খুঁজুন
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩

বিলুপ্তির পথে ফরিদপুরের গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ধানের গোলা

এন কে বি নয়ন, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ জুন, ২০২৫, ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
বিলুপ্তির পথে ফরিদপুরের গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ধানের গোলা

বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ফরিদপুরের ধানের গোলা। একসময় গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের বাড়িতে এরকম ধানের গোলার প্রচলন ছিল। গোলাভরা ধান ও পুকুর ভরা মাছ ছিল। জমিদারি প্রথা ও কৃষক পরিবারের বিভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে ছিল এই ধানের গোলা।

 

এখন মাঠের পর মাঠ ধানক্ষেত থাকলেও কৃষকের বাড়িতে নেই ধান মজুদ করার জন্য বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা। অথচ একসময় সমাজে মানুষের আভিজাত্য নির্ভর করতো কার কয়টি ধানের গোলা আছে এ হিসাব কষে। শুধু তাই নয়, কন্যা পাত্রস্থ করতেও বরপক্ষের লোকজন আগে দেখতো ধানের গোলা। নতুন প্রজন্মের কাছে এটা একটা ইতিহাস। শুধু রূপকথার গল্পের মতো। প্রবীণ ও পুরোনোদের কাছে এটি শুধু হারিয়ে যাওয়া একটি ঐতিহ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামবাংলার কৃষক পরিবারের সমৃদ্ধির প্রতীক ধানের গোলা এখন আর ফরিদপুরে কোথাও চোখে পড়ে না। তবে পুরো জেলার মধ্যে একটি মাত্র ধানের গোলা এখনও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। সদর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে কৃষক অধীর কুমার বিশ্বাসের বাড়িতে এটি রয়েছে। তার মাঠের সব ধান এই গোলায়ই তিনি সংরক্ষণ করেন। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাড়ির উঠানে এখনো তিনি এই ধানের গোলাটি যত্ন করে রেখেছেন। আগেকার দিনের মতো ব্যবহার করছেন।

অধীর কুমার বিশ্বাস বলেন, একসময় এ রকমের ধানের গোলা কৃষক ও সাধারণ পরিবারে ছিল। কিন্তু এখন আর কোথাও দেখা যায় না। ফরিদপুর জেলার মধ্যে আমার বাড়িতে একটি মাত্র ধানের গোলা আছে। এখন এর বয়স হয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর। গোলাটিতে একশত মণেরও বেশি ধান রাখা যায়। আমার নিজের জমির যতো ধান হয়, রাখার উপযোগী করে তা এ গোলায়ই রাখি।বাপ-দাদার আমল থেকে দেখে এসেছি। অনেক যত্ন করে ব্যবহার করা হয় এবং মাঝে মাঝে সংস্কার করে পুরোনো ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছি। ধানের মৌসুমে ধান কেটে শুকিয়ে গোলায় রাখা হয়। প্রয়োজনের সময় গোলা থেকে ধান বের করে পুনরায় রোদে শুকিয়ে ভাঙানো হয়।

অধীর কুমার বলেন, আগেরকার সময় নামকরা গৃহস্থ বলতে মাঠভরা বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ আর কৃষকের গোলা ভরা ধানকেই বোঝাত। এখন আর আগের মতো কেউ এভাবে ধান রাখে না। বস্তায় করে গোডাউন অথবা ঘরের মধ্যে রেখে দেন।

তিনি আরও বলেন, প্রথমে বাঁশ-কঞ্চি দিয়ে গোল আকৃতির কাঠামো তৈরি করা হয়। এঁটেল মাটির কাদা তৈরি করে ভেতরে ও বাইরে আস্তরণ লাগিয়ে উপরে টিনের চালা দিয়ে বিশেষ উপায়ে তৈরি করা এই ধানের গোলা। প্রবেশপথ বেশ উপরে, যেন চোর বা ডাকাত সহজে ধান নিতে না পারে। এ ধরনের ধানের গোলায় ইঁদুর ঢুকেও ক্ষতি করতে পারে না। গোলায় শুকানো ভেজা ধানের চাল শক্ত হয়। তখনকার কৃষকদের কাছে এটিই ছিল ধান রাখার আদর্শ পদ্ধতি।

উপজেলা সদরের সদরদি গ্রামের বাসিন্দা মো. সজীব মোল্লা। তিনি ফরিদপুর সিটি পেজের মডারেটর হিসেবে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করেন। কিন্তু এর আগে কখনো তিনি ধানের গোলা দেখেননি। তিনি বলেন, আমার গ্রামের পাশেই কৃষ্ণনগর গ্রামে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী একটি মাত্র ধানের গোলা আছে। কিন্তু এর আগে এটি সম্পর্কে জানিনি।

