খুঁজুন
, ,

ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

মফিজ ইমাম মিলন
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

বাংলা ভাষায় ‘আমলা’ শব্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের প্রেক্ষিত ভিন্নতর। আরবিতে ‘আমল’ শব্দের অর্থ কাজ। সে নিরিখে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আমল বা কাজ করে, তারাই আমলা। উৎপত্তি আর বুৎপত্তি—যে অর্থেই ব্যবহার করি না কেন, আমলাতন্ত্রের শানে নুযুল কিন্তু আমাদের সামনে এক ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করে। শিল্পী লাইলির আমলনামা কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টোটা।

লাইলি বেগম কবে, কার কাছে থেকে ‘খালা’ উপাধি পেয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে ষাটোর্ধ্ব এই নারীর ক্ষেত্রে বয়সটাই হয়তো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফরিদপুরের ছয় দশকের ধুলো, বালি, ময়লা আর অমলিন সময় লাইলির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে রয়েছে। তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও কম নয়। কারণ তিনি আজন্ম ভবঘুরে।

কোনো পাসপোর্ট তিনি বানাননি, কিন্তু দিল্লির আজমির শরীফ যেন তাঁর হাতের মুঠোয়। বাড়ি থেকে না বলে-কয়ে অজানার পথে রওনা দিতে তাঁর যতটুকু সময় লাগে, ততটুকুই। অক্ষরজ্ঞানহীন এই মানুষটির সবচেয়ে বড় সখ—‘মানুষ দেখা’। তিনি প্রায়ই প্রশ্ন করেন, “আল্লার দুনিয়ায় কত পদের মানুষ, কিন্তু কারো সঙ্গে কারো মিল নাই কেন?” এর সদুত্তর কোনোদিনই তাঁকে দিতে পারিনি। তবে মানুষ দেখতে যাওয়ার সফরসঙ্গী হয়েছি কয়েকবার। হাটে, নৌকাঘাটে, রেলস্টেশনে—যেখানে মানুষের ভিড়, লাইলি সেখানেই।

২০০০ সাল থেকে প্রায় সাত বছর আমি ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমির সেক্রেটারি ছিলাম। প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে লাইলি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। মাঝেমধ্যে বায়না ধরতেন—
“স্যার, একটা গান শোনাই?”

বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাতাম। একদিন জোর করেই আমাকে মেহেদী হাসানের একটি গজল শোনালেন। বাহবা দিতেই গেয়ে উঠলেন রুনা লায়লার ১৪ বছর বয়সে গাওয়া পাকিস্তানি ছবি আঞ্জুমান-এর সেই বিখ্যাত উর্দু গান— “আপ কি দিল মে আনজুমান মে, হুসনে বান কার আগায়া…”

পারিবারিকভাবে আমরা সবাই মেহেদী হাসান আর নূরজাহানের ভক্ত। কিন্তু সেদিন বুঝতে পারিনি—আমি রুনা লায়লার ভক্ত হলাম, নাকি লাইলির।

পিয়নরা ভীষণ বিরক্ত হতো তাঁকে নিয়ে। ওয়ান টাইম কাপ ছাড়া চা দিত না। তাও কখনো ফুরিয়ে যেত। লাইলি সব বুঝতেন। তরমুজের বিচির মতো পান খাওয়া দাঁত বের করে হেসে বলতেন— “স্যার, কত খাওয়া যাবি চা?”

একদিন আবদার করে বললেন—“স্যার, আমারে হারমোনিয়াম শিখাইবেন না?”

স্থানীয় শিক্ষকদের অনুরোধ করলাম, তাঁকে একটু গানবাজনা শেখানোর জন্য। একসময় তিনি নিজেই সুর তুলতে শিখে গেলেন। এরপর ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের প্রায় সব অনুষ্ঠানে লাইলি অপরিহার্য হয়ে ওঠেন।

২০০৩ সালে কবি জসীমউদ্দীনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জসীম পল্লী মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। পল্লীকবির সৃষ্ট নায়ক-নায়িকাদের যেন বাস্তবে হাজির করা হয়েছিল সেই মেলায়। কবিতার আসমানী, লোকগানের কিংবদন্তি হাজেরা বিবি, তাম্বুলখানা থেকে আদর্শ কৃষক গণি মিয়া, আর ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আনা হয়েছিল লাঠিয়াল রুপাইকে।

তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন তরুণ কর্মকর্তা জালাল আহমেদ। তিনি সবার জন্য ভালো উপহারের ব্যবস্থা করতে বললেন। গায়িকা লাইলির কথা বলতেই তাঁর জন্য শাড়ি-কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসক গান শুনে তাঁকে কাপড় উপহার দিয়েছেন—এ কথা লাইলি নিজেই মাইকের মতো প্রচার করতে লাগলেন।

শহরের সবাই লাইলিকে চেনেন—তা নয়। তবে শিল্প-সংস্কৃতির মানুষদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর ঠিকানা অবশ্য কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। একসময় পৌর বিসর্জনঘাটের কাছে থাকতেন। স্বামী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। দুই ছেলে, দুই মেয়ে—সবাই বিবাহিত। স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছু নেই। কখনো শহরতলির হারুকান্দীতে ছেলের বাসায়, কখনো ঝিলটুলীর মালেক মীর বাড়িতে রাত কাটান। শুধু ওয়াজ মাহফিল নয়—যেখানে রামকীর্তন, যেখানে তিন রথের মেলা, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি।

যোগাযোগের সুবিধার্থে কয়েক বছর আগে তাঁকে অল্প দামের একটি বাটন ফোন কিনে দিয়েছিলাম। ফোন হাতে নিয়েই প্রশ্ন করলেন— “এইটার সঙ্গে কি কানেকশন পাওয়া যাবে?”

কার সঙ্গে—জিজ্ঞেস করতেই ফোনটা আমার হাত থেকে নিয়ে দূরে পানিতে ছুড়ে ফেললেন। তারপর বললেন—“এই জ্ঞান নিয়ে আবার গানবাজনা করেন আপনারা!”

লাইলির সেই মারফতি কথার অর্থ আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি ফরিদপুর হেরিটেজ প্রথম অনুষ্ঠান করেছিল লাইলিকে প্রধান অতিথি করে। সেটি ছিল তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন। অধ্যাপক আলতাফ হোসেন, ফারাহ দিবা আহমেদ, শামীম আরা বেগম, মৃধা রেজাউল, অধ্যাপক হিমু, শরীফসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। ভিন্ন মাত্রার এক আয়োজন ছিল সেদিন।

প্রায় ১৫ বছর আগে আমরা একবার ‘পাগল সম্মেলন’ করেছিলাম। মূল চরিত্র ছিলেন প্রফেসর আলতাফ হোসেন। সেই অনুষ্ঠানেও লাইলি গান গেয়েছিলেন। তবে সেখানে গোলমাল বেঁধেছিল গান নিয়ে। কেউ চায় না লাইলি একা গান গাইুক—সব ‘পাগল’ একসঙ্গে গাইবে! অথচ লাইলি সুর, তাল, লয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু পাগলরা কি আর গ্রামার মানে?

গত ২ এপ্রিল ২০২৬, ফরিদপুর হেরিটেজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইসমাইল জবিউল্লাহ। তাঁর সঙ্গে কথা ছিল—ফরিদপুরে এলে তাঁকে লাইলির গান শোনাব। শুনিয়েছিলামও। দুই সংসদ সদস্য—চৌধুরী নায়াব ইউসুফ ও শহীদুল ইসলাম বাবুল—দুজনেই বললেন, “আমরা বক্তব্য রাখব না, লাইলির গান শুনব।”

ইসমাইল জবিউল্লাহ সাহেব ডিসি থাকাকালীন সময় থেকেই লাইলিকে চিনতেন। তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা। অসাধারণ বিনয়ী ও চৌকস প্রশাসক। তিনি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিলেন— “এমন কিছু করবেন না, যাতে জবিউল্লাহ সাহেব অসন্তুষ্ট হন।”

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৪ মে, উপমহাদেশের রাজনৈতিক সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত এবং নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিলে নজরুল জন্মোৎসবের আয়োজন করা হয়। যথারীতি সাহিত্য পরিষদের একনিষ্ঠ সদস্য শরীফ খান দায়িত্ব নেন লাইলিকে অনুষ্ঠানে আনার। যথাসময়ে লাইলি উপস্থিত হন। আমি মঞ্চের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে দর্শক সারিতে তাঁর পাশে গিয়ে বসি।

