খুঁজুন
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯ মাঘ, ১৪৩২

শীতকালীন অ্যালার্জি থেকে যেভাবে রক্ষা পাবেন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:৩৫ এএম
শীতকালীন অ্যালার্জি থেকে যেভাবে রক্ষা পাবেন

এই শীতে কি আগের চেয়ে বেশি অ্যালার্জির সমস্যা হচ্ছে? শীতকালীন অ্যালার্জির লক্ষণ আসলে সাধারণ মৌসুমি অ্যালার্জির মতোই। তবে শীতের ঠান্ডা ও রুক্ষ আবহাওয়ার কারণে আমরা বেশি সময় ঘরের ভেতরে থাকি। এতে ঘরের ভেতরের অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী জিনিসের (indoor allergens) সংস্পর্শে বেশি আসতে হয়।

শীতে অ্যালার্জি বাড়ানোর কিছু সাধারণ কারণ

– বাতাসে ভাসমান ধুলার কণা

– ডাস্ট মাইট (অতি ছোট পোকা)

– পোষা প্রাণীর লোম ও ত্বকের খোসা

– ছত্রাক বা ফাঙ্গাস (mold)

– তেলাপোকার মল

অ্যালার্জির উপসর্গ কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আগেই সতর্কতা নেওয়া। তবে লক্ষণ অনেক বেড়ে গেলেও উপশম পাওয়ার উপায় আছে।

চলুন আজ জেনে নিই ঘরের কোন কোন জিনিস অ্যালার্জির কারণ হতে পারে, কী কী লক্ষণ দেখা দেয়, কীভাবে চিকিৎসা ও প্রতিরোধ করা যায়, এবং শীতকালীন অ্যালার্জি আর সর্দি-কাশির পার্থক্য কী।

ঘরের ভেতরের অ্যালার্জির কারণ

শীতকালে আবহাওয়া স্যাঁতসেঁতে থাকে এবং আমরা বেশি সময় ঘরের ভেতর থাকি। এতে কিছু নির্দিষ্ট অ্যালার্জির কারণ বেশি সক্রিয় হয়।

অ্যালার্জির লক্ষণ

শীতকালীন অ্যালার্জির সাধারণ লক্ষণগুলো হলো :

– হাঁচি

– নাক বন্ধ বা নাক দিয়ে পানি পড়া

– চোখ চুলকানো

– গলা ও কান চুলকানো

– নাক বন্ধ থাকায় শ্বাস নিতে কষ্ট

– শুকনো কাশি (কখনো কফসহ)

– ত্বকে র‍্যাশ

– শরীর খারাপ লাগা

– হালকা জ্বর

তীব্র অ্যালার্জি হলে (বিশেষ করে হাঁপানি থাকলে) দেখা দিতে পারে :

– বুক চেপে ধরা

– শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ

– দ্রুত শ্বাস নেওয়া

– খুব ক্লান্ত লাগা

– অস্থির বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লাগা

অ্যালার্জি আর সর্দির পার্থক্য

সর্দি হয় ভাইরাসের কারণে, যা অন্য মানুষের কাছ থেকে ছড়ায়। অ্যালার্জি হয় শরীরের প্রতিক্রিয়ার কারণে, যখন কোনো অ্যালার্জির উপাদানের সংস্পর্শে আসা হয়।

সর্দি সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। অ্যালার্জি যতদিন অ্যালার্জির কারণের সংস্পর্শে থাকবেন, ততদিন চলতে পারে।

সংক্ষেপে পার্থক্য

সর্দি : কয়েক দিন থেকে ২ সপ্তাহ থাকে

অ্যালার্জি : কয়েক দিন থেকে মাসের পর মাসও থাকতে পারে

সর্দিতে : শরীর ব্যথা ও জ্বর হয়

অ্যালার্জিতে : সাধারণত জ্বর ও শরীর ব্যথা হয় না

সর্দিতে : চোখ চুলকায় না

অ্যালার্জিতে : চোখ চুলকায় ও পানি পড়ে

চিকিৎসা

অ্যালার্জির বেশিরভাগ উপসর্গ ঘরেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ওষুধ : সিটিরিজিন (Zyrtec), ফেক্সোফেনাডিন (Allegra) মতো অ্যান্টিহিস্টামিন নিয়মিত খেলে উপকার পাওয়া যায়। মাথাব্যথা থাকলে Tylenol জাতীয় ওষুধ কাজে আসে।

