খুঁজুন
, ,

ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

মফিজ ইমাম মিলন
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

বাংলা ভাষায় ‘আমলা’ শব্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের প্রেক্ষিত ভিন্নতর। আরবিতে ‘আমল’ শব্দের অর্থ কাজ। সে নিরিখে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আমল বা কাজ করে, তারাই আমলা। উৎপত্তি আর বুৎপত্তি—যে অর্থেই ব্যবহার করি না কেন, আমলাতন্ত্রের শানে নুযুল কিন্তু আমাদের সামনে এক ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করে। শিল্পী লাইলির আমলনামা কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টোটা।

লাইলি বেগম কবে, কার কাছে থেকে ‘খালা’ উপাধি পেয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে ষাটোর্ধ্ব এই নারীর ক্ষেত্রে বয়সটাই হয়তো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফরিদপুরের ছয় দশকের ধুলো, বালি, ময়লা আর অমলিন সময় লাইলির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে রয়েছে। তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও কম নয়। কারণ তিনি আজন্ম ভবঘুরে।

কোনো পাসপোর্ট তিনি বানাননি, কিন্তু দিল্লির আজমির শরীফ যেন তাঁর হাতের মুঠোয়। বাড়ি থেকে না বলে-কয়ে অজানার পথে রওনা দিতে তাঁর যতটুকু সময় লাগে, ততটুকুই। অক্ষরজ্ঞানহীন এই মানুষটির সবচেয়ে বড় সখ—‘মানুষ দেখা’। তিনি প্রায়ই প্রশ্ন করেন, “আল্লার দুনিয়ায় কত পদের মানুষ, কিন্তু কারো সঙ্গে কারো মিল নাই কেন?” এর সদুত্তর কোনোদিনই তাঁকে দিতে পারিনি। তবে মানুষ দেখতে যাওয়ার সফরসঙ্গী হয়েছি কয়েকবার। হাটে, নৌকাঘাটে, রেলস্টেশনে—যেখানে মানুষের ভিড়, লাইলি সেখানেই।

২০০০ সাল থেকে প্রায় সাত বছর আমি ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমির সেক্রেটারি ছিলাম। প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে লাইলি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। মাঝেমধ্যে বায়না ধরতেন—
“স্যার, একটা গান শোনাই?”

বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাতাম। একদিন জোর করেই আমাকে মেহেদী হাসানের একটি গজল শোনালেন। বাহবা দিতেই গেয়ে উঠলেন রুনা লায়লার ১৪ বছর বয়সে গাওয়া পাকিস্তানি ছবি আঞ্জুমান-এর সেই বিখ্যাত উর্দু গান— “আপ কি দিল মে আনজুমান মে, হুসনে বান কার আগায়া…”

পারিবারিকভাবে আমরা সবাই মেহেদী হাসান আর নূরজাহানের ভক্ত। কিন্তু সেদিন বুঝতে পারিনি—আমি রুনা লায়লার ভক্ত হলাম, নাকি লাইলির।

পিয়নরা ভীষণ বিরক্ত হতো তাঁকে নিয়ে। ওয়ান টাইম কাপ ছাড়া চা দিত না। তাও কখনো ফুরিয়ে যেত। লাইলি সব বুঝতেন। তরমুজের বিচির মতো পান খাওয়া দাঁত বের করে হেসে বলতেন— “স্যার, কত খাওয়া যাবি চা?”

একদিন আবদার করে বললেন—“স্যার, আমারে হারমোনিয়াম শিখাইবেন না?”

স্থানীয় শিক্ষকদের অনুরোধ করলাম, তাঁকে একটু গানবাজনা শেখানোর জন্য। একসময় তিনি নিজেই সুর তুলতে শিখে গেলেন। এরপর ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের প্রায় সব অনুষ্ঠানে লাইলি অপরিহার্য হয়ে ওঠেন।

২০০৩ সালে কবি জসীমউদ্দীনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জসীম পল্লী মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। পল্লীকবির সৃষ্ট নায়ক-নায়িকাদের যেন বাস্তবে হাজির করা হয়েছিল সেই মেলায়। কবিতার আসমানী, লোকগানের কিংবদন্তি হাজেরা বিবি, তাম্বুলখানা থেকে আদর্শ কৃষক গণি মিয়া, আর ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আনা হয়েছিল লাঠিয়াল রুপাইকে।

তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন তরুণ কর্মকর্তা জালাল আহমেদ। তিনি সবার জন্য ভালো উপহারের ব্যবস্থা করতে বললেন। গায়িকা লাইলির কথা বলতেই তাঁর জন্য শাড়ি-কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসক গান শুনে তাঁকে কাপড় উপহার দিয়েছেন—এ কথা লাইলি নিজেই মাইকের মতো প্রচার করতে লাগলেন।

শহরের সবাই লাইলিকে চেনেন—তা নয়। তবে শিল্প-সংস্কৃতির মানুষদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর ঠিকানা অবশ্য কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। একসময় পৌর বিসর্জনঘাটের কাছে থাকতেন। স্বামী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। দুই ছেলে, দুই মেয়ে—সবাই বিবাহিত। স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছু নেই। কখনো শহরতলির হারুকান্দীতে ছেলের বাসায়, কখনো ঝিলটুলীর মালেক মীর বাড়িতে রাত কাটান। শুধু ওয়াজ মাহফিল নয়—যেখানে রামকীর্তন, যেখানে তিন রথের মেলা, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি।

যোগাযোগের সুবিধার্থে কয়েক বছর আগে তাঁকে অল্প দামের একটি বাটন ফোন কিনে দিয়েছিলাম। ফোন হাতে নিয়েই প্রশ্ন করলেন— “এইটার সঙ্গে কি কানেকশন পাওয়া যাবে?”

কার সঙ্গে—জিজ্ঞেস করতেই ফোনটা আমার হাত থেকে নিয়ে দূরে পানিতে ছুড়ে ফেললেন। তারপর বললেন—“এই জ্ঞান নিয়ে আবার গানবাজনা করেন আপনারা!”

লাইলির সেই মারফতি কথার অর্থ আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি ফরিদপুর হেরিটেজ প্রথম অনুষ্ঠান করেছিল লাইলিকে প্রধান অতিথি করে। সেটি ছিল তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন। অধ্যাপক আলতাফ হোসেন, ফারাহ দিবা আহমেদ, শামীম আরা বেগম, মৃধা রেজাউল, অধ্যাপক হিমু, শরীফসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। ভিন্ন মাত্রার এক আয়োজন ছিল সেদিন।

প্রায় ১৫ বছর আগে আমরা একবার ‘পাগল সম্মেলন’ করেছিলাম। মূল চরিত্র ছিলেন প্রফেসর আলতাফ হোসেন। সেই অনুষ্ঠানেও লাইলি গান গেয়েছিলেন। তবে সেখানে গোলমাল বেঁধেছিল গান নিয়ে। কেউ চায় না লাইলি একা গান গাইুক—সব ‘পাগল’ একসঙ্গে গাইবে! অথচ লাইলি সুর, তাল, লয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু পাগলরা কি আর গ্রামার মানে?

গত ২ এপ্রিল ২০২৬, ফরিদপুর হেরিটেজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইসমাইল জবিউল্লাহ। তাঁর সঙ্গে কথা ছিল—ফরিদপুরে এলে তাঁকে লাইলির গান শোনাব। শুনিয়েছিলামও। দুই সংসদ সদস্য—চৌধুরী নায়াব ইউসুফ ও শহীদুল ইসলাম বাবুল—দুজনেই বললেন, “আমরা বক্তব্য রাখব না, লাইলির গান শুনব।”

ইসমাইল জবিউল্লাহ সাহেব ডিসি থাকাকালীন সময় থেকেই লাইলিকে চিনতেন। তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা। অসাধারণ বিনয়ী ও চৌকস প্রশাসক। তিনি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিলেন— “এমন কিছু করবেন না, যাতে জবিউল্লাহ সাহেব অসন্তুষ্ট হন।”

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৪ মে, উপমহাদেশের রাজনৈতিক সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত এবং নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিলে নজরুল জন্মোৎসবের আয়োজন করা হয়। যথারীতি সাহিত্য পরিষদের একনিষ্ঠ সদস্য শরীফ খান দায়িত্ব নেন লাইলিকে অনুষ্ঠানে আনার। যথাসময়ে লাইলি উপস্থিত হন। আমি মঞ্চের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে দর্শক সারিতে তাঁর পাশে গিয়ে বসি।

সকলের অনুরোধে লাইলি দুটি গান গাইলেন। মুহূর্তেই শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মাগরিবের আজান হয়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়। “ওয়ান মোর, ওয়ান মোর”—শব্দগুলো বাতাসে ভাসতে থাকে।

রিকশাভাড়া বাবদ তাঁকে তিনশ টাকা দিলে তিনি একশ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন— “অত লাগবে না। যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।”

এর মধ্যেই টেলিভিশনের এক এ-গ্রেডের ধোপদুরস্ত শিল্পী এক এমপির কাছে নালিশ করেন—“রাস্তার শিল্পীরা গান গায়, আর আমি এ-গ্রেডের শিল্পী হয়েও সুযোগ পাই না!”

‘রাস্তার শিল্পী’ বলতে তিনি লাইলিকেই বুঝিয়েছিলেন।

শিল্পী লাইলিকে নিয়ে পোস্ট দিতে কাউকে কেউ উদ্বুদ্ধ করেনি। তিনি ভাইরাল হয়েছেন নিজের গুণে। তাঁর গাওয়া “নয়ন ভরা জল গো তোমার” গানটি শুনলেই বোঝা যায়।

তবে নজরুল জন্মোৎসব এখানেই শেষ হয়নি।

রাত ১০টার দিকে ফরিদপুর জেলা বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক ফোন করে জানতে চান—নজরুল জন্মোৎসব ময়েজ মঞ্জিলে কেন? আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি—১৯৩৯ সালে ময়েজ মঞ্জিলের মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী এবং কোমরপুরের হুমায়ুন কবির মিলে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ গঠন করেছিলেন। নজরুলের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই জায়গাটির সঙ্গে।

ওপাশ থেকে উত্তর আসে—“কবে কে কী কইরা থুইয়া গেছে, তার জন্য এখন ময়েজ মঞ্জিলে অনুষ্ঠান মানা যাবে না!”

আমি বলি—“অশিক্ষিত লোকের মতো কথা বলো না।”

তিনি আরও রেগে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় বলতে থাকেন—ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ ভেঙে-চুরে গুঁড়িয়ে দেবেন।

আমি যদি তাঁর অতীত না জানতাম, তাঁর জাতগোষ্ঠী না চিনতাম, তাহলে হয়তো চুপ থাকতাম। আমার মাতুলকুলের চার পুরুষ এই শহরের মানুষ। আমরা কি মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছি? আমাকে কিছু বলতে হলে বাখুন্ডা পার হয়ে, জোয়ারের মোড় ছাড়িয়ে, মহিলা রোড ডিঙিয়ে তালমার মোড়ে গিয়ে বলতে হবে।

এই শহরে চাঁদাবাজ, ধান্ধাবাজ আমি নই। আশির দশক থেকে ফরিদপুরের যত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তার প্রতিটির শুরুতে আমি জড়িত ছিলাম। কোনো সংগঠন থেকে ১০ টাকারও কোনো ভাউচার দেখাতে পারলে আর সমাজসেবা করব না।

আমি যেহেতু রাজনীতি করি না, কোনো দলের সদস্য নই—তাই সবার কাছেই যাই। প্রতিষ্ঠানের জন্য যাই, ব্যক্তিস্বার্থে নয়। হ্যাঁ, এ কে আজাদের কাছেও গেছি, ভবিষ্যতেও যাব—প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে। তিনি শিশু চিকিৎসাকেন্দ্র ও মুসলিম মিশনে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন, শহীদুল হাসান সাহেব ছাড়া আর কে দিয়েছেন?

যাই হোক, কথা অন্যদিকে চলে গেল। আসলে মফস্বল শহরে সাহিত্যচর্চা আর সমাজসেবার কাজ করতে কত ব্যথা আর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা আমাদের হাসিমুখ দেখে বোঝা যায় না।

সেদিন ময়েজ মঞ্জিলে লাইলি খালা গান গেয়েছিলেন। সেই লাইলি খালা—যাকে আমি শিল্পকলার সেক্রেটারি থাকাকালে হারমোনিয়ামের সামনে বসিয়েছিলাম। যে আমার কাছে আসত জোর করে দুটি গান শোনানোর জন্য।

সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও, বিশেষ করে লাইলি খালার গান, ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর শত শত ফোন পেয়েছি। ফেসবুক সয়লাব হয়ে গেছে। তাই মনে হলো, লাইলি খালা সম্পর্কে কিছু লিখে রাখা দরকার।

দরদি এই শিল্পী নিজের কথা ভদ্রলোকদের কাছে গুছিয়ে বলতে পারেন না। মানুষ দেখতে ছুটে বেড়ানো এই আজন্ম ভবঘুরে নারী ভদ্রসমাজের সঙ্গেও খুব একটা মিশতে চান না। ভিউ-বাণিজ্য তাঁকে বিরক্ত করে। তিনি অন্য সবার মতো নন। তিনি সত্যিকারের ভবঘুরে। মানুষ দেখা পাগল।

লাইলি খালা বলেন—“এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের কোনো মিল নাই। এক জীবনে কি মানুষ দেখা ফুরায়, স্যার?”

এই হলো, আপাতত বর্তমানে ভাইরাল শিল্পী লাইলি খালার বৃত্তান্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ফরিদপুর।

সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৮)। চার বছরের দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর অদম্য স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের একটি মাত্র বুলেট তাঁর সেই সাজানো স্বপ্নের দুনিয়া নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে ঠিকই ফিরছেন তিতাস, তবে তা কোনো আনন্দ নিয়ে নয়—বরং একটি নিথর, প্রাণহীন মরদেহে।

​প্রিয় স্বজনের এমন নির্মম বিদায়ের অপেক্ষায় থাকা তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগমের আহাজারিতে লস্করদিয়ার আকাশ-বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে।

​শেষ মায়ের দোয়া ও মর্মান্তিক পরিণতি

​স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে শেষবারের মতো কথা হয় তিতাসের। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নিতে হবে জানিয়ে তিনি মায়ের কাছে দোয়া চান। কে জানত, এটাই হবে মায়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ কথোপকথন! বৃহস্পতিবার রাতেই তিতাসের মৃত্যুর সংবাদ এসে সব ওলটপালট করে দেয়।

​নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সেনাপরিবারের সন্তান তিতাসের বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তিতাস ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

​স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগম। পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং তিতাসের এমন করুণ মৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীও।

​রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শোক প্রকাশ

​সেনা সদস্য তিতাস শেখের এই মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

​এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিতাস শেখ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

​প্রতিমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশসেবায় নিয়োজিত থেকে সেনা সদস্য তিতাসের এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও তাঁর সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশবাসীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পদ্মা নদীর মধ্যে নির্মিত ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ অভিযান চালিয়ে এসব বাঁধ উচ্ছেদ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর চর শালিপুর ও সিট মির্জাপুরের খাঁ এলাকার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জেলেরা মাছ শিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে পদ্মা নদীতে এই অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করে আসছিলো। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী জেলেরা অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবিতে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম খাঁন বাবুলের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভকে তদন্ত করে এই অবৈধ বাঁধের বিষয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেন। সংসদ সদস্যের নির্দেশনার পর আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জেলেরা।

স্থানীয় জেলেরা বলেন, ভবিষ্যতে যেন কেউ আবার পদ্মা নদীতে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে মাছের অবাধ বিচরণ ও সাধারণ জেলেদের জীবিকার পথে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, প্রবাহমান জলাশয়ে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়া মৎস্য আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব বাঁধ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচল ব্যাহত করার পাশাপাশি জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বাঁধ উচ্ছেদে জব্দকৃত সকল অবৈধ কারেন্ট জাল এবং চায়না দুয়ারী নদীর পারে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

টেকনাফে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনা সদস্য তিতাসের ফরিদপুরের বাড়িতে শোকের মাতম

হাসান মাতুব্বর (শ্রাবণ), ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১:৪৬ অপরাহ্ণ
টেকনাফে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনা সদস্য তিতাসের ফরিদপুরের বাড়িতে শোকের মাতম

কক্সবাজারের ​টেকনাফে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনা সদস্য তিতাস শেখের (২৮) বাড়িতে এখন শোকের মাতম। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের এই তরুণ সেনাসদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। শুক্রবার (০৬ নভেম্বর) সকালে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে তিতাস শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এ দৃশ্য।

​পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিতাস শেখের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক বন্ধন রয়েছে। তাঁর বাবা আফজাল শেখ একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিতাস ছিলেন সবার বড়। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন ২০১৭ সালে। সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিতাস, কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।

​আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযানকালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে তিতাস শেখের বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে। পরে তাঁকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে এবং অবস্থার অবনতি হলে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আটটা আটচল্লিশ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

​নিহত সেনাসদস্যের মা রেখা বেগম জানান, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তখন তিতাস তাঁকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ কিন্তু ছেলের সেই কথাই যে শেষ কথা হবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আর ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক বাবা আফজাল শেখের চোখ বেয়ে ঝরছে অবিরাম অশ্রু।

​নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে শুক্রবার বিকেলে তিতাসের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদানসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

​ছেলের এমন বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগে পরিবারটি গর্বিত হলেও তাঁর এই চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না শোকে বিহ্বল স্বজনেরা।