খুঁজুন
, ,

সম্ভাবনাময় ২৫টি হালাল ব্যবসার ধারণা

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ
সম্ভাবনাময় ২৫টি হালাল ব্যবসার ধারণা

হালাল অর্থনীতি এখন আর কোনো সীমিত ধর্মীয় পরিসরের বিষয় নয়; বর্তমানে এটি একটি বৈশ্বিক, নৈতিকতা-নির্ভর ও আস্থাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ভ্রমণ ও সেবা খাত; সব ক্ষেত্রেই হালাল ধারণা আজ স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত বাণিজ্য ও টেকসই উন্নয়নের প্রতীক।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে হালাল ব্যবসার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে মূলত তিনটি কারণে— নৈতিক উৎস নিশ্চিতকরণ, ভোক্তার আস্থা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে দুনিয়াবি লাভের পাশাপাশি মূল্যবোধ ও ইবাদতের অনুভূতিও যুক্ত থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে বাস্তব চাহিদা, বাজার সম্ভাবনা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতার আলোকে তুলে ধরা হলো ২০২৬ সালে শুরু করার মতো ২৫টি সম্ভাবনাময় হালাল ব্যবসার ধারণা।

খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাত

১. হালাল বেকারি

হালাল বেকারি এখনো হালাল অর্থনীতিতে প্রবেশের অন্যতম সহজ ও কার্যকর মাধ্যম। মুসলিম অধ্যুষিত শহরগুলোতে চাহিদা স্থায়ী, পাশাপাশি অমুসলিম ভোক্তারাও পরিচ্ছন্নতা ও নৈতিক প্রস্তুতির কারণে আগ্রহী হচ্ছেন। সাফল্যের জন্য প্রয়োজন উপকরণের স্বচ্ছতা, মানসম্মত স্বাদ, ন্যায্য মূল্য এবং স্থানীয় আস্থা। আর্টিসান ব্রেড, ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন বা স্বাস্থ্যসম্মত পণ্যে বিশেষায়ন ব্যবসাকে আলাদা পরিচয় দিতে পারে।

২. হালাল ক্যাটারিং ব্যবসা

বিয়ে, করপোরেট অনুষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজন— সবখানেই হালাল ক্যাটারিংয়ের চাহিদা রয়েছে। ২০২৬ সালে গ্রাহকরা শুধু হালাল মান নয়, বরং পেশাদারিত্ব, সময়ানুবর্তিতা ও মেনুতে বৈচিত্র্য প্রত্যাশা করেন। নির্দিষ্ট রান্নার ধরন বা ডায়েটারি চাহিদায় দক্ষতা গড়ে তুললে সুনাম দ্রুত বাড়ে।

৩. হালাল ফুড ট্রাক

কম বিনিয়োগে শুরু করা যায় এমন জনপ্রিয় মডেল হলো হালাল ফুড ট্রাক। অফিস এলাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও ইভেন্টকেন্দ্রিক এলাকায় এটি বিশেষভাবে কার্যকর। সঠিক লোকেশন, সীমিত কিন্তু মানসম্মত মেনু, দ্রুত সেবা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি এখানে সাফল্যের চাবিকাঠি।

৪. হালাল মিল প্রেপ সার্ভিস

ব্যস্ত পেশাজীবী ও পরিবারগুলোর কাছে হালাল মিল প্রেপ সার্ভিস দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক মডেল নিয়মিত আয় নিশ্চিত করে। ফিটনেস মিল বা পারিবারিক প্যাকের মতো বিশেষায়ন গ্রাহক ধরে রাখতে সহায়ক। তবে প্যাকেজিং, ডেলিভারি ও খাদ্য নিরাপত্তা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. হালাল কসাইখানা (অনলাইন বা অফলাইন)

হালাল মাংস একটি আস্থাভিত্তিক ব্যবসা। আধুনিক কসাইখানাগুলো যদি যাচাইকৃত উৎস, পরিষ্কার প্রক্রিয়াকরণ এবং অনলাইন অর্ডার, কাটিং বা ম্যারিনেশনের মতো বাড়তি সেবা দিতে পারে— তবে কম পরিসরেও শক্ত অবস্থান তৈরি সম্ভব।

