খুঁজুন
, ,

যে কারণে হাম নির্মূলে পিছিয়ে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
যে কারণে হাম নির্মূলে পিছিয়ে বাংলাদেশ
২০২০ সালের মধ্যে হাম নির্মূল সম্ভব হবে– একসময় এমন আশা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সাল করা হলেও সেই লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, বরং বাস্তবতা এখন উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে। দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য, হাসপাতালভিত্তিক মৃত্যুর হিসাব, টিকাদান কভারেজের সাম্প্রতিক পতন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এটিই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন কোনো রোগের প্রবণতা নয়, বরং এটি দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা, টিকাদান ঘাটতি ও নীতিগত শৈথিল্যের একটি বড় সতর্ক সংকেত।

দেশে চলতি বছর এ পর্যন্ত ৬৭৬ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশীদ। কিন্তু সরকারিভাবে হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছর দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

রাজধানী ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর ও পাবনায় এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। 

ইতোমধ্যে মহাখালীর ১০০ শয্যার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪, চাঁদপুরে ৩ এবং রাজশাহী ও পাবনায় একজন করে শিশু মারা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর মহাখালী হাসপাতালে মোট ৫৬০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যেখানে গত বছর এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯।

চলতি মাসের ২৯ দিনেই এ হাসপাতালে ৪৪৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। 

সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা রাজশাহীতে। হামের উপসর্গ ওই বিভাগের হাসপাতালগুলোতে প্রতিনিয়ত শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। ১৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫৩ জনের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেছে, যেখানে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ এসেছে। এ অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আলাদা আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে।

তাছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫০ ও নোয়াখালীতে গত ১৫ দিনে তিনশর বেশি শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে। চাঁদপুরেও ২৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি এবং ৩ জন মারা গেছে। 

সরকারি তথ্য ও হাসপাতালভিত্তিক বাস্তব মৃত্যুর তথ্যের মধ্যে ব্যবধান থাকা নতুন কিছু নয় বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অনেক সময় জটিলতা, রেফারাল, দেরিতে হাসপাতালে আসা বা নিশ্চিত ল্যাব রিপোর্ট না থাকা– এসব কারণে অনেক মৃত্যু আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে উঠে আসে না।

নির্মূলের লক্ষ্য সামনে, বাস্তবে টিকাদানে ধস
টিকাদানে ধস এখন দেশে হাম নির্মূলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হামের টিকাদানের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৭ দশমিক ১ থেকে ৫৭ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কভারেজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি ছিল বলে ইপিআই সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে এই হার হঠাৎ ৬০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এ পতন শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি সংক্রমণ বিস্তারের জন্য বাস্তব ও বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

৯০ শতাংশের নিচে নামা মানেই ঝুঁকি
হাম শুধু একটি রোগ নয়, বরং পুরো টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। অর্থাৎ একজন আক্রান্ত শিশু খুব সহজেই তার আশপাশের অনেক শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে হামের মতো রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাধারণ টিকার মতো মাঝারি কভারেজ যথেষ্ট নয়, এখানে প্রয়োজন অন্তত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ। এ উচ্চ হার নিশ্চিত করে যে সমাজে এমন একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি হবে, যেখানে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ পায় না, এটিই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক সুরক্ষা। কিন্তু বর্তমানে যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় টিকাদানের হার ৭০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা প্রয়োজনীয় সীমার অনেক নিচে। এর অর্থ হলো, সমাজে এখন একটি বড় অংশের শিশু সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এই অরক্ষিত জনগোষ্ঠীই হামের মতো রোগের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।

‘হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়া অর্থ হচ্ছে, যখন অধিকাংশ মানুষ টিকা নেয়, তখন ভাইরাস এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে না। কিন্তু কভারেজ কমে গেলে সেই সুরক্ষাবলয় ভেঙে যায়। তখন একটি মাত্র সংক্রমণ থেকেই দ্রুত বহু মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। বাংলাদেশ এখন সেই ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।’

এখনো হয়ত বড় প্রাদুর্ভাব দৃশ্যমান হয়নি, কিন্তু যেসব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে সেগুলোকে ভবিষ্যতের বিপদের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একবার হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। কারণ এটি দ্রুত ছড়ায় এবং শিশুদের জন্য মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এ কারণে আগাম সতর্কতা দিয়ে ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, এখনই যদি টিকাদান কভারেজ দ্রুত বাড়ানো না যায়, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেশ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পড়তে পারে। হামকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। টিকাদান কমে যাওয়া মানেই ভবিষ্যতের বড় প্রাদুর্ভাবের দরজা খুলে দেওয়া। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে শুধু প্রথম ডোজ নয়, দ্বিতীয় ডোজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দ্বিতীয় ডোজ না পেলে অনেক শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না।

দেশে বর্তমানে প্রথম ডোজের কভারেজ প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ প্রায় ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু প্রয়োজনীয় টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

হাম
খুলনায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে শিশু ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে

টিকাদানে ধস: নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে মাঠপর্যায়ের ভাঙন
হঠাৎ দেশে টিকাদানের হারে ধস নামাকে অনেকে কেবল সরবরাহ সংকট হিসেবে দেখছেন। তবে এর পেছনে রয়েছে আরও জটিল এক চিত্র– নীতিগত সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব, যা ধীরে ধীরে পুরো টিকাদান ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

দীর্ঘদিনের সেক্টর প্রোগ্রাম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে এ প্রোগ্রামের আওতায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নসহ প্রায় সব কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক কাঠামোই ছিল না, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করত।

সেক্টর প্রোগ্রাম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাঠ পর্যায়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, সেক্টর প্রোগ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করত। এটি শিশুদের টিকা, জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত কাঠামো হিসেবে কাজ করছিল। হঠাৎ প্রোগ্রাম বন্ধ হওয়ায় কোনো এক্সিট প্ল্যান বা বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা হয়নি। ফলে মাঠে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। যেমন– টিকা ঠিক সময়ে কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছায়নি, কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে।

‘এতে সরবরাহ চেইনেও বিঘ্ন ঘটে, অর্থাৎ জেলা থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা পৌঁছাতে সমস্যা হয়। কোল্ড চেইনের সমস্যার কারণে টিকার সঠিক সংরক্ষণও নিশ্চিত করা যায়নি। এর ফলে অনেক টিকাকেন্দ্র থাকলেও সেখানে টিকা পাওয়া যায়নি। একটি কার্যকর টিকাদান কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থা, সঠিক সরবরাহ চেইন, মাঠপর্যায়ের সমন্বয় ও তদারকি। এক্ষেত্রে কোনো একটি ধাপ ব্যাহত হলে পুরো ব্যবস্থা প্রভাবিত হয়। হঠাৎ প্রোগ্রাম বন্ধ করা মানে পুরো চেইনে ঝুঁকি তৈরি করা।’

এ ধরনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, যেসব শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, তারা সহজে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই স্বাস্থ্য কার্যক্রম বন্ধ বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে পরিকল্পিত রূপান্তর ও বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি। নীতিগত ভুল ও পরিকল্পনার অভাব ছাড়াই হঠাৎ পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বড় কোনো সরকারি কর্মসূচি বন্ধ করার ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে রূপান্তরের পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধের ক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতির অভাব ছিল স্পষ্ট। ফলে দায়িত্ব বণ্টনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব ঘটে এবং কেন্দ্র ও মাঠপর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় ভেঙে পড়ে।

কর্মকর্তারা জানান, এই প্রশাসনিক অচলাবস্থা দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। টিকাদান কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘সরবরাহ চেইন’, সেখানে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। টিকা পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সময়মতো ছাড় না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই টিকা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি। জেলা থেকে উপজেলা এবং সেখান থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা সরবরাহে বিলম্ব দেখা দেয়। একইসঙ্গে কোল্ড চেইন বা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয়।

