খুঁজুন
, ,

বিপ্লব-পরবর্তী শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষকের পদত্যাগ ও সমস্যা থেকে উত্তরণ

মো. হাফিজুর রহমান শিকদার
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:০২ পূর্বাহ্ণ
বিপ্লব-পরবর্তী শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষকের পদত্যাগ ও সমস্যা থেকে উত্তরণ

পৃথিবীতে কিছু ব্যর্থতার মূল্য হয় অনেক চড়া। বিগত সরকারের দেড়যুগ ধরে ব্যর্থ শাসনের মূল্য বেশ চড়া দামে দিতে হচ্ছে দেশকে। প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকীকরণ করে প্রশাসনিক কাঠামো একেবারে ভেঙে দিয়েছে। যার ফল মারাত্মকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে।

বিগত সরকারের পতনের পর দেশের আনাচ-কানাচ থেকে নানা অপ্রীতিকর সংবাদ আসছে। কোথাও স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে, কোথাও শিক্ষকের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হচ্ছে কিংবা কোথাও প্রতিবাদী জনতার ভয়ে শিক্ষক পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে যেমন অপরাধী শিক্ষকের নাম আসছে তেমনি নিরপরাধ কিংবা নিরপেক্ষ শিক্ষকও পদলোভী অন্য শিক্ষকের ইন্ধনে আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা রাষ্ট্রের জন্য মোটেও সুখকর কোনো সংবাদ নয়। স্বাধীনতার দুই দশক পর অর্থাৎ ১৯৯০-৯১ সালের দিকে শিক্ষার প্রতি যে অবহেলার সূচনা হয়েছিল বিগত সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে তার পূর্ণতা ছাপিয়ে দেশকে এক শিক্ষাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল একটি মহল।

উল্লেখ্য, বিগত প্রায় সব গণতান্ত্রিক সরকারই শিক্ষক সমাজকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কমবেশি ব্যবহার করেছে। দলীয় শিক্ষককে দিয়েছে পদোন্নতি আর প্রত্যাশিত পদায়ন। কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ না করলে প্রমোশন, পদায়নসহ অন্যান্য বৈধ সুবিধা থেকেও স্থানভেদে বঞ্চিত হতে হতো। ফলে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা হলো ক্রমক্ষয়িষ্ণু, ছিল না কোনো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তা। এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিতে হতো। অসাদুপায় অবলম্বনের দায়ে কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিলে কিংবা পরীক্ষার উত্তরপত্রে নম্বর কম দিলে শিক্ষক এক ধরনের অপমান-অপদস্তের ভয়ে থাকতেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের প্রতি সরকারের আচরণ ছিল এক ধরনের বিমাতাসুলভ। যে কারণে পড়ালেখা শেষ করে চাকরিপ্রার্থীরা এই অনিরাপদ পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে দিন দিন। মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে আর ক্ষমতার পেছনে ছুটছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান ভিকটিম শিক্ষকরা।

সম্রাট আওরঙ্গজেব একদিন দেখেন তার ছেলে শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছে। এসব দেখেই শিক্ষকের কাছে অনুযোগ করলেন, ছেলে কেন হাত দিয়ে পা ধুইয়ে দিল না অর্থাৎ শিক্ষকের অসম্মান হয়েছে। গত বছর এক শিক্ষক ছাত্রের চুল বড় থাকায় বেত্রাঘাত করায় শিক্ষককে জেলে যেতে হয়েছিল। সম্প্রতি বহু স্কুলের প্রধান শিক্ষক কিংবা কলেজের অধ্যক্ষকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। কোথাও পদলোভী তাদেরই সহকর্মীদের ইন্ধনে কিছু শিক্ষার্থী এ কাজটি সমাধা করেছে।

দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারের পতন হয় ৫ আগস্ট। এর পর পরই বৈষম্য নিরসনে ছাত্র-জনতা দেশের শিক্ষাঙ্গনে হাত দেন। বিগত সরকারের সঙ্গে কোনোরূপ সম্পর্ক ছিল কিংবা আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে প্রকাশ্যে এমন শিক্ষকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দিতে ছাত্র-জনতা অনেকটা জোরাজুরি করেছেন। বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে একপ্রকার অপমান করে শিক্ষক, প্রধানশিক্ষক এবং অধ্যক্ষদের পদত্যাগ করিয়েছে। ফলে দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বর পদত্যাগের ক্রমাগত চাপে ‘হৃদরোগে আক্রান্ত’ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কিশোরগঞ্জ শহরের আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক। কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়ার কিংবা বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষকে জোর করে পদত্যাগ করানোর ভিডিও সারা দেশবাসী দেখেছে, হয়েছে মর্মাহত।

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন আসতে পারে, শিক্ষকদের বেলায় শিক্ষার্থীরা এত মারমুখী হচ্ছে কেন। এর অন্যতম কারণ হলো- শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের খুব কাছ থেকে দেখে। তারা দেখে কিছু শিক্ষক কিভাবে কোনো দলের হয়ে দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি চাপে রাজনৈতিক দলের হয়ে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতা এই শিক্ষকদের নিশ্চিত করতে হয়। মন্ত্রণালয় থেকে অফিসিয়াল নির্দেশনা দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের ক্ষোভ ঝাড়ে তাদের সন্নিকটে থাকা শিক্ষকদের উপর। এর মধ্যে কিছু শিক্ষক ব্যক্তিগত স্বার্থে দলীয় পরিচয়ে নানা সুবিধা নিতে অতিউৎসাহী হয়ে ভিন্ন মতের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হেয়প্রতিপন্ন করেছে, করেছে নানা হয়রানি। কিছু শিক্ষকের আচরণ ছিল দলীয় কর্মীদের মতো যেগুলো একেবারেই অনুচিত এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলের (বিএসআর) বিরোধী। যে কারণে সারা দেশে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি কোনো শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য না করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বিগত সরকারকে টিকিয়ে রাখতে যারা ফ্রন্টলাইনে থেকে গণতন্ত্র ও জনবিরোধী কাজগুলোকে সমর্থন দিয়েছে তাদের কারও মধ্যে শিক্ষক সমাজ নেই। অথচ শিক্ষকরাই বেশি জনরোষের শিকার হচ্ছেন। এটা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

দেশের শিক্ষার এহেন করুণ অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য কিছু বিষয়ে সংশোধন আনা জরুরি। শিক্ষক একটি জাতির দর্পণ। প্রথমত, একাডেমিক পারপাসে তিনি সংশ্লিষ্ট যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। তা যদি বিদ্যমান সরকারের কোনো নীতি কিংবা সিস্টেমের বিরুদ্ধে হয় তবুও। কিন্তু এর ফলে এই শিক্ষককে কোনো শাস্তির সম্মুখীন করা যাবে না। শিক্ষার্থীকে কোনো বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করতে হবে। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক, কোনো তথ্য-উপাত্ত কিংবা তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপনে বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা ভয়ের সঙ্গে পাঠদান করলে শিক্ষার্থী সঠিক কিছু শিখবে না, অন্ধকার কেটে আলো আসবে না। ফলে শিক্ষার সঠিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

দ্বিতীয়ত, কোনটি সরকারের সমালোচনা, কোনটি গৃহীত সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা আর কোনটি দেশদ্রোহিতা এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করা জরুরি। সাবেক স্বৈরশাসক এসব টুলস ব্যবহার করে শিক্ষার্থীকে প্রকৃত শিক্ষার্জন, জ্ঞানলাভ থেকে যেমনি বঞ্চিত করেছিল, তেমনি শিক্ষককে সঠিক কথা বলা থেকেও বিরত রাখতে সফল হয়েছিল। সৃষ্টি করেছিল এক ভয়ের সংস্কৃতি।

তৃতীয়ত, দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বন্ধকরণ। দেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুটি ধারা। একটি রাজস্বভুক্ত এবং অন্যটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়। স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের জন্য রাজনীতি করার সুযোগ থাকলেও রাজস্বভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধি-২৫ এর উপবিধি-১ অনুসারে সরকারি কর্মচারী রাজনীতি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। যেমন বলা আছে- “কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গ সংগঠনের সদস্য হইতে অথবা অন্য কোনোভাবে উহার সহিত যুক্ত হইতে পারিবেন না, অথবা বাংলাদেশ বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে বা কোনো প্রকারেই সহায়তা করতে পারবেন না।”

বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদত্যাগে বাধ্য করার পেছনে এই একটি দ্বি-মুখী নীতি অন্যতম। শিক্ষার্থীরা দেখছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছে, ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেছে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে কিন্তু সরকারি স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। যে কারণে একটি ক্ষোভ কাজ করেছে। এর সমাধান হতে পারে, শিক্ষকদের দেশের নানা ইস্যুতে কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষক কোনো দলের হতে পারে না। একজন শিক্ষক দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে জ্ঞানদান করেন। তিনি যদি কথাই বলতে না পারেন তবে জ্ঞানদান একপেশে হবে যার ফলে প্রকৃত জ্ঞানলাভে ব্যর্থ হবে শিক্ষার্থীরা। রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে।

কিছু শিক্ষক দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেছে এবং ভিন্নমতের শিক্ষকদের অপমান-অপদস্ত এবং ন্যায্য প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত করেছে। ফলে বঞ্চিত সহকর্মী এবং প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কিন্তু এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার এবং শিক্ষক সমাজের আরও সচেতন হওয়া দরকার। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য শিক্ষার দায়িত্ব শিক্ষকদের হাতেই থাকা উচিত।

ভবিষ্যতে কোনো দলীয় সরকার যেন জাতির বিবেক এই শিক্ষক সমাজকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে বর্তমান সরকারের নজর দেওয়া দরকার। সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব সংস্কার কমিশন গঠন করেছে সেখানে শিক্ষা সংস্কার কমিশন স্থান পায়নি, অথচ এটি সর্বপ্রথমে দরকার ছিল। শিক্ষার প্রশাসনিক এবং সাংবিধানিক সংস্কার করে বিষয়টির একটি স্থায়ীরূপ দিতে না পারলে ২০২৪-েএর ছাত্র-জনতার বিপ্লব, হাজারো শহীদের রক্ত বৃথা যাবে।

মো. হাফিজুর রহমান শিকদার প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ

ফরিদপুরে ভবনের সাটারিং খুলতে গিয়ে চাপা পড়ে নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ভবনের সাটারিং খুলতে গিয়ে চাপা পড়ে নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদের সাটারিং খুলতে গিয়ে নিচে চাপা পড়ে হয়রত আলী (৩০) নামে এক নির্মাণশ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিকেল প্রায় ৪টার দিকে উপজেলার ঘারুয়া ইউনিয়নের ডাঙ্গারপাড় গ্রামে কাউসার শেখের নির্মাণাধীন বাড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত হয়রত আলীর বাড়ি রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিনি দুই সন্তানের জনক। জীবিকার তাগিদে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে ভাঙ্গায় নির্মাণকাজে নিয়োজিত ছিলেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে চার থেকে পাঁচজন নির্মাণশ্রমিক ওই বাড়িতে ভবন নির্মাণের কাজ করছিলেন। শুক্রবার বিকেলে ভবনের দ্বিতীয় তলার ছাদের সাটারিং খোলার সময় হঠাৎ ভারী কাঠামোর একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে হয়রত আলী সাটারিংয়ের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা উদ্ধারকাজে এগিয়ে এলেও ভারী সাটারিং সরানো সম্ভব হয়নি। পরে খবর পেয়ে ভাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টার পর রাতের দিকে সাটারিংয়ের নিচ থেকে শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর বাড়ির মালিক কাউসার শেখ এবং সেখানে কর্মরত অন্য শ্রমিকরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। এ ঘটনায় এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ভাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার আবু জাফর বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ভারী সাটারিং অপসারণ করে প্রায় চার ঘণ্টা পর শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।”

ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফরিদপুরে মশলা চাষে আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ, কৃষকদের মাঝে গোলমরিচের চারা বিতরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৬ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে মশলা চাষে আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ, কৃষকদের মাঝে গোলমরিচের চারা বিতরণ

দেশে মশলা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং কৃষকদের লাভজনক চাষাবাদে উৎসাহিত করতে ফরিদপুরে কৃষকদের নিয়ে “মশলা জাতীয় ফসলের আধুনিক উৎপাদন কলাকৌশল” বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের মাঝে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত উন্নত জাত বারি গোলমরিচ-১ এর চারা বিতরণ করা হয়।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় ফরিদপুরের বাহিরদিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মশলা গবেষণা উপ-কেন্দ্রে এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বারির মহাপরিচালক ড. মো. মঞ্জুরুল কাদির। এ সময় তিনি উন্নত জাতের দারুচিনি চারা রোপণের মাধ্যমে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।

মশলা গবেষণা উপ-কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মো. আশিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. সেলিম আহমেদ, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিএসও), ডাল গবেষণা কেন্দ্র, মাদারীপুর; মো. কামরুল ইসলাম, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, খুলনা; মো. মাহমুদুর রহমান, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, ফরিদপুর এবং ড. এইচ এম খায়রুল বাসার, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

প্রশিক্ষণে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক-কৃষাণীরা অংশগ্রহণ করেন। তাদের মশলা জাতীয় ফসলের আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, উন্নত জাত নির্বাচন, মানসম্মত চারা উৎপাদন, সঠিক সময়ে রোপণ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ, রোগ-বালাই দমন এবং ফলন বৃদ্ধির কার্যকর কৌশল সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে টেকসই মশলা চাষের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশে গোলমরিচ, দারুচিনি, আদা, হলুদ, মরিচসহ বিভিন্ন মশলার চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাত এবং বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করলে উৎপাদন বাড়বে, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কৃষকরা অধিক লাভবান হবেন। এজন্য মাঠ পর্যায়ে বারির উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের মাঝে বারি উদ্ভাবিত বারি গোলমরিচ-১ এর চারা বিতরণ করা হয়। কৃষকরা এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও উন্নত জাতের চারা সরবরাহ অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়ে বলেন, গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি মাঠে পৌঁছালে উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকের আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

ফরিদপুরে পদ্মার গর্জনে মুখর মদনখালী স্লুইসগেট, নিরাপত্তাহীনতায় শঙ্কিত দর্শনার্থীরা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৫:২৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে পদ্মার গর্জনে মুখর মদনখালী স্লুইসগেট, নিরাপত্তাহীনতায় শঙ্কিত দর্শনার্থীরা

ফরিদপুর শহরের কোলাহল থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব। পদ্মা নদী থেকে কুমার নদের উৎসমুখে অবস্থিত মদনখালী স্লুইস গেট। একসময় এটি ছিল মূলত পানি নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে ফরিদপুরবাসীর অন্যতম জনপ্রিয় অবকাশ ও বিনোদন কেন্দ্রে।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পদ্মার উত্তাল ঢেউ, স্লুইস গেট খুলে দেওয়ার সময় প্রবল বেগে কুমার নদে পানি প্রবেশের গর্জন, নদীর শীতল বাতাস আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিদিনই টেনে আনে শত শত দর্শনার্থী। আর শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এখানে মানুষের ঢল নামে।

স্থানীয়দের ভাষায়, ফরিদপুরে পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো উন্মুক্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বিনোদনের জায়গা খুবই সীমিত। সেই অভাব অনেকটাই পূরণ করছে মদনখালী স্লুইস গেট এলাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিকেলের পর থেকেই পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ ভিড় করছেন এখানে। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, আবার কেউ বসে গল্পে মেতে উঠেছেন। শিশুদের হাসি, তরুণদের আড্ডা আর নদীর পানির গর্জন মিলিয়ে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।

স্লুইস গেট দিয়ে পানি প্রবাহের দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। গেট খুলে দিলে পদ্মা নদীর পানি প্রবল স্রোতে কুমার নদে প্রবেশ করে। পানির সেই গর্জন আর সাদা ফেনার দৃশ্য মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। নদীতে ছোট ছোট নৌকার চলাচল এবং ভাসমান ভেলার দৃশ্য যেন গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যকে নতুন করে ফিরিয়ে আনে।

এই দর্শনার্থীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট অস্থায়ী ব্যবসা। ঝালমুড়ি, বাদাম, চটপটি, আইসক্রিম, ভুট্টা, কোমল পানীয়সহ নানা ধরনের খাবারের দোকান বসে প্রতিদিন। ভাসমান নৌকাতেও বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন পণ্য। ফলে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকাও এখন এই পর্যটকসমাগমের ওপর নির্ভরশীল।

তবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি চোখে পড়ে নানা অব্যবস্থাপনাও। এত মানুষের সমাগম হলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। নেই কোনো স্থায়ী বেঞ্চ। দর্শনার্থীদের বিশ্রাম নেওয়ার মতো কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুরো এলাকায় নেই পর্যাপ্ত ডাস্টবিন। ফলে বাদামের খোসা, ঝালমুড়ির প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল ও বিভিন্ন খাবারের উচ্ছিষ্ট যত্রতত্র ফেলে যাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। এতে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তেমনি নদীর পানিও দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো নিরাপত্তার অভাব। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে এই এলাকায় পানিতে ডুবে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এরপরও এখানে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো হয়নি। এমনকি স্লুইস গেটের দুই পাশের অনেক নিরাপত্তা রেলিং ভেঙে থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি। অসাবধানতাবশত যে কেউ নদীতে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।

ফরিদপুর শহরের সরকারি চাকরিজীবী আক্কাস মিয়া বলেন, “পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসার জন্য জায়গাটি খুবই সুন্দর। নদীর বাতাস আর পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে। তবে এখানে বসার ব্যবস্থা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।”

ভাসমান ঝালমুড়ি বিক্রেতা মাজেদ মোল্লা বলেন, “প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। ছুটির দিনে তো দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। এই জায়গার কারণে আমাদের মতো অনেকের সংসার চলছে।”

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এনায়েত হোসেন বলেন, “ফরিদপুরে এমন খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব কম। সন্তানদের নিয়ে এখানে আসতে ভালো লাগে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার।”

দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী অন্তরা ইসলাম, যে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে এসেছে, সে বলে, “নদীর পানি আর নৌকা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। এখানে আবার আসতে চাই।”

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, “ফরিদপুরে তেমন কোনো বিনোদনের জায়গা নেই। তাই সপ্তাহজুড়ে কর্মব্যস্ত মানুষ ছুটির দিনে এখানে এসে কিছুটা স্বস্তি খোঁজেন। কিন্তু প্রতিবছরই এখানে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। গত বছরও তিনজন তরুণ সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তাই দ্রুত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, ভাঙা রেলিং সংস্কার এবং স্লুইস গেটের ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পানিতে নামা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “দর্শনার্থীদের জন্য স্থায়ী বেঞ্চ নির্মাণ, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন এবং বর্ষা মৌসুমে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হলে মানুষ আরও নিরাপদে এখানে সময় কাটাতে পারবেন। এতে ছিনতাই, ইভটিজিং কিংবা অন্য অপরাধও কমবে।”

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান বলেন, পর্যটন বা বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে কোনো স্থান জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সেখানে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, বিশ্রামাগার, আলোকসজ্জা এবং দর্শনার্থীদের সচেতনতা—সবকিছুই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অল্প সময়েই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নজর দিবেন এমনটাই আশা রাখছি।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাজহারুল ইসলাম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “মদনখালী স্লুইস গেট এলাকায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফরিদপুরের মানুষের কাছে মদনখালী স্লুইস গেট এখন শুধু একটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নয়, বরং প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা স্বস্তি খোঁজার একটি প্রিয় ঠিকানা। তবে এই সৌন্দর্যকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তা নিশ্চিত করা গেলে মদনখালী স্লুইস গেট শুধু ফরিদপুর নয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় নদীকেন্দ্রিক বিনোদনস্থল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।