বর্তমান সময়ে সুস্থ থাকা মানেই শুধু রোগমুক্ত থাকা নয়, বরং শরীরের ওজন, গঠন, জীবনযাপন; সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে একজন মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যচিত্র।
অনেকেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা ওজন মাপার যন্ত্রে চোখ রেখে ভাবেন, ‘আমার ওজন কি ঠিক আছে?’ কেউ আবার ‘আদর্শ ওজন’ শুনলেই সরাসরি বিএমআই (BMI)-এর হিসাব কষতে শুরু করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিএমআই-ই কি শেষ কথা?
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। কারণ, শুধু ওজন আর উচ্চতার অনুপাত দিয়ে শরীরের ভেতরের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সবসময় সম্ভব হয় না। একই ওজনের দু’জন মানুষের শরীরের গঠন, চর্বির পরিমাণ, এমনকি রোগের ঝুঁকিও একেবারে ভিন্ন হতে পারে।
সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ডায়াবেটিস অ্যান্ড এন্ডোক্রাইনোলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায়ও উঠে এসেছে, শুধু বিএমআই দিয়ে কারও স্বাস্থ্য বিচার করলে অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। এর বদলে তারা বিএমআইয়ের সঙ্গে কোমরের পরিধি ও চর্বির শতকরা হার মাপার মতো কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
গবেষকেরা বলছেন, ওজন ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে ওসব পরিমাপের সঙ্গে জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয়–আশয়, যেমন খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম ও বংশগতির মতো বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।
বিএমআই ও এর সীমাবদ্ধতাগুলো কী
বিএমআই হিসাব করার জন্য প্রথমে কোনো ব্যক্তির ওজনকে কিলোগ্রাম এককে নিতে হবে। উচ্চতা পরিমাপ করতে হবে মিটারে। এরপর সেই ওজনকে মিটারের বর্গ দিয়ে ভাগ করলেই পাওয়া যাবে বিএমআই।
অর্থাৎ বিএমআই = ওজন (কিলোগ্রাম) ÷ উচ্চতা (মিটার)২
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, বিএমআই ১৮.৫–এর নিচে হলে ওজন কম ধরা হয়। ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ পর্যন্ত থাকলে তা আদর্শ। এই সূচক ২৫ থেকে ২৯.৯ হলে তা অতিরিক্ত ওজন এবং ৩০–এর বেশি পাওয়া গেলে তাকে স্থূল ধরা হয়।
কিন্তু এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হিসাব শরীরের চর্বিহীন পেশি ও চর্বিযুক্ত পেশির ওজনের পার্থক্য করতে পারে না। ফলে একজন খেলোয়াড় বা পেশিবহুল ব্যক্তির বিএমআই বেশি দেখালেও তার শরীরে চর্বি প্রকৃতপক্ষে কম থাকতে পারে। আবার কারও ওজন ‘আদর্শ’ দেখালেও তার শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকতে পারে।
গবেষকদের পরামর্শ, ওজন ও স্বাস্থ্যের সঠিক ধারণা পেতে এককভাবে বিএমআইয়ের ওপর নির্ভর করা যাবে না। এর পাশাপাশি আরও কিছুর পরিমাপ করতে হবে।
বিএমআইয়ের বিকল্প কী
বিএমআই পুরোপুরি বাদ দেওয়ার মতো কিছু নয়, তবে এটিকে একমাত্র মানদণ্ড ভাবাও ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি—
১. কোমরের মাপ
এর মাধ্যমে পেটে জমা হওয়া চর্বির পরিমাণ সম্পর্কে জানা যায়। এটি জানার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগ বিষয়ে সতর্ক থাকা সম্ভব। এটি সাধারণত নাভির ঠিক ওপরে টেপ দিয়ে মাপা হয়।
২. কোমর–হিপ অনুপাত
স্কিনফোল্ড ক্যালিপার, ডেক্সা স্ক্যান ও বায়োইলেকট্রিক্যাল ইম্পিডেন্স (বিআই)–এর মতো পরিমাপক দিয়ে শরীরের আদর্শ গঠন সম্পর্কে মোটামুটি সঠিক ধারণা পাওয়া যায়।
স্কিনফোল্ড ক্যালিপার এমন একটি বিশেষ যন্ত্র, যা দিয়ে শরীরের চামড়া ও এর নিচের চর্বির পুরুত্ব মাপা হয়। এটি সাধারণত বাহু, ঊরু, পেট, পিঠ ইত্যাদি জায়গার চামড়া চেপে ধরে চর্বির স্তর মাপতে ব্যবহার করা হয়।
ডেক্সার পূর্ণরূপ হলো ডুয়েল এনার্জি এক্স–রে অ্যাবজর্পশোমেট্রি। এ পরীক্ষার মাধ্যমে ছবি তুলে শরীরের বিভিন্ন অংশের হাড়, পেশি ও চর্বি আলাদা করে মাপা যায়।
বায়োইলেকট্রিক্যাল ইম্পিডেন্স হলো শরীরের চর্বি, পেশি, পানি ইত্যাদির পরিমাণ নির্ণয়ের পদ্ধতি।
৩. শরীর–আকৃতি সূচক (বিএসআই)
স্থূলতাসংক্রান্ত উচ্চঝুঁকি এড়াতে এই পরিমাপ করা হয়। এটি বিএমআই ও কোমরের মাপের সমন্বয়ে একটি পরিমাপের পদ্ধতি।
তবু মিলিয়ে নিন আপনার উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন
যদিও জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও বংশগতির প্রভাব রয়েছে, তবুও একটি সাধারণ ধারণা পেতে নিচের হিসাবটি কাজে লাগতে পারে—
উচ্চতা যখন ৫ ফুট ২ ইঞ্চি, ওজন হতে হবে ৪৭–৬১ কেজি
উচ্চতা যখন ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, ওজন হতে হবে ৫৩–৬৮ কেজি
উচ্চতা যখন ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি, ওজন হতে হবে ৬০–৭৯ কেজি
এই হিসাব বিএমআই অনুযায়ী করা হয়েছে। কাজেই ওজন ও স্বাস্থ্যের সঠিক ধারণা পেতে এর সঙ্গে অন্যান্য পরিমাপকের সুসমন্বয় করতে হবে।
সূত্র: দ্য ল্যানসেট ডায়াবেটিস অ্যান্ড এন্ডোক্রাইনোলজি
আপনার মতামত লিখুন
Array