ফরিদপুরে সাংবাদিক পরিচয়ে কুপ্রস্তাবের অভিযোগ, থানায় গিয়ে বিচার চাইলেন কলেজছাত্রী
সাংবাদিক পরিচয়ে এক কলেজছাত্রীকে ফোন করে অশ্লীল কথাবার্তা, কুপ্রস্তাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বর্ষা ইসলাম (১৯) নামে ওই কলেজছাত্রী ফরিদপুর কোতোয়ালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে থানায় অভিযোগটি দেন বর্ষা। শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান।
অভিযোগপত্রে বর্ষা উল্লেখ করেন, তিনি সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য একটি কোচিং সেন্টারে ক্লাস করছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়, গোলাম মোস্তফা নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে বর্ষাকে অশ্লীল কথাবার্তা ও কুপ্রস্তাব দেন। এতে তিনি আপত্তি জানালে গোলাম মোস্তফা তাকে নিয়ে বিভিন্ন বাজে ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করে ফেসবুকে লাইভ করেন। এসব কর্মকাণ্ডে তার সামাজিক মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বর্ষা।
বর্ষার আরও অভিযোগ, তাকে নিয়ে ফেসবুকে লাইভ ও প্রচার বন্ধের বিনিময়ে টাকা দাবি করেন গোলাম মোস্তফা। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আরও লাইভ করে তার বড় ধরনের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়। এতে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে স্বজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে আইনি সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্ষা ইসলাম বলেন, “আমি একজন ছাত্রী। আমাকে ফোন করে কুপ্রস্তাব দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবাদ করায় টাকা দাবি ও আরও ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত প্রতিকার চাই।”
এদিকে গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে পাওয়া গেছে। এছাড়া ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের নাম ভাঙানোরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর আগে সৈয়দ নাজমুল আলম পারভেজ নামে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও সম্মানহানির অভিযোগে কোতোয়ালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগে গোলাম মোস্তফাসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, ওই কলেজছাত্রীর অভিযোগে নাম আসা গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, নারীদের হয়রানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংবাদিকতার পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাপ প্রয়োগ করেছেন। এমনকি কেউ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে বিষয়টি দলীয় নেতাদের কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে অভিযোগকারীকেই হয়রানির মুখে ফেলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরকান্দার এক প্রবাসী অভিযোগ করে বলেন, “আমার স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে গোলাম মোস্তফা বিভিন্নভাবে আমার ও স্ত্রীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়েছেন। পরে বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে আমাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কোথাও লিখিত অভিযোগ করার সাহস পাইনি। এতে আমি আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছি। এখন আল্লাহর কাছেই বিচার দিয়েছি। আল্লাহ যেন তার বিচার করে।”
নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শওকত আলী শরীফ বলেন, “গোলাম মোস্তফা নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সদস্য নন। তার ব্যক্তিগত কোনো অপকর্মের দায় প্রেসক্লাব নেবে না। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন পিয়াল বলেন, “অনেকেই সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্মে জড়াচ্ছেন। এদের সঙ্গে মূলধারার সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
দলীয় পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, “অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কেউ দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
ফরিদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল বলেন, “বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। খোঁজ নিয়ে দেখব। কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় দল বহন করবে না। আমি ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও আমাদের অভিভাবক মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকেও বিষয়টি জানাব।”
অভিযোগের বিষয়ে গোলাম মোস্তফা বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ “সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। তিনি কোনো কলেজছাত্রীকে কুপ্রস্তাব, ব্ল্যাকমেইল বা টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বিরোধের জেরে তাকে হয়রানি করতে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।
ফরিদপুরের কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বলেন, “বর্ষা ইসলাম নামে একজন কলেজছাত্রী সাংবাদিক পরিচয়ে হয়রানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও হুমকির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আপনার মতামত লিখুন
Array