সকলের অনুরোধে লাইলি দুটি গান গাইলেন। মুহূর্তেই শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মাগরিবের আজান হয়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়। “ওয়ান মোর, ওয়ান মোর”—শব্দগুলো বাতাসে ভাসতে থাকে।

রিকশাভাড়া বাবদ তাঁকে তিনশ টাকা দিলে তিনি একশ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন— “অত লাগবে না। যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।”

এর মধ্যেই টেলিভিশনের এক এ-গ্রেডের ধোপদুরস্ত শিল্পী এক এমপির কাছে নালিশ করেন—“রাস্তার শিল্পীরা গান গায়, আর আমি এ-গ্রেডের শিল্পী হয়েও সুযোগ পাই না!”

‘রাস্তার শিল্পী’ বলতে তিনি লাইলিকেই বুঝিয়েছিলেন।

শিল্পী লাইলিকে নিয়ে পোস্ট দিতে কাউকে কেউ উদ্বুদ্ধ করেনি। তিনি ভাইরাল হয়েছেন নিজের গুণে। তাঁর গাওয়া “নয়ন ভরা জল গো তোমার” গানটি শুনলেই বোঝা যায়।

তবে নজরুল জন্মোৎসব এখানেই শেষ হয়নি।

রাত ১০টার দিকে ফরিদপুর জেলা বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক ফোন করে জানতে চান—নজরুল জন্মোৎসব ময়েজ মঞ্জিলে কেন? আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি—১৯৩৯ সালে ময়েজ মঞ্জিলের মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী এবং কোমরপুরের হুমায়ুন কবির মিলে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ গঠন করেছিলেন। নজরুলের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই জায়গাটির সঙ্গে।

ওপাশ থেকে উত্তর আসে—“কবে কে কী কইরা থুইয়া গেছে, তার জন্য এখন ময়েজ মঞ্জিলে অনুষ্ঠান মানা যাবে না!”

আমি বলি—“অশিক্ষিত লোকের মতো কথা বলো না।”

তিনি আরও রেগে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় বলতে থাকেন—ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ ভেঙে-চুরে গুঁড়িয়ে দেবেন।

আমি যদি তাঁর অতীত না জানতাম, তাঁর জাতগোষ্ঠী না চিনতাম, তাহলে হয়তো চুপ থাকতাম। আমার মাতুলকুলের চার পুরুষ এই শহরের মানুষ। আমরা কি মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছি? আমাকে কিছু বলতে হলে বাখুন্ডা পার হয়ে, জোয়ারের মোড় ছাড়িয়ে, মহিলা রোড ডিঙিয়ে তালমার মোড়ে গিয়ে বলতে হবে।

এই শহরে চাঁদাবাজ, ধান্ধাবাজ আমি নই। আশির দশক থেকে ফরিদপুরের যত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তার প্রতিটির শুরুতে আমি জড়িত ছিলাম। কোনো সংগঠন থেকে ১০ টাকারও কোনো ভাউচার দেখাতে পারলে আর সমাজসেবা করব না।

আমি যেহেতু রাজনীতি করি না, কোনো দলের সদস্য নই—তাই সবার কাছেই যাই। প্রতিষ্ঠানের জন্য যাই, ব্যক্তিস্বার্থে নয়। হ্যাঁ, এ কে আজাদের কাছেও গেছি, ভবিষ্যতেও যাব—প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে। তিনি শিশু চিকিৎসাকেন্দ্র ও মুসলিম মিশনে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন, শহীদুল হাসান সাহেব ছাড়া আর কে দিয়েছেন?