ফ্যাশন, সৌন্দর্য ও লাইফস্টাইল

৬. মডেস্ট ফ্যাশন ই-কমার্স

মডেস্ট ফ্যাশন এখন বৈশ্বিক ট্রেন্ড। অনলাইন স্টোরগুলো সফল হয় তখনই, যখন মানসম্মত ডিজাইন, সঠিক সাইজিং, পেশাদার ছবি ও নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করা যায়। শক্ত ব্র্যান্ডিং ও কমিউনিটি এনগেজমেন্ট দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক।

৭. হালাল কসমেটিকস ব্র্যান্ড

অ্যালকোহলমুক্ত ও নৈতিকভাবে উৎপাদিত সৌন্দর্যপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। হালাল সার্টিফিকেশনের পাশাপাশি কসমেটিকস নিরাপত্তা আইন মেনে চলা ও উপাদানের উৎস স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। ভোক্তা শিক্ষাই এখানে আস্থার ভিত্তি।

৮. হিজাব ও অ্যাকসেসরিজ ব্র্যান্ড

হিজাব ব্যবসায় সাফল্য আসে তখন, যখন সাধারণ পণ্যের বাইরে গিয়ে কাপড়ের উদ্ভাবন, স্টাইলিং গাইড ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডিং করা যায়। বান্ডেল পণ্য ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট বিক্রি বাড়াতে সহায়ক।

৯. টেকসই মডেস্ট পোশাক

বর্তমানে টেকসই উৎপাদন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। ন্যায্য শ্রম, পরিবেশবান্ধব উপকরণ ও নৈতিক উৎপাদন দেখাতে পারলে তরুণ প্রজন্মের আস্থা ও আনুগত্য পাওয়া সহজ হয়।

১০. ইসলামিক গয়না ও উপহার

ইসলামিক গয়না আত্মিক অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। তাই কারুশিল্প ও গল্প বলার দক্ষতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রমজান, ঈদ ও বিয়ের মৌসুমে চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে।

শিক্ষা, দক্ষতা ও সেবা

১১. অনলাইন কোরআন শিক্ষা

অনলাইন কোরআন শিক্ষার চাহিদা আন্তর্জাতিকভাবে বাড়ছে। সুসংগঠিত কারিকুলাম, যোগ্য শিক্ষক ও সময়ের নমনীয়তা অপরিহার্য। সাবস্ক্রিপশন মডেল স্থিতিশীলতা আনে।

১২. ইসলামিক ফাইন্যান্স শিক্ষা

হালাল বিনিয়োগ নিয়ে আগ্রহ বাড়লেও বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। সহজ ভাষায় বাস্তব উদাহরণভিত্তিক কোর্সগুলো এই শূন্যতা পূরণ করছে।

১৩. অনলাইন টিউটরিং ও মেন্টরিং

বিশ্বাস ও সুনামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সেবায় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও ফলাফল প্রমাণ করা জরুরি।

১৪. আরবি ভাষা শিক্ষা

ছাত্র, পেশাজীবী ও পরিবার—সবার মধ্যেই আরবি শেখার আগ্রহ রয়েছে। অনলাইন মডুলার কোর্স বিশ্বব্যাপী পৌঁছাতে সহায়ক।

১৫. হালাল রান্নার ক্লাস

সংস্কৃতি ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটায় এই উদ্যোগ। থিমভিত্তিক ও ইন্টার‌্যাকটিভ ক্লাস জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবসা

১৬. হালাল ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস

একটি নির্ভরযোগ্য মার্কেটপ্লেস ভোক্তার আস্থা বাড়ায় এবং ক্ষুদ্র ব্র্যান্ডকে সুযোগ দেয়। বিক্রেতা যাচাই ও লজিস্টিকস এখানে মূল চ্যালেঞ্জ।

১৭. ইসলামিক মোবাইল অ্যাপ

নামাজের সময়, হালাল লোকেশন বা শিক্ষামূলক অ্যাপ। বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে পারলেই অ্যাপ টিকে থাকে।

১৮. হালাল ব্যবসার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং

সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বোঝা মার্কেটিং এজেন্সির চাহিদা বাড়ছে।

১৯. হালাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন

ব্লগ, পডকাস্ট বা ভিডিও— ধীরে আয় এলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব তৈরি হয়। ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা এখানে মুখ্য।

২০. এআই-ভিত্তিক হালাল সমাধান

শিক্ষা, কাস্টমার সাপোর্ট বা কনটেন্ট ব্যবস্থাপনায় নৈতিক এআই ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ভ্রমণ, কমিউনিটি ও অর্থনীতি

২১. হালাল ট্রাভেল এজেন্সি

মুসলিমবান্ধব ভ্রমণের চাহিদা বাড়ছে। নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতাই এখানে সাফল্যের ভিত্তি।

২২. ওমরাহ ও হজ সহায়তা সেবা

নৈতিকতা, দক্ষতা ও পরিষ্কার যোগাযোগ ছাড়া এই খাতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ভ্রমণের আগের প্রশিক্ষণমূলক সেবা বাড়তি মূল্য যোগ করে।

২৩. ইসলামিক বিবাহ ও ম্যাচমেকিং সেবা

গোপনীয়তা, যাচাই ও আস্থা নিশ্চিত করাই এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল চ্যালেঞ্জ।

২৪. জাকাত ও দাতব্য ব্যবস্থাপনা টুল

ডিজিটাল জাকাত টুল হিসাব ও বণ্টন সহজ করে। বিশ্বস্ত সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।

২৫. ইসলামিক ইভেন্ট প্ল্যানিং

বিয়ে, সম্মেলন ও কমিউনিটি ইভেন্টে ইসলামি শালীনতা বজায় রেখে পরিকল্পনা করাই এই পেশার মূল দায়িত্ব।

কোন হালাল ব্যবসাটি আপনার জন্য উপযুক্ত?

২০২৬ সালের হালাল অর্থনীতি সেই উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করে, যারা নৈতিক দৃঢ়তা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাকে একত্রে ধারণ করতে পারেন। কেবল ট্রেন্ড অনুকরণ নয়, চাহিদা বোঝা, আস্থা গড়া এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়নই সাফল্যের চাবিকাঠি।

উল্লিখিত ২৫টি হালাল ব্যবসার ধারণা কোনো শর্টকাট নয়। তবে এগুলো এমন বাস্তব ও পরীক্ষিত পথ, যা ক্রমবর্ধমান প্রাসঙ্গিকতা ও বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন একটি অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

সূত্র : দ্য হালাল টাইমস

টাকা দিতে অস্বীকৃতি, ফরিদপুরে ব্যবসায়ীর দুই হাত কুপিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৬:২৮ অপরাহ্ণ
টাকা দিতে অস্বীকৃতি, ফরিদপুরে ব্যবসায়ীর দুই হাত কুপিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কোড়কদী এলাকায় এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে নগদ ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুইজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুইজনকে আসামি করে মধুখালী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

শুক্রবার (০৩ জুলাই) বিকেলে আহত ব্যবসায়ী রনি শেখের বাবা খালেক শেখ বাদী হয়ে মধুখালী থানায় এ অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কোড়কদী গ্রামের বাসিন্দা রনি শেখ (৩০) স্থানীয় কোড়কদী বাজারে বিকাশ, নগদ, ফ্লেক্সিলোড ও কসমেটিকসের ব্যবসা করেন। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাত আনুমানিক ১০টা ১৫ মিনিটে তিনি দোকান বন্ধ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

পথে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কোড়কদী এলাকার ভেজাল মণ্ডল ও গোসাই চন্দ্র সরকারের বাড়ির মাঝামাঝি সরকারি পাকা সড়কে পৌঁছালে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তার পথরোধ করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা প্রথমে রনির কাছে থাকা টাকা দাবি করে। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে থাকা ধারালো চাপাতি দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে তার ডান ও বাম হাতের ওপর এলোপাতাড়ি কোপ দেওয়া হয়। পরে তাকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়।

