খুঁজুন
, ,

দেশে হত্যাযজ্ঞ, বিদেশে মব: কোন পথে নিষিদ্ধ আ.লীগ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৩:১৭ অপরাহ্ণ
দেশে হত্যাযজ্ঞ, বিদেশে মব: কোন পথে নিষিদ্ধ আ.লীগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে প্রায় দেড় হাজার মানুষ হত্যার অভিযোগ কাঁধে নিয়ে গত বছরের ৫ আগস্ট দেশছাড়া হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন দলটির প্রধান শেখ হাসিনা।

বিদেশে পালানোর পর কিছুদিন ঘাপটি মেরে থাকলেও আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে আসতে থাকেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। শুধু প্রকাশ্যেই আসতে থাকেননি, তারা বিদেশেও আচরণ করতে থাকেন ‘আওয়ামী মহিমায়’। জুলাই অভ্যুত্থানের সংগঠক থেকে শুরু করে সরকারের উপদেষ্টাদের টার্গেট করতে থাকেন অনলাইনে-অফলাইনে।

 

কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডে পৃথকভাবে দুই উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও মাহফুজ আলমকে টার্গেট করে হেনস্তা করেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সবশেষ সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময় তাদের হাতে আক্রান্ত হলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) সদস্য সচিব ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক আখতার হোসেন। ‘মব’ তৈরি করে ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে আখতারকে। এসময় অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করা হয় এনসিপির আরেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারাকেও। রেহাই পাননি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও।

এই প্রেক্ষাপটে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ আসলে কোন পথে হাঁটছে! একদিকে দেশের মাটিতে জুলাই গণহত্যার জন্য তাদের নেত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রী-এমপিদের বিচার চলছে। হত্যাযজ্ঞ, সহিংসতা, উসকানিসহ নানা কারণে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে চলছে দলটির বিচারেরও আলাপ। অন্যদিকে বিদেশের মাটিতে দেশের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে রাজনীতিকদের তারা আক্রমণ করছে সংঘবদ্ধভাবে। জুলাই গণহত্যার জন্য কোনো ধরনের অপরাধবোধ বা অনুশোচনার বদলে এই সহিংস ‍রূপে আবির্ভূত হয়ে আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের কাছে নিজেদের আরও নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। বিদেশে নিরাপদে থাকা আওয়ামী লীগের লোকদের আচরণে দেশে থাকা দলটির লোকজন নিরাপত্তা শঙ্কায় ভোগেন কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, শত শত আন্দোলনকারীকে হত্যার পরও এ নিয়ে অনুশোচনা বা অপরাধবোধ না থাকা বিস্ময়কর। যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রিত হয়ে আবার যুক্তরাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করা হাস্যকর। তবে বিদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের এ আগ্রাসী আচরণ সরকারের উপদেষ্টা ও রাজনীতিকদের নাজেহাল করলেও এতে দলটিরই ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হচ্ছে বাংলাদেশেরও বদনাম।

আর আক্রান্ত নেতাদের সহকর্মী ও রাজনীতিকরা বলছেন, এ ধরনের আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারকে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে হাঙ্গামায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে সংঘটিত যাবতীয় অপরাধের বিচারের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আসিফ নজরুল, মাহফুজ আলমের পর আখতার-জারা
পতিত আওয়ামী লীগের বিদেশে পলাতক নেতা-কর্মীরা, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় ভোগবিলাসী জীবন যাপন করা দলটির অ্যাক্টিভিস্টরা শুরু থেকেই জুলাই অভ্যুত্থানকে চক্রান্ত বলে আসছেন। এমনকি পুলিশের গুলিতে শত শত আন্দোলনকারীর প্রাণহানির ভিডিও অনলাইনে থাকলেও তারা তা নিয়ে কথা বলতে চান না। জুলাইয়ে প্রায় ১৪শ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যার সমন্বয়ে শেখ হাসিনা নিজে ছিলেন বলে জাতিসংঘ তদন্ত প্রতিবেদন দিলেও সেটিকে পাতানো বলে আসছেন তাদের নেতা-কর্মীরা। উপরন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আক্রোশ থেকে তারা অনলাইনে-অফলাইনে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিকে নানাভাবে টার্গেট করছেন। দিচ্ছেন জানমালের ক্ষয়ক্ষতির হুমকিও।

এর মধ্যে গত নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আওয়ামী লীগের একদল লোকের হাতে হেনস্তার শিকার হন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গভর্নিং বডি এবং সংস্থাটির গুরত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে দেশে ফিরছিলেন। দূতাবাসের প্রটোকলে তিনি গাড়ি করে জেনেভা বিমানবন্দরে পৌঁছান। গাড়ি বিমানবন্দরে নামার পর হাঙ্গামাকারীরা এসে আইন উপদেষ্টাকে ঘিরে ধরে। উপদেষ্টা বিমানবন্দরে প্রবেশের আগ পর্যন্ত হেনস্তাকারী তাকে বিরক্ত করে। সেখানে সুইজারল্যান্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম জমাদার ও সাধারণ সম্পাদক শ্যামল খান উপস্থিত ছিলেন।

এরপর ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা টার্গেট করে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক মাহফুজ আলমকে। সেদিন নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিসে ঢোকার সময় তাকে হেনস্তার চেষ্টা করে তারা। তারা মাহফুজ আলমকে উদ্দেশ করে ডিম ছোড়ে, দেয় বিভিন্ন আগ্রাসী স্লোগান। হাঙ্গামাকারীরা কনস্যুলেট ভবনের কাচের দরজাও ভেঙে ফেলে। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যেও আওয়ামী লীগের টার্গেটে পড়েন মাহফুজ আলম। সেদিন বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব আফ্রিকান অ‍্যান্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ (সোয়াস) ক্যাম্পাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে এক সেমিনারে অংশগ্রহণ শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় তার ওপর হামলার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।

আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা সবশেষ ‘মববাজি’ দেখাল নিউইয়র্কে গত সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় বিকেলে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন আক্রান্ত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মারমুখী কর্মীদের হাতে। তার পিঠে ডিম নিক্ষেপ করেছে পতিত দলটির লোকজন। এছাড়া সেখানে থাকা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং এনসিপির নেত্রী ডা. তাসনিম জারাকেও অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে তারা। এই ঘটনায় আওয়ামী লীগের একজন কর্মীকে আটকও করে নিউইয়র্ক পুলিশ।

দূতাবাসগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিদেশের মাটিতে এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যুত্থানের পর আইন অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ও তার নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা এ ধরনের সুযোগ পাচ্ছে। ‘অনভিপ্রেত’ এসব ঘটনা বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদাকে ভূলণ্ঠিত করবে। ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়,

এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশে দায়িত্বে থাকা দূতাবাসসহ কূটনীতিকদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন সচেতন মহল।

যদিও প্রধান উপদেষ্টার জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে যে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে সেখানে পুলিশ প্রস্তুত থাকবে। পশ্চিমের দেশগুলোতে বাধা দেওয়া, স্লোগান দেওয়া, রাস্তায় মিছিল করা, প্রতিবাদ করার রাস্তা আটকানোর কোনো উপায় আমাদের কেন, কারও নেই। সেসব দেশের সরকার এটা করতে দিতে বাধ্য। ’

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানকালে আওয়ামী লীগের হামলার প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের রাজনৈতিক সফরসঙ্গীদের উপর পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের ন্যক্কারজনক হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, জুলাই আন্দোলনের এক বীরসেনানী এবং একজন নারী নেত্রীর ওপর জঙ্গি কায়দায় হামলে পড়া, নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন আমলে নেবে। ’

তিনি বলেন, ‘আমরা জাতি হিসেবে লড়াই করেছি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য, আর আজ এমন সময়ে এসে যদি আমাদের নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়—তাহলে সেটি কেবল অবহেলা নয়, ইতিহাসের কাছে এক অমার্জনীয় ব্যর্থতা। এই হামলা শুধু ব্যক্তির ওপর নয়, এটি বাংলাদেশের মর্যাদা, আমাদের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার এবং একটি নতুন পথচলার ওপরও হামলা। ’

রাজনৈতিক নেতারা যা বলছেন
নিউইয়র্কের ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দলের নেতারা আওয়ামী লীগের উগ্রবাদী আচরণের নিন্দার পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় দূতাবাসের ভূমিকার সমালোচনা করেন।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকার আমন্ত্রিত এবং সরকার রাজনীতিকদের প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তারা সেখানে গিয়েছেন। তাদের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা অসৌজন্যমূলক। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সম্মান এবং মর্যাদাকে ভূলণ্ঠিত করবে এই আচরণ। এটা কোনো অবস্থাতেই ভালো কাজ হতে পারে না, এটা নিন্দনীয়। ’

তিনি বলেন, ‘তারা কারও ব্যাপারে প্রতিবাদ করতে পারে, প্রতিবাদের বিভিন্ন ভাষা আছে। ডিম নিক্ষেপ করতে হবে কেন? অতীতে তো অনেক প্রতিবাদ হয়েছে। ডিম নিক্ষেপ এক ধরনের আক্রমণাত্মক ভূমিকা। আক্রমণাত্মক ভূমিকা রাখা তো ঠিক নয়। আমরা এটাকে নিন্দনীয় কাজ মনে করি। ’

এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ন টাওয়ারে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যে ক্রমাগত হামলা, ষড়যন্ত্র এবং অপতৎপরতা চলমান রয়েছে, তার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে উপর্যুক্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যখন উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর আক্রমণ হয়েছিল, তখনো আমরা বলেছিলাম, গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের টার্গেট করা হচ্ছে এবং এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা জড়িত। ভেতর থেকে এই তথ্যগুলো লিক (ফাঁস) করা হয়। সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিরাপত্তা প্রদানের যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেই ব্যবস্থাগুলো যথাযথ ছিল না বলে গতকালের ঘটনাটি ঘটছে। ’

সরকার ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে জবাবদিহি চেয়ে তিনি বলেন, ‘এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যে নানা তৎপরতা দেশে-বিদেশে করছে, তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে গতকালের ঘটনাটি দেখতে হবে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকেও বিচার নিশ্চিত করার যে কথা আমরা বারবার বলে আসছি, সেই জায়গায় দুর্বলতা আছে বলেই আওয়ামী লীগ এত তৎপরতা করার সুযোগ পাচ্ছে। ’

নিউইয়র্কের ঘটনাটি নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে যা ঘটেছে তা আবারও প্রমাণ করল– আওয়ামী লীগ তাদের অন্যায়ের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা করে না। আওয়ামী লীগ আজ পর্যন্ত যা অন্যায় করেছে সবকিছুর বিচার আইনের মাধ্যমে হবে। দল ও দেশের স্বার্থে ধৈর্য ধরুন। ’

নির্মল পুরজা : অসম্ভবকে জয় করা এক গুর্খা যোদ্ধার মহাকাব্য

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
নির্মল পুরজা : অসম্ভবকে জয় করা এক গুর্খা যোদ্ধার মহাকাব্য

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাদের জীবন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং একটি জাতির আত্মমর্যাদা, মানবিক সাহস এবং অদম্য সংকল্পের প্রতীক হয়ে ওঠে। তারা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন, অসম্ভবকে সম্ভব করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখান। নেপালের সন্তান নির্মল “নিমস” পুরজা, MBE (২০১৮) ছিলেন তেমনই এক বিরল মানুষ।

তিনি ছিলেন একাধারে Special Boat Service (SBS)-এ যোগদানকারী প্রথম গুর্খা সেনাসদস্যদের একজন (বিশ্বের অন্যতম কঠিন বিশেষ বাহিনী Special Boat Service (SBS) –এর সদস্য), উচ্চতাপর্বতারোহী, লেখক, প্রেরণাদায়ক বক্তা এবং মানবিক উদ্ধারকর্মী। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয়- তিনি প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের মানসিক শক্তি যদি অটুট থাকে, তবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতও তার কাছে অজেয় নয়।

২০১৯ সালে মাত্র ১৮৯ দিনে বিশ্বের ১৪টি ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করে তিনি বিশ্বপর্বতারোহণের ইতিহাস নতুন করে লিখেছিলেন। সেই কীর্তি শুধু একটি রেকর্ড ছিল না; এটি ছিল মানবিক সক্ষমতার এক নতুন সংজ্ঞা। কিন্তু নির্মল পুরজার গল্প শুরু হয়নি এভারেস্টের চূড়ায়। শুরু হয়েছিল নেপালের এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, অথচ স্বপ্ন ছিল আকাশেরও ওপরে।

হিমালয়ের কোলে এক শিশুর জন্ম

১৯৮৩ সালের ২৫ জুলাই, নেপালের মিয়াগদি জেলার দানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নির্মল পুরজা। ধৌলাগিরি পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এই পাহাড়ি জনপদে প্রকৃতি যেমন ছিল অপরূপ, জীবনও ছিল তেমনি কঠিন। শৈশব থেকেই তিনি বরফঢাকা শৃঙ্গ, খাড়া পাহাড়, নদী আর জঙ্গলের মধ্যে বড় হয়েছেন। পাহাড় তার কাছে কোনো ভয়ের প্রতীক ছিল না; বরং ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। হয়তো সেই কারণেই পরবর্তীকালে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক শৃঙ্গগুলোর সামনে দাঁড়িয়েও তিনি অটল থাকতে পেরেছিলেন।

নির্মল পুরজার পরিবার ছিল সাধারণ, পরিশ্রমী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। তার বাবা ছিলেন গুর্খা সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য, যিনি সামরিক জীবনের কঠোরতা ও দেশপ্রেমকে পারিবারিক মূল্যবোধ হিসেবে সন্তানদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন। তার মা ছিলেন একজন গৃহিণী- সহনশীলতা, মমতা ও ত্যাগের এক নীরব প্রতীক। অভাব ছিল, কিন্তু আত্মসম্মানের অভাব ছিল না। পরিবারের সবাই জানতেন, কঠোর পরিশ্রম ছাড়া সাফল্যের কোনো বিকল্প নেই। নির্মল পরে বহুবার বলেছেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে নয়, এসেছে নিজের পরিবার থেকেই। দারিদ্র্য ছিল বাস্তবতা, পরাজয় নয়।

পাহাড়ি পথে দীর্ঘ হাঁটা, নদী পার হওয়া, প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই- এসবই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন। অজান্তেই এই জীবন তাকে এমন শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতা দিয়েছিল, যা পরে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতগুলো জয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। অনেকেই প্রতিকূল পরিবেশকে জীবনের সীমাবদ্ধতা মনে করেন। নির্মল সেটিকেই নিজের শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন।

বিদ্যালয় থেকে জীবনের পাঠ নির্মল স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনায় আগ্রহী হলেও তিনি বইয়ের বাইরের শিক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। খেলাধুলা, দৌড়, পাহাড়ি পরিবেশে চলাফেরা এবং দলগত কাজ- এসব তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে তিনি উপলব্ধি করেন, নেতৃত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে শেখা যায় না; নেতৃত্ব শেখা যায় মানুষের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে, কষ্টকে গ্রহণ করতে গিয়ে এবং সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

কৈশোরেই নির্মল বুঝতে পারেন, তিনি সাধারণ জীবন চান না। তিনি এমন কিছু করতে চান, যা তাকে নিজের সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করবে। এই আকাক্সক্ষাই তাকে সামরিক জীবনের দিকে নিয়ে যায়। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, শৃঙ্খলা মানুষকে শুধু শক্তিশালীই করে না, তাকে নিজের ভয়কে জয় করতেও শেখায়। পরে সেই সামরিক জীবনই তাকে নিয়ে যায় বিশ্বের অন্যতম কঠিন বিশেষ বাহিনীতে। আর সেখান থেকে শুরু হয় এমন এক যাত্রা, যা শেষ পর্যন্ত তাকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ উচ্চতাপর্বতারোহীদের কাতারে স্থান করে দেয়।

২০০৩ সালে মাত্র বিশ বছর বয়সে নির্মল পুরজা ব্রিটিশ আর্মির Brigade of Gurkhas-এ যোগ দেন। গুর্খাদের সাহস, সততা এবং আনুগত্যের ইতিহাস দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে তাদের অসাধারণ অবদানের জন্য গুর্খারা আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত। কিন্তু গুর্খা হওয়া সহজ নয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পৃথিবীর অন্যতম কঠিন সামরিক বাছাই হিসেবে পরিচিত। হাজারো আবেদনকারীর মধ্য থেকে অল্প কয়েকজনই এই বাহিনীতে সুযোগ পান। শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, সহনশীলতা এবং নেতৃত্ব- সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ মান অর্জন করতে হয়। নির্মল সেই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ করেছিলেন, তার ভেতরে অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে।

গুর্খা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক মিশনে অংশ নেন, যার মধ্যে আফগানিস্তান অন্যতম। যুদ্ধক্ষেত্র তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; বরং ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। তিনি পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুদ্ধ তাকে জীবনের অনিশ্চয়তা বুঝিয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান, আর সংকটের সময় শান্ত থাকা একজন নেতার সবচেয়ে বড় গুণ। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে উচ্চতাপর্বতারোহণে তার অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়।

সামরিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় শুরু হয়, যখন তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির Special Boat Service (SBS)-এ নির্বাচিত হন। ঝইঝ বিশ্বের অন্যতম অভিজাত বিশেষ বাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার, বিশেষ গোয়েন্দা অভিযান, সমুদ্রপথে গোপন অপারেশন এবং উচ্চ-ঝুঁকির সামরিক মিশন পরিচালনায় এই ইউনিট বিশ্বব্যাপী খ্যাত। এই বাহিনীতে নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া এতটাই কঠিন যে অধিকাংশ প্রার্থী শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন না। নির্মল পুরজা সেই কঠিন পথ সফলভাবে অতিক্রম করেন এবং SBS-এ যোগদানকারী প্রথম গুর্খা সৈনিক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। SBS-এর প্রশিক্ষণ শুধু শরীরকে নয়, মনকেও নতুনভাবে গড়ে তোলে।

দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম, পাহাড়ি অভিযাত্রা, ভারী সরঞ্জাম বহন, গভীর সমুদ্রে ডাইভিং, প্যারাশুট জাম্প, চরম আবহাওয়ায় টিকে থাকা, ক্লোজ-কোয়ার্টার কমব্যাট এবং মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা- এসবই ছিল তার প্রতিদিনের প্রশিক্ষণের অংশ। এই প্রশিক্ষণ তাকে শিখিয়েছিল একটি মৌলিক সত্য- মানুষের শরীর ক্লান্ত হয় আগে নয়; আগে ক্লান্ত হয় মন। মনকে জয় করতে পারলে শরীর আরও অনেক দূর যেতে পারে। পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত জয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আসলে ঝইঝ-এর প্রশিক্ষণক্ষেত্রেই।

বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক বিশেষ বাহিনীতে কর্মরত একজন সৈনিকের ভবিষ্যৎ সাধারণত নিরাপদ ও সম্মানজনক হয়। অনেকেই সারা জীবন সেই পেশাতেই থেকে যান। কিন্তু নির্মল পুরজার ভেতরে তখন আরেকটি স্বপ্ন বড় হয়ে উঠছিল। ছুটির সময় তিনি নিয়মিত পর্বতারোহণ করতেন। প্রতিটি অভিযানের পর তার মনে হতো, এটাই তার প্রকৃত পরিচয়। তিনি উপলব্ধি করেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; বরং পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোর সঙ্গে।এই উপলব্ধিই তাকে এক কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করায়।

২০১৮ সালে তিনি SBS-এর সফল সামরিক জীবন থেকে সরে দাঁড়ান। অনেকেই তার এই সিদ্ধান্তকে অবিবেচক বলেছিলেন। নিশ্চিত আয়, মর্যাদাপূর্ণ পেশা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছেড়ে অনিশ্চিত পর্বতারোহণে ঝুঁকে পড়া সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু নির্মল বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো নিজের স্বপ্নকে সুযোগ না দেওয়া। পর্বতারোহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ বন্ধক রাখতেও দ্বিধা করেননি। কারণ তার লক্ষ্য ছিল শুধু পাহাড়ে ওঠা নয়- বিশ্বকে দেখানো যে, অসম্ভব বলে পরিচিত সীমাগুলোও ভাঙা যায়।

সামরিক জীবনের শৃঙ্খলা, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা, SBS-এর কঠোর প্রশিক্ষণ এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস-এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই নির্মল পুরজা তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা তৈরি করেন। সেই পরিকল্পনার নাম Project Possible। এটি ছিল এমন একটি স্বপ্ন, যা প্রথমে অবাস্তব বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই স্বপ্ন বিশ্বপর্বতারোহণের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর অর্জনগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

অসম্ভব’ শব্দটির বিরুদ্ধে এক ঘোষণা

উচ্চতাপর্বতারোহণের জগতে ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতগুলোকে বলা হয় Eight-Thousanders। পৃথিবীতে এমন পর্বতের সংখ্যা মাত্র ১৪টি। প্রতিটি শৃঙ্গই মৃত্যু, বৈরী আবহাওয়া, অক্সিজেনের ঘাটতি এবং চরম শারীরিক ঝুঁকির প্রতীক। এই ১৪টি শৃঙ্গ জয় করতে অনেক কিংবদন্তি পর্বতারোহীর লেগেছে বছরের পর বছর। দক্ষিণ কোরিয়ার কিংবদন্তি পর্বতারোহী কিম চ্যাং-হো এই ১৪টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলেন ৭ বছর ১০ মাস ৬ দিনে। তখন সেটিই ছিল বিশ্বরেকর্ড। নির্মল পুরজা ঘোষণা দিলেন-তিনি একই কাজ শেষ করবেন সাত মাসেরও কম সময়ে। অনেকেই এটিকে আত্মবিশ্বাস নয়, দুঃসাহস বলেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বড় পরিবর্তনের শুরু প্রায়ই অসম্ভব বলে মনে হওয়া স্বপ্ন থেকেই হয়।

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল অন্নপূর্ণা আরোহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার ঐতিহাসিক অভিযান। এরপর একের পর এক শৃঙ্গ-

* অন্নপূর্ণা
* ধৌলাগিরি
* কাঞ্চনজঙ্ঘা
* এভারেস্ট
* লোৎসে
* মাকালু
* নাঙ্গা পর্বত
* গাশেরব্রুম-১
* গাশেরব্রুম-২
* কে-২
* ব্রড পিক
* চো ওইউ
* মানাসলু
* শিশাপাংমা

২৯ অক্টোবর ২০১৯, শেষ শৃঙ্গ শিশাপাংমায় পৌঁছে নির্মল পুরজা পৃথিবীকে অবাক করে দেন। মাত্র ১৮৯ দিন (৬ মাস ৬ দিন)-এ তিনি ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এই অর্জন শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি মানুষের সম্ভাবনার সীমাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে অমর নাম

Project Possible-এর মাধ্যমে নির্মল পুরজা Guinness World Records-এ নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে দেন।

তার সবচেয়ে আলোচিত রেকর্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে-

* বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ সবচেয়ে কম সময়ে আরোহণ।
* এভারেস্ট, লোৎসে এবং মাকালুÑএই তিনটি শৃঙ্গ মাত্র প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরোহণ।
* একই মৌসুমে একাধিক আট-হাজারি শৃঙ্গে ধারাবাহিক সফল আরোহণের নজির।

বিশেষজ্ঞদের মতে, Project Possible ছিল আধুনিক পর্বতারোহণের ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে সুপরিকল্পিত অভিযানের একটি।

মৃত্যুর পাহাড়ে ইতিহাস

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ক২ বহু পর্বতারোহীর কাছে এভারেস্টের চেয়েও কঠিন। তীব্র ঠান্ডা, খাড়া বরফঢাল এবং অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে এটিকে প্রায়ই “Savage Mountain” বলা হয়। ২০২১ সালে নির্মল পুরজা দশ সদস্যের সম্পূর্ণ নেপালি একটি দলের সঙ্গে ইতিহাস গড়েন। তাদের দলই প্রথমবারের মতো শীতকালে ক২ সফলভাবে আরোহণ করে। শীর্ষে ওঠার আগে তারা একসঙ্গে নেপালের জাতীয় সংগীত গেয়েছিলেন-যা আজও উচ্চতাপর্বতারোহণের ইতিহাসে এক আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়। এই অভিযানের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, নেপালি পর্বতারোহীরা শুধু সহায়ক নন; তারা নিজেরাই বিশ্বমানের অভিযানের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

নির্মল পুরজার পরিচয় শুধু রেকর্ডধারী পর্বতারোহী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন অভিযানে তিনি বিপদগ্রস্ত বহু আরোহীর উদ্ধারকাজে অংশ নেন। এমনও হয়েছে, নিজের লক্ষ্য ও সময়সূচি পিছিয়ে দিয়ে তিনি অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি নিয়েছেন। ২০১৯ সালে এভারেস্টে দীর্ঘ আরোহী-সারির যে বিখ্যাত ছবি তিনি প্রকাশ করেছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সেই ছবি বাণিজ্যিক পর্বতারোহণ, অতিরিক্ত ভিড় এবং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করে।

নির্মল পুরজার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্য তাঁকে MBE (Member of the Order of the British Empire) সম্মানে ভূষিত করে। এই সম্মান শুধু তার সামরিক জীবনের জন্য নয়; নেতৃত্ব, মানবিক অবদান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুপ্রেরণাদায়ক কাজেরও স্বীকৃতি। পর্বতারোহণের জগতে তার প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, অভিযাত্রী সংগঠন এবং ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান তাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে।

২০২১ সালে মুক্তি পায় নেটফ্লিক্সের বহুল আলোচিত তথ্যচিত্র 14 Peaks: Nothing Is Impossible। এই চলচ্চিত্রে Project Possible-এর প্রতিটি ধাপ, শারীরিক সংগ্রাম, মানসিক চাপ, অর্থসংকট এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাহিনি তুলে ধরা হয়। ডকুমেন্টারিটি মুক্তির পর নির্মল পুরজা শুধু একজন পর্বতারোহী নন; বরং বিশ্বজুড়ে লক্ষ মানুষের কাছে সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

নিজের আত্মজীবনী Beyond Possible- এ নির্মল পুরজা লিখেছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা পাহাড় নয়, নিজের মন। এই বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন- কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনা এবং দলগত নেতৃত্ব থাকলে অসম্ভব বলে মনে হওয়া লক্ষ্যও অর্জন করা যায়। বইটি কেবল পর্বতারোহীদের জন্য নয়; উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, সৈনিক কিংবা যে কেউ বড় স্বপ্ন দেখতে চান- সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার এই অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল একটি রেকর্ড নয়- একটি মানদণ্ড, একটি অনুপ্রেরণা এবং একটি বার্তা: “অসম্ভব বলে কিছু নেই- যদি মানুষ নিজের সীমাকে অতিক্রম করার সাহস রাখে।”

Project Possible– এর পর তিনি থেমে যাননি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তরুণ পর্বতারোহীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, নেপালি শেরপা ও উচ্চতাপর্বতারোহীদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠান Elite Exped–এর মাধ্যমে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল অভিযানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তার প্রতিটি বক্তব্যে একটি কথাই বারবার ফিরে এসেছে- “অসম্ভব” শব্দটি মানুষের মনেই বাস করে; বাস্তবে নয়। তার নেতৃত্বে পরিচালিত বহু অভিযানে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্বতে ফেলে যাওয়া বর্জ্য অপসারণ এবং নিরাপদ আরোহণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি প্রায়ই বলতেন, হিমালয় শুধু নেপালের সম্পদ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির ঐতিহ্য। তাই এই পর্বতমালার প্রতি সম্মান দেখানো প্রতিটি অভিযাত্রীর নৈতিক দায়িত্ব।

শেষ অভিযানের মর্মান্তিক পরিণতি

২০২৬ সালে আবারও তিনি কারাকোরাম পর্বতমালায় অভিযানে যান। লক্ষ্য ছিল বিশ্বের অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ ব্রড পিক। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং অসংখ্য সাফল্যের পরও তিনি জানতেন, পাহাড় কখনো কারও কাছে নিশ্চয়তা দেয় না। উচ্চতাপর্বতারোহণ এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রকৃতির অনুকূলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযানের সময় বৈরী আবহাওয়া ও তুষারধসের ঘটনায় তিনি নিখোঁজ হন। পরবর্তী অনুসন্ধান ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বিশ্ব জানতে পারে-নির্মল পুরজা আর ফিরে আসবেন না। এই সংবাদ শুধু নেপাল বা যুক্তরাজ্যকেই শোকাহত করেনি; সমগ্র আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ সম্প্রদায় গভীর বেদনার সঙ্গে তাকে স্মরণ করেছে। অসংখ্য অভিযাত্রী, ক্রীড়াবিদ, সামরিক কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, তিনি তাদের কাছে সাহস, নেতৃত্ব এবং অধ্যবসায়ের এক অনন্য প্রতীক। বিশ্বের বহু তরুণ আজ নির্মল পুরজার জীবন থেকে শিখছে- স্বপ্ন বড় হতে পারে, পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু অধ্যবসায়, পরিকল্পনা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভব মনে হওয়া লক্ষ্যও অর্জন করা যায়। তার আত্মজীবনী Beyond Possible এবং তথ্যচিত্র 14 Peaks: Nothing Is Impossible ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু সাফল্যের গল্প নয়; বরং আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ববোধের এক অনন্য পাঠ হয়ে থাকবে।

ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। নির্মল পুরজা তাদেরই একজন। আজ তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু যখনই কোনো তরুণ অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখবে, যখনই কোনো অভিযাত্রী প্রতিকূলতার মুখে সাহস ধরে রাখবে, যখনই কোনো মানুষ নিজের সীমা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে-সেখানেই নির্মল পুরজার উত্তরাধিকার নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠবে।

হিমালয়ের বরফ একদিন গলতে পারে, পাথরের গায়ে মানুষের পদচিহ্নও সময়ের সঙ্গে মুছে যেতে পারে। কিন্তু যে মানুষ নিজের সাহস দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে পথ নির্মাণ করেন, তার নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নয়-মানুষের বিশ্বাসে অমর হয়ে থাকে। নির্মল “নিমস” পুরজা- তিনি শুধু বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেননি; তিনি মানুষের সম্ভাবনার উচ্চতাও নতুন করে মেপে দিয়েছেন।

লেখক: সহ-সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের সেই হাতি আদালতের নির্দেশে ফিরছে মালিকের কাছে

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের সেই হাতি আদালতের নির্দেশে ফিরছে মালিকের কাছে

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সড়কে হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জব্দ হয়ে এক সপ্তাহ ধরে থানা হেফাজতে থাকা হাতিটি অবশেষে আদালতের নির্দেশে মালিকের কাছে ফিরছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) আদালত এক আদেশে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে হাতিটি তার প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ২৮ জুলাই দুপুরে সদরপুর উপজেলার আটরশি এলাকায় হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাস বয়সী আরিশা জান্নাত গুরুতর আহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা হাতির মাহুতকে আটক করে গণপিটুনি দেয় এবং হাতিটিকে আটকে রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহুতকে উদ্ধার করে আটক করে এবং হাতিটিকে জব্দ করে সদরপুর থানায় নিয়ে আসে।

পরদিন পুলিশ আটক মাহুত জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার মাদারের চর গ্রামের আনিসউদ্দিনের ছেলে বকুল মিয়াকে (২৪) আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। একই সঙ্গে জব্দকৃত হাতিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে নাকি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে-সে বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করে।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী হাতিটির মালিক হিসেবে নওগাঁ জেলার বাসিন্দা ব্যবসায়ী দুলাল দেওয়ানের কাছে প্রাণীটি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানা গেছে, তিনি নিজে সার্কাস পরিচালনা না করলেও বিভিন্ন সার্কাস দলের কাছে হাতিটি ভাড়া দিয়ে থাকেন।

তবে আদালতের নির্দেশ এলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হাতিটি সদরপুর থানা প্রাঙ্গনেই ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি মালিকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

গত সাত দিন ধরে হাতিটি সদরপুর থানা প্রাঙ্গনে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। এ সময় হাতিটির দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য মালিকের পক্ষ থেকে নাজমুল সরদার (১৭) নামে আরেক মাহুতকে সদরপুর থানায় পাঠানো হয়। তিনি নিয়মিত হাতিটিকে গোসল করানো, খাবার খাওয়ানো, সকালে হাঁটানো এবং সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন।

এক সপ্তাহ ধরে থানায় হাতিটি রাখার ফলে খাদ্যের ব্যবস্থা করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কলাগাছ, ঘাস ও অন্যান্য খাদ্যের প্রয়োজন হয়। থানা প্রাঙ্গণে এমন কোনো স্থায়ী খাদ্যব্যবস্থা না থাকায় পুলিশ ও মাহুতকে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও হাতির মালিকের সহযোগিতায় খাদ্যের ব্যবস্থা করা হলেও তা সবসময় পর্যাপ্ত ছিল না।

থানায় অবস্থানকালে বিশাল আকৃতির হাতিটি স্থানীয় মানুষেরও ব্যাপক কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। প্রতিদিন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সদরপুর থানায় এসে হাতিটিকে দেখতে ভিড় করেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের আদেশ হাতে পেয়েছি। আদালত হাতিটিকে তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুতই হাতিটি মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে বিছানায় গেলেও অনেকের চোখে ঘুম আসে না। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এপাশ-ওপাশ করেন, আবার কারও মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এমন সমস্যা এক-দুদিন হলে চিন্তার কারণ না হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা হতে পারে অনিদ্রা (ইনসমনিয়া)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে বিশ্রাম নিতে পারে না। ফলে পরদিন ক্লান্তি, কাজে অমনোযোগ, খিটখিটে মেজাজ, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এমনকি দীর্ঘমেয়াদে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

অনেকেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে প্রাকৃতিকভাবেই অনিদ্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন হয় অনিদ্রা?

অনিদ্রার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা

বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন)

আশপাশের অতিরিক্ত শব্দ

অস্বস্তিকর বিছানা বা ঘুমের পরিবেশ

মদ্যপানের অভ্যাস

অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ

রাতের শিফটে কাজ করার অভ্যাস

অনিদ্রা দূর করতে যা করবেন

১. নিয়মিত মেডিটেশন করুন

মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে এবং মনকে শান্ত রাখতে কার্যকর। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেডিটেশন করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে।

২. ল্যাভেন্ডার অয়েলের ব্যবহার

ল্যাভেন্ডার অয়েল দীর্ঘদিন ধরে অ্যারোমাথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি মানসিক প্রশান্তি এনে ঘুমে সহায়তা করতে পারে। বালিশে সামান্য স্প্রে করা বা ঘাড় ও কাঁধে অল্প পরিমাণে ম্যাসাজ করেও ব্যবহার করা যায়।

৩. নির্দিষ্ট সময় ঘুমানোর অভ্যাস

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের ‘বডি ক্লক’ বা সার্কাডিয়ান রিদমকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এতে ধীরে ধীরে ঘুমের সমস্যা কমতে পারে।

৪. ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান

ম্যাগনেসিয়াম পেশি শিথিল করতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। ডার্ক চকলেট, বাদাম, অ্যাভোকাডোসহ ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা ভালো।

৫. মেলাটোনিন বাড়ায় এমন খাবার

মেলাটোনিন হলো ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ডিম, দুধ, মাছ, কলা, মাশরুম, বাদাম ও আখরোটের মতো খাবার শরীরে মেলাটোনিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ঘুমানোর আগে মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিনের ব্যবহার কমানোও জরুরি।

৬. নিয়মিত শরীরচর্চা

প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট ব্যায়াম করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম না করে অন্তত তিন ঘণ্টা আগে শরীরচর্চা শেষ করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

৭. ৪-৭-৮ শ্বাস-প্রশ্বাস পদ্ধতি

অনিদ্রা কমাতে ‘৪-৭-৮’ শ্বাস-প্রশ্বাস কৌশল বেশ জনপ্রিয়। এ পদ্ধতিতে চার সেকেন্ড শ্বাস নিতে হবে, সাত সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখতে হবে এবং আট সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে। কয়েকবার অনুশীলন করলে শরীর ও স্নায়ু শিথিল হতে পারে।

আরও কিছু অভ্যাস বদলাতে হবে

ঘুমানোর আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ পান করা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি রাতে অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভারী খাবার ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক রাখলে ভালো ঘুমের সম্ভাবনা বাড়ে।

তবে জীবনযাপনের পরিবর্তনের পরও যদি দীর্ঘদিন অনিদ্রা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকে, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, অনিদ্রা অনেক সময় অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।

সূত্র : কালবেলা