খুঁজুন
, ,

শতবর্ষে উত্তম কুমার: সময় পেরিয়েও যিনি চির আধুনিক

মো. মাহবুবুর রহমান
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ
শতবর্ষে উত্তম কুমার: সময় পেরিয়েও যিনি চির আধুনিক

কিছু মানুষ সময়ের সন্তান, আর কিছু মানুষ সময়কে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হন। উত্তম কুমার সেই বিরল দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ। পর্দার আলো নিভে গেছে বহু বছর আগে, বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ও আজ ইতিহাস; তবু উত্তম কুমারের নাম উচ্চারিত হলে বাঙালির মনে যে আলো জ্বলে ওঠে, তার কোনো মেয়াদ নেই। তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন—তিনি বাঙালির প্রেম, স্বপ্ন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক—সময়ের এতটা পথ পেরিয়ে উত্তম কুমার আজও কেন এত আপন? সময় বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। বিনোদনের মাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে অকল্পনীয়ভাবে। তবু উত্তমের অভিনয় আজও দর্শককে থামিয়ে দেয়। কারণ তাঁর জনপ্রিয়তার ভিত শুধু সুদর্শন চেহারা কিংবা রোমান্টিক নায়কের ইমেজে নির্মিত ছিল না; এর গভীরে ছিল অভিনয়ের এক স্বতন্ত্র ব্যাকরণ, পর্দায় উপস্থিত থাকার এক অনন্য ক্ষমতা। তিনি দর্শককে শুধু গল্পের সঙ্গে যুক্ত করতেন না, চরিত্রের অনুভূতির মধ্যেও টেনে নিয়ে যেতেন।

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কলকাতা পোর্ট কমিশনার্স অফিসে কেরানির চাকরি করতেন। কিন্তু মনের ভেতর তখন অন্য এক পৃথিবী—অভিনয়ের পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে পৌঁছানোর পথ তাঁর জন্য সহজ ছিল না।

১৯৪৭ সালে ‘মায়াডোর’ ছবিতে সুযোগ এলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’-এ ছোট চরিত্রে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ। এরপর পরপর কয়েকটি ছবি ব্যর্থ হতে লাগল। ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি হয়ে উঠলেন হাসি-তামাশার পাত্র। তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গেল এক ব্যঙ্গাত্মক অভিধা—‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’।

কিন্তু ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু চেহারা বা প্রতিভা যথেষ্ট নয়; ক্যামেরার সামনে নিজেকে নির্মাণ করতে হয়। সংলাপের উচ্চারণ, বিরতি, মুখের অভিব্যক্তি, চোখের দৃষ্টি, শরীরের সামান্য নড়াচড়া—সবকিছুর ওপর তিনি সচেতনভাবে কাজ করেছিলেন।

ব্যর্থতাকে তিনি পরাজয় হিসেবে নেননি; বরং সেটিকে আত্মসংশোধনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এখানেই ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম বড় শক্তি। জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠার আগে তিনি নিজেকে একজন অভিনেতা হিসেবে তৈরি করেছিলেন—এই নির্মাণপ্রক্রিয়াই পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনয়ের ভিতকে শক্ত করে দেয়।

১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ এনে দিল প্রথম বড় সাফল্য। এরপর যে মানুষটিকে একদিন ব্যর্থতার প্রতীক মনে করা হয়েছিল, তিনিই হয়ে উঠলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক। উত্তম কুমারের উত্থান তাই শুধু একজন তারকার জন্মের গল্প নয়; এটি আত্মসংশোধন, অধ্যবসায় এবং শিল্পীসত্তাকে ক্রমাগত পরিশীলিত করে তোলার গল্প।

এই উত্থানের পরই তাঁর জীবনে আসে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়—সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন প্রথমবার জুটি বাঁধলেন। এরপর ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘শাপমোচন’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘পথে হলো দেরি’সহ একের পর এক চলচ্চিত্রে তাঁদের জুটি হয়ে উঠল বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।

তাঁদের রসায়নের বিশেষত্ব ছিল অভিনয়ের সূক্ষ্ম সমন্বয়ে। সংলাপের চেয়ে চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি কিংবা সামান্য শরীরী ভঙ্গির মাধ্যমেই তাঁরা অনেক সময় অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। উত্তমের চোখের অভিনয় ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়—বিস্ময়, অভিমান, আকর্ষণ কিংবা মমতা তিনি কখনো কখনো সংলাপ ছাড়াই ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। তাঁর হাসিও ছিল বহুমাত্রিক—কখনো আত্মবিশ্বাসী, কখনো লাজুক, কখনো বিষণ্নতার আড়ালে ঢাকা।

