খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

সরকারি হাসপাতালে বিড়ম্বনা, বেসরকারি ব্যয়বহুল

রেজাউল করিম রাজা
প্রকাশিত: বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:৫৪ অপরাহ্ণ
সরকারি হাসপাতালে বিড়ম্বনা, বেসরকারি ব্যয়বহুল
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক চাহিদা, যা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চরম বৈষম্য বিদ্যমান। নিম্নবিত্তদের চিকিৎসার জন্যে রয়েছে সরকারি হাসপাতাল, নিম্ন মধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্তদের জন্যে বেসরকারি হাসপাতাল এবং উচ্চ বিত্তদের জন্য আছে ফাইভ স্টার মানের বেসরকারি হাসপাতাল।সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে লম্বা লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে ব্যয় করতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। একদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর, পদে পদে বিড়ম্বনা, অন্যদিকে ব্যয়ের চাপে নাভিশ্বাস। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার এ চিত্র দেশের মানুষের জীবনের নিত্য বাস্তবতা।

সরকারি হাসপাতালের নাজুক অবস্থা, রোগীর তুলনায় অপর্যাপ্ত ডাক্তার, শয্যা এবং যন্ত্রপাতির যথেষ্ট সংকট রয়েছে। এ ছাড়াও সরকারি হাসপাতালে রোগীকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে চিকিৎসক ও অন্যান্য সহায়ক কর্মীদের অনীহা দেখা যায়। ফলে বাধ্য হয়েই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে এবং বিত্তশীলরা বিদেশে চলে যাচ্ছে চিকিৎসা নিতে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মতো যে পরিমাণ হাসপাতাল, চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য দক্ষ লোকবল থাকা উচিৎ, সরকারের পক্ষ থেকে সেটা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সেই সুযোগে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসাকেন্দ্র। তবে এসব হাসপাতালে সেবার থেকে মুনাফা অর্জনই প্রধান লক্ষ্য।

সরকারি চিকিৎসা
সরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে অথবা নামমাত্র মূল্যে দেওয়া হয়। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ থাকা সাপেক্ষে রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। তবে বিনামূল্যের চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীকে চরম ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। প্রথমেই লাইন ধরে টিকিট কাটতে হয়। তারপর আবার ডাক্তার দেখাতেও দীর্ঘ সময়ে লাইন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। ডাক্তার দেখানোর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হলে সেখানেও আবার টাকা জমা দিতে একবার লাইনে দাঁড়াতে হয়, এরপর আবার পরীক্ষার করাতেও লাইন ধরতে হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট নেওয়ার পর ডাক্তার দেখাতে আবার লাইন দিতে হয়। উল্লেখিত কাজগুলো সম্পন্ন করতে প্রায় দুই দিন লেগে যায়, যা একজন কর্মজীবী মানুষের জন্য খুবই কষ্টকর।সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচ অনেক কম। তবে সরকারি হাসপাতালে বেশিরভাগ সময়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিকল, কিংবা দক্ষ জনবলের অভাব থাকে। এমনকি রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে রোগীকে অনেক টেস্ট অন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতাল থেকে করতে হয়, যা অনেক ব্যয়বহুল।

সরকারি হাসপাতালের দক্ষ চিকিৎসক থাকলেও সেবার মান নিয়ে রোগীদের যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকায় চিকিৎসক বেশিরভাগ সময়ে রোগীকে যথাযথ সময় দিয়ে আন্তরিকতার সাথে চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন না কিংবা দেন না। চিকিৎসায় অন্যান্য সহায়ক লোকজনও রোগীদের প্রতি কম আন্তরিকতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবহেলা করা হয়ে থাকে।রোগীর চাপের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে শয্যার চরম সংকট থাকে। বেশিরভাগ সময়ে রোগী সরকারি হাসপাতালে একটা সিট পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়ার সমান। এ ছাড়াও সরকারি হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে।

বেসরকারি চিকিৎসা
সরকারি হাসপাতালের নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে গড়ে উঠেছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উদ্যোগে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন। মুনফার পাশাপাশি তারা চিকিৎসাসেবাও দিয়ে থাকে। তবে বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন অনুযায়ী না হয়ে, টাকা দ্বারা নির্ধারণ হয়। যার টাকা আছে, তারাই বেসরকারি চিকিৎসা পাবেন, টাকা নেই সেবাও নেই!বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অপেক্ষার সময় সাধারণত কম হয় এবং দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ভর্তি সুবিধা পাওয়া যায়। বেসরকারি হাসপাতালে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো, পরিষ্কার-পরিছন্নতা এবং ভালো পরিবেশ থাকে। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সকলেই রোগীর প্রতি যত্ন এবং আন্তরিকতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। পাশাপাশি রোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা সরকারি হাসপাতালে দেখা যায় না।

বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ডাক্তার দেখাতে এক থেকে দুই হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্রুত করা গেলেও খরচ সরকারি হাসপাতালের কয়েকগুণ বেশি হয়। বেসরকারি হাসপাতালে দ্রুত শয্যা পাওয়া গেলেও ভাড়া অনেক বেশি গুনতে হয়। এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। সামগ্রিকভাবে চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালের খরচ অনেক বেশি, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

জরুরি চিকিৎসা
ছোট কিংবা বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ও অবস্থান বেশ ভালো। জরুরি বিভাগে চিকিৎসক এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও থাকে। যেকোনো দুর্ঘটনায় তারা তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেন।

বেসরকারি হাসপাতালে যেকোনো ছোট বা বড় দুর্ঘটনায় বা যেসব ক্ষেত্রে পুলিশ কেস থাকে, সেসব ক্ষেত্রে কিংবা চিকিৎসা ব্যয়ভার বহনের অনিশ্চয়তায় রোগীদের সেবা দেওয়া হয় না, কিছু কিছু সময় তাৎক্ষণিক কিছু চিকিৎসা দিয়ে সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
সরকারি হাসপাতালগুলো সাশ্রয়ী হলেও সেখানে সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি আছে। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে উন্নত সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া গেলেও তা বেশ ব্যয়বহুল। জনগণের জন্য এটা একটা উভয় সংকট অবস্থা।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি এবং স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব  বলেন, মূল কথা হচ্ছে সরকার চিকিৎসাসেবা কতটুকু দেবে, কাদের দেবে? এখন বলা হচ্ছে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, কিন্তু যাদের সেবা ফ্রি পাওয়ার কথা, তারা পায় না। বেসরকারি হাসপাতালে যেহেতু সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে কী হচ্ছে না হচ্ছে জানা যায় না। আবার জানলেও কিছু করার থাকে না। এ থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে সুশাসন, বাজেটে যথাযথ অর্থায়ন, যাতে যারা সক্ষম না, তারা যেন চিকিৎসাসেবা পায়। এটা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়, রাষ্ট্র বা সরকার চাইলেই এটা করতে পারে।

তিনি বলেন, শুধু নীতিমালা করলেই হবে না, সেটাকে কার্যকর করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকে কী হচ্ছে? আমরা এমন কমিউনিটি ক্লিনিক চাইনি। স্বাস্থ্য শিক্ষায় কী হচ্ছে? সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে ব্যবহার হয় না। বর্তমান সরকার রিফর্ম কমিশন করেছে, এটা কি তারা বাস্তবায়ন করবে? এগুলো ছেলে ভোলানো বিষয়। যে পর্যন্ত রাজনীতিবিদেরা এটা জনস্বার্থে করতে না চান, সে পর্যন্ত এটা হবে না। একদিনে হবে না, অন্তত ২০ বছর লাগবে, কিন্তু আমাদের শুরু করতে হবে। তারা আগ্রহী বড় বড় বিল্ডিং বানাতে, সেখান থেকে পয়সার ভাগ পাওয়া যাবে। তারা আগ্রহী বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আনতে কিন্তু যন্ত্রপাতি চালাতে আগ্রহী না। যন্ত্রপাতি কিনলে সেখান থেকে তারা কমিশন পায়।