যাই হোক, কথা অন্যদিকে চলে গেল। আসলে মফস্বল শহরে সাহিত্যচর্চা আর সমাজসেবার কাজ করতে কত ব্যথা আর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা আমাদের হাসিমুখ দেখে বোঝা যায় না।

সেদিন ময়েজ মঞ্জিলে লাইলি খালা গান গেয়েছিলেন। সেই লাইলি খালা—যাকে আমি শিল্পকলার সেক্রেটারি থাকাকালে হারমোনিয়ামের সামনে বসিয়েছিলাম। যে আমার কাছে আসত জোর করে দুটি গান শোনানোর জন্য।

সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও, বিশেষ করে লাইলি খালার গান, ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর শত শত ফোন পেয়েছি। ফেসবুক সয়লাব হয়ে গেছে। তাই মনে হলো, লাইলি খালা সম্পর্কে কিছু লিখে রাখা দরকার।

দরদি এই শিল্পী নিজের কথা ভদ্রলোকদের কাছে গুছিয়ে বলতে পারেন না। মানুষ দেখতে ছুটে বেড়ানো এই আজন্ম ভবঘুরে নারী ভদ্রসমাজের সঙ্গেও খুব একটা মিশতে চান না। ভিউ-বাণিজ্য তাঁকে বিরক্ত করে। তিনি অন্য সবার মতো নন। তিনি সত্যিকারের ভবঘুরে। মানুষ দেখা পাগল।

লাইলি খালা বলেন—“এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের কোনো মিল নাই। এক জীবনে কি মানুষ দেখা ফুরায়, স্যার?”

এই হলো, আপাতত বর্তমানে ভাইরাল শিল্পী লাইলি খালার বৃত্তান্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ফরিদপুর।

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নতুন ভবনের করিডোরে প্রতিদিনের মতোই ধীর পায়ে হাঁটেন মো. জাকির হোসেন। কারও হাতে এক কাপ চা তুলে দেন, কারও জন্য দরজা খুলে দেন, আবার কখনো কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দেন, চা খাওয়ান। সংবাদ শিরোনামে যাদের নাম উঠে আসে, তাদের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটির নাম খুব কম মানুষই জানেন। অথচ এই প্রেসক্লাবের প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি কক্ষ যেন তার জীবনেরই অংশ।

মো. জাকির হোসেনের জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৯ মে, ফরিদপুর শহরের মধ্য আলীপুর মহল্লায়। বাবা শেখ আব্দুর রহমান ছিলেন একজন নাইটগার্ড। অল্প আয়ের সেই চাকরিতে সংসার চলত কষ্টে। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেই বড় হয়েছেন জাকির। ফরিদপুরের বাখুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তার বই-খাতা কেড়ে নেয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে স্কুলের বেঞ্চ ছেড়ে জীবিকার পথে নামতে বাধ্য করে।

মাত্র দশ বছর বয়সে, ১৯৮৯ সালে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তমিজউদ্দীন তাজের হাত ধরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেই যে শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, প্রেসক্লাবের ভবন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি জাকিরের দায়িত্ববোধ।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য সাংবাদিকের উত্থান-পতন দেখেছেন। অনেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব নিতে দেখেছেন, আবার তাদের চিরবিদায়ও প্রত্যক্ষ করেছেন। সভাপতি সৈয়দ ইমামুল আজম আব্দুর রব, শেখ মো. দেলোয়ার হোসেন, জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, আব্দুল আলী শিকদার—আজ তারা আর নেই। সাধারণ সম্পাদক মন্টু দাস গোপী, ইউসুফ রেজা মন্টু, আ.জ.ম. আমীর আলী, আলী আশরাফ মো. শোয়াইব ও আরিফ ইসলামও চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আরও কত সদস্য, কত পরিচিত মুখ—এক এক করে হারিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।

এসব কথা বলতে বলতে জাকিরের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। তিনি বলেন, “এই প্রেসক্লাবটাই আমার জীবন। এখানে আমার যৌবন কেটেছে, হাসি-কান্না কেটেছে। প্রতিটি দেয়ালে আমার স্মৃতি লেগে আছে।”

জাকিরের ব্যক্তিগত জীবনও সংগ্রামের গল্পে ভরা। স্ত্রী লিপি বেগম একজন গৃহিণী। অল্প আয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে প্রতিটি দিনই তাদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। ছেলে আজিম হোসেন ২০২৪ সালে ফরিদপুরের সরকারি ইয়াছিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে জীবিকার তাগিদে হামিম গ্রুপের একটি গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছেন। মেয়ে মোসা. হাফছার বিয়ে হয়েছে কাপড় তৈরির মেশিনচালক আরিফের সঙ্গে। নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন জাকির।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরের হাড় ক্ষয়ের মতো জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। প্রতিদিন ওষুধ কিনতেই খরচ হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা। এই সামান্য টাকাও অনেক সময় জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার আশায় মানুষের সহায়তায় ছয়-সাতবার ভারতে গিয়েছেন। কিছুদিন সুস্থ থাকলেও আবার ফিরে এসেছে অসুস্থতা। প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, কিন্তু অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসা এখন অধরাই রয়ে গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কখনো কারও দরজায় গিয়ে হাত পাতেননি। নিজের অভাবকে হাসিমুখে আড়াল করে প্রতিদিন যথাসময়ে কর্মস্থলে হাজির হন। যারা তাকে চেনেন, তারা জানেন—জাকিরের মুখে অভিযোগের চেয়ে কৃতজ্ঞতার কথাই বেশি শোনা যায়।

২০২৬ সালের মে মাসে মায়ের মৃত্যুর পর যেন আরও একা হয়ে গেছেন তিনি। সংসারের দায়িত্ব, ওষুধের খরচ, পুরোনো দেনা—সব মিলিয়ে জীবন যেন আরও ভারী হয়েছে। তবুও দায়িত্ব পালনে তার কোনো ক্লান্তি নেই। কেউ প্রেসক্লাবে এলে এখনও আগের মতোই আন্তরিক হাসিতে অভ্যর্থনা জানান তিনি।

জাকির হোসেন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। তিনি সংবাদপত্রের প্রথম পাতার মানুষও নন। কিন্তু সংবাদ তৈরির পেছনে যারা নিরলস শ্রম দিয়ে যান, তাদের একজন তিনি। সাংবাদিকদের ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো অনেকেই তাকে খেয়াল করেন না, কিন্তু প্রেসক্লাবের প্রতিটি দিন, প্রতিটি আয়োজন, প্রতিটি ব্যস্ত মুহূর্তে তার নীরব উপস্থিতি অপরিহার্য।

একটি প্রতিষ্ঠানে টানা প্রায় ৩৭ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা শুধু চাকরি নয়, এটি এক ধরনের ভালোবাসা, এক ধরনের আত্মনিবেদন। সেই ভালোবাসার মূল্য কি শুধু একটি সামান্য বেতন? একজন মানুষ, যিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎসর্গ করেছেন, অসুস্থতার সময়ে কি তার পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব নয়?

আজও জাকির হোসেনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন খুব সাধারণ—আরও একবার ভালো চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে বাঁচতে চান। তিনি বিলাসী জীবন চান না, বড় কোনো বাড়ি বা গাড়িও চান না। শুধু চান একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ, যাতে প্রতিদিনের ওষুধের চিন্তা আর চিকিৎসার খরচের হিসাব তাকে তাড়া না করে।

হয়তো সমাজে এমন অনেক জাকির হোসেন আছেন, যারা নীরবে দায়িত্ব পালন করে যান, অথচ নিজেদের কষ্টের কথা কাউকে জানান না। তাদের গল্প খুব কমই আলোয় আসে। কিন্তু এমন মানুষেরাই আমাদের সমাজের নীরব ভিত্তি। তাদের ত্যাগ, সততা আর আত্মসম্মান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা পদবি বা সম্পদে নয়, বরং নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতায়।

জাকির হোসেন এখনও প্রতিদিন ফরিদপুর প্রেসক্লাবের দরজা খুলে দেন। হয়তো একদিন সেই দরজাই তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে। কিন্তু তার আগে, একজন সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এটাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।

বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নিজের অভাবী পরিবারকে স্বাবলম্বী করার জন্য বছর তিনেক আগে মালয়েশিয়ায় গিয়ে পাড়ি জমান মো. শোয়াইব বিশ্বাস (২৩) নামে এক যুবক। সেখানে গিয়ে দীর্ঘদিন একটি কোম্পানিতে কাজ করে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশে আসেন। দেশে এসে গত মাস দুয়েক আগে বিয়ে করেন।

তবে তার বিয়ের মেহেদীর রং শুকানোর আগেই জীবিকার তাগিদে ফের মালয়েশিয়ায় নিজের কর্মস্থলে গিয়ে চলে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- কর্মস্থলে কাজ করার সময় মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর।

নিহত শোয়াইব বিশ্বাস ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরুটিয়া গ্রামের মো. শওকত বিশ্বাসের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো।

শনিবার (১০ জুলাই) সকালে শোয়াইবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ভগ্নিপতি মো. তুহিন হাসান। এদিকে শোয়াইয়ের খবরে শোকে স্তব্দ হয়েছে পরিবার। এমন অবস্থায় দেশে লাশ আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে চেয়েছেন সরকারের সহযোগিতা।

নিহতের পরিবার জানান, জীবিকার তাগিদে ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে একটি কম্পানিতে কাজ শুরু করেন শোয়াইব। সেখানে কাজ শেষে চলতি বছরের এপ্রিলে ছুটিতে বাড়িতে আসেন। বাড়ি আসার পর গত দুই মাস আগে বিয়ে করেন তিনি। এরপর ছুটি শেষে গত ১ জুলাই মালয়েশিয়া চলে যায়। দেশটির জহুরবারু এলাকায় একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অধীনে বোম্ব ক্রেনের সাহায্যে নির্মাণাধীন ভবনে ফায়ার ফাইটারের পাইপ লাগানোর কাজ শুরু করেন। শুক্রবার সকালে কাজ করাকালীন বোম্বক্রেন চাপায় নিহত হন তিনি।

নিহতের ভগ্নিপতি তুহিন হাসান বলেন, শুক্রবার দুপুরে মালয়েশিয়ার ওই কোম্পানির দায়িত্বরত এক বাংলাদেশী আমাকে ফোন করে নিহতের বিষয়টি জানান৷ তাছাড়া ওই বাংলাদেশী ছবি ও ভিডিও পাঠিয়েছে, তাতে নির্মমভাবে মৃত্যুর বিষয় ফুটে উঠেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে তার লাশ ফেরত পাঠানোর জন্য তিন সপ্তাহের সময় চেয়েছেন। তবে লাশটি দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।

ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. আশিক সিদ্দিকী বলেন, নিহত ব্যক্তি কোনো কোম্পানির অধীনে কাজ করে থাকলে তাঁরা দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে লাশ পাঠাতে পারবে৷ সেখান থেকে কোনো সহযোগিতার না পেলে নিহতের পরিবার আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৈধ কর্মী হয়ে থাকলে আমরা লাশ আনার ক্ষেত্রে দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করব।

ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারি বরখাস্ত

পান্না বালা, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারি বরখাস্ত

ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) ষষ্ঠ শ্রেণির এক কিশোরী (১৪) ২৭ সপ্তাহের অধিক অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায়। এ মামলার একমাত্র আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য শিশু পরিবারের পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে বরখাস্ত করা হয়েছে।গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম মো. ওয়াহিদ শেখ (৫৪)। তিনি ওই শিশু পরিবার এলাকার একটি বাজারে দর্জির দোকানের মালিক।

এই ঘটনায় “দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে” ফরিদপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও শিশু নিবাসের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বাদী হয়ে গত ৬ জুলাই ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কিশোরীটি শহরের টেপাখোলা এলাকার একটি স্কুলে পড়ে। শিশু পরিবার থেকে স্কুলে যাতায়াত করার সুবাদে গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে ওই এলাকার এক দর্জির দোকানের মালিক মো. ওয়াহিদ শেখ (৫৪) তাকে চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই ব্যক্তি তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে।

এর ফলে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে শারিরীক জটিলতার জন্য শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে গত ৬ জুলাই নেওয়া হয়। চিকিৎসক পরীক্ষার পর জানায় শিশুটি ২৭ সপ্তাহ ও দুই দিনের গর্ভাবস্থায় রয়েছে।

এ মামলার সূত্রে গত ৮ জুলাই পুলিশ সদর উপজেলার আদমপুর গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজ শেখের ছেলে ওয়াহিদ শেখকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এদিকে দায়িত্ব অবহেলার দায়ে গত ৮ জুলাই সমাজসেবা অধিদপ্তরের পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার ও আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীণ।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-সচিব ও পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ওই পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে গত ৮ জুলাই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ এহিয়াতুজ্জামান বলেন, আদালতের নির্দেশে মেয়েটিকে সমাজসেবা বিভাগের অধীনে “নারী ও শিশু কিশোরী মহিলা হেফজতিদের আবাসন কেন্দ্র”- রাখা হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুর কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।