এই জুটি শুধু জনপ্রিয় হয়নি; বাংলা মধ্যবিত্ত সমাজের প্রেম ও সম্পর্কের কল্পনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘সপ্তপদী’র সেই বিখ্যাত বাইক-দৃশ্য আজও বাঙালির প্রেমের স্মৃতিতে অমলিন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সেই গানের আবহ, আর উত্তম-সুচিত্রার চোখের ভাষা মিলেমিশে প্রেমকে দিয়েছিল এক অনন্য মাত্রা। উত্তম–সুচিত্রা জুটি পরবর্তী বহু প্রজন্মের কাছে পর্দার রোমান্টিক সম্পর্কের এক মানদণ্ড হয়ে উঠেছিল। তাঁদের জনপ্রিয়তা এমন এক সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করেছিল, যেখানে সিনেমার প্রেম বাস্তব জীবনের প্রেমের কল্পনাকেও স্পর্শ করত।

কিন্তু এই সাফল্যই উত্তমকে তাঁর নিজস্ব গণ্ডিতে আটকে রাখতে পারেনি। বরং সুচিত্রার সঙ্গে স্বপ্নময় রোমান্টিকতার পাশাপাশি অন্য সহশিল্পীদের সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন সম্পর্ক, হাস্যরস, দাম্পত্য, সংকট ও জীবনের নানা বাস্তবতার ভিন্ন রূপ। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর জুটি নিয়ে এসেছিল ঘরোয়া ও স্বাভাবিক এক জগৎ। ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘মৌচাক’, ‘ধন্যি মেয়ে’সহ বিভিন্ন ছবিতে তাঁদের অভিনয়ে প্রেমের পাশাপাশি ছিল হাসি, দাম্পত্য ও পারিবারিক টানাপোড়েন। কমেডিতে তাঁদের স্বাভাবিক ছন্দ দৃশ্যকে করে তুলেছিল প্রাণবন্ত। তারকাসুলভ দূরত্বের বদলে তাঁদের অভিনয়ে ফুটে উঠত পরিচিত জীবনের হাসি-কান্না, ভুল বোঝাবুঝি ও সম্পর্কের সহজ উষ্ণতা।

অন্যদিকে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে উত্তমের অভিনয় ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে রোমান্টিকতার পাশাপাশি সম্পর্কের পরিণত ও জটিল আবেগ প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ভিন্ন ভিন্ন নায়িকার সঙ্গে কাজ করার সময় উত্তম নিজেকে একই ছাঁচে আটকে রাখেননি। সহশিল্পীর অভিনয়ভঙ্গি ও চরিত্রের প্রকৃতি অনুযায়ী নিজের প্রকাশভঙ্গি বদলেছেন—এটিই একজন বড় অভিনেতার পরিচয়। তাঁর এই অভিযোজনক্ষমতাই প্রমাণ করে, জনপ্রিয়তার পাশাপাশি চরিত্রের প্রয়োজনকেও তিনি সমান গুরুত্ব দিতেন।

সুচিত্রা, সাবিত্রী বা সুপ্রিয়ার বাইরেও তনুজার সঙ্গে উত্তম কুমারের জুটি বাংলা সিনেমায় আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। মাত্র তিনটি ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করলেও সেগুলো দর্শকপ্রিয়তায় অনন্য হয়ে উঠেছিল। ১৯৬৩ সালের ‘দেয়া নেয়া’ ছিল তাঁদের প্রথম ছবি—রোমান্টিক কমেডির ছন্দে ভরা এই চলচ্চিত্র আজও জনপ্রিয়। এরপর ১৯৬৭ সালে আসে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, যেখানে উত্তম কুমার পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কবিয়াল অ্যান্টনির চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করেন। তনুজা সেখানে নীরূপমার চরিত্রে ছিলেন।