নেটি পট বা নাক ধোয়া : পরিষ্কার পানিতে নাক ধুলে ভেতরের অ্যালার্জির উপাদান বের হয়ে যায়।

নাসাল স্প্রে: Flonase বা Nasacort-এর মতো স্প্রে নাকের প্রদাহ কমায়।

অ্যালার্জি শট (ইমিউনোথেরাপি) : দীর্ঘদিনের তীব্র অ্যালার্জি হলে ডাক্তার পরামর্শ দিতে পারেন। এতে ধীরে ধীরে শরীর অ্যালার্জির সঙ্গে মানিয়ে নেয়।

প্রতিরোধের উপায়

শীতে ঘরের অ্যালার্জি কমাতে :

– বালিশ ও ম্যাট্রেসে ডাস্ট-প্রুফ কভার ব্যবহার করুন

– গরম পানিতে নিয়মিত কাপড় ও বিছানার চাদর ধুতে থাকুন

– ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করে ঘরের আর্দ্রতা ৩০-৫০% রাখুন

– HEPA ফিল্টারযুক্ত ভ্যাকুয়াম দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করুন

– সম্ভব হলে কার্পেট বাদ দিন

– ছত্রাক দেখা গেলে ব্লিচ ও পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন

– খাবারের উচ্ছিষ্ট খোলা রাখবেন না

– কোথাও পানি লিক হলে দ্রুত ঠিক করুন

– দরজা-জানালার ফাঁক বন্ধ রাখুন

– পোষা প্রাণীকে শোবার ঘর বা রান্নাঘরে কম ঢুকতে দিন

শীতকালীন অ্যালার্জির লক্ষণ মূলত মৌসুমি অ্যালার্জির মতোই— হাঁচি , চুলকানি, ত্বকের র‍্যাশ, নাক বন্ধ বা নাক দিয়ে পানি পড়া। সঠিক ওষুধ, নাক পরিষ্কার রাখা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে শীতেও স্বস্তিতে থাকা সম্ভব।

তবে কয়েক সপ্তাহ পরও যদি উপসর্গ না কমে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

সূত্র : Healthline

ভাঙ্গার চৌকিঘাটায় মৃত্যু ফাঁদ! ভেঙে পড়া ব্রিজে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হাজারো মানুষের

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও সোহাগ মাতুব্বর, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৫২ এএম
ভাঙ্গার চৌকিঘাটায় মৃত্যু ফাঁদ! ভেঙে পড়া ব্রিজে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হাজারো মানুষের

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ঘারুয়া ইউনিয়নের চৌকিঘাটা এলাকায় ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজের মাঝখান ভেঙে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ঝুঁকিপূর্ণ এই ব্রিজ দিয়েই প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প পথ না থাকায় কাঠ ও বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে পারাপার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চৌকিঘাটা থেকে ঘারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সহজ পথ হলো এই ব্রিজটি। কয়েক মাস আগে ব্রিজের মাঝখানে ফাটল দেখা দিলে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। পরে ঘারুয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আংশিক মেরামত করা হলেও তা টেকসই হয়নি। সর্বশেষ গত শনিবার চৌকিঘাটা থেকে ঘারুয়া সড়কের বিটুমিন ঢালাই কাজ চলাকালে রাস্তা সমান করার রোলার ব্রিজের ওপর উঠলে আবারও ব্রিজের মাঝখান ভেঙে যায়। এরপর থেকে ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

এলাকাবাসী জানান, ব্রিজটি বিশ্বাস বাড়ি ও শেখ বাড়ির মাঝখানে অত্যন্ত সরু করে নির্মাণ করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই পাশের জমি ভরাট হয়ে গেলেও ব্রিজটি আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। ফলে ব্রিজটির কার্যকারিতা অনেকটাই হারিয়েছে। ব্রিজটি সরু হওয়ায় একসঙ্গে দুটি যানবাহন চলাচল করতে পারে না। তার ওপর দুই পাশে কোনো রেলিং না থাকায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা লিয়াকত মাতুব্বর বলেন, “প্রতিদিন এই ব্রিজ দিয়েই আমাদের চলাচল। বাচ্চারা স্কুলে যায়, রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় এখন প্রাণ হাতে নিয়ে পার হতে হচ্ছে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নেবে কে?”

