খুঁজুন
, ,

যে কারণে হাম নির্মূলে পিছিয়ে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
যে কারণে হাম নির্মূলে পিছিয়ে বাংলাদেশ
২০২০ সালের মধ্যে হাম নির্মূল সম্ভব হবে– একসময় এমন আশা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সাল করা হলেও সেই লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, বরং বাস্তবতা এখন উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে। দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য, হাসপাতালভিত্তিক মৃত্যুর হিসাব, টিকাদান কভারেজের সাম্প্রতিক পতন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এটিই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন কোনো রোগের প্রবণতা নয়, বরং এটি দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা, টিকাদান ঘাটতি ও নীতিগত শৈথিল্যের একটি বড় সতর্ক সংকেত।

দেশে চলতি বছর এ পর্যন্ত ৬৭৬ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশীদ। কিন্তু সরকারিভাবে হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছর দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

রাজধানী ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর ও পাবনায় এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। 

ইতোমধ্যে মহাখালীর ১০০ শয্যার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪, চাঁদপুরে ৩ এবং রাজশাহী ও পাবনায় একজন করে শিশু মারা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর মহাখালী হাসপাতালে মোট ৫৬০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যেখানে গত বছর এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯।

চলতি মাসের ২৯ দিনেই এ হাসপাতালে ৪৪৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। 

সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা রাজশাহীতে। হামের উপসর্গ ওই বিভাগের হাসপাতালগুলোতে প্রতিনিয়ত শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। ১৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫৩ জনের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেছে, যেখানে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ এসেছে। এ অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আলাদা আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে।

তাছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫০ ও নোয়াখালীতে গত ১৫ দিনে তিনশর বেশি শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে। চাঁদপুরেও ২৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি এবং ৩ জন মারা গেছে। 

সরকারি তথ্য ও হাসপাতালভিত্তিক বাস্তব মৃত্যুর তথ্যের মধ্যে ব্যবধান থাকা নতুন কিছু নয় বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অনেক সময় জটিলতা, রেফারাল, দেরিতে হাসপাতালে আসা বা নিশ্চিত ল্যাব রিপোর্ট না থাকা– এসব কারণে অনেক মৃত্যু আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে উঠে আসে না।

নির্মূলের লক্ষ্য সামনে, বাস্তবে টিকাদানে ধস
টিকাদানে ধস এখন দেশে হাম নির্মূলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হামের টিকাদানের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৭ দশমিক ১ থেকে ৫৭ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কভারেজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি ছিল বলে ইপিআই সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে এই হার হঠাৎ ৬০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এ পতন শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি সংক্রমণ বিস্তারের জন্য বাস্তব ও বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

৯০ শতাংশের নিচে নামা মানেই ঝুঁকি
হাম শুধু একটি রোগ নয়, বরং পুরো টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। অর্থাৎ একজন আক্রান্ত শিশু খুব সহজেই তার আশপাশের অনেক শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে হামের মতো রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাধারণ টিকার মতো মাঝারি কভারেজ যথেষ্ট নয়, এখানে প্রয়োজন অন্তত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ। এ উচ্চ হার নিশ্চিত করে যে সমাজে এমন একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি হবে, যেখানে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ পায় না, এটিই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক সুরক্ষা। কিন্তু বর্তমানে যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় টিকাদানের হার ৭০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা প্রয়োজনীয় সীমার অনেক নিচে। এর অর্থ হলো, সমাজে এখন একটি বড় অংশের শিশু সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এই অরক্ষিত জনগোষ্ঠীই হামের মতো রোগের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।

‘হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়া অর্থ হচ্ছে, যখন অধিকাংশ মানুষ টিকা নেয়, তখন ভাইরাস এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে না। কিন্তু কভারেজ কমে গেলে সেই সুরক্ষাবলয় ভেঙে যায়। তখন একটি মাত্র সংক্রমণ থেকেই দ্রুত বহু মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। বাংলাদেশ এখন সেই ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।’

