খুঁজুন
, ,

উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা

ওয়াহিদুদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ
উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত বার্ষিক ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্সের এবারের আলোচনার শিরোনাম ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন’, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা সবাই এখন এ বিষয়টি নিয়েই ভাবছি। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, তাতে আমার মনে হয় তিনটি বিষয় এখানে প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, একটি কার্যকর জনপ্রতিনিধিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ; দ্বিতীয়ত, এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে এবং তৃতীয়ত, সেই উন্নয়নের গুণগত মান কী হবে। অর্থাৎ, যে উন্নয়ন সংঘটিত হবে, তা একটি ন্যায্য সমাজ গঠন এবং আর্থসামাজিক বৈষম্য দূর করতে সহায়ক হবে কি না, সেটাই বিবেচ্য। এ তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয় এবং আমি বলব, এগুলো নিয়ে প্রচুর গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমাদের বর্তমান আলাপ-আলোচনা মূলত ওই প্রথম বিষয়টি অর্থাৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিয়েই আবর্তিত হচ্ছে। এই যে ঐকমত্য কমিশন কিংবা জুলাই সনদ—এগুলো সবই খুব ‘মডেস্ট’ বা সীমিত প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। এই মুহূর্তে আমাদের প্রত্যাশা—আমরা যেন অন্তত একটি কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি। স্বাধীনতার প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পরও আমাদের এ লক্ষ্যটি আমার কাছে সীমিতই মনে হচ্ছে। কারণ, এটি মূলত দেশ শাসনের একটি কার্যকর বন্দোবস্ত তৈরি করা মাত্র। এতদিন পরও আমাদের লক্ষ্য এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকাটা দুঃখজনক। তবুও আমরা আশা করব, নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, সেখানে হয়তো আমরা আরও দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই বন্দোবস্তের দিকে এগোতে পারব।

গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন নিয়ে প্রচুর গবেষণা ও লেখালেখি হয়; এটি অত্যন্ত বিস্তৃত একটি বিষয়। ফলে এটা নিয়ে কথা বলতে বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয় যে, এই বিস্তৃত বিষয়ের কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব। এ ছাড়া এতসব বিষয় নিয়ে সুস্থির মনে তাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা করার মতো মানসিক অবস্থাও আমার নেই। সে কারণে আমি আমার লেখা ইদানীংকালের দুটো বইয়ের আলোকে কথা বলতে চাই। একটি বইয়ের নাম ‘উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ এবং অন্যটি ‘মার্কেটস, মরালস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: রি-থিংকিং ইকোনমিকস ফ্রম এ ডেভেলপিং কান্ট্রি পারসপেকটিভ’। সারা বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল সমস্যাটি হলো—একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থাকবে, যেখানে অর্থনীতি হবে প্রধানত মুনাফাতাড়িত, ব্যক্তিনির্ভর এবং বাজারভিত্তিক; আবার তাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণও থাকবে। এমন একটি গণতান্ত্রিক বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় আমরা একই সঙ্গে একটি ন্যায্য সমাজ চাই এবং বৈষম্যও কমিয়ে রাখতে চাই। এটি কীভাবে সম্ভব? এ প্রশ্নের কোনো একক সমাধান নেই। আমি নিজে যা চিন্তা করেছি, তা ওপরে উল্লিখিত বই দুটিতে মোটামুটি লিখেছি। তবে এখন আরও নানা ধরনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

আসলে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করে একটি দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং পরিবেশের ওপর। এর কোনো একক সমাধান অন্য দেশ থেকে ধার করে আনা সম্ভব নয়। যেমন—আমরা যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাই, যা সুষম এবং দারিদ্র্য নিরসনকারী হবে; তবে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো হতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। ভালো ক্রিকেট খেলতে চাইলেই যেমন শচীন টেন্ডুলকারের মতো খেলা যায় না, ব্যাপারটা তেমনই। প্রতিটি দেশকেই তার নিজস্ব পথ খুঁজে বের করতে হয়।

আগেই বলেছি যে, খুব সুস্থিরভাবে নতুন কোনো একাডেমিক ভাবনা-চিন্তার অবকাশ আমি পাচ্ছি না। কারণ হলো, আমি একটি দৈবক্রমে গঠিত সরকারের দৈবক্রমে নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্টা। সেখানে গবেষণা বা লেখালেখির সুযোগ নেই। তবে একটা সুবিধা আছে—তা হলো, এতদিন যেসব গবেষণা বা লেখালেখি করেছি, সেগুলোর ধারণার সঙ্গে বাস্তবের কতটুকু মিল আছে, তা যাচাই করা। আমরা অনেকেই গবেষণায় বলি—কেন এটা করা হচ্ছে না, কেন ওটা আরও ভালো হচ্ছে না, কেন এদিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যে এগুলোর অনেক সময় মিল থাকে না, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে।

আমি আগেই বলেছি, এই মুহূর্তে আমরা যেসব সংস্কারের কথা বলছি, তার লক্ষ্য হলো কার্যকর গণতন্ত্রের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। যেখানে একটি নির্বাচিত সংসদ থাকবে এবং সেই সংসদের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। সেইসঙ্গে কিছু অনির্বাচিত কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকবে, যা যে কোনো দেশেই থাকে। যেমন—স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সক্রিয়তা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহির জন্য এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং ভালো গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ঠিকঠাক থাকলেও গণতন্ত্রের গুণগত মান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে রাজনৈতিক আচার-আচরণ এবং সংস্কৃতির ওপর। এটাই আসল কথা এবং এ সংস্কৃতি এক দিনে গড়ে ওঠে না, ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘টুয়েন্টি ইয়ার্স অব রিফর্মস’ নামে একটি বিখ্যাত বই আছে। বইটি মূলত দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কার নিয়ে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা অনেকটা বাংলাদেশের মতোই ছিল—সার্কিট জাজ থেকে শুরু করে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, সব জায়গাই ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। নিয়মনীতির বালাই ছিল না, ছিল মাফিয়াতন্ত্র। মাত্র বিশ বছরের মধ্যে সেই সংস্কৃতি বদলে আমেরিকা কীভাবে একটি নিয়মবদ্ধ, প্রাতিষ্ঠানিক ও সুসংগত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আসতে পারল, তা লক্ষণীয়। আমরা অতীতে যা দেখেছি, তা বদলাতে হবে। রাজনীতি যদি জনকল্যাণমুখী না হয়ে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা বিতরণের হাতিয়ার হয়, যা আমরা এতদিন দেখে এসেছি—তাহলে যুবসমাজের একটি বড় অংশ ‘ক্যাডারভিত্তিক’ রাজনীতি বা চাঁদাবাজিকেই জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, একটি সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী শুধু ব্যবসার পরিবেশই নষ্ট করে না (যাকে আমরা ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বলি), বরং তারা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণকেও নিজেদের প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসে। এর ফলে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

আমার মনে হয়, একটি বিষয় হয়তো কেউ সেভাবে তুলে ধরেননি—তা হলো আমাদের শিক্ষার নিম্নমান এবং বিদ্যালয় থেকে অকালে ঝরে পড়া। এর সঙ্গে যুব বেকারত্ব ও যুবসমাজের একাংশের রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক জীবিকার প্রতি ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি পরস্পর সম্পর্কিত। এ সমস্যাগুলোর সমাধান পৃথকভাবে করা সম্ভব নয়। আমরা হয়তো এভাবে বিষয়টি ভেবে দেখিনি। তাই শুধু রাজনীতির ওপর দোষ চাপালেই চলবে না; আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও বেকার সমস্যার দিকেও নজর দিতে হবে।

