খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হাজার বছরের জ্ঞানতীর্থ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:৫৭ অপরাহ্ণ
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হাজার বছরের জ্ঞানতীর্থ

ইসলামি ঐতিহ্য, আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান এবং উন্নত চিন্তাধারার এক অপূর্ব সমন্বয় হলো আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ফাতেমীয় খিলাফতের স্বর্ণালি যুগেরোর পুণ্যভূমিতে যে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, কালের বিবর্তনে সেই মসজিদটিই আজ বিশ্বজুড়ে ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ‘আল-আজহার’ নামকরণের মূলে রয়েছে মহীয়সী রমণী রাসূলকন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-এর পবিত্র স্মৃতি। তার মহিমান্বিত উপাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘আয-যাহরা’, যার অর্থ ‘উজ্জ্বল (Luminous)’ বা ‘দীপ্তিমান (Fulgente)’। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় একটি সাধারণ মসজিদ থেকে বিশ্বখ্যাত ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরছি।

ফাতেমীয় শাসনামল

ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ-এর শাসনামলে ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মিশর জয়ের পর সেনাপতি জওহর আল-সিকিল্লি নতুন রাজধানী ‘আল-কাহিরা’ (কায়রো) গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৯৭০ থেকে ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদ। শুরুতে আল-আজহার ছিল শুধু একটি ইবাদতখানা। যেখানে ইবাদতের পাশাপাশি ছোট পরিসরে মক্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হতো। তবে কয়েক দশক পর জ্ঞানী ও দক্ষ শিক্ষকদের হাত ধরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর শেষের দিকে ইবনে কিলিস (৯৩০-৯৯১ খ্রি.) ও ইবনে নুমান (৯০৩-৯৭৪ খ্রি.)-এর মতো বিখ্যাত আইনবিদরা এখানে যোগ দিলে আল-আজহারের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা এখানে ভিড় করতে শুরু করেন। তৎকালীন পাঠ্যসূচিতে কুরআন ও ইসলামি আইনের (ফিকহ) পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, আরবি ব্যাকরণ, দর্শন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের চন্দ্রগণনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে এখানে প্রথম ছাত্রাবাস নির্মিত হয় এবং ইবনে কিলিসের বিশেষ অনুরোধে তৎকালীন খলিফা শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বৃত্তি চালু করেন। পরবর্তী সময়ে ১০০৫ সালে একটি সমৃদ্ধ গবেষণা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। এমনকি জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিতে পণ্ডিতদের বিনামূল্যে কাগজ, কলম ও কালি সরবরাহ করা হতো। তৎকালীন খলিফা এবং ধনীদের উদার অনুদানের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়।

আইয়ুবির শাসনামল

ফাতেমীয়দের পতনের পর ১১৬০-এর দশকের শেষে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি ক্ষমতা গ্রহণ করলে আল-আজহারের ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তন আসে। বিদ্যাপীঠটি মূলত শিয়া মতাদর্শে চলত এবং সেখানকার অনেক শিক্ষকই ছিলেন শিয়া মতাদর্শী। কিন্তু নতুন শাসক সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ছিলেন সুন্নি মতের অনুসারী। মতাদর্শের এ পার্থক্যের কারণে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না। ফলে সরকারিভাবে শিক্ষকদের বেতন এবং শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আর এ আর্থিক সংকটে পড়ে অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এ সময় ফাতেমীয়দের তৈরি বিশাল লাইব্রেরিটিও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আল-আজহারের প্রতি কঠোর মনোভাব থাকলেও সালাউদ্দিন মিশরে কলেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় এক স্থায়ী অবদান রাখেন। এ ব্যবস্থার ফলে মসজিদের আঙ্গিনায়ই আলাদা শ্রেণিকক্ষসমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত ছাত্রাবাস গড়ে ওঠে। বিদ্যাপীঠটিতে নতুন ব্যবস্থাপনার ফলে ১২৫৮ সালে প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ আবদুল লতিফের (১১৬২-১২৩১ খ্রি.) মতো বিখ্যাত গুণী মানুষ এখানে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন।