এখনো হয়ত বড় প্রাদুর্ভাব দৃশ্যমান হয়নি, কিন্তু যেসব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে সেগুলোকে ভবিষ্যতের বিপদের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একবার হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। কারণ এটি দ্রুত ছড়ায় এবং শিশুদের জন্য মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এ কারণে আগাম সতর্কতা দিয়ে ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, এখনই যদি টিকাদান কভারেজ দ্রুত বাড়ানো না যায়, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেশ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পড়তে পারে। হামকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। টিকাদান কমে যাওয়া মানেই ভবিষ্যতের বড় প্রাদুর্ভাবের দরজা খুলে দেওয়া। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে শুধু প্রথম ডোজ নয়, দ্বিতীয় ডোজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দ্বিতীয় ডোজ না পেলে অনেক শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না।

দেশে বর্তমানে প্রথম ডোজের কভারেজ প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ প্রায় ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু প্রয়োজনীয় টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

হাম
খুলনায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে শিশু ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে

টিকাদানে ধস: নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে মাঠপর্যায়ের ভাঙন
হঠাৎ দেশে টিকাদানের হারে ধস নামাকে অনেকে কেবল সরবরাহ সংকট হিসেবে দেখছেন। তবে এর পেছনে রয়েছে আরও জটিল এক চিত্র– নীতিগত সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব, যা ধীরে ধীরে পুরো টিকাদান ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

দীর্ঘদিনের সেক্টর প্রোগ্রাম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে এ প্রোগ্রামের আওতায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নসহ প্রায় সব কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক কাঠামোই ছিল না, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করত।

সেক্টর প্রোগ্রাম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাঠ পর্যায়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, সেক্টর প্রোগ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করত। এটি শিশুদের টিকা, জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত কাঠামো হিসেবে কাজ করছিল। হঠাৎ প্রোগ্রাম বন্ধ হওয়ায় কোনো এক্সিট প্ল্যান বা বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা হয়নি। ফলে মাঠে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। যেমন– টিকা ঠিক সময়ে কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছায়নি, কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে।

‘এতে সরবরাহ চেইনেও বিঘ্ন ঘটে, অর্থাৎ জেলা থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা পৌঁছাতে সমস্যা হয়। কোল্ড চেইনের সমস্যার কারণে টিকার সঠিক সংরক্ষণও নিশ্চিত করা যায়নি। এর ফলে অনেক টিকাকেন্দ্র থাকলেও সেখানে টিকা পাওয়া যায়নি। একটি কার্যকর টিকাদান কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থা, সঠিক সরবরাহ চেইন, মাঠপর্যায়ের সমন্বয় ও তদারকি। এক্ষেত্রে কোনো একটি ধাপ ব্যাহত হলে পুরো ব্যবস্থা প্রভাবিত হয়। হঠাৎ প্রোগ্রাম বন্ধ করা মানে পুরো চেইনে ঝুঁকি তৈরি করা।’

এ ধরনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, যেসব শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, তারা সহজে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই স্বাস্থ্য কার্যক্রম বন্ধ বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে পরিকল্পিত রূপান্তর ও বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি। নীতিগত ভুল ও পরিকল্পনার অভাব ছাড়াই হঠাৎ পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বড় কোনো সরকারি কর্মসূচি বন্ধ করার ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে রূপান্তরের পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধের ক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতির অভাব ছিল স্পষ্ট। ফলে দায়িত্ব বণ্টনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব ঘটে এবং কেন্দ্র ও মাঠপর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় ভেঙে পড়ে।

কর্মকর্তারা জানান, এই প্রশাসনিক অচলাবস্থা দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। টিকাদান কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘সরবরাহ চেইন’, সেখানে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। টিকা পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সময়মতো ছাড় না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই টিকা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি। জেলা থেকে উপজেলা এবং সেখান থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা সরবরাহে বিলম্ব দেখা দেয়। একইসঙ্গে কোল্ড চেইন বা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয়।

ফলে মাঠপর্যায়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে কেন্দ্র আছে, স্বাস্থ্যকর্মী আছেন কিন্তু টিকা নেই। সরবরাহ ব্যবস্থার এই ভাঙনের সরাসরি প্রভাব পড়ে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর। তারা নির্ধারিত সব কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম চালাতে পারেননি। কোথাও কোথাও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাতে হয়েছে, আবার অনেক কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে অভিভাবকদের একাধিকবার টিকাকেন্দ্রে গিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

টিকাদান কর্মসূচি শুধু টিকা কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে জানান জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি একটি জটিল ও সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মধ্যে রয়েছে– টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি। এই চেইনের যেকোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থাই ব্যাহত হয়। অর্থাৎ টিকা কেনা হলেও তা সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারলে কার্যত সেই টিকা কোনো কাজে আসে না।

কিন্তু বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, বরং নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনার ঘাটতি, আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা এবং মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এ অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো– জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে হঠাৎ পরিবর্তন নয়, বরং ধাপে ধাপে পরিকল্পিত রূপান্তর নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ টিকাদান শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়, এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার ভিত্তি। এই ভিত্তি একবার দুর্বল হয়ে গেলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বহন করতে হয়, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় শিশুরা।

বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি, বেড়েছে ‘মিসড চাইল্ড’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালে একটি বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল হয়ে যায়। একই সময়ে মুখে খাওয়ার পোলিও টিকা কর্মসূচি চলমান থাকায় হাম প্রতিরোধী বিশেষ ক্যাম্পেইনটি আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান সেশনে টিকা পায়নি, তাদের বড় একটি অংশ ক্যাচ-আপ কভারেজের বাইরে থেকে যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিশুদেরই পরে ‘মিসড চাইল্ড’ বলা হয় আর হাম প্রাদুর্ভাবের সময় তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক বছরের টিকাদানের ঘাটতি পরের বছর আরও বড় সংক্রমণচক্র তৈরি করতে পারে। কারণ, টিকা না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা জমতে জমতে বড় একটি অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হয়।

৪৫৮ কোটি টাকার টিকা কেনার পরও কাটেনি সংকট
২০২৫ সালের মার্চে ৪৫৮ কোটি টাকার টিকা কেনা হয়েছিল বলে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যেগুলো জুন পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি ও ক্যাম্পেইনে ব্যবহার করা হয়। তবে পরবর্তী মাসগুলোতে আবারও টিকার সংকট দেখা দেয়। অর্থাৎ শুধু ক্রয় নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো রোগ প্রতিরোধে টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচ্ছিন্ন বা অস্থায়ী সরবরাহ কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে পারে না।

মাঠপর্যায়ে টিকার ঘাটতি কতটা ছিল
মাঠপর্যায়ের চিত্র ছিল আরও উদ্বেগজনক। লক্ষ্মীপুরের স্বাস্থ্য সহকারী নিখিল চন্দ্র দাস জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট থেকেই টিকার সংকট শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন-ওয়ার্ডের আটটি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুই-তিনটিতে টিকাদান কার্যক্রম চালাতে পেরেছি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ জেলার সব টিকাদান কেন্দ্রে পাঁচ ধরনের টিকা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়।’

একই তথ্য দেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের স্বাস্থ্যকর্মী আফরোজা খানমও। ফলে টিকাদান কর্মসূচি কাগজে সচল থাকলেও বাস্তবে বহু এলাকায় তা কার্যকর ছিল না। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ কেন্দ্রে যদি টিকা না থাকে, তাহলে জাতীয় কভারেজ দ্রুত কমে যাওয়া অনিবার্য।

কোভিডের প্রভাব এখনো কাটেনি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়েছে। মহামারির সময় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, রুটিন ইমিউনাইজেশন, কমিউনিটি আউটরিচ ও টিকাদান সেশন সবকিছুতেই বিঘ্ন ঘটে। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত বয়সে হামসহ অন্যান্য টিকা নিতে পারেনি। এই জমে থাকা টিকা বঞ্চিত শিশুরাই এখন সংক্রমণ বিস্তারের বড় উৎস হয়ে উঠছে।

অপুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য ও শহুরে ঝুঁকি
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের আক্রমণ করে। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি– এসব এর সাধারণ লক্ষণ। কিন্তু জটিল ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টিজনিত অবনতি, মস্তিষ্কের জটিলতা এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, তাদের শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না।

একইসঙ্গে শহরের বস্তি এলাকা, প্রত্যন্ত অঞ্চল, দুর্গম এলাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী এখনো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

৯ মাসের কম বয়সী শিশুও আক্রান্ত
৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও এখন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যেটিকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ দেওয়ার কথা। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, এটি নির্দেশ করে সমাজে ভাইরাসের চলাচল এত বেশি যে, টিকা নেওয়ার আগের বয়সী শিশুরাও সুরক্ষিত থাকছে না।

‘প্রতিরোধযোগ্য সংকট’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রতিরোধযোগ্য সংকট হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, হাম এমন একটি রোগ, যা টিকাদানের মাধ্যমে প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই এ পরিস্থিতি আসলে প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করছে।

অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা হামের প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না বা সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। ফলে শিশুরা জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসে।

সচেতনতার ঘাটতি, টিকার প্রতি অনীহা, ভ্রান্ত ধারণা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিতে বিলম্ব– এসবও প্রাদুর্ভাব বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী
অধ্যাপক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। এগুলো হচ্ছে– হাম আক্রান্ত শিশুদের আলাদা চিকিৎসা (আইসোলেশন), হাসপাতালগুলোতে পৃথক ওয়ার্ড বা আলাদা ব্যবস্থা, ডে কেয়ার, স্কুল ও শিশু সমাগম স্থলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা, হাম চিকিৎসায় জাতীয় গাইডলাইন দ্রুত প্রণয়ন, সারা দেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ, লজিস্টিক ও জরুরি বরাদ্দ নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, টিকাদান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ওষুধ ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এতে শুধু চলমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না, ভবিষ্যতে নতুন সংক্রমণ বা রোগের ঝুঁকিও কমানো যাবে। অর্থাৎ দ্রুত টিকা দেওয়া এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করলেই শিশু ও জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

জুন পর্যন্ত অপেক্ষা না করার পরামর্শ
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রিয়াজ মোবারক জানান, নতুন করে টিকা দিলে সাধারণত ১০ দিনের মধ্যে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তবে আগে যদি কোনো টিকা নেওয়া থাকে, তাহলে মাত্র ৫ থেকে ৬ দিনের মধ্যেই সুরক্ষা গড়ে ওঠে। তাই যত দ্রুত সম্ভব শিশুদের টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।

‘বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে চলমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ভবিষ্যতে নতুন প্রাদুর্ভাবও রোধ করা সম্ভব হয়।’

তিনি সতর্ক করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জুন পর্যন্ত টিকাদান ক্যাম্পেইনের জন্য অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, ওই সময় পর্যন্ত আরও অনেক শিশু সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত ও ত্বরান্বিত টিকাদান কার্যক্রম চালানো ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না।

অধ্যাপক মোবারক বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম চালানো অপরিহার্য। আর এর জন্য অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

সরকারের পরিকল্পনা: বিশেষ হাম ক্যাম্পেইন
পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে সরকার জুনের শুরুতে মাসব্যাপী বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ক্যাম্পেইন কার্যকরভাবে দ্রুত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, একটি বিশেষ ক্যাম্পেইনই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা, টিকা না পাওয়া শিশুদের তালিকা তৈরি, সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করা, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও তদারকি বাড়ানো এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।

নির্মূলের লক্ষ্য কী আরও দূরে সরে যাচ্ছে
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে একটি সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, সামান্য নীতিগত শৈথিল্য, সরবরাহ সংকট ও মাঠ পর্যায়ের দুর্বলতা বহু বছরের অর্জনকে দ্রুত ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০২৬ সালের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। বরং সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে, যা শিশুস্বাস্থ্য ছাড়াও সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

বাংলানিউজ

বোয়ালমারীতে বাস-ট্রাক সংঘর্ষের ৩ দিন পর খাদে মিলল নিখোঁজ কলেজছাত্রের লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ২:১৭ অপরাহ্ণ
বোয়ালমারীতে বাস-ট্রাক সংঘর্ষের ৩ দিন পর খাদে মিলল নিখোঁজ কলেজছাত্রের লাশ

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে বাস ও ইটবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষের তিনদিন পর দুর্ঘটনাস্থলের পাশের খাদ থেকে হাফিজুর রহমান (২৪) নামে এক নিখোঁজ কলেজছাত্রের গলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।

​বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের পাইকহাটি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় লাশটি উদ্ধার করা হয়।

​নিহত হাফিজুর রহমান গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পিঙ্গুলিয়া গ্রামের সন্তান। তিনি তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। হাফিজুর বোয়ালমারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন।

​পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৭ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মাঝকান্দি-বোয়ালমারী-ভাটিয়াপাড়া আঞ্চলিক মহাসড়কের পাইকহাটি এলাকায় ফরিদপুরগামী একটি লোকাল বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা ইটবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে বাসটি সড়ক থেকে ছিটকে পাশের খাদে উল্টে পড়ে এবং ট্রাকটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে আটকে যায়। দুর্ঘটনায় উভয় যানের চালক ও হেলপারসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

​ঘটনার পর থেকে বাসের যাত্রী হাফিজুর রহমান নিখোঁজ ছিলেন। স্বজনরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ না পেয়ে কাশিয়ানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

​বোয়ালমারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ জাহিদুল হক জানান, সেদিন সকালে ব্যাসপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ফরিদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সেমিস্টার পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন হাফিজুর। উদ্ধারের সময়ও তার গলায় কলেজের পরিচয়পত্র ও ব্যাজ ঝুলছিল।

​বুধবার সকাল ৯টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলের পাশের বিলে লাশ ভেসে উঠলে স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশে খবর দেয়। বোয়ালমারী ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।

​বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তাফিজুর রহমান জানান, লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রাক জব্দ করে থানায় আনা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের যে ৪ কারণ? এক পলকে দেখে নিন

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ
অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের যে ৪ কারণ? এক পলকে দেখে নিন

একটা সময় পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাককে ভাবা হতো বয়স্কদের সমস্যা। কিন্তু এখন তরুণ বয়সেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। এই কারণে প্রাণ হারানোর সংখ্যাও কম নয়।

তাই শুধু বয়স্করা নয়, হার্টের অসুখের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে অল্প বয়সীদেরও। এই যে অল্প বয়সেই হার্ট অ্যাটাক, এর পেছনে কারণ কী?

হার্ট অ্যাটাক যে কারণে হয়

কোনো কারণে আমাদের শরীরের শিরা-উপশিরায় রক্ত ​​চলাচল ঠিকমতো না হলে রক্ত ​​জমাট বাঁধার সমস্যা সৃষ্টি হয়। যে কারণে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক হয়। আমাদের হৃৎপিণ্ডে যখন রক্ত ​​ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না, তখন শিরায় চাপ পড়ে। এর ফলে তখন হার্ট অ্যাটাক হয়।

জীবনযাপনে অনিয়ম

আমাদের বেশিরভাগ অসুখ-বিসুখের কারণ হলো জীবনযাপনের বিভিন্ন অনিয়ম। বর্তমানে বাইরের খাবার বেশি খাওয়া, রাতে দীর্ঘ সময় জেগে থাকসহ নানা অনিয়মত করে থাকে তরুণেরা। জীবনযাপনের এসব বদ অভ্যাসের প্রভাব পড়ে শরীরে। বর্তমানে বিভিন্ন দিকে খেয়াল দিতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখার কথা ভুলে যান বেশিরভাগই। যে কারণে ধীরে ধীরে তৈরি হয় হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্র।

ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ

অনেকে না বুঝেই সিগারেট এবং অ্যালকোহলের প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের আসক্তি একবার পেয়ে বসলে তা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। কিন্তু সিগারেট এবং অ্যালকোহল স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। এ ধরনের অভ্যাস সরাসরি ধমনীতে প্রভাব ফেলে। হৃৎপিণ্ড দ্রুত পাম্প করার কারণে এটি পরিণত হয় আক্রমণে।

স্থূলতা

সঠিক খাদ্যাভ্যাস পারে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থতায় সাহায্য করতে। কিন্তু বর্তমানে ভুলভাল খাদ্যাভ্যাসের কারণে অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের শিকার হচ্ছেন অনেকে। শরীরে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে হার্ট অ্যাটাক, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, ট্রিপল ভেসেল ডিজিজ ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। যে কারণে বাড়ে বিপদ।

উত্তেজনা

আমাদের দেশে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যায়ই অনেকে পাত্তা দিতে চান না, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার কথা অনেকে চিন্তাও করতে চান না। এদিকে মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে মারাত্মক সব রোগের কারণ। বর্তমানে তরুণেরা পড়াশোনা, চাকরি, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ইত্যাদি নানা দুশ্চিন্তায় থাকে। যে কারণে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক।

সূত্র : ঢাকা পোস্ট

পেটের মেদ কমাতে যে ৪টি স্বাস্থ্যকর পানীয়?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ
পেটের মেদ কমাতে যে ৪টি স্বাস্থ্যকর পানীয়?