ফলে মাঠপর্যায়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে কেন্দ্র আছে, স্বাস্থ্যকর্মী আছেন কিন্তু টিকা নেই। সরবরাহ ব্যবস্থার এই ভাঙনের সরাসরি প্রভাব পড়ে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর। তারা নির্ধারিত সব কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম চালাতে পারেননি। কোথাও কোথাও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাতে হয়েছে, আবার অনেক কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে অভিভাবকদের একাধিকবার টিকাকেন্দ্রে গিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

টিকাদান কর্মসূচি শুধু টিকা কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে জানান জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি একটি জটিল ও সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মধ্যে রয়েছে– টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি। এই চেইনের যেকোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থাই ব্যাহত হয়। অর্থাৎ টিকা কেনা হলেও তা সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারলে কার্যত সেই টিকা কোনো কাজে আসে না।

কিন্তু বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, বরং নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনার ঘাটতি, আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা এবং মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এ অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো– জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে হঠাৎ পরিবর্তন নয়, বরং ধাপে ধাপে পরিকল্পিত রূপান্তর নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ টিকাদান শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়, এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার ভিত্তি। এই ভিত্তি একবার দুর্বল হয়ে গেলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বহন করতে হয়, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় শিশুরা।

বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি, বেড়েছে ‘মিসড চাইল্ড’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালে একটি বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল হয়ে যায়। একই সময়ে মুখে খাওয়ার পোলিও টিকা কর্মসূচি চলমান থাকায় হাম প্রতিরোধী বিশেষ ক্যাম্পেইনটি আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান সেশনে টিকা পায়নি, তাদের বড় একটি অংশ ক্যাচ-আপ কভারেজের বাইরে থেকে যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিশুদেরই পরে ‘মিসড চাইল্ড’ বলা হয় আর হাম প্রাদুর্ভাবের সময় তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক বছরের টিকাদানের ঘাটতি পরের বছর আরও বড় সংক্রমণচক্র তৈরি করতে পারে। কারণ, টিকা না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা জমতে জমতে বড় একটি অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হয়।

৪৫৮ কোটি টাকার টিকা কেনার পরও কাটেনি সংকট
২০২৫ সালের মার্চে ৪৫৮ কোটি টাকার টিকা কেনা হয়েছিল বলে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যেগুলো জুন পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি ও ক্যাম্পেইনে ব্যবহার করা হয়। তবে পরবর্তী মাসগুলোতে আবারও টিকার সংকট দেখা দেয়। অর্থাৎ শুধু ক্রয় নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো রোগ প্রতিরোধে টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচ্ছিন্ন বা অস্থায়ী সরবরাহ কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে পারে না।

মাঠপর্যায়ে টিকার ঘাটতি কতটা ছিল
মাঠপর্যায়ের চিত্র ছিল আরও উদ্বেগজনক। লক্ষ্মীপুরের স্বাস্থ্য সহকারী নিখিল চন্দ্র দাস জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট থেকেই টিকার সংকট শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন-ওয়ার্ডের আটটি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুই-তিনটিতে টিকাদান কার্যক্রম চালাতে পেরেছি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ জেলার সব টিকাদান কেন্দ্রে পাঁচ ধরনের টিকা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়।’

একই তথ্য দেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের স্বাস্থ্যকর্মী আফরোজা খানমও। ফলে টিকাদান কর্মসূচি কাগজে সচল থাকলেও বাস্তবে বহু এলাকায় তা কার্যকর ছিল না। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ কেন্দ্রে যদি টিকা না থাকে, তাহলে জাতীয় কভারেজ দ্রুত কমে যাওয়া অনিবার্য।

কোভিডের প্রভাব এখনো কাটেনি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়েছে। মহামারির সময় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, রুটিন ইমিউনাইজেশন, কমিউনিটি আউটরিচ ও টিকাদান সেশন সবকিছুতেই বিঘ্ন ঘটে। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত বয়সে হামসহ অন্যান্য টিকা নিতে পারেনি। এই জমে থাকা টিকা বঞ্চিত শিশুরাই এখন সংক্রমণ বিস্তারের বড় উৎস হয়ে উঠছে।

অপুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য ও শহুরে ঝুঁকি
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের আক্রমণ করে। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি– এসব এর সাধারণ লক্ষণ। কিন্তু জটিল ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টিজনিত অবনতি, মস্তিষ্কের জটিলতা এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, তাদের শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না।

একইসঙ্গে শহরের বস্তি এলাকা, প্রত্যন্ত অঞ্চল, দুর্গম এলাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী এখনো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

৯ মাসের কম বয়সী শিশুও আক্রান্ত
৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও এখন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যেটিকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ দেওয়ার কথা। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, এটি নির্দেশ করে সমাজে ভাইরাসের চলাচল এত বেশি যে, টিকা নেওয়ার আগের বয়সী শিশুরাও সুরক্ষিত থাকছে না।

‘প্রতিরোধযোগ্য সংকট’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রতিরোধযোগ্য সংকট হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, হাম এমন একটি রোগ, যা টিকাদানের মাধ্যমে প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই এ পরিস্থিতি আসলে প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করছে।

অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা হামের প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না বা সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। ফলে শিশুরা জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসে।

সচেতনতার ঘাটতি, টিকার প্রতি অনীহা, ভ্রান্ত ধারণা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিতে বিলম্ব– এসবও প্রাদুর্ভাব বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী
অধ্যাপক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। এগুলো হচ্ছে– হাম আক্রান্ত শিশুদের আলাদা চিকিৎসা (আইসোলেশন), হাসপাতালগুলোতে পৃথক ওয়ার্ড বা আলাদা ব্যবস্থা, ডে কেয়ার, স্কুল ও শিশু সমাগম স্থলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা, হাম চিকিৎসায় জাতীয় গাইডলাইন দ্রুত প্রণয়ন, সারা দেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ, লজিস্টিক ও জরুরি বরাদ্দ নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, টিকাদান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ওষুধ ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এতে শুধু চলমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না, ভবিষ্যতে নতুন সংক্রমণ বা রোগের ঝুঁকিও কমানো যাবে। অর্থাৎ দ্রুত টিকা দেওয়া এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করলেই শিশু ও জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

জুন পর্যন্ত অপেক্ষা না করার পরামর্শ
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রিয়াজ মোবারক জানান, নতুন করে টিকা দিলে সাধারণত ১০ দিনের মধ্যে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তবে আগে যদি কোনো টিকা নেওয়া থাকে, তাহলে মাত্র ৫ থেকে ৬ দিনের মধ্যেই সুরক্ষা গড়ে ওঠে। তাই যত দ্রুত সম্ভব শিশুদের টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।

‘বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে চলমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ভবিষ্যতে নতুন প্রাদুর্ভাবও রোধ করা সম্ভব হয়।’

তিনি সতর্ক করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জুন পর্যন্ত টিকাদান ক্যাম্পেইনের জন্য অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, ওই সময় পর্যন্ত আরও অনেক শিশু সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত ও ত্বরান্বিত টিকাদান কার্যক্রম চালানো ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না।

অধ্যাপক মোবারক বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম চালানো অপরিহার্য। আর এর জন্য অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

সরকারের পরিকল্পনা: বিশেষ হাম ক্যাম্পেইন
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে সরকার জুনের শুরুতে মাসব্যাপী বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ক্যাম্পেইন কার্যকরভাবে দ্রুত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, একটি বিশেষ ক্যাম্পেইনই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা, টিকা না পাওয়া শিশুদের তালিকা তৈরি, সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করা, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও তদারকি বাড়ানো এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।

নির্মূলের লক্ষ্য কী আরও দূরে সরে যাচ্ছে
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে একটি সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সামান্য নীতিগত শৈথিল্য, সরবরাহ সংকট ও মাঠ পর্যায়ের দুর্বলতা বহু বছরের অর্জনকে দ্রুত ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০২৬ সালের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। বরং সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে, যা শিশুস্বাস্থ্য ছাড়াও সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

বাংলানিউজ

ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি (চায়না জাল) দিয়ে অবাধে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। আষাঢ় মাসজুড়ে যখন দেশীয় প্রজাতির অধিকাংশ মাছ ডিম ছাড়ে ও বংশবিস্তার করে, ঠিক সেই সময় নির্বিচারে মাছ ধরায় জলজ জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

শুক্রবার (৩ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় খাল, বিল, নালা ও নদীর বিভিন্ন স্থানে চায়না দুয়ারি বসিয়ে দিন-রাত মাছ ধরা হচ্ছে। এসব ফাঁদে শুধু বড় মাছই নয়, রেণু, পোনা এবং ডিমওয়ালা মাছও আটকা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এভাবে নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযান না থাকায় অসাধু জেলেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে একদিকে যেমন দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বাসিন্দা মজিবুর মাতুব্বর বলেন, “আগে বর্ষাকালে খাল-বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে ছোট-বড় সব মাছ ধরা পড়ে যাচ্ছে। মাছ ডিম দেওয়ার আগেই ধরে ফেলায় আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চালানো প্রয়োজন।”

একই উপজেলার বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, “চায়না দুয়ারি একবার বসালে পানির ভেতরের প্রায় সব ধরনের মাছ আটকা পড়ে। এতে ছোট মাছও রক্ষা পায় না। কয়েকজনের লাভের জন্য পুরো এলাকার মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। বিষয়টি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি বা সূক্ষ্ম ফাঁসের অবৈধ জাল ব্যবহারের ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব জাল ব্যবহার দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণে সরকার বিভিন্ন সময় এ ধরনের অবৈধ উপকরণ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তরুণ বসু ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “চায়না দুয়ারি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেখানে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে স্থানীয়দেরও সচেতন হয়ে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।”

২০২৬-২৭ সালের বাজেট কতটা জনমুখী, কতটা অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত?

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
২০২৬-২৭ সালের বাজেট কতটা জনমুখী, কতটা অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত?

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়নের রূপরেখা এবং নাগরিকের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। ২০২৬- ২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির লক্ষ্য সামনে এনেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান কতটা কমাতে পারবে এই বাজেট?

প্রতিটি জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। এটি শুধু সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা নয়; বরং রাষ্ট্র কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেবে, কীভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করবে, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ে তুলবে তারই একটি সামগ্রিক নীতিপত্র।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে কার্যকর হলো, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ তুলনামূলক সহজ; সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, দক্ষ প্রশাসন এবং নীতির ধারাবাহিকতা।

জনপ্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা:

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বাজেট নিয়ে প্রত্যাশা খুব জটিল নয়। তারা চায়-

* নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমুক

* কর্মসংস্থান বাড়ুক

* চিকিৎসা ও শিক্ষা আরও সহজলভ্য হোক

* করের বোঝা যেন অসহনীয় না হয়

* এবং ব্যবসা-বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হোক

অন্যদিকে সরকারের সামনে বাস্তবতা ভিন্ন। একদিকে রাজস্ব বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো, ঋণের সুদ এবং সরকারি পরিচালন ব্যয়, সবকিছুই অর্থের দাবি রাখে। ফলে সরকারকে একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও সেই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট।

বাজেটের আকার বাড়ানো হয়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণেও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে মূল প্রশ্নটি অন্যত্র।
রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা যদি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় অংশই কাগজে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রায়ই পূরণ হয় না। ফলে বছরের মাঝামাঝি উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হয় অথবা ঋণ নির্ভরতা বাড়াতে হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

অর্থনীতির ভাষায়, একটি বাজেটের সফলতা তার আকারে নয়; বরং বাস্তবায়নের দক্ষতায়। কেননা জনগণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের ভাষণ মনে রাখে না, তারা মনে রাখে বাজারের চাল-ডাল, চিকিৎসার খরচ, সন্তানের চাকরি এবং নিজের ক্রয়ক্ষমতার বাস্তব অভিজ্ঞতা।

বাজেটের সামগ্রিক মূল্যায়ন : লক্ষ্য যত বড়, বাস্তবায়ন তত বড় চ্যালেঞ্জ

একটি বাজেটের সাফল্য তার আকারে নয়, বরং তার বাস্তবায়নে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উচ্চাভিলাষী। প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা এতে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা হলো বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান। উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত সুফল সময়মতো জনগণের কাছে পৌঁছায় না। ফলে বড় বাজেট সবসময় বড় ফলাফল নিশ্চিত করে না।

রাজস্ব ও করনীতি : শুধু কর বাড়ানো নয়, করের ভিত্তি বাড়ানো জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান শক্তি রাজস্ব। কিন্তু বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। প্রতি বছর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে করব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তিনটি-

প্রথমত, করের আওতা বাড়ানো।

দ্বিতীয়ত, কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

তৃতীয়ত, সৎ করদাতাকে উৎসাহিত করা এবং কর ফাঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে ব্যবসার ব্যয় বাড়ে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। তাই করনীতি এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়াবে, অন্যদিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবেশও বজায় রাখবে।

মূল্যস্ফীতি : জনগণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটি-বাজারে কি স্বস্তি ফিরবে? গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় করেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেবল আর্থিক নীতির বিষয় নয়, এটি সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি এবং মুদ্রানীতির সমন্বিত ফল। তাই শুধু বাজেটে লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ : একটি অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার তরুণ জনগোষ্ঠী উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সীমিত হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতি আরও কার্যকর প্রণোদনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিনিয়োগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। তাই বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও রপ্তানি: টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। শিল্প ও সেবাখাতের প্রসার সত্ত্বেও কৃষি এখনও খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই বাজেটে কৃষিকে শুধু ভর্তুকি নির্ভর খাত হিসেবে নয়, একটি প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আম, কাঁঠাল, সবজি, আলু, চিংড়ি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকমান, কোল্ডচেইন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতা আমাদের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে দিচ্ছে না। বাজেটে এসব অবকাঠামো উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ হলে কৃষি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরও শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : ব্যয় নয়, বিনিয়োগ

যে রাষ্ট্র শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ব্যয় হিসেবে দেখে, সে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের গতি হারায়। দক্ষ মানবসম্পদই একটি দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। বাজেটে শিক্ষা খাতে শুধু অবকাঠামো নয়, গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত সেবা, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।

সামাজিক নিরাপত্তা : সহায়তা থেকে সক্ষমতায়

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তোলা। বিশেষ করে প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও আয়বর্ধক উদ্যোগ যুক্ত করা হলে রাষ্ট্রের সামাজিক ব্যয় আরও কার্যকর হবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা কমে আসতে পারে। তাই এখন থেকেই রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একটি আধুনিক অর্থনীতি শুধু উৎপাদন দিয়ে নয়; আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা দিয়েও মূল্যায়িত হয়।

অর্থনীতির দৃষ্টিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সতর্ক আশাবাদের বাজেট বলা যেতে পারে। এতে উচ্চাকাক্সক্ষা রয়েছে, উন্নয়নের রূপরেখা রয়েছে, তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন বাস্তবায়নের সক্ষমতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা। যদি রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশামতো না বাড়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত না হয়, তবে এই বাজেটের অনেক ইতিবাচক লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত-

> করের আওতা সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল করব্যবস্থা জোরদার করা।

> মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা।

>  ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর সংস্কার।

> ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

> কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

> শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার।

> স্বাস্থ্যসেবায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি।

> উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর জবাবদিহি।

> বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ।

> তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রসার।

জাতীয় বাজেট কোনো জাদুকাঠি নয়;  এটি সম্ভাবনার একটি নকশা। সেই নকশা বাস্তবে রূপ দেয় মানুষের পরিশ্রম, সুশাসন, দক্ষ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে, যদি ঘোষণাগুলো বাস্তবায়নের দৃঢ়তা থাকে, যদি ব্যয়ের প্রতিটি টাকার জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এবং যদি নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। জনগণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের ভাষণ মনে রাখে না; তারা মনে রাখে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম, সন্তানের কর্মসংস্থান, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, উদ্যোক্তার বিনিয়োগের পরিবেশ এবং চিকিৎসার নিশ্চয়তা।

তাই একটি সফল বাজেটের প্রকৃত পরিচয় কাগজে নয়, মানুষের জীবনে। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান যত কমবে, ততই শক্তিশালী হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ততই অর্থবহ হয়ে উঠবে জাতীয় বাজেট। সবশেষে বলা যায়, এই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়; বরং বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। জনগণ বাজেটের আকার নয়, তার বাস্তব প্রভাব অনুভব করতে চায়।

লেখক: সহ-সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ফরিদপুরে ইতালি প্রবাসীর বাড়িতে তালা, বৃদ্ধ মাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ

নগরকান্দা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে ইতালি প্রবাসীর বাড়িতে তালা, বৃদ্ধ মাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় ইতালি প্রবাসী এক ব্যক্তির বসতবাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ, ভাঙচুর, বাড়ি দখল করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং তার বৃদ্ধ মাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি শুক্রবার (৩ জুলাই) উপজেলার চরযশোরদি ইউনিয়নে পৌলানপুটি গ্রামে ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা খুলে বাড়িটি পরিবারের জিম্মায় বুঝিয়ে দেয়।

অভিযোগে জানা যায়, ইতালি প্রবাসী জাহিদ শেখের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার কাসালিয়া গ্রামের শাহিদুল মল্লিকের ছেলে নাসিম মল্লিকের বিদেশে পাঠানোকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন হয়। নাসিম মল্লিকের দাবি, ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাহিদ শেখ চুক্তিপত্রের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নেন। পরে বিদেশে পাঠাতে ব্যর্থ হলেও দীর্ঘদিন টাকা ফেরত দেননি। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি বলে দাবি তার।

এদিকে জাহিদ শেখের পরিবারের অভিযোগ, ওই বিরোধের জেরে শুক্রবার নাসিম মল্লিক দলবল নিয়ে তাদের বাড়িতে এসে সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। এরপর জাহিদের মা দুলু বেগমকে জোরপূর্বক ঘর থেকে বের করে দিয়ে বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে একাধিক তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় তাকে মারধর, গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

দুলু বেগম বলেন, “ওরা দলবল নিয়ে এসে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। আমাকে মারধর ও হত্যার হুমকি দেয়। এরপর আমার ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়। বিষয়টি আমি আমার ছেলেকে জানাই। পরে সে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে তালা খুলে দেয়।”

ইতালি থেকে মুঠোফোনে জাহিদ শেখ বলেন, “নাসিমের কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য টাকা নিয়েছিলাম। তাকে পাঠাতে না পারায় টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ না দিয়ে তারা আমার বসতবাড়ি দখলের চেষ্টা করেছে, সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেছে এবং আমার মায়ের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। আমি এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

অভিযুক্ত নাসিম মল্লিক বসতবাড়ি দখলের অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, “বিদেশে পাঠানোর জন্য টাকা দিয়েছিলাম। কথা ছিল বিদেশে পাঠাতে না পারলে বাড়ি আমাকে দিয়ে দেবে। সেই কারণে আমি বাড়িতে গিয়ে তালা ঝুলিয়েছি।” তবে আদালতের আদেশ বা আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে বাড়ি দখল করা বৈধ কি না, এ প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি।

ঘটনার খবর পেয়ে নগরকান্দা থানার এসআই আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে তালা খুলে বাড়িটি পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”