আরেক বাসিন্দা বাদল হোসেন জানান, “এখানে ব্রিজ না রেখে একটা কালভার্ট করা হলে সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে। বারবার মেরামত করে লাভ নেই।”

এ বিষয়ে উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মোহাম্মদ মালিক নাজমুল হাসান বলেন, “ব্রিজটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি আমি অবগত। আপাতত কোনো বরাদ্দ না থাকায় বড় কাজ করা সম্ভব নয়। তবে নির্বাচন শেষ হলে বরাদ্দ পেলে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দ্রুতই আমি নিজে সরেজমিনে ব্রিজটি পরিদর্শন করব।”

এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ্-আবু-জাহের বলেন, “বিষয়টি আগে জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। চৌকিঘাটা মাদ্রাসা সংলগ্ন ব্রিজের মাঝখান ভেঙে পড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে এবং দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে এলাকাবাসী দ্রুত স্থায়ী সমাধান হিসেবে নতুন কালভার্ট নির্মাণের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

টুপি আর ঘোমটা কি সত্যিই ভোট বাড়ায়?

তানহা তাসনিম
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:০৩ এএম
টুপি আর ঘোমটা কি সত্যিই ভোট বাড়ায়?

উদারপন্থি থেকে বামপন্থি, কিংবা স্বতন্ত্র – নির্বাচনী জনসংযোগে প্রায় সব পক্ষের প্রার্থীদেরই পোশাকে পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। টুপি, পাঞ্জাবি, ঘোমটা হয়ে উঠেছে তাদের প্রচারণার পোশাক।

কেবল পোশাকই নয়, ধর্মকে ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশ পুরনো ঘটনা। আর তাতে পিছিয়ে ছিল না ধর্মভিত্তিক কিংবা উদারপন্থি রাজনৈতিক দলের কেউ।

দেখা গেছে, ধর্মভিত্তিক স্লোগান, পোস্টার কিংবা মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারের নজির।

তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বন্দোবস্তে’ ভোটাররা যে পরিবর্তনের আশা করেছিল নির্বাচনী জনসংযোগে, তার প্রতিফলন হয়নি, বরং এবাররের নির্বাচনে ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে।

আর ভোটারদের অজ্ঞতাকেই রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

যদিও নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্মকে ব্যবহারের বিষয়ে আছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কোনো প্রার্থী যদি সেই নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির বিধানও রয়েছে।

নির্বাচনী জনসংযোগে টুপি, ঘোমটা, পাঞ্জাবি

১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলেও বেশ কিছুদিন আগে থেকেই নিজ নিজ আসনে জনসংযোগ করছেন প্রার্থীরা।

বেশিরভাগ সময়ই এসব প্রার্থীদের মসজিদ বা শোকসভার মতো জমায়েতে জনসংযোগ করতে দেখা গেছে, যেখানে বেশিরভাগই পুরুষ প্রার্থীদের পরতে দেখা গেছে টুপি-পাঞ্জাবি আর নারী প্রার্থীরা টেনেছেন ঘোমটা।

বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায় সবাইকেই এই বেশে দেখা গেছে।

তবে এনিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েন ঢাকার এমপি পদপ্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

সম্প্রতি তার জনসংযোগের সময় একজন ধর্মীয় পোশাক পরা ব্যক্তি তাকে হঠাৎ করে টুপি, পাঞ্জাবি পরার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। এসময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

মি. পাটওয়ারীই বা কেন এখন এসে এই পোশাককে প্রয়োজনীয় মনে করলেন?

“নির্বাচন আসলে এটা থাকে। আর সমাজে যারা উপরস্থ, মসজিদ বা বাজার কমিটির সভাপতি- তাদের বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের উপরে থাকে। ফলে তারা ঐ সময় ধর্মচর্চাটা করেন – পাঞ্জাবি, টুপি পরেন।

“তো তাদের সাথে যখন কমিউনিকেশন হয়, তখন ঐ ধরনের একটা কালচারাল জায়গা চলে আসে। যেহেতু এটা ৯০ পারসেন্ট মুসলমানের দেশ এবং ভোটার রেশিওটা মুসলমানদের মধ্যেই বেশি – তখন ওই ইস্যুটা চলে আসে” বিবিসি বাংলাকে বলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দলের নেতাদের অনেক আগে থেকেই ধর্মীয় পোশাক পরতে দেখা গেলেও, নির্বাচনী জনসংযোগের সময় তারা ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহার করছেন- উঠছে এমন অভিযোগও।