বিএমএ-এর সাবেক সভাপতি আরও বলেন, চিকিৎসকর দলবাজ হয়ে গেছেন, তাদের কখনো দলবাজ হওয়া উচিত না। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্যা। কোনো সরকার সমস্যা সমাধান করছে না। বেসরকারি হাসপাতালে টাকার গাট্টি নিয়ে যাবেন। তারা আপনাদের লুট করবে এবং সেটা দেখারও কেউ নেই।

কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, সরকারি হাসপাতাল দালাল পোষে না, যারা রোগীদের হাত-পা ধরে সেখানে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসবে। অন্যদিকে প্রাইভেট হাসপাতালে উল্টো চিত্র দেখা যায়। সরকারি হাসপাতালেও প্রাইভেট হাসপাতালের দালাল থাকে, সরকারি হাসপাতালের ভিতর থেকেও একটা সমর্থন থাকে, তারা রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায়। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিকেলে প্রাইভেট হাসপাতালের চেম্বারে রোগী দেখেন। দালালির এই চক্রটা একটা বড় ফ্যাক্টর।

তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকট আছে, পাশাপাশি নার্স বা প্যারামেডিক যে পরিমাণ থাকার কথা, সেটাও নেই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে একজনের চিকিৎসকের অনুপাতে তিন জন নার্স, পাঁচ জন প্যারামেডিক থাকা দরকার। আমাদের সেটা নেই। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক থাকলেও যেহেতু পর্যাপ্ত নার্স, প্যারামেডিক নেই, তাই গুনগত সেবা দেওয়া যায় না। এ ছাড়াও দুটি আলাদা অধিদপ্তরের অধীনে হওয়ার কারণে চিকিৎসকদের কথা নার্সরা সবসময় শুনতেও চান না। এক্ষেত্রেও সেবার মানে ঘাটতি দেখা যায়।

স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, যেহেতু সরকারি হাসপাতালের বরাদ্দ বছর ভিত্তিক হয়, সেটা পেতেও কয়েক মাস চলে যায়, ফলে ওষুধ কিংবা অন্যান্য উপকরণের ঘাটতি দেখা যায়। গত এক বছর থেকে উন্নয়ন খাতের টাকা রিলিজ হয়নি। ফলে এখানেও একটা ঘাটতি আছে। রোগীরা ওষুধ পাচ্ছে না। এত কষ্ট করে এসে রোগীরা দেখে ওষুধ নেই, চিকিৎসককে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন তারা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে চলে যান।

বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে যখন কোনো গর্ভবতী নারী যায়, সেখানে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সিজারের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব করানো হয়। এটা কোনোভাবেই ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা না। এটা দেখার কেউ নেই। এটা যারা নিয়ন্ত্রণ করবে, তাদের ব্যাকআপ দেওয়ার কেউ নেই। প্রাইভেট হাসপাতাল যাদের, তারা অনেক ক্ষমতাবান, বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ। প্রাইভেট হাসপাতালের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কালচার গড়ে উঠেছে। আবার সরকারি হাসপাতালের অনেকেই প্রাইভেট হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত। এজন্য প্রাইভেট হাসপাতালে তদারকি করা হয় না।

সালথায় যে কারণে থামছে না সংঘর্ষ? —কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ণ
সালথায় যে কারণে থামছে না সংঘর্ষ? —কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

ফরিদপুরের সালথা উপজেলা মারামারি ও সংঘর্ষ প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানকার স্থানীয় অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মোড়ল কিংবা মাতুব্বররা এখানে লিড দিয়ে থাকেন। তারা তাদের দলে লোকজন ভিড়িয়ে আধিপত্য বিস্তার আর ক্ষমতার বলয় বৃদ্ধি করে থাকেন।

এরপর চলে এলাকায় আধিপত্য, দরবার-সালিশ, মামলা-হামলাসহ নানা কাহিনী। এভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে এ উপজেলার কাইজা, সংঘর্ষ আর বাড়ি-ঘর ভাংচুরের ঘটনা। এভাবেই কারো যাচ্ছে প্রাণ, কেউ হচ্ছেন বাড়ি হারা, কেউবা বরণ করছেন পঙ্গুত্ব।

