খুঁজুন
, ,

পেশাদার আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আইনি রূপরেখা

তানভীর আহমেদ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫, ১২:৫৭ অপরাহ্ণ
পেশাদার আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আইনি রূপরেখা
২০২২ সালের শেষদিকে যুক্তরাজ্যের একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা অভিযোগ করেন যে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী এবং বিচারবিষয়ক মন্ত্রী ডমিনিক রব তাদের প্রতি বুলিং (বলপ্রয়োগ বা ভয় দেখিয়ে কাউকে কিছু করতে বাধ্য করা) এবং অপমানজনক আচরণ করছেন। অভিযোগগুলো মূলত বিচারবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আসে।  সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক অভিযোগগুলো পর্যালোচনার জন্য অ্যাডাম টলি কেসি-কে Independent Investigator হিসেবে নিয়োগ দেন। টলি যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সিনিয়র ব্যারিস্টারদের একজন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণসংক্রান্ত তদন্ত, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ অনিয়ম অনুসন্ধান এবং কর্মক্ষেত্রে অনৈতিক আচরণসংক্রান্ত বিষয়ে আইনগত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ King’s Counsel খেতাব অর্জন করেন; সেজন্যই তার নামের পশ্চাতে কেসি লেখা হয়। টলি প্রায় পাঁচ মাস ধরে বিস্তারিত তদন্ত ও প্রমাণাদি সংগ্রহ করেন। তদন্তে দুটি ঘটনায় বুলিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন যে অভিযুক্ত মন্ত্রী সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের প্রতি অযথা রূঢ় ও ভয় সৃষ্টিকারী আচরণ করেছেন, যা যুক্তরাজ্যের ‘মিনিস্টিরিয়াল কোড’-এর লঙ্ঘন।  অভিযুক্ত উপপ্রধানমন্ত্রী ডমিনিক রব এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও তদন্তের ফলাফলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ২১ এপ্রিল ২০২৩ উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন অ্যাঞ্জেলা রেইনার; পাশাপাশি তিনি গৃহায়ন, কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল যে তিনি ইংল্যান্ডের হোভ এলাকায় নিজের দ্বিতীয় বাড়ি কেনার সময় ৪০ হাজার পাউন্ডের স্ট্যাম্প ডিউটি (কর) কম পরিশোধ করেছেন। বর্তমান ‘স্বাধীন উপদেষ্টা’ স্যার লরি ম্যাগনাসের তদন্তে অ্যাঞ্জেলার অনিয়ম ধরা পড়ে। এরপর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। ক্ষমতায় আসার পর গত ১৪ মাসে কিয়ার স্টারমারের মন্ত্রিসভা থেকে ৯ জন পদত্যাগ করলেন; যার বেশির ভাগই স্বাধীন উপদেষ্টার তদন্তের ফলস্বরূপ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির যে অভিযোগের মুখে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘সিটি মিনিস্টার’-এর পদ থেকে পদত্যাগ করেন, সেই অভিযোগের বিষয়েও এই স্বাধীন উপদেষ্টাই তদন্ত করেছিলেন।

যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী ও রাজনৈতিক পদাধিকারীদের করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রয়েছে ৩৮ পৃষ্ঠার মিনিস্টিরিয়াল কোডে; যার সর্বশেষ ভার্সনটি নভেম্বর, ২০২৪-এ জারি হয়েছে। সেখানে সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, মন্ত্রী হিসেবে দেশ ও জনগণের সেবা করা একটি বিশেষ সুযোগ ও দায়িত্ব। মন্ত্রীদের উচিত সব ধরনের যোগাযোগ ও কার্যসম্পর্কে ভদ্রতা ও পেশাদারি বজায় রাখা এবং যাদের সঙ্গে তারা কাজ করেন তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও বিবেচনাবোধ প্রদর্শন করা। যাদের সঙ্গে তাদের কাজের সম্পর্ক রয়েছে যেমন সরকারি কর্মচারী, মন্ত্রিসভা ও সংসদীয় সহকর্মী বা সংসদ সচিবালয়ের কর্মচারীদের সঙ্গে সম্পর্ক যথাযথ ও পেশাগত হওয়া উচিত। যে কোনো ধরনের হয়রানি, হুমকি, নিপীড়ন বা বৈষম্যমূলক আচরণ আচরণবিধির পরিপন্থি এবং তা কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না [অনুচ্ছেদ ১.৫]। মন্ত্রীদের অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে হবে এবং কখনো তাদের এমন কোনো কাজ করতে বলা যাবে না, যা সিভিল সার্ভিস কোডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় [অনুচ্ছেদ ১.৬] মন্ত্রী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্ক একটি সহযোগিতা, যা তাদের অভিন্ন বা জনসেবামূলক দায়িত্বের (public service duty) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। মন্ত্রীদের অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে হবে এবং কখনো তাদের এমন কোনো কাজ করতে বলা যাবে না যা সিভিল সার্ভিস কোড এবং ‘সংবিধান সংস্কার এবং সুশাসনসংক্রান্ত ২০১০ সালের আইন’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় [অনুচ্ছেদ ১.৮]। মন্ত্রীদের উচিত এটা নিশ্চিত করা যে সরকারি সম্পদ, যার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত, কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা না হয় [অনুচ্ছেদ-১.১০]।

যদি বলা হয় যে আমাদের দেশেও তো ভালো ভালো আইনকানুন আছে, কিন্তু মানা হয় না। তাহলে তার জবাব কী হবে? না, আমাদের দেশে মন্ত্রীদের করণীয়-বর্জনীয় বিশেষ করে সিভিল সার্ভিসের নিরপেক্ষতা সমুন্নত রাখার বিষয়ে স্পষ্ট বা বিস্তারিত বিধান নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে তার প্রতিকার কীভাবে হবে সেই সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান এই মিনিস্টিরিয়াল কোডের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিভিন্ন উপ-অনুচ্ছেদে পাওয়া যায়। সে মতে, যদি কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেট অফিসকে তথ্য অনুসন্ধানের নির্দেশ দিতে পারেন অথবা তিনি বিষয়টি Independent Adviser on Ministerial Standards-এর কাছে তদন্তের জন্য পাঠাতে পারেন। যুক্তরাজ্যে ‘মন্ত্রীগণের আচরণবিধিবিষয়ক স্বাধীন উপদেষ্টার এই পদটি প্রথম চালু হয় ২০০৬ সালে। তিনি সরকার থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। মন্ত্রী ও অন্যান্য উচ্চ পদাধিকারীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে তদন্তভার প্রদান করে থাকেন। তবে স্বাধীন উপদেষ্টা প্রয়োজন মনে করলে তার কাছে পাঠানো হয়নি, এমন অভিযোগও স্ব-উদ্যোগে তদন্ত শুরু করতে পারেন। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে তিনি  শাস্তি বা ব্যবস্থা সম্পর্কেও সুপারিশ করতে পারেন। যদি তিনি মনে করেন যে তার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন তবে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বাধ্য করতে পারেন। কোনো মন্ত্রী তার নিজের সততা বা স্বচ্ছতার বিষয়ে উত্থাপিত কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন পরিষ্কার করার জন্য নিজেই তদন্ত শুরু করার অনুরোধ জানাতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন মনে করলে ‘স্বাধীন উপদেষ্টা’ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তিকেও ইনডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটর হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। যেমনটি ঋষি সুনাক ব্যারিস্টার টলিকে উপপ্রধানমন্ত্রী ডমিনিক রবের বিরূদ্ধে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করেছিলেন।

কানাডার নৈতিকতাবিষয়ক কমিশনার (আনুষ্ঠানিক নাম Office of the Conflict of Interest and Ethics Commissioner) হলো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যার মূল কাজ হলো ফেডারেল রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী এবং সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তারা যেন স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে না পড়েন এবং নৈতিক আচরণবিধি মেনে চলেন তা নিশ্চিত করা। তিনিও যুক্তরাজ্যের উপদেষ্টার মতোই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা কারও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে থাকেন। তিনি সরাসরি সংসদকে রিপোর্ট করেন, সরকারি কোনো দপ্তরকে নয়। কানাডায় গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার নাম Public Sector Integrity Commissioner (PSIC); যা সরকারি কর্মকর্তাদের নৈতিকতা, সততা ও সুশাসন রক্ষায় কাজ করে। এই সংস্থাটিও পুরোপুরি স্বাধীন এবং সরকার থেকে আলাদা। সরকারি কর্মকর্তারা নিরাপদে সেখানে যে কোনো অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারেন। কোনো মন্ত্রীর দ্বারা বা রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হলে নাম গোপন রেখেও অনলাইনে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। পিএসআইসি অভিযোগ দায়েরকারীকে সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য তার তথ্য কাউকে প্রদান করে না। অভিযোগ করার কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি বা হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়ার আইনি সুরক্ষাও রয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনে।

যুক্তরাজ্য বা কানাডায় কিংবা অন্য কোনো দেশে অনুসৃত নিয়মনীতির অনুরূপ বিধান আমাদের দেশে চালিয়ে দিতে আমরা বলতে পারি না। তবে এটা জরুরি যে আমরা এই বিষয়গুলো সম্পর্কে উদাসীন না থাকি এবং বিস্তারিত পরীক্ষানিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়নে সচেষ্ট হই। সম্প্রতি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘জনপ্রতিনিধির কর্মপরিধি’ শীর্ষক ৯.৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সুপারিশ করেন যে ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিগণ কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কর্মপরিচালনায় হস্তক্ষেপ করবেন না। কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা রাজনৈতিক ব্যক্তি কোনো সরকারি কর্মচারীকে অন্যায্য ও বিধিবহির্ভূত কাজের জন্য অনৈতিক চাপপ্রয়োগ করলে তিনি বিষয়টি গোপনীয়ভাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অবহিত করবেন বলে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। কোনো বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক লিখিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে উপরস্থ কর্মকর্তা বা উপরস্থ জনপ্রতিনিধি ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই তাকে লিখিতভাবে নির্দেশ প্রদান করতে হবে। মৌখিক নির্দেশ বাস্তবায়ন করা যাবে না এবং মৌখিক নির্দেশে তা কার্যকর করা যাবে না।’ এটি সুপারিশ, স্বভাবতই পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নয়। পূর্ণাঙ্গ বিধান প্রণয়ন অধিকতর পর্যালোচনার দাবি রাখে। উল্লিখিত সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়নের উদ্যোগের বিষয়ে আমার জানা নেই, তবে সরকার নিশ্চয় তা গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছে।

কারও কারও এই লেখা পড়ে মনে হতে পারে, যেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মধ্যেই আমলাতন্ত্রের পেশাদারি নিহিত মর্মে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি মোটেও তা নয়। আমলাতন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত নিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণ এবং ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য অনেকগুলো বিষয়ে হাত দিতে হবে। তবে বিশ্বের টপ র‌্যাংকিং ব্যুরোক্রেসির সংস্কার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আমলাতন্ত্রের পেশাদারি বজায়ের উদ্দেশ্যে লিখিত বিধিবিধান থাকা জরুরি; নতুবা দিন শেষে সংস্কারের প্রকৃত সুফল ঘরে তোলা অথবা টিকিয়ে রাখা মুশকিল হতে পারে।  সম্প্রতি একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ব্যুরোক্রেট আমাকে বললেন যে তোমরা অভিযোগ কর রাজনীতিবিদরা তোমাদের কাজের ওপর হস্তক্ষেপ করে; বরং আমি তো বলি তোমরাই কাঙ্ক্ষিত পদায়ন আর পদোন্নতি পেতে নিজেরাই তাদের কাছে ধরনা দিয়ে বেড়াও। তার অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য; তবে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই লেখার মাধ্যমে মূলত আমাদের আর্জি হচ্ছে, যদি কোনো ক্ষমতাসীন পদাধিকারী অন্যায়ভাবে সরকারি কার্যক্রম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে সেই ‘বেচারা’ কর্মচারী যদি চাপের মুখেও আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখার সংকল্প করেন, তবে তার আইনি প্রতিকার আর সুরক্ষা কোন্ পথে হবে? এই ভাবনার খোরাক জোগাতেই এই নিবন্ধের অবতারণা।
লেখক : সরকারের যুগ্ম সচিব, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন

সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪১ অপরাহ্ণ
সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগে নতুন অগ্রগতি এসেছে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ ও সদস্য সচিব (মাননীয় সংসদ সদস্যগণের প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেল) মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে আধা-সরকারি (ডিও) পত্রের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়টির জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নারী শিক্ষার প্রসার এবং পিছিয়ে পড়া জনপদের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৮৮ সালে নগরকান্দায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন এবং দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের মেয়েদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ উদ্যোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হবে।

ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সড়কে হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জব্দ করা হাতিটি এখনো সদরপুর থানা প্রাঙ্গণেই রয়েছে। হাতিটির মালিকানা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাতিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি বন বিভাগের জিম্মায় হস্তান্তর করা হবে -তা নির্ধারণ হবে।

থানা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাতিটি সদরপুর থানা চত্বরে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। হাতিটির দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য মালিক পক্ষ থেকে দুইজন মাহুতকে থানায় পাঠানো হয়েছে। তারাই নিয়মিত হাতিটিকে গোসল করানো, খাওয়ানো ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে প্রতিদিন একটি হাতির জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হয়। কলাগাছ, ঘাসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার সংগ্রহ করতে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশ ও মাহুতদের। থানা প্রাঙ্গণে হাতির জন্য স্থায়ীভাবে খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় খাদ্যসংকটও দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও হাতির মালিকের সহযোগিতায় খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও তা সবসময় পর্যাপ্ত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

থানায় অবস্থানকালে হাতিটি প্রায়ই মাহুতদের সঙ্গে থানা চত্বরে হেঁটে বেড়ায়। বিশাল আকৃতির প্রাণীটিকে দেখতে প্রতিদিন উৎসুক মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে থানায় এসে হাতিটিকে দেখছেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন অপ্রত্যাশিত এক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তবে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

সদরপুর থানার পলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোকলেসুর রহমান জানান, আদালতের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত হাতিটি থানার হেফাজতেই থাকবে। আদালত যদি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তাহলে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তা হস্তান্তর করা হবে। আর বন বিভাগের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, হাতিটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, পুলিশ সেটিই বাস্তবায়ন করবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই দুপুরে সদরপুর উপজেলার আটরশি এলাকায় হাতি নিয়ে সড়কে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাস বয়সী আরিশা জান্নাত গুরুতর আহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা হাতির মাহুত বকুল মিয়াকে গণপিটুনি দেয় এবং হাতিটিকে আটক করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহুতকে আটক এবং হাতিটিকে জব্দ করে সদরপুর থানায় নিয়ে আসে। এরপর থেকে হাতিটি থানার হেফাজতেই রয়েছে।

সালথায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল দুই সন্তানের জননীর

সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
সালথায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল দুই সন্তানের জননীর

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের পিসনাইল গ্রামে টয়লেট থেকে ফেরার পথে সাপের কামড়ে সরস্বতী মণ্ডল (৪২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। সরস্বতী মণ্ডল ওই গ্রামের প্রেমানন্দ মণ্ডলের স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে বাড়ির পাশের টয়লেট থেকে ফেরার সময় সরস্বতী মণ্ডল অসাবধানতাবশত একটি ইঁদুরের গর্তে পা দেন। এ সময় গর্তে থাকা একটি সাপ তাঁকে দংশন করে। পরে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। সকাল আটটার দিকে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের ধারণা, বিষধর গোখরা সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বল্লভদী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান খন্দকার সাইফুর রহমান শাহীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে তিনি নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়েছেন।

হঠাৎ এ মৃত্যুর ঘটনায় পিসনাইল গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।