একপর্যায়ে রনি শেখ মাটিতে লুটিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে তার সঙ্গে থাকা ব্যবসার নগদ ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আকাশ বিশ্বাস (২৫), পিতা- মৃত নিপেন্দ্র বিশ্বাস, সাং- কোড়কদী মাঝিপাড়া এবং জিহাদ শেখ (২৭), পিতা- আক্কাচ শেখ, সাং- কোড়কদী বাবুপাড়াকে নামীয় আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও দুইজনকে আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কিছুক্ষণ পর ওই সড়ক দিয়ে সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় বাসিন্দা মিলন বিশ্বাস আহত রনি শেখকে রাস্তার পাশে ঘাসের মধ্যে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। খবর পেয়ে স্বজনরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে রনি শেখকে উদ্ধার করে দ্রুত মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুটা সুস্থ হলে রনি শেখ তার ওপর হামলা ও ছিনতাইয়ের ঘটনার বিস্তারিত পরিবারের সদস্যদের জানান। পরে এলাকাবাসী ও স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে শুক্রবার বিকেলে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় বলে জানান বাদী।

এ বিষয়ে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, “এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ফরিদপুরে চাকরির শেষ লগ্নে কলেজ অধ্যক্ষের মানবেতর জীবন, রাষ্ট্রের কাছে চাইলেন ন্যায়বিচার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৪:১৬ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে চাকরির শেষ লগ্নে কলেজ অধ্যক্ষের মানবেতর জীবন, রাষ্ট্রের কাছে চাইলেন ন্যায়বিচার

চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানোর অভিযোগ তুলে নিজের প্রতি সংঘটিত অন্যায়-অবিচারের প্রতিকার এবং স্বপদে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌর সদরের কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদ।

শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে বোয়ালমারী বাজারের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাকে অন্যায়ভাবে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে অধ্যক্ষ ফরিদ আহমেদ বলেন, জীবনের চার দশকেরও বেশি সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পর আজ চাকরির মাত্র দুই মাস বাকি থাকতে তাকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা, নিজের চিকিৎসা ব্যয়, মেডিকেলে অধ্যয়নরত মেয়ের লেখাপড়ার খরচ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কলেজের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর উস্কানিতে বহিরাগত কিছু ব্যক্তি ও শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদত্যাগের দাবি জানায়। পরবর্তীতে গত ২৮ নভেম্বর কলেজ পরিচালনা পর্ষদ কতিপয় শিক্ষক-কর্মচারী ও বহিরাগতদের চাপের মুখে প্রচলিত বিধি অনুসরণ না করেই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

তার দাবি, সাময়িক বরখাস্তের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি এবং বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ফরিদ আহমেদ বলেন, বরখাস্তের পর তার বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি তার ব্যাংক হিসাবও স্থগিত করা হয়। ফলে নিয়মিত আয় তো বন্ধ হয়েছেই, নিজের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অর্থও ব্যবহার করতে পারেননি। এতে পরিবার নিয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

তিনি আরও জানান, নিরুপায় হয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালতের আদেশে তিনি চাকরি ও বেতন-ভাতার অধিকার ফিরে পান। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কলেজের একটি প্রভাবশালী পক্ষ এবং পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য তাকে এখনও দায়িত্ব গ্রহণ করতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাকে অধ্যক্ষের সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তার বাসায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন। এসব ঘটনার জন্য তিনি কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. হোসনেয়ারা বেগম, প্রভাষক সৈয়দা দিল আশরাফি, প্রভাষক জাহেদা বেগম, সহকারী অধ্যাপক মো. আজহার আলী, সহকারী অধ্যাপক আ. মান্নান, সেকশন অফিসার কামরুল ইসলাম এবং অফিস সহায়ক মো. মানিক হোসেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে কলেজ প্রাঙ্গণে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের সেখানে অংশ নিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে অধ্যক্ষ ফরিদ আহমেদ বলেন, “আমি এখন জীবনের শেষ কর্মপর্বে। চাকরির বয়স আর মাত্র দুই মাস বাকি। এই সময়ের মধ্যে যদি দায়িত্বে ফিরতে না পারি, তাহলে আমার অবসরজনিত সব প্রাপ্য, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং শেষ বয়সের নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যাবে। আমার বৃদ্ধ মা, অসুস্থ স্ত্রী ও সন্তানদের কথা ভেবে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায়বিচার এবং স্বপদে পুনর্বহালের আবেদন জানাচ্ছি।”

এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষবিরোধী মানববন্ধনে অংশগ্রহণের জন্য কিছু শিক্ষার্থীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে আইন ও বিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এতে যেমন অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে, তেমনি প্রতিষ্ঠানটিতে স্থিতিশীল পরিবেশও ফিরে আসবে।

ফরিদপুরে একসঙ্গে জন্ম নেওয়া সেই পাঁচ সন্তানের ৪ জন মারা গেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে একসঙ্গে জন্ম নেওয়া সেই পাঁচ সন্তানের ৪ জন মারা গেছে

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এক প্রসূতি। তবে গর্ভধারণের প্রায় সাড়ে ছয় মাসের মাথায় নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সন্তান প্রসব হওয়ায় জন্ম নেওয়া পাঁচ নবজাতকের মধ্যে চারজনই মারা গেছে। বর্তমানে একটি ছেলে শিশু হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রিয়া বিশ্বাস জানান, জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিন নবজাতক মারা যায়। পরে শুক্রবার ভোরে আরও এক ছেলে শিশুর মৃত্যু হয়। বর্তমানে একটি ছেলে শিশু জীবিত রয়েছে এবং তাকে অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার অবস্থাও এখনও আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে ৫টা ৫০ মিনিটের মধ্যে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে একে একে তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম দেন চাঁদনী বেগম (২২)। বিরল এই প্রসবের ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চার নবজাতকের মৃত্যুর খবরে নেমে আসে শোকের ছায়া।

চাঁদনী বেগম ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কোদালিয়া-শহীদনগর ইউনিয়নের বড় কাজুলী গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় দেড় বছর আগে একই উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের ভবুকদিয়া গ্রামের মাহামুদুল হাসান ডলারের (৩০) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। মাহামুদুল হাসান ডলার বর্তমানে সিঙ্গাপুরে কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বিয়ের কয়েক মাস পর চাঁদনী গর্ভবতী হন। পরবর্তীতে আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে তাঁর গর্ভে পাঁচটি সন্তান রয়েছে বলে জানতে পারেন চিকিৎসকেরা। বিষয়টি পরিবারে আনন্দের সৃষ্টি করলেও চিকিৎসকেরা শুরু থেকেই এটিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স মিনতি সরকার জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে প্রসূতিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে প্রায় এক ঘণ্টা পর স্বাভাবিক প্রসব শুরু হয়। মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে পাঁচটি নবজাতকের জন্ম হয়। জন্মের সময় প্রতিটি শিশুর ওজন ছিল আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম, যা অত্যন্ত কম।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু ওয়ার্ড সূত্র জানায়, জন্মের পর পাঁচ নবজাতককেই চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া এবং অত্যন্ত কম ওজনের কারণে তাদের শারীরিক অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন।

নবজাতক ও শিশু ওয়ার্ডের দায়িত্বরত শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) চিকিৎসক প্রীতিরাজ পাল চৌধুরী বলেন, জন্মের সময় পাঁচ শিশুই জীবিত ছিল। কিন্তু তারা ‘এক্সট্রিমলি লো বার্থ ওয়েট’ বা অত্যন্ত কম ওজনের নবজাতক হওয়ায় তাদের নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন ছিল। এ ধরনের শিশুদের সাধারণত উন্নত নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (NICU)-এ চিকিৎসা দিতে হয়। হাসপাতালের সীমিত সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে নবজাতকদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের আর স্থানান্তর করা হয়নি।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, সাধারণ গর্ভধারণের মেয়াদ ৩৭ থেকে ৪০ সপ্তাহ হলেও এই প্রসূতির সন্তানদের জন্ম হয়েছে প্রায় ২৮ সপ্তাহের আগেই। এত কম বয়সে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের ফুসফুস, হৃদ্‌যন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত না হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে।

একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্ম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তবে অপরিণত প্রসব এবং পর্যাপ্ত নিবিড় নবজাতক পরিচর্যার অভাবে চার নবজাতকের মৃত্যুতে আনন্দের সেই মুহূর্ত মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে গভীর বেদনায়। বর্তমানে পরিবারের সব প্রার্থনা এখন একমাত্র জীবিত শিশুটিকে ঘিরেই।