১৯৭০ সালের ‘রাজকুমারী’তে তনুজা ছিলেন রাজকুমারী মঞ্জু এবং উত্তম কুমার নির্মল চরিত্রে। আর. ডি. বর্মণের সঙ্গীত ও দুজনের রসায়ন ছবিটিকে দর্শকপ্রিয় করে তোলে। স্বল্পসংখ্যক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেও তনুজার সঙ্গে উত্তমের জুটি বাঙালি দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। এই ভিন্ন ভিন্ন জুটির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার ভিত্তি কোনো একক রসায়ন বা নির্দিষ্ট নায়ক-ইমেজে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর অভিনয়ের পরিসর ছিল অনেক বিস্তৃত।

সেই বিস্তারের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ তাঁর চরিত্রনির্বাচন। ‘যতুগৃহ’-এ অরুন্ধতী দেবীর সঙ্গে তাঁর অভিনয় ছিল সংযত, বাস্তবধর্মী এবং সম্পর্কের অন্তর্গত টানাপোড়েননির্ভর। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এ শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর অভিনয় আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল।

এখানে তিনি চলচ্চিত্র-তারকা অরিন্দম মুখার্জি—বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে যার ভেতরে ছিল অপরাধবোধ, সংশয়, একাকিত্ব ও আত্মজিজ্ঞাসা। চরিত্রটির অন্তর্গত দ্বন্দ্বকে উত্তম এমন সংযত অভিনয়ে প্রকাশ করেছিলেন যে, পর্দার তারকা অরিন্দম ধীরে ধীরে একজন ভঙ্গুর, আত্মসংশয়ী মানুষের রূপ পায়।

বড় কোনো অঙ্গভঙ্গি বা নাটকীয় উচ্চারণের ওপর নির্ভর না করে মুখের সামান্য পরিবর্তন, নীরবতা ও চোখের দৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ‘নায়ক’ তাই শুধু উত্তম কুমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নয়; এটি তাঁর অভিনয়ক্ষমতার গভীরতা বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’তে তিনি ধারণ করেছিলেন এক ভিন্ন জীবন ও সংস্কৃতির শিল্পীসত্তা; ‘জীবন বন্দী’তেও তাঁর অভিনয়ে ফুটে উঠেছিল চরিত্রের আবেগ ও মানবিক সংকট। আর ‘চিড়িয়াখানা’য় ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেখিয়েছিলেন, পরিচিত নায়ক-ইমেজের বাইরে গিয়েও রহস্যনির্ভর চরিত্রকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়। চরিত্র যত বদলেছে, উত্তমের অভিনয়ের ভাষাও তত বদলেছে—এটাই তাঁকে নিছক তারকা থেকে একজন বড় অভিনেতার মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

তাঁর শরীরী ভাষাও ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি পর্দা দখল করতেন বড় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নয়; হাঁটার ধরন, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, মাথা ঘোরানো কিংবা নিঃশব্দ উপস্থিতির মধ্য দিয়েই দৃশ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠতেন। ক্যামেরা যেন তাঁকে ভালোবাসত। তাঁর উপস্থিতি ক্লোজ-আপকে বিশেষ অর্থ দিত। একই সঙ্গে তিনি জানতেন, অতিরিক্ত অভিনয় স্বাভাবিকতা নষ্ট করে।

তাই তাঁর পরিণত অভিনয়ে দেখা যায় সংযম ও স্বাভাবিকতার এক চমৎকার ভারসাম্য। তাঁর অভিনয়ের এই স্বাভাবিকতা আজকের দর্শকের কাছেও বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য—কারণ তা সময়ের বাহ্যিক ফ্যাশনের ওপর নয়, মানুষের চিরন্তন অনুভূতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

দীর্ঘ কর্মজীবনে কিছু ছবিতে তিনি তারকা-ইমেজের ওপর নির্ভর করেছেন, কিছু চরিত্রে পুনরাবৃত্তিও এসেছে—এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলো সেই সীমাবদ্ধতাকে অনেক দূর ছাপিয়ে গেছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৮০—মাত্র বত্রিশ বছরের চলচ্চিত্রজীবনে দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় তাঁর কর্মক্ষমতার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। তবে তাঁর উত্তরাধিকার সংখ্যায় নয়; বরং এমন কিছু চরিত্র ও অভিনয়মুহূর্তে, যেগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে থেমে যায় মহানায়কের জীবন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে কলকাতা শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু শরীরের মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয় না। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে নতুন প্রজন্ম এখনও তাঁর ছবি দেখে, তাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা করে। তিনি শুধু একটি সময়ের নায়ক নন; পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও তিনি এক নতুন করে আবিষ্কারের বিষয়।

