খুঁজুন
, ,

গণঅভ্যুত্থান : আকাঙ্খা, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতা

শেখ রফিক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০২৫, ১:৩৪ অপরাহ্ণ
গণঅভ্যুত্থান : আকাঙ্খা, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতা

আমার দুই ছেলে, সক্রেটিস পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে আর সব্যসাচী সদ্য এসএসসি দিয়েছে। প্রতিদিন রাতে আমি বাসায় ফিরলে ওরা নানা প্রশ্ন করে। প্রশ্নগুলোর অনেকটাই আসে ফেসবুকে দেখা কোনো দুর্ঘটনা, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন, চাঁদাবাজি বা সংঘর্ষ নিয়ে। ছোট ছেলে বেশি প্রশ্ন করে। প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তরগুলো খুব কঠিন। ওরা জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা, মানুষ এত খারাপ হয় কেন? তুমি জান, আজ একটা মাজার ভেঙে দিয়েছে। আজ ছাত্ররা-ছাত্ররা মিছিলে মারামারি করেছে। আজ একজনের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আজ একজন শিক্ষককে মেরেছে। আজ একজনের মাথায় গুলি করে মেরে ফেলেছে। আজ একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আজ একজন মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়েছে। আজ একজন ছাত্রকে মেরে ফেলেছে। আজ একজনকে পাথর দিয়ে মেরে ফেলেছে! আজ একজন মেয়েকে রেপ করে মেরে ফেলেছে! এমন অসংখ্য ঘটনার কথা এবং কেন হচ্ছে সেই জিজ্ঞাসার সম্মুখীন গত এক বছর আমাকে হতে হয়েছে। ওরা বলে, ‘এসব করে কেন?’ কিংবা সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, ‘সরকার কী করে?’ আমি কখনো উত্তর দিই, আবার কখনো নীরব থাকি। ওদের প্রশ্নের উত্তর হয়তো সবসময় দিতে পারি না। কিন্তু প্রতিদিন প্রশ্ন করে।

ঢাকায় পঁচিশ বছর ধরে আমি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে পল্টন ময়দান, মুক্তাঙ্গন, শহীদ মিনার, শাহবাগ ও প্রেসক্লাবে হাজারবার মিছিল-মিটিং-সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছি। এই মিছিল-সমাবেশগুলো বারবার বলেছে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা দিন, কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম দিন। মতপ্রকাশে বাধা দেবেন না। বিরোধী দলের ওপর মিথ্যা মামলা, হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধ করুন। হত্যা, ধর্ষণ ও গুম বন্ধ করতে হবে। গরিব মেহনতি মানুষের জন্য রেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান করুন। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করুন। দুর্নীতি বন্ধ করুন, লুটপাট থামান, বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ করুন। খেলাপি ঋণ আদায় করুন, সন্ত্রাস দমন করুন, টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্ব রোধ করুন। সিপিবি লাখ লাখবার এসব বলেছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? কেউ কথা শুনেনি, কেউ কথা রাখেনি। ‘তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?’ বঙ্কিমচন্দ্রের অবিস্মরণীয় এই উক্তি মনুষ্যত্বের এক বাস্তব ও গভীর মূল্যবোধের উৎসারণ। গত ৫৪ বছর ধরে যারা লেখাপড়া করেছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন, প্রত্যেকেই এই ভাব-সম্প্রসারণ পড়েছেন ও লিখেছেন। কিন্তু কতটা ধারণ করেছেন এবং তা নিজের কর্মজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগ করেছেন সেটা জনগণ খুব ভালো করেই জানে। বঙ্কিমের এ উক্তি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিম্নলিখিত বাক্যটি স্মরণীয় ‘Relationship is the fundamental truth of the world of appearance, সম্পর্কই হলো এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মূল সত্য। মানুষকে মানুষ করে তোলে তার পারস্পরিক সম্পর্ক, সংযোগ এবং সহানুভূতি। আমাদের জীবনে সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। এটাই আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। সেই সময়ের স্বপ্ন ছিল, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন করা। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই কাক্সিক্ষত রাষ্ট্রব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি। ‘খেয়ে-পরেই একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই’  শিক্ষা ও চিকিৎসায় বৈষম্য বেড়েই চলছে, সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থা ও বেসরকারি খাতের উচ্চ ব্যয় দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে স্বপ্ন করে তুলেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ছিল দুঃখ-দুর্দশা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। কিন্তু পাঁচ আগস্টের পর শুরু হওয়া হামলা, নির্যাতন ও দমন-পীড়ন ন্যায়বিচারের স্বপ্নকে অনেকটা ভেঙে দিয়েছে। খুনের বিচার হয়নি, দুর্নীতিবাজ গ্রেপ্তার হয়নি, পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা যায়নি। মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বেড়েই চলছে, জনজীবন অনিশ্চিত। জনগণ ভেবেছিল, শেখ হাসিনা চলে গেলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে। কারণ তার সরকারের অধীনে ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সম-অধিকার হারিয়ে গিয়েছিল। বিরোধী দল দমন, গুম, খুন, ধর্ষণ ও দুর্নীতি রাজত্ব ছিল। সেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে ৫ আগস্ট সরকারের পতন ঘটায়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, গত এক বছরে শান্তি-শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফিরেছে কি? জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার পেয়েছে কি? র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর পোশাক বদলেছে, কিন্তু চরিত্র কতটুকু বদল হয়েছে? রাষ্ট্র যদি জনবান্ধব হতো, তাহলে আন্দোলনের পর চিন্তাচেতনার সংস্কার হতো; কিন্তু বাস্তবতা বিপরীত, হয়রানি ও দমন চলছে। অপরাধীরা সরকারের দুর্বল নেতৃত্বে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, খাদ্য ও পানির নিশ্চয়তা আজও অধরা। ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার শুধু কোনো ব্যক্তি বা দালান-কোঠায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাষ্ট্রযন্ত্র, সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে গভীরে প্রবাহিত একটি ব্যবস্থা। তাই স্বৈরাচারী শাসন কেবল শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিরোধ করলেই নির্মূল হয় না; বরং তা পুনরুৎপাদনের আশঙ্কা থেকেই যায়। এ জন্য সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক পন্থায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচর্চার মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলা প্রয়োজন। গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়া। যেখানে সবাই মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার পাবে। কিন্তু নেতৃত্বের স্বার্থপরতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ক্ষমতার ‘ডিসিপ্লিনারি মেকানিজম’ জনআকাক্সক্ষার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে ‘মব-সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছে, যা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সংখ্যালঘু ও বিরোধী মতের ওপর সহিংসতা এবং গণতান্ত্রিক কণ্ঠরোধকে উসকে দিচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন ও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে সহিংসতা কীভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে? অপরাধীরা প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির মুখে। ধর্ষক, খুনি, দুর্নীতিবাজ ও মাদকাসক্তরা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করার চেষ্টা করছে। তারা অস্থিরতা ও ভয় সৃষ্টি করছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলে। এসব ব্যর্থতা জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। এই অপরাধীরা হঠাৎ কোথাও জন্ম নেয় না; তারা গড়ে ওঠে বৈষম্যপূর্ণ, অব্যবস্থাপনা ও ন্যায়বিচারহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই।

দুর্বল শাসনব্যবস্থা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক পক্ষপাত অপরাধীদের উৎসাহ দেয়। যখন অপরাধীরা শাস্তি পায় না, তখন তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিচারহীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাব খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি ও দমন-পীড়ন বাড়িয়েছে। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারীর প্রতি অবজ্ঞাসূচক মনোভাব, লিঙ্গ বৈষম্য এবং ঘৃণার রাজনীতি বিকৃত মানসিকতার অপরাধী তৈরিতে সহায়ক। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার প্রতি অবহেলা অপরাধ প্রবণতা বাড়ায়। অপরাধকে ‘ট্রেন্ড’ হিসেবে দেখা এবং অসৎ জীবনযাপনকে সামাজিক সহানুভূতির মাধ্যমে মেনে নেওয়া একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যা দেশের স্থিতিশীলতা ও মানুষের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এই জাতি অন্যায় সহ্য করে না। ভাষার অধিকার, ভোটাধিকার বা ন্যায্য জীবনের দাবিতে মানুষ বারবার রক্ত দিয়েছে। প্রতিবারই জন্ম দিয়েছে গণঅভ্যুত্থান, যা শুধু সরকারের পতনের জন্য নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামো চ্যালেঞ্জ করার জন্য। তবে ১৯৬৯ সালের ছাত্র-অভ্যুত্থান থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া একই প্রতিক্রিয়াশীল ও আত্মবিমুখ।

প্রশাসনে দায়বদ্ধতার অভাব প্রকট, আত্মসমালোচনা নেই। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিপক্ষের দোষারোপে লিপ্ত, জনগণের রক্ত ও ক্ষোভকে ক্ষমতার খেলায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে গণতন্ত্র ক্ষয়ে যাচ্ছে, লোভ-হিংসা বাড়ছে, রাষ্ট্র থেকে মানুষ আবার দূরে সরে যাচ্ছে। বর্তমান অস্থিরতা ও হতাশার মধ্যে সবচেয়ে বড় সংস্কার হলো, নিজেকে প্রশ্ন করা ‘আমি কী আমাকে পরিবর্তন করেছি’? সর্বত্র সংস্কার প্রয়োজন। সংস্কার ছাড়া সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। সংস্কার ও নির্বাচন এই দুই পরস্পরের পরিপূরক। জনগণ চায় অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোটাধিকার ফিরে পেতে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ। ভোটাধিকার ফিরলে শাসনব্যবস্থায় শান্তি আসবে। বিচারব্যবস্থা, পুলিশ ও প্রশাসনে সংস্কার অপরিহার্য, সাংবিধানিক পরিবর্তনও সময়ের দাবি। তবে গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল হয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। কারণ প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। তাই প্রথম প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে। গণমাধ্যম কিছুটা স্বাধীনভাবে কথা বলছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর আলোচনা চলছে এবং তরুণদের কর্মমুখী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরুর কিছু অভিযান সাধারণ মানুষের মাঝে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রদর্শন প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি ও ন্যায্য সম্পদের বণ্টন নিশ্চিত করবে। রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি প্রশাসন স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করবে, সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে ভূমিকা রাখবে। নারীর মর্যাদা ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা ধর্ষণ কমাবে। যুবসমাজে নৈতিকতা গড়ে উঠলে দুর্নীতি কমে। উন্নত দেশগুলোতে বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তাই অপরাধ হ্রাসের মূল কারণ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ৩১ দফা রূপরেখা এবং ভিশন-২০৩০-এ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ও নির্বানের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক রূপান্তরের বার্তা বহন করে। তবে সময় বলে দিতে এই রূপান্তরের বার্তা কতটা কার্যকর হবে। গণতন্ত্র তখনই সফল হবে, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবে ‘সাধারণ মানুষ’ এবং রাষ্ট্র হবে সবার মৌলিক অধিকারের রক্ষক ও জনতার প্রকৃত সেবক। তখনই ‘খেয়ে-পরেই একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই’ এই আর্তনাদ শব্দহীন হয়ে যাবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪১ অপরাহ্ণ
সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগে নতুন অগ্রগতি এসেছে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ ও সদস্য সচিব (মাননীয় সংসদ সদস্যগণের প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেল) মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে আধা-সরকারি (ডিও) পত্রের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়টির জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নারী শিক্ষার প্রসার এবং পিছিয়ে পড়া জনপদের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৮৮ সালে নগরকান্দায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন এবং দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের মেয়েদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ উদ্যোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হবে।

ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সড়কে হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জব্দ করা হাতিটি এখনো সদরপুর থানা প্রাঙ্গণেই রয়েছে। হাতিটির মালিকানা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাতিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি বন বিভাগের জিম্মায় হস্তান্তর করা হবে -তা নির্ধারণ হবে।

থানা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাতিটি সদরপুর থানা চত্বরে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। হাতিটির দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য মালিক পক্ষ থেকে দুইজন মাহুতকে থানায় পাঠানো হয়েছে। তারাই নিয়মিত হাতিটিকে গোসল করানো, খাওয়ানো ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে প্রতিদিন একটি হাতির জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হয়। কলাগাছ, ঘাসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার সংগ্রহ করতে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশ ও মাহুতদের। থানা প্রাঙ্গণে হাতির জন্য স্থায়ীভাবে খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় খাদ্যসংকটও দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও হাতির মালিকের সহযোগিতায় খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও তা সবসময় পর্যাপ্ত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

থানায় অবস্থানকালে হাতিটি প্রায়ই মাহুতদের সঙ্গে থানা চত্বরে হেঁটে বেড়ায়। বিশাল আকৃতির প্রাণীটিকে দেখতে প্রতিদিন উৎসুক মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে থানায় এসে হাতিটিকে দেখছেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন অপ্রত্যাশিত এক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তবে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

সদরপুর থানার পলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোকলেসুর রহমান জানান, আদালতের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত হাতিটি থানার হেফাজতেই থাকবে। আদালত যদি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তাহলে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তা হস্তান্তর করা হবে। আর বন বিভাগের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, হাতিটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, পুলিশ সেটিই বাস্তবায়ন করবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই দুপুরে সদরপুর উপজেলার আটরশি এলাকায় হাতি নিয়ে সড়কে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাস বয়সী আরিশা জান্নাত গুরুতর আহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা হাতির মাহুত বকুল মিয়াকে গণপিটুনি দেয় এবং হাতিটিকে আটক করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহুতকে আটক এবং হাতিটিকে জব্দ করে সদরপুর থানায় নিয়ে আসে। এরপর থেকে হাতিটি থানার হেফাজতেই রয়েছে।

সালথায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল দুই সন্তানের জননীর

সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
সালথায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল দুই সন্তানের জননীর

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের পিসনাইল গ্রামে টয়লেট থেকে ফেরার পথে সাপের কামড়ে সরস্বতী মণ্ডল (৪২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। সরস্বতী মণ্ডল ওই গ্রামের প্রেমানন্দ মণ্ডলের স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে বাড়ির পাশের টয়লেট থেকে ফেরার সময় সরস্বতী মণ্ডল অসাবধানতাবশত একটি ইঁদুরের গর্তে পা দেন। এ সময় গর্তে থাকা একটি সাপ তাঁকে দংশন করে। পরে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। সকাল আটটার দিকে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের ধারণা, বিষধর গোখরা সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বল্লভদী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান খন্দকার সাইফুর রহমান শাহীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে তিনি নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়েছেন।

হঠাৎ এ মৃত্যুর ঘটনায় পিসনাইল গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।