুন ঠিকই পচা ঢুকিয়ে দিয়েছে। রুই মাছের পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গেছে। জীবনে প্রথমবারের মতো আজ কাঁচাবাজারে গিয়েছিল সুরাইয়া। রাস্তার ভ্যান থেকে পটোল, কাঁচামরিচ কেনা আর শান্তিনগরের মতো বাজারে

মাছ-মুরগি কেনার মধ্যে ঢের তফাৎ কে জানতো! কাদাপানিতে মাছের বাজার থিকথিক করছে। বিচিত্র রকমের দুর্গন্ধে শরীর গুলিয়ে উঠেছিল। কোনোরকম গা বাঁচিয়ে সুরাইয়া বাজার থেকে বেরিয়ে আসে।

বাজারের কাজ সবসময় হাফিজই করে। সুরাইয়াকে কখনো মাছের বাজারে যেতে হয়নি; কিন্তু আজ তেরোদিন হলো হাফিজ লাপাত্তা।  তিনদিন আগেই মাছ-তরিতরকারি শেষ। তাতে সুরাইয়ার কোনো সমস্যা নেই, কারণ হাফিজ নিখোঁজ হওয়ার দিন থেকে তার খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ। কিন্তু আব্দুল্লাহকে তো খাওয়াতে হবে। দুদিন যাবত ছেলেটার উথাল-পাথাল জ্বর। জ্বরের ঘোরে বাবা বাবা করে চিৎকার করে। মাছ ভাজা ছাড়া সে কিছুই মুখে নেয় না। অগত্যা পাশের বাসার ভাবিকে আব্দুল্লাহর  কাছে রেখে তাকে বাজারে যেতে হলো।

তেরো দিনের নিরন্তর শ্রান্তিতে সুরাইয়ার শরীর-মন কিছুই চলে না। হাফিজ কোথায় কী অবস্থায় আছে কোনো খবরই পাচ্ছে না সে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অফিসের কলিগ সবাই ওর খোঁজে লেগে আছে। পুলিশও চেষ্টা করছে। একজন জলজ্যান্ত মানুষ আচানক কীভাবে হারিয়ে যায়! নাকি হাফিজ নিজেই হারিয়েছে?

শ্বাস আটকে আসে সুরাইয়ার। মাত্র একজন মানুষের অভাবে পৃথিবীটা জনশূন্য হয়ে পড়েছে। হাসি-আনন্দ
রোদ-বৃষ্টি কোনোকিছুর অস্তিত্ব সে অনুভব করছে না। চারপাশ যেন নির্জন আর রংহীন এক অশরীরী বলয়।

বহুত কাহিনি করে হাফিজের সঙ্গে সুরাইয়ার বিয়ে হয়েছিল।  এই তেরো দিনে সুরাইয়ার মনে সেসব কাহিনি ফের জাগরূক হয়ে উঠেছে। পাক্কা তিন বছর প্রেম ছিল তাদের। সব প্রেমের মতো তাদের প্রেমেও ছেলেমানুষি ছিল, পাগলামি ছিল। জীবন দিয়ে দেবে তবুও কেউ অন্য কারো হবে না – এমন কমিটমেন্টে ভরপুর ছিল তাদের ব্যক্তিগত বক্স। তবে এসব ক্ষেত্রে সুরাইয়া যত না পাগল ছিল, তারচেয়ে বেশি পাগলামি ছিল হাফিজের। ঘুমাতে যাওয়ার সময় সুরাইয়া, ঘুম থেকে উঠে সুরাইয়া! সুরাইয়া নামের জপমালা তৈরি করে নিশিদিন সেই নামেই জপ করত। মাঝেমধ্যে হাফিজের এই পাগলামিতে সুরাইয়ার দমবন্ধ হয়ে আসতো। অন্যদিকে প্রিয় পুরুষের কাছ থেকে পলে পলে নৈবেদ্য পেয়ে সে নিজেকে দেবী ভাবতে শুরু করেছিল। প্রেম তো একেই বলে! এই প্রেম শেষ করার ক্ষমতা কি ঈশ্বরের হাতেও আছে?

কিন্তু কে জানতো, সময় বড় ভয়ংকর খেলিয়ে। কখন কাকে সে কি খেলা দেখায় বোঝা মুশকিল! একদিন যাকে ছাড়া জীবনকে নিতান্তই বেসুরো আর মরুভূমির মতো নিষ্করুণ মনে হয়, যে-মানুষটি রংধনুর সবকটি রং নিয়ে জীবনে বিরাজ করে সেইজনই হয়তো একদিন সব রং নিজ হাতে ধুয়ে-মুছে দিয়ে নির্দ্বিধায় চলে যায়।

সে যাই হোক, সুরাইয়া সবে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছে। হাফিজ জেলা শহরের সরকারি একটা কলেজে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। সেই সময় সুরাইয়ার বড়ভাই আওলাদ একদিন কোনোভাবে ওদের প্রেমের খবর জেনে যায়। তার থেকে বাবা-মা, কাকা, সবাই। সুরাইয়ার পরিবারের কারো কল্পনাতেও ছিল না, তাদের লক্ষ্মী মেয়েটা এমন ধুন্ধুমার প্রেম করতে জানে। সেদিনই তারা পারিবারিক মিটিং বসায়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, যেভাবেই হোক এই মেয়েকে ছ-মাসেই পরের ঘরে পার করতে হবে। নইলে সমাজের সামনে তাদের বংশের মুখে চুনকালি মাখাবে। যা বলা সেই কাজ। এলাকার ঘটকের সঙ্গে মুহূর্তে ফোনে যোগাযোগ করে ফেলেন কাকা। বোবা-কানা, লুলা, যেমনই হোক একজন পাত্র চাই, তাদের মেয়ে বিয়ে দেবেন। সুরাইয়া ফান্দে পড়ে যায়। হাফিজের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন। ফোন মায়ের আলমারিতে তালাবদ্ধ। একেক জায়গা থেকে একেক ধরনের পাত্রের খোঁজ আসে আর তাদের সামনে সুরাইয়াকে সং সাজিয়ে বসিয়ে রাখা হয়। এভাবেই একদিন তার বিয়েও ঠিক হয়ে গেল। পাত্র কোনো সরকারি অফিসের কেরানি। উপরি ভালোই পায়। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। গ্রামে প্রচুর জমিজিরেতের মালিক। আর কি চাই! হোক না কেরানি! সরকারি চাকরি তো সোনার হরিণ। এমন হরিণ জামাই পাওয়াও ভাগ্যের। বিয়ের তারিখ পড়েছে। আর মাত্র পনেরো দিন বাকি। জোরেশোরে তার আয়োজন চলছে। বাবা-ভাইয়ের মুখে বিজয়ের আকীর্ণ হাসি।

সুরাইয়া কিচ্ছু বলে না। চুপচাপ সব মেনে নেয়। সে জানে এই বিয়ে তার হবে না। হাফিজ কোনোভাবেই হতে দেবে না। ভালোবাসার মন্ত্রেই সুরাইয়া জেনেছিল হাফিজ সুরাইয়াকে পেতে সবকিছু করতে পারে। হলোও তাই। হাফিজ অন্য কোথাও সুরাইয়াকে বিয়ে হতে দেয়নি। অন্য কোনো উপায় না পেয়ে সে সুইসাইড অ্যাটেম্প করেছে। তার মৃত্যুর জন্য সুরাইয়ার পরিবারকে দায়ী করে পাশে লিখে রেখেছে বিশাল সুইসাইড নোট। হাফিজকে হাসপাতালে ভর্তিও করা হয়েছিল। এসবকিছু অবশ্য সুরাইয়া পরে শুনেছে। সুইসাইডের বিষয়টিও ছিল স্ক্রিপ্টেড।

বিয়ের তিনদিন আগে গভীর রাতে বসার ঘরে সুরাইয়ার ডাক পড়ল। ঘরে ঢুকে দেখলো একদিকে হাফিজ আর তার পরিবারের লোকজন বসে আছে, অন্যপাশে সুরাইয়ার বাবা কাকা আর ভাইয়েরা। ঘরে ঢুকতেই হাফিজের চোখে চোখ পড়ে সুরাইয়ার। সেই চোখে সুরাইয়ার জন্য একটাই বার্তা, ‘ভয় নেই, আমি আছি।’

বাবা মাথা নিচু করে বসে আছেন। ভাইয়েদের চোখে রাগ, হতাশা। মা নেই ঘরে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই পরিবারে নারীদের অবশ্য গণ্য করা হয় না। তাদের মূল কাজ হেঁসেল ঠেলা। কাকা গম্ভীর মুখে সুরাইয়ার কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘ইনারা তোমার সঙ্গে হাফিজের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। এই বিয়েতে আমাদের কারো মত নেই। তারা তোমার মতামত জানতে চান। তুমি কি এই বিয়েতে রাজি আছো?’

সুরাইয়া হাফিজের মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু হাফিজের চোখ অন্যদিকে। সে জানে হাফিজ কেন তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রেখেছে, সুরাইয়া নির্দ্বিধায়  জবাব দেয়, ‘জি, আমি এই বিয়েতে রাজি।’  ঘরে পিনপতন নীরবতা। বড় দুই ভাই গজগজ করতে করতে উঠে চলে গেল। হাফিজ চকিতে সুরাইয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। সুরাইয়া সবার অলক্ষে হাসি ফিরিয়ে দেয়। বাবা এত সময় কোনো কথা বলেননি। এবার ধীরে-ধীরে বলেন, ‘আপনারা কাজি ডেকে আনেন। এখনই বিয়ে হবে।’

‘জি, এখনই? সেটা কীভাবে সম্ভব? আমরা কোনো প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। বরং সুবিধামতো একটা তারিখ ঠিক করি। আত্মীয়স্বজনকে জানাতে হবে তো।’  হাফিজের বাবা কাঁচুমাচু করে বলার চেষ্টা করলেন।

‘আমি মেয়ে বিয়ে দিচ্ছি না। তার কবর দিচ্ছি। বাড়িতে বউ নিয়ে আপনারা আত্মীয়-স্বজন খাওয়ান। আমাদের আত্মীয়দের এত সময় নেই।’

বাবা মেয়েকে কবর দিচ্ছেন? এই বাবাকে সুরাইয়া চেনে।  এখনই বিয়ে দেওয়ার মানেও সে জানে। কবরই বটে! আচমকা তার প্রচণ্ড খারাপ লাগতে শুরু করে। মনে হয় ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। হাফিজ বা বাবা কারো কাছেই সে থাকবে না। কিন্তু আদতে তার কিছুই ঘটে না। বরং মাত্র এক হাজার এক টাকা কাবিনে দুই ঘণ্টার মধ্যে হাফিজের সঙ্গে সুরাইয়ার বিয়ে হয়ে যায়। যে-বাড়িতে সে উনিশ বছর কাটিয়েছে সেই বাড়ি থেকে বিদায়ের মুহূর্তে তার সামনে কেউ ছিল না। বাবা ঘরে ছিটকিনি তুলে বসে ছিলেন। কাকা তার বাড়িতে। ভাইয়েরা কোথায় ছিল জানে না সুরাইয়া। শুধু বাবার ঘর থেকে মায়ের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। সেই রাতেই বাবা-মায়ের সঙ্গে সুরাইয়ার শেষ দেখা। এরপর কখনোই না।

দশ বছর হলো সে বাবা-মায়ের পরিবার থেকে একদম বিচ্ছিন্ন। মাঝেমধ্যে খুব কষ্ট হলেও হাফিজ তাকে সব ভুলিয়ে রেখেছিল। নানা ফন্দি করে মা এবং ভাইদের সঙ্গে সে ফোনে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। মায়ের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় সুরাইয়ার। ভাইদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা হয়। কিন্তু কেউ সুরাইয়ার সঙ্গে দেখা করতে রাজি নয়, কারণ বাবা তাদের পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁইয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছেন। বাবা সুরাইয়ার সঙ্গে কথা না বললেও সে বাবার কণ্ঠ শুনতে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করেছে। বাবা ‘হ্যালো, কে? কে?’ বলে ফোন কেটে দেন। সুরাইয়ার চোখ গলে পানি আসে কিন্তু সেও সে ভুলে যায় হাফিজের কারণে।

চমৎকার কাটছিল তাদের যুগল জীবন। হাফিজ টিউশনি করে নানাভাবে প্রথম তিন বছর সংসার চালিয়েছে। তার পরিবারও যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। এরপর তো হাফিজ একটা চাকরিও জুটিয়ে ফেলে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরপরই সুরাইয়ার কোলজুড়ে আসে ছেলে আব্দুল্লাহ। সুরাইয়া তখন সুখের জোয়ারে ভাসছে। এমন দায়িত্বশীল স্বামী, দেবশিশুর মতো সন্তান, এই সুখের রাজ্যে দুঃখের ছিটেফোঁটা আসার সম্ভাবনা কোথায়? কি হবে পড়ালেখা করে!

তার ভাবনায় ভুল কিছু ছিল না। সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বছরখানেক ধরে হাফিজের মধ্যে আচানক পরিবর্তন দেখতে পায় সুরাইয়া। সেই পরিবর্তন এত সূক্ষ্ম যে সরাসরি অভিযোগ করার মতোও নয়। হাফিজ সংসারে থেকেও যেন সংসারে নেই। কেমন আলগা আঠার মতো লেগে থাকা যাকে বলে। সুরাইয়া হাফিজের আগপাশতলা চেনে। বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তন তার দৃষ্টি এড়ায় না। সে বুঝতে পারে হাফিজ ব্যালান্স করার খুব চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই চেষ্টাও সুরাইয়ার চোখে ধরা পড়ে যায়।

বিশ্রী একটা অবস্থা। চোখে চোরাবালি পড়লে যেমন চোখ খচখচ করে কিন্তু বালু খুঁজে পাওয়া যায় না তেমনটি। আগের মতোই সে প্রতিদিন কিছু না কিছু বাজার করে ঘরে ফিরছে, আগের মতোই উইকেন্ডে একসঙ্গে বাইরে খেতে যাচ্ছে, আগের মতোই আব্দুল্লাহর সঙ্গে খেলছে; কিন্তু সবকিছুতে কোথাও একটা ফাঁকি চলছে।

গত ক-মাসে মোবাইলের প্রতি ভয়াবহ অ্যাডিকশন তৈরি হয়েছিল হাফিজের। মুহূর্তের জন্য সেটি হাতছাড়া করতে চায় না। বিশেষত সুরাইয়া মোবাইল ধরতে গেলেই হাহা করে ছুটে আসে। যেটা সে আগে কখনো করেনি। সে বুঝতে পারে মোবাইলটাই হাফিজের গোপন নথি। সুরাইয়া বরাবরই কম কথা বলার মানুষ। কোনো লুকোছাপার ধার ধারে না। একদিন হাফিজের কাছ থেকে ঠান্ডা গলায় মোবাইল চেয়ে নেয়। তার মুডের সামনে হাফিজ কোনো কথা বলার সাহসই পায়নি। কিছু সময় মোবাইল ঘেঁটে সুরাইয়া বুঝতে পারে, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আর মানুষের মন তো উড়াল পাখি। কখন কার জন্য উড়াল দেয় কে জানে? এক নারীর সঙ্গে হাফিজের বহু অন্তরঙ্গ ছবি, টেক্সটের আদান-প্রদান, ভিডিও কলের হিস্ট্রি। সুরাইয়ার চোখ জ্বলে উঠেছিল। মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। মোবাইল মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। তারপর পায়ের নিচে ফেলে প্রচণ্ড আক্রোশে খণ্ড খণ্ড করে ফেলেছিল।

এরপর হাফিজের সঙ্গে প্রায় পনেরো দিন কথা বলেনি। হাফিজ সুরাইয়ার পা পর্যন্ত জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘মাফ করে দাও। আমার ভুল হয়ে গেছে। ওই মহিলার সঙ্গে জাস্ট মজা করেছি। আর কখনো এমন হবে না তোমার কসম।’ সুরাইয়া মাফ করে দিয়েছিল।  ধীরে ধীরে  আবার সবকিছু মনে হয়েছিল স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সুরাইয়া বরং নিজের বাড়াবড়ির জন্য লজ্জাই পেয়েছিল। হাফিজ ওই নারীটিকে সুরাইয়ার সামনেই ব্লক করে দেয়। সেও মাস তিন আগের কথা।

কিন্তু হাফিজ আসলেই কোথায় গেল? নাকি কোনো বিপদে পড়েছে? এই শহরে কত কত মানুষের গুমের খবর আসে! কিন্তু ওর তো কোনো শত্রু নেই! নানা ধরনের দুশ্চিন্তায় আতঙ্কিত হয়ে ওঠে সুরাইয়া। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে আপডেট নেয়। কিন্তু কারো কাছে কোনো খবর নেই। জ্বরে আব্দুল্লাহর শরীর পুড়ে যাচ্ছে। ছেলেটা বাবার খুব ন্যাওটা। বাবাকে ছেড়ে দুদিন থাকার অভ্যাস তার নেই। সেখানে আজ তেরো দিন হলো বাবাকে দেখে না। স্কুলের গেটে মাকে দেখে আগে প্রশ্ন করে, ‘মা, বাবা এসেছে? বাবা এতদিন অফিসের কী কাজ করে?’ সুরাইয়া জবাব দেয় না। আব্দুল্লাহ ঘ্যানঘ্যান করতে করতে একসময় চুপ হয়ে যায়। সুরাইয়া বলেছিল বাবা চট্টগ্রাম গিয়েছে অফিসের কাজে। ওর কেবল ছয়। সবকিছু বোঝে না আবার একদম অবুঝ তো নয়। বাবা চট্টগ্রামে গেলে ফোন কেন বন্ধ রেখেছে? আব্দুল্লাহকে ফোন করছে না কেন? নানা প্রশ্ন।

আব্দুল্লাহর শরীর মুছে দিয়ে ওর পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সুরাইয়া। ফোনের রিংটোনে ঘুম ছুটে যায়। বান্ধবী ডালিয়ার ফোন। কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ডালিয়ার উত্তেজিত কণ্ঠ, ‘সুরাইয়া মেসেঞ্জারে একটা ভিডিও লিংক দিয়েছি, দ্রুত দেখ।’

মেজাজ খারাপ হয় সুরাইয়ার। এখন কি রিলস, ভিডিও এসব দেখার অবস্থা আছে সুরাইয়ার? ধমক দিতে গিয়ে দেখলো ডালিয়া ফোন কেটে দিয়েছে। মেসেঞ্জারে টিকটকের একটা ভিডিও পাঠিয়েছে ডালিয়া। সুরাইয়া ভিডিওতে ক্লিক করে।

ভিডিওটি চলছে আর তার প্রতি মুহূর্ত সুরাইয়া গিলছে। সেই নারীর আইডি। যে নারীটিকে হাফিজ তার সামনেই ব্লক করেছিল। কোথায় এই জায়গা? কক্সবাজার নয়। সম্ভবত সেইন্ট মার্টিন। কি সুন্দর আর মনোরম! বেহেশতের মতো। হাফিজের সঙ্গে সে কতবার সেইন্ট মার্টিন যেতে চেয়েছে! নানা ঝামেলায় যাওয়া হয়নি। নীল টি-শার্টে হাফিজকে ভীষণ সুন্দর লাগছে! মহিলাটির পরনে নীল সাদা কম্বিনেশনের জর্জেট শাড়ি। দুজন হাত ধরে বিচে হাঁটছে। ওদের খুব সুখী দেখাচ্ছে। মোবাইলটি পাশে রেখে আব্দুল্লাহকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে সুরাইয়া। আব্দুল্লাহ জ্বরের ঘোরে ‘বাবা’ বলে কেঁদে ওঠে।  বহুদিন পর সুরাইয়াও আব্দুল্লাহর মতো করে বুকভরে ডাক দেয়, ‘বাবা’।

রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সালথা উপজেলা শাখার উদ্যোগে ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সোমবার (৯ মার্চ) বিকেলে সালথা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় মুসল্লি, আলেম-ওলামা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রমজানের তাৎপর্য ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা এবং মিলনমেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. তরিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মাওলানা আবুল ফজল মুরাদ।

আলোচনা সভায় প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা মাহে রমজানের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, রমজান কেবল রোজা পালনের মাসই নয়, এটি আত্মসংযম, ধৈর্য, ত্যাগ ও নৈতিকতার অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। রমজানের শিক্ষা ব্যক্তি জীবনকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বক্তারা আরও বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ফরিদপুর জেলা জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি মাওলানা মিজানুর রহমান, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা সোহরাব হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বকুল মিয়া, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের সুরা সদস্য ও তালমা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. এনায়েত হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা মাহবুব হোসেন, ঢাকা মহানগরীর মুহাম্মদপুর থানা জামায়াতের সুরা সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা মুহাম্মদ সাইফুর রহমান হিটু।

এ ছাড়া উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি চৌধুরী মাহবুব আলী সিদ্দিকী নসরু, সালথা প্রেসক্লাবের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে উপস্থিত সকলের অংশগ্রহণে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৪ পিএম
১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এ বিষয়ে সোমবার (৯ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার (পশ্চিম) কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তিনি বিধি অনুযায়ী সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দুটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণের গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে তিনি ফৌজদারী মামলা দুটির অভিযোগ থেকে আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে খালাস পান।

এছাড়া তার গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করায় আরোপিত চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়। তাই কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে তার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হলো এবং তিনি বিধি মোতাবেক সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

 

 

বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও লাবলু মিয়া, সালথা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৯ পিএম
বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। নেই কোনো ঘর, নেই আধুনিক সেলুনের ঝাঁ চকচকে সাজসজ্জা। তবু এই পুকুরপাড়েই প্রতিদিনের মতো বসে মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর—এই সামান্য সরঞ্জাম নিয়েই তিনি টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামেও এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য সেলুন। উন্নত চেয়ার, আয়না, বৈদ্যুতিক ট্রিমার আর সাজানো দোকান—সবই আছে সেখানে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারের এই পুকুরপাড়ে বসা বৃদ্ধ নাপিতের কাছে এখনও ভিড় করেন অনেকেই। কারণ তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের স্মৃতি, বিশ্বাস আর গ্রামীণ জীবনের এক সরল অধ্যায়।

শৈশবেই পেশায় যুক্ত:

অকিল শীলের বাড়ি পাশের নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তাঁর পিতা হরিবদন শীল ছিলেন পেশায় নাপিত। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে তিনি এই কাজ শেখেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই কৈশোরেই জীবিকার তাগিদে পেশাটিকে বেছে নিতে হয় তাকে।

প্রথমদিকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নিজেই কাজ শুরু করেন। প্রায় ৬৬ বছর আগে মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে বসেই তিনি নিজের কর্মজীবনের যাত্রা শুরু করেন। সেই শুরু থেকে আজও একই জায়গায় বসেই কাজ করে যাচ্ছেন অকিল শীল।

হাটের দিনেই জমে ওঠে সেলুন:

মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। সাধারণত হাটের দিন সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে চলে আসেন অকিল শীল। সঙ্গে থাকে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি, পুরোনো কাঁচি, ক্ষুর আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

পুকুরপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসেই শুরু হয় তাঁর দিনের কাজ। গ্রামের মানুষজন একে একে এসে বসেন তাঁর সামনে। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে থাকেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে কাঁচি চালিয়ে চুল কাটছেন তিনি। মাঝে মাঝে ক্ষুর দিয়ে দাড়িও ছেঁটে দেন।

এই পুকুরপাড়ের ছোট্ট জায়গাটিই যেন তাঁর সেলুন, আবার কর্মজীবনের স্মৃতিবহ স্থান।

গ্রাহকদের কাছে প্রিয় ‘অকিল দা’:

স্থানীয় অনেকেই এখনও আধুনিক সেলুন ছেড়ে অকিল শীলের কাছেই চুল কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বৃদ্ধ নাপিতের সঙ্গে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, “আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকে অকিল দার কাছেই চুল কাটাই। এখন বয়স হয়েছে, তবু তাঁর হাতের কাঁচির ওপর ভরসা আছে।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “ওনার কাছে ধনী-গরিব সবাই চুল কাটান। কেউ তাকে অবহেলা করে না। বরং অনেকেই গল্প করতে করতে চুল কাটান। ওনার কাছে চুল কাটাতে অন্যরকম একটা আনন্দ আছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, অকিল শীল শুধু একজন নাপিত নন, তিনি যেন বাজারের একটি জীবন্ত ইতিহাস।

সামান্য আয়েই চলে সংসার:

অকিল শীল জানান, বর্তমানে তিনি প্রতি জনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তাঁর কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই হিসেবে প্রতিদিন খুব বেশি আয় হয় না।

তবুও এই সামান্য আয়ের ওপরই ভর করে তিনি নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন অনেক সেলুন হয়েছে, তবুও পুরোনো গ্রাহকেরা আসে।”

বয়সের কারণে কাজ করা কঠিন হলেও তিনি এখনো থামতে চান না।

অকিল শীল বলেন, “বয়স তো অনেক হয়েছে। শরীরও আগের মতো শক্তি পায় না। কিন্তু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। তাই যতদিন পারি কাজ করেই যেতে চাই।”

পরিবারের কেউ নেননি পেশা:

অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে তাঁদের কেউই বাবার পেশাকে অনুসরণ করেননি। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো জোর করিনি। তারা যার যার মতো কাজ করছে। আমি আমার কাজ নিয়েই খুশি।”

তবে তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ কর্মযাত্রা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক প্রতীক:

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড় মানেই অকিল শীল। বহু বছর ধরে তিনি এই জায়গাটিকে নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একসময় গ্রামে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসে নাপিতেরা মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন। আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারে এখনও সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন অকিল শীল।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি উনি এখানে বসে চুল কাটছেন। বাজারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, দোকানপাট বেড়েছে, কিন্তু উনার জায়গা বদলায়নি।”

কাঁচির টুংটাং শব্দে লেখা জীবনের গল্প:

পুকুরপাড়ে বসে কাঁচির টুংটাং শব্দ তুলতে তুলতে যেন নিজের জীবনের গল্পই লিখে চলেছেন অকিল শীল।

গ্রামীণ জীবনের সরলতা, পরিশ্রম আর আত্মমর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। বয়সের ভার, আধুনিকতার চাপ—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

হাটের দিনগুলোতে এখনো মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে দেখা যায় সেই পরিচিত দৃশ্য—একটি ছোট পিঁড়ি, হাতে কাঁচি ও ক্ষুর, আর সামনে বসা গ্রাহক।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও, অকিল শীল যেন এখনো ধরে রেখেছেন সেই পুরোনো দিনের গল্প। তাঁর কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে গ্রামীণ বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।