আজকের দর্শকের হাতে স্মার্টফোন, বিনোদনের বিকল্পেরও অভাব নেই। তবু উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা টিকে আছে শুধু নস্টালজিয়ার জোরে নয়। তাঁর অভিনয় নতুন দর্শকের কাছেও অনুভূতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। চোখের দৃষ্টি, সংলাপের ছন্দ, হাসির বৈচিত্র্য এবং আবেগকে সংযতভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা আজও কার্যকর। তিনি এমন এক নায়ক-চরিত্র নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে পুরুষত্ব ছিল দৃঢ় কিন্তু আগ্রাসী নয়, রোমান্টিকতা ছিল আবেগময় কিন্তু অতিনাটকীয় নয়। এই কারণেই তাঁর অভিনয়ের অনেক কিছু আজও সমকালীন বলে মনে হয়।

উত্তম কুমারের প্রাসঙ্গিকতা শুধু পুরোনো দর্শকের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন প্রজন্মের দর্শক ও শিল্পীদের কাছেও তাঁর অভিনয় আজও এক অনিবার্য পাঠ—বিশেষ করে সংলাপের চেয়ে দৃষ্টি, নীরবতা ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশের যে শিল্প তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা সময়ের সীমানা অতিক্রম করেছে। তাঁর ছবি তাই শুধু স্মৃতিচারণের উপকরণ নয়; নতুন করে অভিনয় ও চলচ্চিত্রকে বোঝারও এক মূল্যবান জানালা।

শতবর্ষে উত্তম কুমারকে ফিরে দেখা তাই শুধু একজন অভিনেতাকে স্মরণ করা নয়; ফিরে দেখা বাঙালির একটি সাংস্কৃতিক সময়কে—যে সময়ে সিনেমা ছিল স্বপ্ন দেখার জানালা। তিনি দেখিয়েছেন, জনপ্রিয়তা ও শিল্পমান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; একজন তারকা একই সঙ্গে মানুষের প্রিয় এবং একজন গভীর শিল্পীও হতে পারেন। তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই—তিনি দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন, আবার সময়ের পরীক্ষাতেও টিকে গেছেন।

পর্দার আলো একদিন নিভে যায়, নায়কেরা একদিন চলে যান; কিন্তু শিল্প যদি মানুষের অনুভূতিতে বেঁচে থাকে, তবে শিল্পীও বেঁচে থাকেন। একশ বছর পেরিয়েও উত্তম তাই চির আধুনিক, চির প্রিয়। সময় পেরোয়, প্রজন্ম বদলায়—তবু তাঁর মুগ্ধতা ফুরোয় না। তিনি সমান আপন, সমান জীবন্ত।

শিল্পী বোধহয় এভাবেই বেঁচে থাকেন—সময়কে পেরিয়ে, মানুষের ভালোবাসায় কালোত্তীর্ণ হয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর পঙ্‌ক্তি—“তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম”—মহানায়কের জন্য এর চেয়ে যথার্থ পঙ্‌ক্তি আর কী-ই বা হতে পারে!

লেখক
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ

ফরিদপুরে সরকারি দামে মিলছে না সার, বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সরকারি দামে মিলছে না সার, বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ

কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে। সরকারি তালিকায় নির্ধারিত রয়েছে প্রতিটি সারের দামও। কিন্তু ফরিদপুরের মাঠ ও বাজারের চিত্রে সেই হিসাব যেন মিলছে না। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি মূল্যের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েই কিনতে হচ্ছে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার।

কোথাও ডিলারের কাছে সার না থাকার কথা বলা হলেও খুচরা বাজারে একই সার মিলছে বাড়তি দামে। আবার কোথাও সরকারি মূল্যের রশিদ দেওয়া হলেও এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সারের সঙ্গে অন্য কোম্পানির পণ্য কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও করেছেন কৃষকেরা।

ফলে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা শেষ পর্যন্ত কৃষকের হাতে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুরে বরাদ্দ বিবেচনায় ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের সংকট নেই। জেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির মোট ১৪৪ জন সার ডিলার রয়েছেন।

সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রি করার কথা।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সারের বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ডিএপি নিয়ে। সরকারি মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও কোথাও কোথাও এক বস্তা ডিএপি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