আধুনিক জীবনযাত্রায় অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস আর কায়িক শ্রমের অভাবে পেটের মেদ বা ‘বেলি ফ্যাট’ জমানো এখন অনেকের জন্যই নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে পেটের এই বাড়তি মেদ কেবল আপনার বাহ্যিক সৌন্দর্যই নষ্ট করে না; বরং এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, পেটের মেদ মূলত দুই ধরনের হয়—চামড়ার নিচে থাকা ‘সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট’ এবং শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে জমে থাকা ‘ভিসারাল ফ্যাট’। এর মধ্যে ভিসারাল ফ্যাট অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সুস্থতার মাপকাঠি হিসেবে আমরা সাধারণত বিএমআই-এর ওপর নির্ভর করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোমর ও নিতম্বের অনুপাত জানা এখন অনেক বেশি জরুরি। যদি পুরুষদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ০.৯ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ০.৮৫-এর বেশি হয়, তবে বুঝতে হবে আপনার পেটে ক্ষতিকর মেদ জমছে। এই জেদি মেদ ঝরানো বেশ কষ্টসাধ্য হলেও কিছু নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক পানীয় বিপাক প্রক্রিয়া বাড়িয়ে মেদ কমানোর এই সংগ্রামকে সহজ করতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন এনডিটিভি ফুড-এর কনসালট্যান্ট নিউট্রিশনিস্ট ড. রূপালী দত্ত।

ড. রূপালী দত্তের পরামর্শ অনুযায়ী পেটের মেদ কমাতে কার্যকরী ৪টি পানীয় নিচে দেওয়া হলো:

১. গ্রিন টি

সামগ্রিক ওজন কমাতে গ্রিন টি-র কার্যকারিতা এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এতে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ‘ক্যাটেচিন’ এবং বিশেষ করে ‘EGCG’ বিশ্রামের সময়ও শরীরের ফ্যাট অক্সিডেশনে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে তা সরাসরি পেটের ভেতরের ভিসারাল ফ্যাট কমাতে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, যা বাড়তি ক্যালরি গ্রহণের প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

২. দারুচিনি চা

দারুচিনি কেবল মসলা হিসেবেই নয়; বরং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমাতেও অনন্য। উল্লেখ্য যে, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স পেটের মেদ জমার অন্যতম প্রধান কারণ। দারুচিনি শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা কমিয়ে আনে, যা চিনিযুক্ত খাবার ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আসক্তি কমায়। এর বিপাক বৃদ্ধিকারী গুণাগুণ পেটের চর্বি পোড়াতে অত্যন্ত সহায়ক।

৩. ব্ল্যাক কফি

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে পরিমিত (২-৩ কাপ) ব্ল্যাক কফি পান করলে শরীরের সামগ্রিক মেদ, বিশেষ করে ভিসারাল ফ্যাট উল্লেখযোগ্য হারে কমে। কফিতে থাকা পলিফেনল এবং ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড পেটের চর্বি কমাতে কাজ করে। কফিতে থাকা ক্যাফেইন প্রাকৃতিক এনার্জি বুস্টার হিসেবে কাজ করলেও এটি চিনি ছাড়া পান করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

৪. মধু মিশ্রিত পানীয়

পেটের মেদ বা ভিসারাল ওবেসিটি কমাতে মধু একটি চমৎকার উপাদান। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মধু শরীরের অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি রোধ করতে এবং মেদ কমাতে সাহায্য করে। মধু একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা ভিসারাল ফ্যাট কোষের কারণে তৈরি হওয়া অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে শরীরকে রক্ষা করে। এটি শরীরে দ্রুত শক্তি যোগায় এবং বারবার খিদে পাওয়ার সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করে।

সতর্কতা

যদিও এই পানীয়গুলো ওজন কমাতে এবং বিপাক প্রক্রিয়া বাড়াতে সহায়ক, তবে মনে রাখতে হবে মেদ কমানোর কোনো ‘শর্টকাট’ বা জাদুকরী উপায় নেই। পেটের মেদ পুরোপুরি ঝরাতে এই পানীয়গুলোর পাশাপাশি একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা বজায় রাখা অপরিহার্য। যে কোনো ডায়েট শুরু করার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ফুড