খুঁজুন
, ,

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হাজার বছরের জ্ঞানতীর্থ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:৫৭ অপরাহ্ণ
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হাজার বছরের জ্ঞানতীর্থ

ইসলামি ঐতিহ্য, আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান এবং উন্নত চিন্তাধারার এক অপূর্ব সমন্বয় হলো আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ফাতেমীয় খিলাফতের স্বর্ণালি যুগেরোর পুণ্যভূমিতে যে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, কালের বিবর্তনে সেই মসজিদটিই আজ বিশ্বজুড়ে ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ‘আল-আজহার’ নামকরণের মূলে রয়েছে মহীয়সী রমণী রাসূলকন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-এর পবিত্র স্মৃতি। তার মহিমান্বিত উপাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘আয-যাহরা’, যার অর্থ ‘উজ্জ্বল (Luminous)’ বা ‘দীপ্তিমান (Fulgente)’। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় একটি সাধারণ মসজিদ থেকে বিশ্বখ্যাত ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরছি।

ফাতেমীয় শাসনামল

ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ-এর শাসনামলে ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মিশর জয়ের পর সেনাপতি জওহর আল-সিকিল্লি নতুন রাজধানী ‘আল-কাহিরা’ (কায়রো) গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৯৭০ থেকে ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদ। শুরুতে আল-আজহার ছিল শুধু একটি ইবাদতখানা। যেখানে ইবাদতের পাশাপাশি ছোট পরিসরে মক্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হতো। তবে কয়েক দশক পর জ্ঞানী ও দক্ষ শিক্ষকদের হাত ধরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর শেষের দিকে ইবনে কিলিস (৯৩০-৯৯১ খ্রি.) ও ইবনে নুমান (৯০৩-৯৭৪ খ্রি.)-এর মতো বিখ্যাত আইনবিদরা এখানে যোগ দিলে আল-আজহারের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা এখানে ভিড় করতে শুরু করেন। তৎকালীন পাঠ্যসূচিতে কুরআন ও ইসলামি আইনের (ফিকহ) পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, আরবি ব্যাকরণ, দর্শন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের চন্দ্রগণনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে এখানে প্রথম ছাত্রাবাস নির্মিত হয় এবং ইবনে কিলিসের বিশেষ অনুরোধে তৎকালীন খলিফা শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বৃত্তি চালু করেন। পরবর্তী সময়ে ১০০৫ সালে একটি সমৃদ্ধ গবেষণা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। এমনকি জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিতে পণ্ডিতদের বিনামূল্যে কাগজ, কলম ও কালি সরবরাহ করা হতো। তৎকালীন খলিফা এবং ধনীদের উদার অনুদানের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়।

আইয়ুবির শাসনামল

ফাতেমীয়দের পতনের পর ১১৬০-এর দশকের শেষে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি ক্ষমতা গ্রহণ করলে আল-আজহারের ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তন আসে। বিদ্যাপীঠটি মূলত শিয়া মতাদর্শে চলত এবং সেখানকার অনেক শিক্ষকই ছিলেন শিয়া মতাদর্শী। কিন্তু নতুন শাসক সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ছিলেন সুন্নি মতের অনুসারী। মতাদর্শের এ পার্থক্যের কারণে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না। ফলে সরকারিভাবে শিক্ষকদের বেতন এবং শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আর এ আর্থিক সংকটে পড়ে অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এ সময় ফাতেমীয়দের তৈরি বিশাল লাইব্রেরিটিও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আল-আজহারের প্রতি কঠোর মনোভাব থাকলেও সালাউদ্দিন মিশরে কলেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় এক স্থায়ী অবদান রাখেন। এ ব্যবস্থার ফলে মসজিদের আঙ্গিনায়ই আলাদা শ্রেণিকক্ষসমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত ছাত্রাবাস গড়ে ওঠে। বিদ্যাপীঠটিতে নতুন ব্যবস্থাপনার ফলে ১২৫৮ সালে প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ আবদুল লতিফের (১১৬২-১২৩১ খ্রি.) মতো বিখ্যাত গুণী মানুষ এখানে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন।

মামলুক শাসনামল

১২৬০-এর দশকে মামলুকরা ক্ষমতায় আসার পর আল-আজহারকে আবারও সক্রিয় করে তোলেন এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া শুরু করেন। আইয়ুবি আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তি এবং শিক্ষকদের বেতন চালু করার পাশাপাশি তারা এ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য প্রচুর অর্থ ও সম্পদ দান করেন। ১৩৪০ সালে মসজিদের পাশে একটি বিশাল কলেজ ভবন নির্মাণ করা হয়, যা শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করে। মামলুকদের শাসনামলে আল-আজহার ইসলামি আইন ও আরবি শিক্ষার জন্য বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং সারা দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে শুরু করেন। এ সময় অন্ধ বালকদের পড়ালেখায় উৎসাহিত করতে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। মামলুকদের দেওয়া সম্মান ও সুযোগ-সুবিধার কারণে ১৩৮৩ সালে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনের (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.) মতো বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতরা এখানে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৪০০-এর দশকের শেষের দিকে মামলুকদের ১৮তম সুলতান কায়েতবে (১৪১৬-১৪৯৬ খ্রি.) পুরো মসজিদটি সংস্কার করেন এবং শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য নতুন ও আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণ করে আল-আজহারের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেন।

অটোমান বা তুর্কিদের শাসনামল

১৫১৭ সালে অটোমান তুর্কিরা মিশর দখলের সময় কায়রোতে অনেক যুদ্ধবিগ্রহ চালালেও আল-আজহারে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের ক্ষতি করেনি এবং এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখায়। তুর্কিদের শাসনামলে আল-আজহার সারা বিশ্বের মুসলমানদের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। এ সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পদের নাম দেওয়া হয় ‘শায়খুল আজহার’, যা আজ পর্যন্ত চালু আছে। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য তখন শিক্ষার্থীদের জাতীয়তা ও মাজহাব অনুযায়ী আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়েছিল। সে সময় আল-আজহারে আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা খুব একটা ছিল না। তা সত্ত্বেও ১৭৪৮ সালে কায়রোর তুর্কি শাসক আহমেদ পাশা (১৬৯১-১৭৪৮ খ্রি.) গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে পণ্ডিতদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য একটি সূর্যঘড়ি (Sundial) উপহার দিয়েছিলেন।

ফরাসি শাসনামল

১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিশর জয়ের মাধ্যমে আল-আজহারে আধুনিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ফরাসিদের আনা মুদ্রণযন্ত্রের (Printing Press) ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করার বদলে প্রথমবারের মতো মূল বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। ফরাসিদের মাধ্যমে আসা পাশ্চাত্য জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রভাবে ১৮৩০-এর দশকে আল-আজহারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা (Rector) ফরাসি ভাষা শেখেন এবং পরবর্তী সময়ে পাঠ্যসূচিতে গণিত ও বিজ্ঞানের মতো আধুনিক বিষয়গুলো যুক্ত করেন।

আধুনিকায়ন ও বর্তমান পরিসর

১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা মিশর দখল করলে তাদের শাসনামলে আল-আজহারকে আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কাজ গতি পায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশাল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। ১৮৮৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো ও ছাত্র সংসদ গড়ে তোলা হয়। একইসঙ্গে মিশরের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ আবদুহ (১৮৪৯-১৯০৫ খ্রি.) নিয়মিত পরীক্ষা পদ্ধতি ও নতুন কোর্স চালু করে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করেন। দীর্ঘদিনের এসব সংস্কার ও আধুনিকায়নের ফলে ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করে। দীর্ঘ সংস্কার প্রক্রিয়ার পর ১৯৩৬ সালে আল-আজহার আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৫২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন এবং ১৯৫৮-৫৯ সালে উচ্চশিক্ষার এক হাজার বছর পূর্তি উদ্যাপন করেন। এরপর ১৯৬১ সালে একটি যুগান্তকারী আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এখানে নারীদের উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করা হয় এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি ঐতিহ্যের সমন্বয়ে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।

বর্তমানে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান অর্জনের এক বিশাল ও প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সমকালীন তথ্য অনুযায়ী কায়রোসহ মিশরের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮১টি অনুষদ (Faculties) এবং ৩৬০টিরও বেশির বিভাগ (Department) রয়েছে, যেখানে ইসলামি শাস্ত্রের পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পড়ানো হয়। বর্তমানে এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষাধিক, যাদের একটি বিশাল অংশ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা বিদেশি শিক্ষার্থী। এ বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদানে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষক ও গবেষক নিরন্তর নিয়োজিত আছেন। আর এভাবেই হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ আজ মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদ্যাপীঠ হিসাবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

 

ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৭৫ বছর পূর্তি উৎসবে নেতৃত্বে সাঈদুর-নান্না, চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৭৫ বছর পূর্তি উৎসবে নেতৃত্বে সাঈদুর-নান্না, চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় তার গৌরবময় ১৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ডিসেম্বর মাসে আয়োজন করতে যাচ্ছে বর্ণাঢ্য পুনর্মিলনী ও উৎসব। বিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে দুই দিনব্যাপী এই উৎসব আয়োজনের লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে উদযাপন পর্ষদ, উপদেষ্টা পর্ষদ এবং সমন্বয়ক পর্ষদ।

উৎসব সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য গঠিত উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার সাঈদুর রহমান এবং সদস্য সচিব হয়েছেন সৈয়দ আব্দুল আউয়াল নান্না। ৫০টিরও বেশি ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত এই পর্ষদের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে শাব্বির হোসেন মনিকে।

যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কাজী জোবায়দুল হক টুলু, এস এম শামীম হাসান, সৈয়দ মান্নাফ হোসেন খসরু, মো. আমীর হোসেন সাগর, মাহফুজুর রহমান মবিন, মোস্তফা মাহমুদ আরেফি, মাহবুবুর রহমান সোহেল, অশোকেশ রায়, শোয়েবুল ইসলাম, মো. শেখ আব্দুল জলিল, দিদারুল মাহমুদ খান টিটু, শাহীন হক, উজ্জ্বল হোসেন, মুহাম্মদ শামীম হোসেন, সৈয়দ আলাওল হোসেন তনু এবং মো. আবু সাঈদ খান রানা।

উৎসবকে ঘিরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণ, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা, প্রকাশনা, ক্রীড়া ও বিভিন্ন আয়োজন পরিচালনার জন্য ১৪টি উপ-পর্ষদও গঠন করা হয়েছে। এসব উপ-পর্ষদ উৎসবের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করবে।

বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে গঠিত সমন্বয়ক পর্ষদের প্রধান সমন্বয়ক নির্বাচিত হয়েছেন প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান। অন্যদিকে ১৯৫৪ সালের এসএসসি ব্যাচ থেকে শুরু করে ৩০টিরও বেশি ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত উপদেষ্টা পর্ষদের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা।

শনিবার (২০ জুন) সকালে বিদ্যালয়ের ঈশান মেমোরিয়াল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ১১তম প্রস্তুতি সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এসব পর্ষদের নাম ঘোষণা করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান। সদস্য সচিব সৈয়দ আব্দুল আউয়াল নান্নার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা, আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার সাঈদুর রহমান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ মান্নাফ হোসেন খসরুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বক্তারা বলেন, ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ১৭৫ বছর পূর্তির এই আয়োজন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের জন্য এক সেতুবন্ধন তৈরি করবে।

আয়োজকরা আশা করছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশে অবস্থানরত হাজারো প্রাক্তন শিক্ষার্থী এই উৎসবে অংশ নিয়ে বিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাসের অংশীদার হবেন। ইতোমধ্যে নিবন্ধন কার্যক্রম ও উৎসবের বিভিন্ন প্রস্তুতি জোরেশোরে এগিয়ে চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উদ্বোধনের আগেই দখলের কবলে ফরিদপুরের নগরকান্দার স্বপ্নের সেতু, বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা

এহসানুল হক মিয়া, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৯:৪১ অপরাহ্ণ
উদ্বোধনের আগেই দখলের কবলে ফরিদপুরের নগরকান্দার স্বপ্নের সেতু, বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা

ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্র জুঙ্গুরদী এলাকায় কুমার নদের ওপর নির্মিত বহুল প্রতীক্ষিত নতুন সেতুটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়নি। তবে উদ্বোধনের আগেই সেতুর উত্তর প্রান্তে অবৈধ দখলের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, সেতুর সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউটার্ন এলাকায় টিনের বেড়া নির্মাণ করে জায়গা দখল করায় যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের পর নির্মিত এই সেতু নগরকান্দার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সেতুটি চালু হলে পৌর শহরসহ আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসবে। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই সেতুর নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, সেতুর উত্তর পাশে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন রয়েছে। স্থানীয়রা শুরু থেকেই ওই স্থানে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন ও সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে সড়ক বিভাগ সেতুর জন্য ১৪টি ল্যাম্পপোস্ট বরাদ্দ দেয়। বর্তমানে ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আলোকসজ্জার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটি উদ্বোধন করা হবে।

কিন্তু এরই মধ্যে সেতুর উত্তর প্রান্তের ইউটার্ন এলাকায় টিনের বেড়া নির্মাণ করে জায়গা দখলের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বেড়া সড়কের দৃশ্যমানতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বাঁক ঘুরে আসা কিংবা বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন সহজে দেখা যাচ্ছে না। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“সড়কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলায় চালকরা সামনে কী আছে তা বুঝতে পারছেন না। বিশেষ করে রাতে এবং দ্রুতগতির যানবাহনের ক্ষেত্রে এটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।”

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষ দাবি করেছে, তারা কোনো সরকারি জায়গা দখল করেননি। সেতুর ওপর থেকে সরাসরি তাদের বাড়ির অভ্যন্তর দেখা যাওয়ায় পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে টিনের বেড়া স্থাপন করা হয়েছে।

তবে পরিবহন চালক ও স্থানীয়রা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। ট্রাকচালক মুজিবুর রহমান বলেন,
“সেতুর একদিকে খাড়া ঢাল, অন্যদিকে তীব্র বাঁক। এর মধ্যে টিনের বেড়া দেওয়ায় বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি দেখা যায় না। ফলে যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পরে দায় চাপানো হবে চালকদের ওপর।”

স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াহিদুজ্জামান মোল্যা বলেন,
“এটি শুধু একটি সেতু নয়, নগরকান্দাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সেতুর সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি এই বেড়া মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। দ্রুত এটি অপসারণ করা প্রয়োজন।”

নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. হাবিবুর রহমান (বাবুল তালুকদার) বলেন, “সেতুটি অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে এবং এটি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে সেতুর সৌন্দর্য ও জননিরাপত্তা দুটিই নিশ্চিত হয়।”

এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফরোজা হক তানিয়া জানান, “ঘটনাস্থলে তহসিলদার পাঠানো হয়েছিল। অভিযুক্তরা টিনের বেড়া সরিয়ে নেওয়ার জন্য একদিন সময় চেয়েছিল। কিন্তু এখনো তা অপসারণ না করায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজোয়ানা আফরিন বলেন, “আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এসিল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “কেউ সরকারি জায়গা দখলের চেষ্টা করলে কিংবা জনস্বার্থ বিঘ্নিত করে এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত টিনের বেড়া অপসারণ না করা হলে উদ্বোধনের আগেই স্বপ্নের এই সেতু দুর্ঘটনার ‘ব্ল্যাক স্পট’-এ পরিণত হতে পারে। তাই জনস্বার্থ ও জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

ফরিদপুরে ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৬:৪৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে গাঁজাসহ আটক হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা মো. ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ।

রবিবার (২১ জুন) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সার্বিক পরিস্থিতি তদন্তের জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামছুল আজম এবং ডিআই-১ মো. মোশারফ হোসেন।

এর আগে শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাত ২টার দিকে মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকায় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের সময় মাদক বিক্রির অভিযোগে প্রান্তকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করে পুলিশ।

ডিবি পুলিশের তথ্যমতে, আটকের প্রায় এক ঘণ্টা পর প্রান্ত শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী জানিয়েছেন, হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সিটিস্কানে দেখা যায়, প্রান্ত ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন এবং তার মাথায় বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার শরীরে কোনো আঘাত বা নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “চিকিৎসকদের প্রাথমিক মতামত অনুযায়ী তিনি ব্রেনস্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছেন। তারপরও ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি সব দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেবে। তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।”

এদিকে প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান শেষ হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।