মধুখালী উপজেলার জাহাপুর গ্রামের কৃষক মেহেদী হাসান বলেন, কয়েক দিন আগে তিনি জাহাপুর বাজার থেকে এক বস্তা ডিএপি ১ হাজার ৭৫০ টাকা এবং এক বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৪৫০ টাকা দিয়ে কিনেছেন।

তিনি বলেন, “সরকারি দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় সারের সঙ্গে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনের সার নিতে গেলে এসব পণ্যও ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে সারের বাড়তি দামের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনেও খরচ বাড়ছে।”

ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুরের কৃষক লিয়াকত শেখ বলেন, “আমরা জমিতে ফসল ফলাই, কিন্তু সার কিনতে গেলেই বাড়তি টাকার চিন্তা করতে হয়। সরকার যে দামে সার দেওয়ার কথা বলছে, সেই দামে না পেলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফসলের দাম কম হলে তখন লোকসান সামলানো কঠিন।”

সালথা উপজেলার কৃষক মহসিন ব্যাপারী বলেন, “সার ছাড়া চাষ করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজনের সময় বেশি দাম হলেও কিনতে বাধ্য হই। আমরা চাই সরকারি দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করা হোক।”

বোয়ালমারীর সাতৈর এলাকার কৃষক রুস্তুম শেখের অভিযোগ, সাতৈর বাজারের মেসার্স স্বপ্ন কৃষি ভান্ডারে সার কিনতে গেলে অনেকটা জিম্মি অবস্থায় বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।

শুধু কৃষকরাই নন, কয়েকজন খুচরা সার ব্যবসায়ীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাড়তি দামে সার কেনার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, বিএডিসির ডিলারদের কাছ থেকে অনেক সময় বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হয়। ফলে খুচরা পর্যায়ে সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ের কিছু বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলার সার নেই বলে জানালেও একই সার খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। কোথাও কোথাও ডিলারের কাছ থেকে সার নেওয়ার সময় কোনো রশিদ দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আবার কিছু ক্ষেত্রে সরকারি মূল্যের রশিদ দেওয়া হলেও রশিদের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। এতে ডিলারের কাছ থেকে সরকারি দামে সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

ডিলারদের একটি অংশ অবশ্য এসব বাড়তি দামের দায় নিজেদের ওপর নিতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলার দাবি করেন, সার উত্তোলনের সময় সরকারি রসিদের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।

তাঁদের অভিযোগ, আঞ্চলিক সার গুদাম থেকে সার উত্তোলনের সময় বস্তাপ্রতি আলাদা অর্থ নেওয়া হলেও সেই অর্থের কোনো রশিদ বা চালান দেওয়া হয় না। পরে বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে সেই বাড়তি অর্থের প্রভাব পড়ে বাজারদরে।

কয়েকজন ডিলার আরও দাবি করেন, মৌসুমে চাহিদা বেড়ে গেলে যশোরের নওয়াপাড়া থেকেও সার সংগ্রহ করতে হয়। পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচের কারণে বাইরে থেকে আনা সারের দাম বেশি পড়ে।

তবে কৃষকদের প্রশ্ন, পরিবহন বা অন্য খরচ থাকলেও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের বাইরে কত টাকা নেওয়ার বৈধতা রয়েছে এবং সেই বাড়তি অর্থের হিসাবই বা কোথায়?

ডিলারদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে সার বিক্রি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফরিদপুর সার ডিলারদের সংগঠন ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মিয়া (বাবু)।

তিনি বলেন, “ফরিদপুর জেলায় বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার রয়েছে। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী ডিলাররা সব ধরনের সার সংগ্রহ করছেন। জেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসিসহ মোট ১৪৪ জন সার ডিলার রয়েছেন।”

তিনি বলেন, পেঁয়াজ চাষের মৌসুমে একসঙ্গে অনেক কৃষক সার ব্যবহার করায় বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অনেক কৃষক জমির প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ডিএপি ব্যবহার করেন।

তবে সার সংকট নেই দাবি করে তিনি বলেন, “আমার জানামতে বর্তমানে কোনো সারের সংকট নেই।”

ডিলারদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, রশিদের বাইরে টাকা নেওয়া এবং সারের সঙ্গে অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই ধরনের বিষয়ে আমি অবগত নই।”

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর সারের গুদামের উপসহকারী পরিচালক এম এ জাকির বলেন, “আমি এই বিষয়টি নিয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে পারব না। আমাদের সহকারী পরিচালক কাইয়ুম মল্লিক স্যারের নিষেধ আছে। আমি শুধু মেমো কেটে দিই এবং হিসাব ঠিকঠাক রাখি।”

এ বিষয়ে ফরিদপুর অঞ্চলের বিএডিসি সার বিভাগের টেপাখোলা গুদামের সহকারী পরিচালক মো. কাইয়ুম মল্লিকের বক্তব্য জানতে তাঁর কার্যালয়ে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি রাজবাড়ীতে জরুরি মিটিংয়ে থাকার কথা জানান। দুপুর গড়িয়ে বিকেলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে রাত ৮টার দিকে তিনি প্রতিবেদককে ফোন করেন।

তখন কাইয়ুম মল্লিক বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার বিরুদ্ধে উপসহকারী পরিচালক এম এ জাকির সম্ভবত মিথ্যা কথা বলেছেন। আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।”

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, “ফরিদপুর জেলায় কোনো প্রকার সারের সংকট নেই। নিয়মিত মাঠপর্যায়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। আমাদের একাধিক কর্মকর্তা সব সময় খবরাখবর রাখছেন। কোনো ডিলার এ ধরনের কাজে জড়িত থাকলে বা কোনো কৃষক অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি বলেন, “আমি বর্তমানে আলফাডাঙ্গা উপজেলায় অবস্থান করছি। এখানেও খোঁজখবর নিতে পারেন। কোনো কৃষক কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিও দেখতে পারবেন। প্রতিটি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। ডিলারদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।”

সার কেনার সময় কৃষকদের রশিদ দেওয়া এবং তাঁদের মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে এবং নিয়মিত মনিটরিংও হচ্ছে। সার ডিলার সমিতিও সংকটের কথা অস্বীকার করছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিযোগ, খুচরা ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এবং কয়েকজন ডিলারের দেওয়া তথ্য—সব মিলিয়ে সরকারি দামের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগটি নতুন করে সামনে এসেছে।

বিশেষ করে রশিদের বাইরে টাকা নেওয়া, সারের সঙ্গে অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করা এবং গুদাম পর্যায়েই অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি বরাদ্দ থেকে শুরু করে গুদাম থেকে সার উত্তোলন, ডিলার পর্যায়ে বিতরণ এবং খুচরা বাজারে বিক্রি—প্রতিটি ধাপে প্রকৃত মূল্য ও লেনদেনের হিসাব পর্যালোচনা করা হলে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগের উৎস বেরিয়ে আসতে পারে।

কৃষকেরা বলছেন, সরকার ভর্তুকি দিয়ে যে সার দিচ্ছে, সেটি যদি নির্ধারিত দামে মাঠপর্যায়ের কৃষকের হাতে না পৌঁছায়, তাহলে ভর্তুকির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকেরা।

কতক্ষণ ঘুমানো ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
কতক্ষণ ঘুমানো ভালো?

প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

তাই শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মান, নিয়মিত জীবনযাপন এবং শারীরিক সক্রিয়তার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে ৯ ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর প্রয়োজন হলে, ঘুম থেকে ওঠার পরও অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকলে বা দিনের বেশিরভাগ সময় ঘুমঘুম ভাব থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুস্থ থাকার জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং সক্রিয় জীবনযাপনও জরুরি।
সুস্থ শরীর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি।

তবে ঘুমের ঘাটতি যেমন শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি নিয়মিত অতিরিক্ত ঘুম এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও ডেকে আনতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনই সতর্কবার্তা উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ঘুমান এবং একই সঙ্গে শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকেন, তাদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। বিশেষ করে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমানোর পাশাপাশি যারা অলস জীবনযাপন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় চারগুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ঘুমানোর সঙ্গে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা যুক্ত হলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার মতো বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তাই ঘুমের সময়ের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা ও সক্রিয় জীবনযাপনও সুস্থ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত ঘুমে যেসব সমস্যা হতে পারে

বিষণ্ণতা ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি

দীর্ঘ সময় ঘুমানোর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত ১০ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ঘুমান, তাদের মধ্যে বিষণ্ণতার লক্ষণ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঘুম বিষণ্ণতার সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কর্মক্ষমতা কমতে পারে

অতিরিক্ত ঘুমের ফলে ঘুম থেকে ওঠার পরও অনেকের মধ্যে অলসতা, ঝিমুনি ও ক্লান্তি থাকতে পারে। এতে দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ ও কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এমন জীবনযাপন শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকেও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ওজন বাড়ার আশঙ্কা

দীর্ঘ সময় ঘুমানো এবং কম শারীরিক পরিশ্রমের ফলে দৈনন্দিন ক্যালরি খরচ কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস যুক্ত হলে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে শুধু বেশি ঘুমের কারণেই ওজন বাড়ে-এমন সরল সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে

নিয়মিত দীর্ঘ সময় ঘুমানোর সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় ঘুমান এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় নন, তাদের মধ্যে হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে।

অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে

বিভিন্ন গবেষণায় দীর্ঘ সময় ঘুমানোর সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। প্রায় ১৪ লাখ মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণাগুলোর সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ঘুমানো ব্যক্তিদের মধ্যে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি হতে পারে।

তবে গবেষণাগুলো মূলত সম্পর্ক বা association দেখায়; অতিরিক্ত ঘুমই যে সরাসরি অকালমৃত্যুর কারণ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। দীর্ঘ ঘুমের পেছনে বিষণ্ণতা, স্থূলতা, হৃদরোগ, ঘুমের ব্যাধি বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে।

সালথার সেই সোহেলের অন্ধকার ঘরে আশার আলো, নতুন ঘর দিলেন ইউএনও দবির উদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
সালথার সেই সোহেলের অন্ধকার ঘরে আশার আলো, নতুন ঘর দিলেন ইউএনও দবির উদ্দিন

ফরিদপুরের সালথায় অন্ধকার গোয়ালঘরসদৃশ কক্ষে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা সেই সোহেলের জন্য অবশেষে নতুন ঘরের কাজ শুরু হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টার দিকে উপজেলার আটঘর গ্রামে নতুন ঘর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।

এর আগে সোহেলের দুর্দশার চিত্র নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি নজরে আসে উপজেলা প্রশাসনের। সরেজমিনে সোহেলের পরিবারের অবস্থা দেখে ইউএনও তাঁদের জন্য একটি ঘর নির্মাণ এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন।

নতুন ঘরের কাজ শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিনের কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা সোহেলের পরিবারে এখন বইছে আনন্দের হাওয়া।

খুশি হয়ে সোহেল বলেন, “গোয়ালঘরের মতো ছোট্ট একটি ঘরে পরিবার নিয়ে কত কষ্টে দিন কাটিয়েছি, তা বলে বোঝাতে পারব না। নিজের কোনো জমি-ঘর নেই বলে সবসময় একটা ভয় কাজ করত। এখন ইউএনও স্যার আমাদের জন্য ঘর করে দিচ্ছেন। নতুন ঘর পাওয়ার আশা কখনো করিনি। আমি ও আমার পরিবার খুব খুশি। এই সহযোগিতা আমাদের নতুন করে বাঁচার সাহস দিয়েছে।”

সোহেলের স্ত্রী বলেন, “অসুস্থ শরীর নিয়ে এই ঘরে অনেক কষ্টে থেকেছি। বৃষ্টি হলে, রাতে ঘুমানোর সময়ও চিন্তা হতো। সন্তানদের নিয়ে খুব অসহায় লাগত। নতুন ঘর হবে শুনে মনে হচ্ছে আমাদেরও একটি নিরাপদ ঠিকানা হবে। ইউএনও স্যার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।”

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “সোহেলের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে খুব কষ্টে ছিল। এমন একটি পরিবারের পাশে প্রশাসন দাঁড়ানো সত্যিই প্রশংসনীয়। শুধু ঘর নয়, তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য দোকানের ব্যবস্থা করা হলে পরিবারটি স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে।”

ইউএনও দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “সোহেলের পরিবারের বাস্তব অবস্থা দেখে আমরা তাঁদের জন্য একটি ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থাও করা হবে। পরিবারটি যেন নিরাপদে বসবাস করতে পারে এবং ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”

নতুন ঘরের কাজ শুরু হওয়ায় সোহেলের পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসানের পথ তৈরি হয়েছে। অন্ধকার গোয়ালঘরসদৃশ কক্ষ থেকে এবার একটি নিরাপদ ঘরে যাওয়ার অপেক্ষায় পরিবারটি।