মধুখালী উপজেলার মেকচামী ইউনিয়নের বামুন্দী গ্রামের বাসিন্দা ও প্রবীণ শিক্ষক প্রভাষ মণ্ডল জানান, এখন আর গোলার প্রচলন বা কদর কোনোটাই নেই। এখন এটি চোখেও পড়ে না। ড্রাম কিংবা বস্তায়ই ধান রাখা হয়।

বোয়ালমারী উপজেলা সদর এলাকার বাসিন্দা, সাংস্কৃতিক কর্মী আমীর চারু, সুমন খানসহ অনেকেই জানান, এখন আর এসব চোখে পড়ে না। একেবারেই বিলুপ্তির পথে। গোলা নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে দক্ষ শ্রমিক ছিল। এখন এই পেশাটিও হরিয়ে গেছে।

কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী হাসান ফিরোজ ও সমর চক্রবর্তী বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে দেখেছি ও শুনেছি গোলায় ধান রাখা কৃষকের জন্য খুবই ভালো। কিন্তু এগুলো আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে। অন্য জেলায় কিছু কিছু দেখা গেলেও আমার জানা মতে ফরিদপুরে নেই। গোলাগুলো একসময় আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য বহন করতো।

সালথা উপজেলা যদুনন্দীর গোপীনাথপুর গ্রামের নরেন্দ্র নাথ মজুমদার ও সদরপুর, নগরকান্দা, ভাঙ্গা এলাকার প্রবীণরা জানান, আগেরকার দিনে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এ ধরনের ধানের গোলা থাকত। নাতি-নাতনিদের কাছে বললে তারা এখন বিশ্বাসও করতে চায় না। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে গ্রামীণ ঐতিহ্য ধানের গোলা।বর্তমানে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক কালের কলের নাঙলে ওলট-পালট করে দিয়েছে গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সেসব চালচ্চিত্র। শুধু ধানের গোলা নয়, ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি।

এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শাহেদুজ্জামান বলেন, কালের বিবর্তনে আজ বিলুপ্ত। আশির দশকের দিকে ওইসব ধানের গোলা কৃষক ও সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতো। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে মানুষের পারিবারিক ব্যবহার্য উপকরণে।ফলে ঐতিহ্যবাহী এসব ধানের গোলার জায়গা দখল করে নিয়েছে পাটের বস্তা। এগুলো তৈরি ঝামেলামুক্ত ও সহজে বাজারে পাওয়া যায় বলে মানুষ বাঁশের গোলার পরিবর্তে এসব আধুনিক উপকরণ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে হারিয়ে গেছে বাঁশের গোলার কদর। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তালিকায় এর অবস্থান শূন্য বলে তিনি জানান।

সংবাদ প্রকাশের পর: জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন এমপি বাবুল

সদরপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:২৯ অপরাহ্ণ
সংবাদ প্রকাশের পর: জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন এমপি বাবুল

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাইশরশি জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন ফরিদপুর-৪ (সদরপুর, ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। এরই প্রেক্ষিতে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার দিকে এমপি বাবুল সরেজমিনে জমিদার বাড়িটি পরিদর্শন করেন এবং সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, এই জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। এটিকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। ইতোমধ্যে আমরা এটি অধিদপ্তর-এর আওতায় এনে সংরক্ষণের চেষ্টা করছি।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা এই জমিদার বাড়ির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি গুপ্তধনের আশায় বউঘাট খননের ঘটনাও এলাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

শহিদুল ইসলাম বাবুলের এ ঘোষণায় এলাকাবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের কাফুরা রেলক্রসিংটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই রেলক্রসিংয়ে নেই কোনো লেভেল ক্রসিং গেট, নেই গেটম্যান—ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন পথচারী ও যানবাহন চালকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি এই কাফুরা রেলক্রসিংয়েই ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় ট্রেন ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন, যাদের তাৎক্ষণিকভাবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকাগামী একটি ট্রেন রেলগেট অতিক্রম করার সময় একটি মাইক্রোবাস হঠাৎ লাইনের ওপর উঠে পড়লে এ সংঘর্ষ ঘটে। ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি প্রায় ৫০ গজ দূরে ছিটকে গিয়ে পাশের একটি পুকুরে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো গেট বা গেটম্যান না থাকাই বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে। এরপর স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কাফুরা রেলক্রসিংয়ে এখনো নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ট্রেন আসার সময় সতর্কবার্তা বা ব্যারিয়ার না থাকায় হঠাৎ করেই যানবাহন লাইনে উঠে পড়ছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ওহিদুল ফকির বলেন, “প্রতিদিনই ভয় নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। ট্রেন কখন আসবে, কোনো ধারণা থাকে না। দ্রুত এখানে গেটম্যান নিয়োগ জরুরি।”

অটোরিকশা চালক হামিদ শরীফ বলেন, “হঠাৎ ট্রেন চলে এলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় অল্পের জন্য বেঁচে যাই।”

এলাকার চা দোকানদার হেলাল বেপারি জানান, “ট্রেন এলে আমরা নিজেরাই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করি।”

ঝালমুড়ি বিক্রেতা রফিক মোল্যা বলেন, “এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এত মানুষ মারা গেলেও কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই।”

চটপটি বিক্রেতা মো. হায়দার মন্ডল বলেন, “প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে এই রাস্তা দিয়ে। ঝুঁকি থাকলেও যেন কারো নজর নেই—এটা খুবই দুঃখজনক।”

এ বিষয়ে ফরিদপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার প্রহলাদ বিশ্বাস ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, “গেটম্যান নিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন।”

এ ব্যাপারে রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহাবুব হাসান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, এ ব্যাপারে পাকশীতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনও এর কোনো সমাধান মিলেনি।

রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মোসা. হাসিনা খাতুন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “এটি সম্ভবত অননুমোদিত রেলগেট হওয়ায় গেটম্যান নেই। তবে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি। আমরা এলাকাবাসী ও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুতই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহরাব হোসেন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “জননিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাইতো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রীঘ্রই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

যে বটগাছ জানে আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
যে বটগাছ জানে আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা

গ্রামের বটের ছায়ায় বসে থাকা হারানো শৈশব
বিকেলের আলোটা আজও ঠিক আগের মতোই নরম হয়ে আসে। হালকা সোনালি রোদ ধানের ক্ষেতে পড়ে যেন একরাশ স্মৃতি ঝলমল করে ওঠে।

গ্রামের সেই পুরোনো বটগাছটা—যার শেকড়গুলো মাটিতে নেমে এসে যেন আরেকটা পৃথিবী তৈরি করেছে—আজও দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের মতোই। শুধু বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে মানুষ, আর হারিয়ে গেছে এক টুকরো শৈশব।

রফিক আজ অনেক বছর পর গ্রামে ফিরেছে। শহরের ব্যস্ততা, চাকরি, সংসার—সব মিলিয়ে সে যেন ভুলেই গিয়েছিল এই মাটির গন্ধ। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই মনে হলো, একবার ফিরে দেখা দরকার। সেই জায়গাগুলোকে, যেগুলো তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোকে আগলে রেখেছিল।

বটগাছটার নিচে এসে দাঁড়াতেই বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার উঠে গেল। কতদিন, কত বছর পরে সে এখানে এসেছে! অথচ জায়গাটা যেন ঠিক আগের মতোই আছে—শুধু নেই সেই মানুষগুলো, নেই সেই হাসির শব্দ।

ছোটবেলায় এই বটগাছটার নিচেই ছিল তাদের আস্তানা। বিকেল হলেই সে, বাবু, করিম, লিপি—সবাই একসাথে জড়ো হতো এখানে। কখনও গোল্লাছুট, কখনও কাবাডি, আবার কখনও শুধু গল্প আর হাসাহাসি। সময় যেন তখন থেমে থাকতো তাদের জন্য।

রফিক ধীরে ধীরে গাছটার একপাশে বসে পড়ল। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল গাছের খসখসে গা। মনে হলো, গাছটা যেন তাকে চিনে ফেলেছে। যেন বলছে—“এতদিন কোথায় ছিলি?”

হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল এক বিকেলের কথা।
সেদিন আকাশে মেঘ ছিল, হালকা বাতাস বইছিল। তারা সবাই মিলে লুকোচুরি খেলছিল। রফিক লুকিয়ে ছিল বটগাছের পেছনে। তখন লিপি এসে বলেছিল— “এই, তুই এখানে! আমি তোকে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না।”

রফিক তখন মুচকি হেসে বলেছিল— “তুই খুঁজে পাবি না, আমি খুব ভালো লুকাই।”
লিপি হেসে বলেছিল— “বড় হয়ে তুই নিশ্চয়ই গুপ্তচর হবি!”

সেই হাসির শব্দটা আজও যেন বাতাসে ভাসে। কিন্তু লিপি এখন কোথায়? কেমন আছে? হয়তো সংসার নিয়ে ব্যস্ত, হয়তো এই গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে।

রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শৈশবের বন্ধুরা একে একে হারিয়ে গেছে জীবনের স্রোতে। কেউ শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ বা এই পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছে। শুধু এই বটগাছটা রয়ে গেছে, সব স্মৃতি আগলে রেখে।
তার চোখের কোণে জল এসে গেল। সে চুপচাপ বসে রইল।

হঠাৎ দূর থেকে একটা বাচ্চার হাসির শব্দ ভেসে এলো। সে তাকিয়ে দেখল—কয়েকটা ছোট ছেলে-মেয়ে খেলছে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে একসময় তারা খেলত।

একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এসে গাছটার পাশে দাঁড়াল, ঠিক যেভাবে রফিক দাঁড়াত ছোটবেলায়। ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল— “ধরতে পারবি না!”
এই দৃশ্যটা দেখে রফিকের বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু শৈশব—সে তো একই থাকে, শুধু মানুষ বদলে যায়।
সে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।

“তোমরা কী খেলছো?”—সে জিজ্ঞেস করল।
একটা মেয়ে উত্তর দিল— “লুকোচুরি!”
রফিক হেসে বলল— “আমরাও এই গাছটার নিচে এই খেলাটাই খেলতাম।”

ছেলেমেয়েগুলো অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। যেন তারা বুঝতে পারছে না—এই মানুষটা কীভাবে তাদের মতোই একসময় এখানে খেলেছে।
একটা ছেলে বলল— “আপনি এখানে থাকতেন?”
রফিক মাথা নেড়ে বলল— “হ্যাঁ, অনেক দিন আগে।”

ছেলেটা বলল— “তাহলে আপনি আমাদের সাথে খেলবেন?”

প্রশ্নটা শুনে রফিক একটু থমকে গেল। কত বছর হয়ে গেছে সে এমন করে খেলেনি! কিন্তু আজ কেন যেন মনে হলো—আবার একবার ফিরে যাওয়া যাক সেই সময়ে।

সে মুচকি হেসে বলল— “খেলব।”
খেলা শুরু হলো। রফিক দৌড়াচ্ছে, লুকাচ্ছে, হাসছে—ঠিক যেমনটা করত ছোটবেলায়। কিছুক্ষণ জন্য সে ভুলেই গেল যে সে এখন বড় হয়ে গেছে, তার দায়িত্ব আছে, তার বাস্তবতা আছে।
সেই মুহূর্তে সে শুধু একজন শিশু—একজন হারানো শৈশব ফিরে পাওয়া মানুষ।

খেলা শেষ হওয়ার পর সে হাঁপাতে হাঁপাতে বটগাছটার নিচে বসে পড়ল। ছেলেমেয়েগুলোও তার পাশে এসে বসলো।
একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করল— “আপনি আবার আসবেন?”

রফিক একটু চুপ করে থেকে বলল— “হ্যাঁ, আসব।”
কিন্তু সে জানে—জীবনের ব্যস্ততা তাকে আবার টেনে নিয়ে যাবে। হয়তো আবার অনেক বছর কেটে যাবে।

তবুও সে একটা প্রতিজ্ঞা করল—এই জায়গাটা, এই বটগাছটা, এই স্মৃতিগুলো—সে আর ভুলে যাবে না।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। পাখিরা বাসায় ফিরছে।
রফিক উঠে দাঁড়াল। একবার শেষবারের মতো গাছটার দিকে তাকাল।

তার মনে হলো—এই গাছটা শুধু একটা গাছ নয়। এটা তার শৈশব, তার স্মৃতি, তার হারানো সময়।
সে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। পেছনে পড়ে রইল বটগাছটা—কিন্তু তার ভেতরে থেকে গেল এক টুকরো শৈশব।

হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো—শৈশব কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সেটা কোথাও না কোথাও থেকে যায়—একটা গাছের ছায়ায়, একটা বিকেলের রোদে, বা কোনো পুরোনো হাসির শব্দে।
আর যখনই মানুষ একটু থেমে ফিরে তাকায়—সেই শৈশব আবার ফিরে আসে, খুব নীরবে, খুব গভীরভাবে।

রফিকের চোখে তখন আর জল নেই। আছে একরাশ শান্তি।
কারণ সে জানে—তার হারানো শৈশব পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সে এখনো বসে আছে—গ্রামের বটের ছায়ায়। 🌿

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর