খুঁজুন
, ,

পেশাদার আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আইনি রূপরেখা

তানভীর আহমেদ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫, ১২:৫৭ অপরাহ্ণ
পেশাদার আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আইনি রূপরেখা
২০২২ সালের শেষদিকে যুক্তরাজ্যের একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা অভিযোগ করেন যে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী এবং বিচারবিষয়ক মন্ত্রী ডমিনিক রব তাদের প্রতি বুলিং (বলপ্রয়োগ বা ভয় দেখিয়ে কাউকে কিছু করতে বাধ্য করা) এবং অপমানজনক আচরণ করছেন। অভিযোগগুলো মূলত বিচারবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আসে।  সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক অভিযোগগুলো পর্যালোচনার জন্য অ্যাডাম টলি কেসি-কে Independent Investigator হিসেবে নিয়োগ দেন। টলি যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সিনিয়র ব্যারিস্টারদের একজন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণসংক্রান্ত তদন্ত, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ অনিয়ম অনুসন্ধান এবং কর্মক্ষেত্রে অনৈতিক আচরণসংক্রান্ত বিষয়ে আইনগত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ King’s Counsel খেতাব অর্জন করেন; সেজন্যই তার নামের পশ্চাতে কেসি লেখা হয়। টলি প্রায় পাঁচ মাস ধরে বিস্তারিত তদন্ত ও প্রমাণাদি সংগ্রহ করেন। তদন্তে দুটি ঘটনায় বুলিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন যে অভিযুক্ত মন্ত্রী সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের প্রতি অযথা রূঢ় ও ভয় সৃষ্টিকারী আচরণ করেছেন, যা যুক্তরাজ্যের ‘মিনিস্টিরিয়াল কোড’-এর লঙ্ঘন।  অভিযুক্ত উপপ্রধানমন্ত্রী ডমিনিক রব এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও তদন্তের ফলাফলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ২১ এপ্রিল ২০২৩ উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন অ্যাঞ্জেলা রেইনার; পাশাপাশি তিনি গৃহায়ন, কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল যে তিনি ইংল্যান্ডের হোভ এলাকায় নিজের দ্বিতীয় বাড়ি কেনার সময় ৪০ হাজার পাউন্ডের স্ট্যাম্প ডিউটি (কর) কম পরিশোধ করেছেন। বর্তমান ‘স্বাধীন উপদেষ্টা’ স্যার লরি ম্যাগনাসের তদন্তে অ্যাঞ্জেলার অনিয়ম ধরা পড়ে। এরপর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। ক্ষমতায় আসার পর গত ১৪ মাসে কিয়ার স্টারমারের মন্ত্রিসভা থেকে ৯ জন পদত্যাগ করলেন; যার বেশির ভাগই স্বাধীন উপদেষ্টার তদন্তের ফলস্বরূপ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির যে অভিযোগের মুখে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘সিটি মিনিস্টার’-এর পদ থেকে পদত্যাগ করেন, সেই অভিযোগের বিষয়েও এই স্বাধীন উপদেষ্টাই তদন্ত করেছিলেন।

যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী ও রাজনৈতিক পদাধিকারীদের করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রয়েছে ৩৮ পৃষ্ঠার মিনিস্টিরিয়াল কোডে; যার সর্বশেষ ভার্সনটি নভেম্বর, ২০২৪-এ জারি হয়েছে। সেখানে সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, মন্ত্রী হিসেবে দেশ ও জনগণের সেবা করা একটি বিশেষ সুযোগ ও দায়িত্ব। মন্ত্রীদের উচিত সব ধরনের যোগাযোগ ও কার্যসম্পর্কে ভদ্রতা ও পেশাদারি বজায় রাখা এবং যাদের সঙ্গে তারা কাজ করেন তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও বিবেচনাবোধ প্রদর্শন করা। যাদের সঙ্গে তাদের কাজের সম্পর্ক রয়েছে যেমন সরকারি কর্মচারী, মন্ত্রিসভা ও সংসদীয় সহকর্মী বা সংসদ সচিবালয়ের কর্মচারীদের সঙ্গে সম্পর্ক যথাযথ ও পেশাগত হওয়া উচিত। যে কোনো ধরনের হয়রানি, হুমকি, নিপীড়ন বা বৈষম্যমূলক আচরণ আচরণবিধির পরিপন্থি এবং তা কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না [অনুচ্ছেদ ১.৫]। মন্ত্রীদের অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে হবে এবং কখনো তাদের এমন কোনো কাজ করতে বলা যাবে না, যা সিভিল সার্ভিস কোডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় [অনুচ্ছেদ ১.৬] মন্ত্রী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্ক একটি সহযোগিতা, যা তাদের অভিন্ন বা জনসেবামূলক দায়িত্বের (public service duty) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। মন্ত্রীদের অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে হবে এবং কখনো তাদের এমন কোনো কাজ করতে বলা যাবে না যা সিভিল সার্ভিস কোড এবং ‘সংবিধান সংস্কার এবং সুশাসনসংক্রান্ত ২০১০ সালের আইন’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় [অনুচ্ছেদ ১.৮]। মন্ত্রীদের উচিত এটা নিশ্চিত করা যে সরকারি সম্পদ, যার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত, কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা না হয় [অনুচ্ছেদ-১.১০]।

যদি বলা হয় যে আমাদের দেশেও তো ভালো ভালো আইনকানুন আছে, কিন্তু মানা হয় না। তাহলে তার জবাব কী হবে? না, আমাদের দেশে মন্ত্রীদের করণীয়-বর্জনীয় বিশেষ করে সিভিল সার্ভিসের নিরপেক্ষতা সমুন্নত রাখার বিষয়ে স্পষ্ট বা বিস্তারিত বিধান নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে তার প্রতিকার কীভাবে হবে সেই সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান এই মিনিস্টিরিয়াল কোডের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিভিন্ন উপ-অনুচ্ছেদে পাওয়া যায়। সে মতে, যদি কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেট অফিসকে তথ্য অনুসন্ধানের নির্দেশ দিতে পারেন অথবা তিনি বিষয়টি Independent Adviser on Ministerial Standards-এর কাছে তদন্তের জন্য পাঠাতে পারেন। যুক্তরাজ্যে ‘মন্ত্রীগণের আচরণবিধিবিষয়ক স্বাধীন উপদেষ্টার এই পদটি প্রথম চালু হয় ২০০৬ সালে। তিনি সরকার থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। মন্ত্রী ও অন্যান্য উচ্চ পদাধিকারীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে তদন্তভার প্রদান করে থাকেন। তবে স্বাধীন উপদেষ্টা প্রয়োজন মনে করলে তার কাছে পাঠানো হয়নি, এমন অভিযোগও স্ব-উদ্যোগে তদন্ত শুরু করতে পারেন। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে তিনি  শাস্তি বা ব্যবস্থা সম্পর্কেও সুপারিশ করতে পারেন। যদি তিনি মনে করেন যে তার তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন তবে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বাধ্য করতে পারেন। কোনো মন্ত্রী তার নিজের সততা বা স্বচ্ছতার বিষয়ে উত্থাপিত কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন পরিষ্কার করার জন্য নিজেই তদন্ত শুরু করার অনুরোধ জানাতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন মনে করলে ‘স্বাধীন উপদেষ্টা’ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তিকেও ইনডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটর হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। যেমনটি ঋষি সুনাক ব্যারিস্টার টলিকে উপপ্রধানমন্ত্রী ডমিনিক রবের বিরূদ্ধে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করেছিলেন।

কানাডার নৈতিকতাবিষয়ক কমিশনার (আনুষ্ঠানিক নাম Office of the Conflict of Interest and Ethics Commissioner) হলো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যার মূল কাজ হলো ফেডারেল রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী এবং সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তারা যেন স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে না পড়েন এবং নৈতিক আচরণবিধি মেনে চলেন তা নিশ্চিত করা। তিনিও যুক্তরাজ্যের উপদেষ্টার মতোই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা কারও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে থাকেন। তিনি সরাসরি সংসদকে রিপোর্ট করেন, সরকারি কোনো দপ্তরকে নয়। কানাডায় গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার নাম Public Sector Integrity Commissioner (PSIC); যা সরকারি কর্মকর্তাদের নৈতিকতা, সততা ও সুশাসন রক্ষায় কাজ করে। এই সংস্থাটিও পুরোপুরি স্বাধীন এবং সরকার থেকে আলাদা। সরকারি কর্মকর্তারা নিরাপদে সেখানে যে কোনো অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারেন। কোনো মন্ত্রীর দ্বারা বা রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হলে নাম গোপন রেখেও অনলাইনে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। পিএসআইসি অভিযোগ দায়েরকারীকে সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য তার তথ্য কাউকে প্রদান করে না। অভিযোগ করার কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি বা হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়ার আইনি সুরক্ষাও রয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনে।

যুক্তরাজ্য বা কানাডায় কিংবা অন্য কোনো দেশে অনুসৃত নিয়মনীতির অনুরূপ বিধান আমাদের দেশে চালিয়ে দিতে আমরা বলতে পারি না। তবে এটা জরুরি যে আমরা এই বিষয়গুলো সম্পর্কে উদাসীন না থাকি এবং বিস্তারিত পরীক্ষানিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়নে সচেষ্ট হই। সম্প্রতি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘জনপ্রতিনিধির কর্মপরিধি’ শীর্ষক ৯.৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সুপারিশ করেন যে ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিগণ কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কর্মপরিচালনায় হস্তক্ষেপ করবেন না। কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা রাজনৈতিক ব্যক্তি কোনো সরকারি কর্মচারীকে অন্যায্য ও বিধিবহির্ভূত কাজের জন্য অনৈতিক চাপপ্রয়োগ করলে তিনি বিষয়টি গোপনীয়ভাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অবহিত করবেন বলে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। কোনো বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক লিখিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে উপরস্থ কর্মকর্তা বা উপরস্থ জনপ্রতিনিধি ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই তাকে লিখিতভাবে নির্দেশ প্রদান করতে হবে। মৌখিক নির্দেশ বাস্তবায়ন করা যাবে না এবং মৌখিক নির্দেশে তা কার্যকর করা যাবে না।’ এটি সুপারিশ, স্বভাবতই পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নয়। পূর্ণাঙ্গ বিধান প্রণয়ন অধিকতর পর্যালোচনার দাবি রাখে। উল্লিখিত সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়নের উদ্যোগের বিষয়ে আমার জানা নেই, তবে সরকার নিশ্চয় তা গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছে।

কারও কারও এই লেখা পড়ে মনে হতে পারে, যেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মধ্যেই আমলাতন্ত্রের পেশাদারি নিহিত মর্মে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি মোটেও তা নয়। আমলাতন্ত্রের কাঙ্ক্ষিত নিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণ এবং ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য অনেকগুলো বিষয়ে হাত দিতে হবে। তবে বিশ্বের টপ র‌্যাংকিং ব্যুরোক্রেসির সংস্কার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আমলাতন্ত্রের পেশাদারি বজায়ের উদ্দেশ্যে লিখিত বিধিবিধান থাকা জরুরি; নতুবা দিন শেষে সংস্কারের প্রকৃত সুফল ঘরে তোলা অথবা টিকিয়ে রাখা মুশকিল হতে পারে।  সম্প্রতি একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ব্যুরোক্রেট আমাকে বললেন যে তোমরা অভিযোগ কর রাজনীতিবিদরা তোমাদের কাজের ওপর হস্তক্ষেপ করে; বরং আমি তো বলি তোমরাই কাঙ্ক্ষিত পদায়ন আর পদোন্নতি পেতে নিজেরাই তাদের কাছে ধরনা দিয়ে বেড়াও। তার অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য; তবে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই লেখার মাধ্যমে মূলত আমাদের আর্জি হচ্ছে, যদি কোনো ক্ষমতাসীন পদাধিকারী অন্যায়ভাবে সরকারি কার্যক্রম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে সেই ‘বেচারা’ কর্মচারী যদি চাপের মুখেও আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখার সংকল্প করেন, তবে তার আইনি প্রতিকার আর সুরক্ষা কোন্ পথে হবে? এই ভাবনার খোরাক জোগাতেই এই নিবন্ধের অবতারণা।
লেখক : সরকারের যুগ্ম সচিব, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ

 

ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে সেক আব্দুল্লাহ (৫) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

শনিবার (২০ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত আব্দুল্লাহ উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের চর অমরাপুর গ্রামের সেক শাহেদের ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল পরিবারের সবার ছোট এবং অত্যন্ত আদরের সন্তান।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাড়ির পেছনে খেলাধুলা করছিল আব্দুল্লাহ। এ সময় একটি কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে থাকা বিষাক্ত সাপ তার পায়ে কামড় দেয়। কামড় খাওয়ার পর শিশুটি বাড়িতে এসে মাকে জানায়, তাকে ‘ব্যাঙে কামড় দিয়েছে’। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান, যিনি নিজেকে ঝাড়ফুঁক ও চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন বলে পরিচয় দেন।

শিশুটির চাচি আখি আক্তার জানান, স্থানীয় শহীদ ফকির নামে এক ব্যক্তির কাছে নেওয়ার পর তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, এটি সাপের কামড় নয়। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে কিছু সময় সেখানে কাটানো হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আব্দুল্লাহর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও দুপুরের দিকে শিশুটি মারা যায়।

গাজিরটেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রথমে শিশুটিকে স্থানীয় এক ফকিরের কাছে নেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

আব্দুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো চর অমরাপুর গ্রাম। প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।