ধরলাম, আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হলাম। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো—সেই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে? শুধু গণতন্ত্র থাকলেই যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তা ছাড়া বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশইবা কীভাবে তৈরি হবে? এটি তো শুধু সরকারের একার বিষয় নয়। বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে অনেক আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ সবসময়ই পিছিয়ে। একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া হয়—যদিও আমরা অনেকে তা পুরোপুরি বিশ্বাস করি না যে, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কমালে বা লাইসেন্স পাওয়ার সময় কমিয়ে আনলেই ব্যবসার পরিবেশ ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু আমলাতান্ত্রিক সমাধান দিয়ে এ পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে ব্যবসায়ী এবং আমলা বা সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যদি একটি অশুভ লেনদেন বা আঁতাতের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবে তা শুধু প্রশাসনিক সংস্কার দিয়ে হঠাৎ করে ঠিক করা যায় না। এটি সত্য যে, আমরা নতুন আইনকানুন ও বিধিবিধান তৈরি করতে পারি, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াবে এবং এতে কিছু সমস্যার সমাধানও হবে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এ বছর থেকে অনলাইনে আয়কর জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছি। এর ফলে কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ আর নেই, যা নিঃসন্দেহে সাধারণ করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করবে। এটি অবশ্যই কার্যকর একটি পদক্ষেপ। কিন্তু বড় বড় কর ফাঁকির ঘটনাগুলো যে শুধু অনলাইনে কর ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাধান হবে, তা নিশ্চিত নয় বা আমি তা মনেও করি না। সেটির জন্য আরও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। মোদ্দাকথা হলো, আমরা আইনকানুন বা বিধিবিধান দিয়ে যা-ই করতে চাই না কেন, সেটার ফলাফল নির্ভর করবে ওই দেশের তৎকালীন ব্যবসায়িক-আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি বা আচরণবিধির ওপর—যাকে আমরা বলি ‘সোশ্যাল সুপার স্ট্রাকচার’। আমরা যেসব নতুন বিধিবিধান দিচ্ছি, সেগুলো কী ধরনের প্রণোদনা বা ইনসেনটিভ তৈরি করছে, তা এ কাঠামোর ওপরই নির্ভর করে। আমি যদি ওই পরিবেশ বা আচরণকে ঠিকমতো বুঝতে না পেরে ভুলভাবে নতুন বিধিবিধান চাপিয়ে দিই, তবে তার ফলাফল অনির্দিষ্ট হতে পারে। যদি সেটি কার্যকর হয়, তবে হয়তো উৎপাদনশীল উদ্যোগকে উৎসাহিত করবে। কিন্তু কার্যকর না হলে তা উল্টো ‘রেন্ট সিকিং’ বা অবৈধ উপার্জনের দিকেই মানুষকে ঠেলে দেবে। তখন মনে হবে আমরা ভালো বিধিবিধান করছি, কিন্তু আদতে তা অবৈধ উপার্জনের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত সংস্কারের অধীনে বলা হতো—ঢালাওভাবে উদারীকরণ ও বেসরকারীকরণ করে যাও, তাহলেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে এবং সব সমস্যার সমাধান মিলবে। কিন্তু ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংক নিজেই একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানায় যে, তাদের এ উদারীকরণ ও সংস্কারের পরামর্শ একেক দেশে একেক রকম ফল দিয়েছে। কোনো দেশে ভালো ফল মিলেছে, আবার কোনো দেশে উল্টো ক্ষতি হয়েছে। এর কারণ হলো, একটি দেশের আচরণবিধি এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক, অর্থাৎ ‘রিলেশনশিপ অব ট্রাস্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন’ কেমন, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। একে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বা সামাজিক মূলধনও বলা হয়। আমরা যখন নতুন বিধিবিধান চাপিয়ে দিই, তখন সেটির কার্যকারিতা কতটুকু হবে, তা মূলত এ সামাজিক মূলধনের ওপরই নির্ভর করে।

আমি দুয়েকটি উদাহরণ দিতে চাই। আগেই বলেছি, নতুন করে ভাবার সময় আমি পাইনি, তবে কিছু উদাহরণ আমি লক্ষ করেছি। যেমন—ভারতে ঘুষ নেওয়া যেমন ফৌজদারি অপরাধ (ক্রিমিনাল অফেন্স), তেমনি ঘুষ দেওয়াও অপরাধ। আমাদের অনেকের পরিচিত কৌশিক বসু, যিনি একসময় ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল, ঘুষ দেওয়াও যদি অপরাধ হয়, তবে কেউ আর ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ হবে না। অর্থাৎ, কেউ নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলবে না যে, অমুক কর্মচারী আমার কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছে। তাই তিনি প্রস্তাব করেছিলেন ঘুষ দেওয়াকে যেন অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা হয়। কিন্তু তখন ভারতের গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে এ নিয়ে তুমুল হৈচৈ পড়ে যায়। তারা মনে করেছিল, এটি একটি অনৈতিক প্রস্তাব, যা ঘুষ দেওয়াকে বৈধতা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তার প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখলাম, বাংলাদেশে ঘুষ নেওয়া অপরাধ হলেও ঘুষ দেওয়াকে সবসময় সেভাবে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। কিন্তু তারপরও তো খুব একটা লাভ হয়নি। এর কারণ হলো, যখন কোনো অবৈধ সুবিধা আদায়ের জন্য—যেমন কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া হয়, তখন যিনি দিচ্ছেন তিনিও বিষয়টি প্রকাশ করবেন না। বাংলাদেশ বা আমাদের মতো দেশগুলোতে অনেক ঘুষ লেনদেন হয় ‘স্পিড মানি’ হিসেবে। এতে উভয়পক্ষেরই স্বার্থ থাকে, তাই কেউই এ নিয়ে কথা বলে না।

আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। আমাদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘সরকারি ক্রয়নীতি সংশোধন ২০২৫’ পাস হয়েছে এবং এটি এখনই কার্যকর। সরকারি ব্যয়ের বিশাল অংশ উন্নয়ন বাজেট, পরিচালন বাজেট, রাজস্ব বাজেট—সবকিছুই এ ক্রয়নীতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা একদম উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চতম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সংশোধনীর উদ্দেশ্য হলো ঠিকাদারি খাতের একচেটিয়া প্রভাব ভাঙা। আমরা দেখেছি, রেলওয়ে বা সড়ক ও জনপথের মতো বিভিন্ন খাতে দু-তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে কাজগুলো কুক্ষিগত করে রেখেছে। নতুন নীতিমালার অধীনে টেন্ডার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ের সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ওই সেক্টরের অতীত অভিজ্ঞতাই এখন আর মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বেনামে ঠিকাদারি নেওয়ার কোনো সুযোগ আর থাকছে না; অর্থাৎ, প্রভাব খাটিয়ে কাজ নিয়ে অন্যকে দিয়ে করানো যাবে না। এতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। যারা হয়তো আগে কখনো টেন্ডারে অংশ নেয়নি কিন্তু ভালো ব্যবসায়ী, যাদের কর ও ব্যবসার নথিপত্র স্বচ্ছ—তাদের এখন পার্টনার হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে।

যাইহোক, এগুলো আমার মূল কথা নয়। আমি আসলে যেটা বলতে চেয়েছি তা হলো, টেন্ডারের মূল্যায়ন পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়েছে। কোনো একটি দেশে টেন্ডার মূল্যায়নের আদর্শ পদ্ধতি কী হবে, তার কোনো ধরাবাঁধা ফর্মুলা নেই। এটি মূলত নির্ভর করে যে সরকারি কর্তৃপক্ষ টেন্ডার আহ্বান করছে এবং যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবেদন করছে—এ দুপক্ষের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। বিভিন্ন দেশে এ পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন হয়। যদি উভয়পক্ষকেই সন্দেহের চোখে দেখতে হয়—আমাদের ক্ষেত্রে যা দিয়েই শুরু করতে হচ্ছে, যেখানে টেন্ডার আহ্বানকারী কর্মকর্তাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন এবং ঠিকাদার যে কুকর্ম করবেন না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই—সে ক্ষেত্রে মূল্যায়ন পদ্ধতিকে একদম নিয়মবদ্ধ করে দিতে হয়। সেখানে কোনো ‘ডিসক্রিপশন’ বা নমনীয় মূল্যায়নের সুযোগ রাখা যায় না।

তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। যদি আমি কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য হতাম, তবে আমি নমনীয়ভাবে চাইতাম যেন সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই কাজটা পায়; শুধু নিয়মনীতির ফর্মুলার মধ্যে আটকে না থেকে নিজের বিবেচনা ব্যবহার করতাম। কিন্তু এখানেই একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়—একদিকে কীভাবে দুর্নীতির সুযোগ কমানো যাবে আর অন্যদিকে কীভাবে প্রকৃত ভালো দরদাতা বাছাই করা যাবে। আমি এ কথাটি বললাম কারণ, এ ফর্মুলাটি কী হবে তা নির্ভর করে ওই দেশে এই দুপক্ষের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার সংস্কৃতি কতটা গড়ে উঠেছে তার ওপর। হয়তো ভবিষ্যতে এ ফর্মুলা বদলানো যাবে বা আরও নমনীয় করা যাবে, যখন আমরা দেখব যে সত্যিই ভালো ভালো ঠিকাদার এসেছে, তাদের বিশ্বাস করা যায় এবং কর্তৃপক্ষও আরও সৎ হয়েছে।

আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সেটি হলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উৎপাদিত পরিসংখ্যান, বিশেষ করে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির হিসাব। এসব পরিসংখ্যান বিবিএস নিজেরা সরাসরি প্রকাশ করে না; সরকারের মন্ত্রীকে তা অনুমোদন করতে হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। একটি হলো বিবিএসের সক্ষমতার বিষয়। যে কোনো উন্নয়নশীল দেশে তারা যেসব পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করে, সেগুলোর মধ্যে অনেক অসম্পূর্ণতা থাকে এবং গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে। আরেকটি হলো, সরকার প্রভাব বিস্তার করে মূল্যস্ফীতি কম দেখাতে চাচ্ছে কি না, কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখাতে চাচ্ছে কি না। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এমনটা প্রায়ই ঘটে। আসলে জিডিপি বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি খুব ভালো একটি সূচক নয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভালো হলেই যে সবার কল্যাণ সাধিত হবে, এমন কোনো কথা নেই। ১৯৩০-এর দশকে বা ৪০-এর দশকের শুরুতে যখন সাইমন কুজনেট জিডিপি ধারণাটি তৈরি করেন, তখন তা মূলত যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র সম্পর্কিত হিসাব-নিকাশ তৈরির জন্য করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ৫০-এর দশকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাপ্লাইড ইকোনমিকসের রিচার্ড স্টোন এবং কেইনসের ছাত্ররা মিলে ‘ইনপুট-আউটপুট টেবিল’ ব্যবহার করে জিডিপিকে আজকের কাঠামোতে রূপ দেন।

যাইহোক, আমি বলছিলাম যে বিবিএসের সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং আমরা তা নিয়ে ভাবছি। হোসেন জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এখানে প্রশ্ন উঠেছে—বিবিএসকে স্বাধীন করে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? স্বাধীন করলেও তো যে কোনো প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত সরকারের অধীনেই থাকে এবং সক্ষমতার বিষয়টিও থেকে যায়। তার চেয়েও বড় কথা, আমার নিজের বিশ্বাস এবং এ কারণেই কিছু বিধিবিধান এরই মধ্যে করা হয়েছে এবং পরিসংখ্যান আইনে নতুন ধারা সংযুক্ত করার উদ্যোগ আমরা নিচ্ছি; তা হলো বিবিএসের স্বাধীনতার চেয়েও বেশি জরুরি হলো তাদের উৎপাদিত পরিসংখ্যান ও তথ্যের স্বচ্ছতা। (চলবে)

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা।

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ

 

ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে সেক আব্দুল্লাহ (৫) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

শনিবার (২০ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত আব্দুল্লাহ উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের চর অমরাপুর গ্রামের সেক শাহেদের ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল পরিবারের সবার ছোট এবং অত্যন্ত আদরের সন্তান।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাড়ির পেছনে খেলাধুলা করছিল আব্দুল্লাহ। এ সময় একটি কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে থাকা বিষাক্ত সাপ তার পায়ে কামড় দেয়। কামড় খাওয়ার পর শিশুটি বাড়িতে এসে মাকে জানায়, তাকে ‘ব্যাঙে কামড় দিয়েছে’। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান, যিনি নিজেকে ঝাড়ফুঁক ও চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন বলে পরিচয় দেন।

শিশুটির চাচি আখি আক্তার জানান, স্থানীয় শহীদ ফকির নামে এক ব্যক্তির কাছে নেওয়ার পর তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, এটি সাপের কামড় নয়। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে কিছু সময় সেখানে কাটানো হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আব্দুল্লাহর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও দুপুরের দিকে শিশুটি মারা যায়।

গাজিরটেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রথমে শিশুটিকে স্থানীয় এক ফকিরের কাছে নেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

আব্দুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো চর অমরাপুর গ্রাম। প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।