যাহোক, এবার আসি কেন সালথা উপজেলায় মারামারি ও সংঘর্ষ বন্ধ হয় না—

এই উপজেলার মানুষ ধর্মপরায়ণ। তাইতো মাদ্রাসার সংখ্যাও বেশি, যেমন— বাহিরদিয়া মাদ্রাসা, পুরুরা মাদ্রাসা উল্লেখযোগ্য। মসজিদের সংখ্যাও অসংখ্য।

তবুও কেন থামছে না সংঘর্ষ—

‌> আধিপত্য বিস্তারের লড়াই:

মাতুব্বর তার আধিপত্য বিস্তার করতে এবং একক বলয় তৈরি করতে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষ করে থাকেন। এরপর ঢাল, সরকি, রামদা, লাঠিসোঁটা আর ইটপাটকেল দিয়ে চলে সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে যদি নিজের পক্ষের কোনো লোকজন না যায় তবে তাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকেন মাতুব্বর ও তার অনুসারীরা। এরপরও কাইজা বা সংঘর্ষে না গেলে যিনি কাইজায় না যান তার বাড়িতে হামলা-ভাংচুর করা, এছাড়া তাদের মারধর করা হয়। এ কারণে একজন নিরীহ মানুষ কাইজা বা সংঘর্ষে না যেতে চাইলেও বাধ্য করা হয়।

> জোর করে দলভুক্ত করা:

বিপীরত বা বিরোধী পক্ষের মাতুব্বরের লোকজনকে মারধর ও বাড়ি-ঘর ভাংচুর ও হুমকি-ধমকি দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে নেন অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাসীন মাতুব্বর কিংবা মোড়লরা। অতঃপর দলে ভিড়িয়ে তাদের দিয়েও কাইজা করান। না করলে হুমকি-ধামকি আর ভাংচুর চালায় তাদের বাড়িঘরেও।

> প্রতিবাদের পথ বন্ধ:

কেউ যদি মাতুব্বরের অপকর্ম নিয়ে কথা বলে কিংবা প্রতিবাদ করে তবে তাকে মারধর সহ মিথ্যা মামলায় জড়ান ওই মাতুব্বর ও তার অনুসারীরা। তাই ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করেনা।

> একপাক্ষিক সালিশ ব্যবস্থা:

এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলেই এই অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মোড়ল সালিশ ডেকে যে রায় দেন সেটাই মানতে হয়! ভয়ে কেউ সঠিক কথা বলতে পারেন না।

> সালিশকে আয়ের উৎস বানানো:

এরপর এই মোড়ল বা মাতুব্বররা এলাকায় যে কোনো ঘটনা মিমাংসার নামে সালিশ বসিয়ে উভয় পক্ষের কাছে থেকে বা যে কোনো এক পক্ষের কাছে থেকে টাকা বা জরিমানা আদায় করেন। অতঃপর সেখানে ভাগ বসানোর অভিযোগ রয়েছে অহঃরহ। কেউ প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হন সে ব্যক্তি।

> অসৎ যোগসাজশের অভিযোগ:

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু অসৎ কর্মকর্তার সঙ্গে এই মাতুব্বররা যোগসাজশ করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে বিধায় অনেক নিরীহ মানুষ থানা কিংবা প্রশাসনে অভিযোগ করলে উল্টো নিজেই অপরাধী ও মামলা হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাইতো, ভয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।

> শিক্ষিত সমাজের নীরবতা:

এ উপজেলার উচ্চ শিক্ষিত ও ভালো চাকরিজীবী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীরা এলাকায় থাকেন না। হয়রানি ও সম্মানহানির ভয়ে এ এলাকার মোড়ল কিংবা মাতুব্বরের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না। সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে দেখা যায় না। তারা মনে করেন মাতুব্বরদের কিছু বললে উল্টো তারা নাজেহাল হবেন, পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় থাকবে। তাই অযথা ঝামেলায় জড়াতে চায় না।

এ উপজেলায় সংঘর্ষ ও মারামারি এড়াতে বা প্রতিরোধের উপায়-

> . ‘গ্রাম্য শান্তি কমিটি’ গঠন:

এ উপজেলায় মোড়ল কিংবা মাতুব্বর প্রথা বিলুপ্তি করে এলাকার সুশীল সমাজের লোক— যেমন নিরপেক্ষ স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মসজিদের ইমাম, চাকরিজীবী ও উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে কিংবা নিরপেক্ষ একজন মানুষকে প্রধান করে নিরপেক্ষভাবে গ্রামের যেকোনো বিরোধ কিংবা সমস্যা সমাধান কিংবা পরিচালনা করার জন্য ‘গ্রাম্য শান্তি কমিটি’ নামক একটি কমিটি করে দেওয়া যেতে পারে। তারা গ্রামের যেকোনো বিরোধ মিমাংসা করবেন। না পারলে আইনগত সহায়তা নিবেন বা সুপারিশ করবেন।

> মাদকবিরোধী কমিটি:

প্রতিটি এলাকার গ্রামে গ্রামে মাদক নির্মূল ও প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যারা এলাকার মাদক নির্মূল বা বন্ধে প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে কাজ করবে।

> সংঘর্ষ প্রতিরোধ টিম:

এ ছাড়া প্রতিটি গ্রামে সুশীল সমাজের লোকজন দিয়ে কাইজ্যা কিংবা সংঘর্ষ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যারা সংঘর্ষ বন্ধে ভূমিকা পালন করবেন।

> নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ:

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থেকে স্থানীয় মোড়ল কিংবা মাতুব্বর অথবা যারা মারামারিতে উস্কানি দেয় তাকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষপাতিত্ব করা যাবেনা।

> প্রশাসন ও জনগণের সমন্বয়:

থানা পুলিশ ও প্রশাসন স্থানীয় প্রতিটি গ্রামে গঠন করা শান্তি কমিটির কিংবা সুশীল সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা ভালো রাখতে কাজ করতে পারেন।

> জরুরি হেল্পলাইন চালু:

সংঘর্ষ ও কাইজা বন্ধে দ্রুত রেসপন্স করার জন্য থানা কিংবা উপজেলা প্রশাসনে হেল্পলাইন নম্বর চালু করা যেতে পারে। যাতে যেকোনো সহিংসতা বন্ধে দ্রুত রেসপন্স করতে পারে প্রশাসন।

> দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান:

প্রশাসনের দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখা। যাতে নতুন দেশীয় অস্ত্র তৈরি করতে না পারা ও মানুষের ভয় এবং আতঙ্ক তৈরি হয় কাইজের বিরুদ্ধে।

> সচেতনতামূলক কার্যক্রম:

প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি উপজেলায় সংশ্লিষ্ট এমপি, ইউএনও কিংবা ওসিকে প্রধান করে সুশীল সমাজ, চাকরিজীবী, শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে, সম্মানি ব্যক্তির দ্বারা কয়েকটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যে কমিটির কাজ হবে একেকদিন এক একটি স্কুল-কলেজে গিয়ে এভাবে প্রতিটি স্কুল-কলেজে পৌঁছে কাইজা বা সংঘর্ষের কুফল ও খারাপ দিকগুলো বিস্তর আলোচনা করতে পারে শিক্ষার্থীদের মাঝে। যাতে নতুন প্রজন্ম এই কাইজা করতে নিরুৎসাহিত হয়।

> নিয়মিত গণসভার আয়োজন:

থানার ওসি ও ইউনওর অন্তত মাসে এলাকার লোকজন নিয়ে এক একটি ইউনিয়নে গিয়ে কাইজা বন্ধে সভা-সমাবেশ করতে পারেন।

এইভাবেই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সালথা উপজেলায় সংঘর্ষ ও সহিংসতা কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক:

হারুন-অর-রশীদ, বিবিএ (অনার্স), এমবিএ (ব্যবস্থাপনা)।

– ফরিদপুর প্রতিনিধি: বাংলানিউজ২৪ ও দৈনিক আজকালের খবর।

– সিনিয়র সহ-সভাপতি : সালথা প্রেসক্লাব

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।