মামলুক শাসনামল

১২৬০-এর দশকে মামলুকরা ক্ষমতায় আসার পর আল-আজহারকে আবারও সক্রিয় করে তোলেন এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া শুরু করেন। আইয়ুবি আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তি এবং শিক্ষকদের বেতন চালু করার পাশাপাশি তারা এ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য প্রচুর অর্থ ও সম্পদ দান করেন। ১৩৪০ সালে মসজিদের পাশে একটি বিশাল কলেজ ভবন নির্মাণ করা হয়, যা শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করে। মামলুকদের শাসনামলে আল-আজহার ইসলামি আইন ও আরবি শিক্ষার জন্য বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং সারা দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে শুরু করেন। এ সময় অন্ধ বালকদের পড়ালেখায় উৎসাহিত করতে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। মামলুকদের দেওয়া সম্মান ও সুযোগ-সুবিধার কারণে ১৩৮৩ সালে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনের (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.) মতো বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতরা এখানে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৪০০-এর দশকের শেষের দিকে মামলুকদের ১৮তম সুলতান কায়েতবে (১৪১৬-১৪৯৬ খ্রি.) পুরো মসজিদটি সংস্কার করেন এবং শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য নতুন ও আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণ করে আল-আজহারের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেন।

অটোমান বা তুর্কিদের শাসনামল

১৫১৭ সালে অটোমান তুর্কিরা মিশর দখলের সময় কায়রোতে অনেক যুদ্ধবিগ্রহ চালালেও আল-আজহারে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের ক্ষতি করেনি এবং এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখায়। তুর্কিদের শাসনামলে আল-আজহার সারা বিশ্বের মুসলমানদের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। এ সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পদের নাম দেওয়া হয় ‘শায়খুল আজহার’, যা আজ পর্যন্ত চালু আছে। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য তখন শিক্ষার্থীদের জাতীয়তা ও মাজহাব অনুযায়ী আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়েছিল। সে সময় আল-আজহারে আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা খুব একটা ছিল না। তা সত্ত্বেও ১৭৪৮ সালে কায়রোর তুর্কি শাসক আহমেদ পাশা (১৬৯১-১৭৪৮ খ্রি.) গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে পণ্ডিতদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য একটি সূর্যঘড়ি (Sundial) উপহার দিয়েছিলেন।

ফরাসি শাসনামল

১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিশর জয়ের মাধ্যমে আল-আজহারে আধুনিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ফরাসিদের আনা মুদ্রণযন্ত্রের (Printing Press) ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করার বদলে প্রথমবারের মতো মূল বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। ফরাসিদের মাধ্যমে আসা পাশ্চাত্য জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রভাবে ১৮৩০-এর দশকে আল-আজহারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা (Rector) ফরাসি ভাষা শেখেন এবং পরবর্তী সময়ে পাঠ্যসূচিতে গণিত ও বিজ্ঞানের মতো আধুনিক বিষয়গুলো যুক্ত করেন।

আধুনিকায়ন ও বর্তমান পরিসর

১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা মিশর দখল করলে তাদের শাসনামলে আল-আজহারকে আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কাজ গতি পায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশাল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। ১৮৮৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো ও ছাত্র সংসদ গড়ে তোলা হয়। একইসঙ্গে মিশরের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ আবদুহ (১৮৪৯-১৯০৫ খ্রি.) নিয়মিত পরীক্ষা পদ্ধতি ও নতুন কোর্স চালু করে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করেন। দীর্ঘদিনের এসব সংস্কার ও আধুনিকায়নের ফলে ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করে। দীর্ঘ সংস্কার প্রক্রিয়ার পর ১৯৩৬ সালে আল-আজহার আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৫২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন এবং ১৯৫৮-৫৯ সালে উচ্চশিক্ষার এক হাজার বছর পূর্তি উদ্যাপন করেন। এরপর ১৯৬১ সালে একটি যুগান্তকারী আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এখানে নারীদের উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করা হয় এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি ঐতিহ্যের সমন্বয়ে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।

বর্তমানে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান অর্জনের এক বিশাল ও প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সমকালীন তথ্য অনুযায়ী কায়রোসহ মিশরের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮১টি অনুষদ (Faculties) এবং ৩৬০টিরও বেশির বিভাগ (Department) রয়েছে, যেখানে ইসলামি শাস্ত্রের পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পড়ানো হয়। বর্তমানে এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষাধিক, যাদের একটি বিশাল অংশ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা বিদেশি শিক্ষার্থী। এ বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদানে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষক ও গবেষক নিরন্তর নিয়োজিত আছেন। আর এভাবেই হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ আজ মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদ্যাপীঠ হিসাবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

 

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা