খুঁজুন
, ,

কী আছে তারেক রহমানের পরিকল্পনায়?

তানভীর আহমেদ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৪:০২ অপরাহ্ণ
কী আছে তারেক রহমানের পরিকল্পনায়?
বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটিই আলোচনা—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সেই আশাব্যাঞ্জক উক্তি, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)।দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানের এই ঘোষণা দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছে। তারেক রহমানের এই ‘প্ল্যান’ বা পরিকল্পনা আসলে কী, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

তারেক রহমান হুট করে কোনো পরিকল্পনার কথা বলেননি।

তার এই নতুন ‘প্ল্যান’ মূলত তার আগের ঘোষণাগুলোর একটি সমন্বিত রূপ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ‘৩১ দফা’ ঘোষণা করেছিলেন, যা দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তনের একটি ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি ‘ফ্যামেলি কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তার মূল সুর হলো— ‘সবাই মিলে শান্তির দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি’।
তারেক রহমানের পরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো রাষ্ট্র সংস্কারের সেই ৩১ দফা। বিশ্লেষকদের মতে, এই ৩১ দফায় কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান যে নতুন পরিকল্পনার কথা বলছেন, তা সম্ভবত এই ৩১ দফাকে আরও আধুনিক এবং বাস্তবায়নযোগ্য করার একটি সুসংহত রূপ।

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের কাছে তারেক রহমানের ‘ফ্যামেলি কার্ড’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে সাধারণ মানুষ এমন একটি ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছে যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা থাকবে। তারেক রহমান তার পরিকল্পনায় এই কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের কাছে সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন, তা সাধারণ জনগণের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

১৭ বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংবর্ধনা দিয়েছে তার দল। সেখানে তিনি দেশবাসীদের উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেন।

তার বক্তব্যে প্রখ্যাত আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিংয়ের একটি উক্তির প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, মার্টিন লুথার কিংয়ের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে— ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’। আজ বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সকলের সামনে আমি বলতে চাই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হিসেবে আমি বলতে চাই— ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি’। আজ এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য। যদি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়, এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, এই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি যত মানুষ আছেন, প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমাদের লাগবে। আপনারা যদি আমাদের সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ—আই হ্যাভ আ প্ল্যান, আমরা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবো।”

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মতে, তারেক রহমানের এই ‘প্ল্যান’ কোনো কল্পনাপ্রসূত বিষয় নয়। এটি দীর্ঘদিনের গবেষণা এবং দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, এই পরিকল্পনা কেবল বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, বরং ক্ষমতায় যাওয়ার পর দেশকে কীভাবে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন। তারা মনে করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত এবং লক্ষ্য অভিমুখী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ উক্তিটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক কৌশল। এটি একই সাথে রহস্য এবং আশার জন্ম দেয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি তারেক রহমান তার এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে পারেন এবং সুশাসনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে পারেন, তবে তা দেশের রাজনীতিতে একটি বড় মাইলফলক হবে। তবে তারা এটিও সতর্ক করেছেন যে, পরিকল্পনার ঘোষণা যতটা সহজ, তার বাস্তবায়ন ততটাই চ্যালেঞ্জিং।

তারেক রহমানের পরিকল্পনার বিষয়ে কেবল দেশের অভ্যন্তরে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা দেখতে চায় তারেক রহমানের এই পরিকল্পনায় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, মানবাধিকার রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে কী ধরনের অঙ্গীকার রয়েছে। বিদেশি কূটনীতিকরা বিএনপির এই পরিবর্তনশীল এবং সংস্কারমুখী অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলে বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একজন সাধারণ নাগরিক যখন শোনেন যে নেতার কাছে একটি পরিকল্পনা আছে, তখন তিনি সেখানে নিজের উন্নত ভবিষ্যতের ছায়া দেখতে পান। সাধারণ মানুষ এখন সংঘাতের রাজনীতির চেয়ে উন্নয়নের এবং স্থিতিশীলতার রাজনীতি বেশি পছন্দ করে। তারেক রহমানের ‘সবাই মিলে দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি’ সাধারণ মানুষকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, আগামীর বাংলাদেশ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে কোনো বিভেদ থাকবে না।

তারেক রহমানের এই ‘প্ল্যান’ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে এর সফল প্রয়োগের ওপর। তবে বর্তমানে এটি যে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে এবং জনমনে আশার সঞ্চার করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ৩১ দফা, ফ্যামেলি কার্ড এবং জাতীয় ঐক্যের ডাক—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই সম্ভবত তৈরি হচ্ছে তারেক রহমানের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘প্ল্যান’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেছেন, দেশের মানুষ নতুন কিছু দেখতে চায়। তারা চায় পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের জন্য দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। যদি তারেক রহমান তার এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে পারেন এবং সুশাসনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে পারেন, তবে তা দেশের রাজনীতিতে একটি বড় মাইলফলক হবে।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহবায়ক আমিনুল হক বলেছেন, তারেক রহমানের এই পরিকল্পনাটি মূলত দেশের মানুষের উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। এর আওতায় দেশের প্রতিটি পরিবারের নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ প্রবর্তন করা হবে। এছাড়া খেলাধুলাকে একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে ৮০ শতাংশই হবেন নারী। পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে। এছাড়া ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর অংশ হিসেবে ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, এই পরিকল্পনার একটি বড় দিক হলো মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি বন্ধ করা। পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করার প্রতিশ্রুতিও এই পরিকল্পনায় রয়েছে।

আমিনুল ইসলাম উল্লেখ করেন, এগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এগুলো সুপরিকল্পিত উদ্যোগ যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ তার ফেইসবুক পেজে লিখেছেন, একবিংশ শতাব্দীর একজন দূরদর্শী নেতা, যিনি জনগণের জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা এবং জাতির প্রতি গভীর অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছেন।

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ

 

ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে সেক আব্দুল্লাহ (৫) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

শনিবার (২০ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত আব্দুল্লাহ উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের চর অমরাপুর গ্রামের সেক শাহেদের ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল পরিবারের সবার ছোট এবং অত্যন্ত আদরের সন্তান।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাড়ির পেছনে খেলাধুলা করছিল আব্দুল্লাহ। এ সময় একটি কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে থাকা বিষাক্ত সাপ তার পায়ে কামড় দেয়। কামড় খাওয়ার পর শিশুটি বাড়িতে এসে মাকে জানায়, তাকে ‘ব্যাঙে কামড় দিয়েছে’। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান, যিনি নিজেকে ঝাড়ফুঁক ও চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন বলে পরিচয় দেন।

শিশুটির চাচি আখি আক্তার জানান, স্থানীয় শহীদ ফকির নামে এক ব্যক্তির কাছে নেওয়ার পর তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, এটি সাপের কামড় নয়। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে কিছু সময় সেখানে কাটানো হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আব্দুল্লাহর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও দুপুরের দিকে শিশুটি মারা যায়।

গাজিরটেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রথমে শিশুটিকে স্থানীয় এক ফকিরের কাছে নেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

আব্দুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো চর অমরাপুর গ্রাম। প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।