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার আগে খোদ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত ডিসেম্বরে সেদিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, “ভোটের রাজনীতিতে, জাতীয় রাজনীতিতে ধর্মের নামে ভোট চাওয়া হচ্ছে”।

‘লেবাস পরিবর্তনকে’ ভোটাররা কীভাবে দেখেন

গত ১৩ই জানুয়ারি নিজের ফেসবুক পাতায় এনিয়ে একটি পোস্ট দেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ।

সেখানে তিনি লেখেন, “নির্বাচন উপলক্ষ্যে প্রচারণায় টুপির ব্যবহার বেড়েছে। এটা এদেশে নতুন নয়। এতে যে কাজ হয় না তাও তো বলা যায় না! নিশ্চয়ই কাজ হয়, না হলে এত এত স্মার্ট প্রার্থীরা এই কৌশল নিবেন কেন!”

যদিও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে নির্বাচনের আগ দিয়ে পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টিকে খুব বেশি ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না ভোটারদের অনেকে।

এনিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শাজেদুজ্জামান সৌমিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটাতো হিপোক্রেসি হয়ে গেল না?”

“সবার রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি থাকে, সেখান থেকে কেউ যদি ফলো করে, সেটা বেটার। কিন্তু লেবাস পরে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করাতো কাম্য নয়”, বলেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেকজন শিক্ষার্থী রুমানা খাতুন বলেন, “আমি সচেতন হলে ব্যক্তি দেখে ভোট দেবো, কিন্তু মেজরিটি মানে গ্রামের দিকে দেখা যায়, যারা তাদের মতো রিলিজিয়াস মাইন্ডের তাকে ভোট দেবে”।

ফলে সেখানে পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি কাজে দেবে বলেই মনে করেন তিনি।

বিষয়টিকে অনেকটা একইভাবে দেখেন নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মোবারক। “এটা আসলে লোক দেখানোর জন্য, নির্বাচন চলে গেলে তারা আগের লেবাসে চলে যায়”, বলেন তিনি।

এমন কোনো প্রার্থীকে ভোট দেবেন না বলেও জানান ওই ব্যবসায়ী।

তবে কেউ যদি “লেবাস ধারণ করে ভালো ইলেকশন করতে পারে” তাতে কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মাহমা আলম শান্তা।

আপাতভাবে বেশিরভাগ ভোটারদের চোখে বিষয়টিকে প্রতারণা মনে হলেও প্রার্থীরা কেন ধর্মীয় পোশাকের দিকে ঝোঁকেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন, “একটা হলো ক্লিন ইমেজ দেয়া, কারণ অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলের অভিযোগ আছে। এছাড়া ঋণ খেলাপি, দুর্নীতি এগুলোতো কমবেশি আছেই”।

ফলে ধর্মীয় পোশাক পরে ভোটারদের মন জয় করা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরির উদ্দেশ্যেই তারা এধরনের পোশাক পরেন বলে মন্তব্য করেন এই বিশ্লেষক।

অতীতেও দেখা গেছে ধর্মের ব্যবহার

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগই হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ফলে লম্বা সময় ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার এই অংশে নির্বাচন তথা রাজনীতিকে কেন্দ্র করে হয়েছে ধর্মের ব্যবহার।

আলতাফ পারভেজ তার পোস্টে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর টুপি পরার একটি প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।

“মুসলিম লিগে যোগ দেয়ার আগে টুপি পরা ব্যক্তি জিন্নাহ’র ছবি পাওয়া মুশকিল। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে টুপির আনুষ্ঠানিক অভিষেক ১৯৩৭ এর নির্বাচনের পর থেকে। ঐ নির্বাচনে মুসলিম লিগ অতি খারাপ ফল করে। জিন্নাহ তখন তার ও দলের রাজনীতির মোড় বদল ঘটান।… তারপর ১৯৪৬ এর নির্বাচনে কী ঘটলো সেটা সবার জানা। মূলত সে-ই থেকে টুপির রাজনৈতিক কদর বেশ!”, লেখেন তিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ালী লীগের নির্বাচনী পোস্টারের ওপর “আল্লাহু আকবর”, “পাকিস্তান জিন্দাবাদ”, “আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ”, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব – জিন্দাবাদ” লেখা ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফ্যাস্টোতে লেখা ছিল, “কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করতে দেয়া হবে না”।

১৯৭১ সালের তেসরা জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে জনসভা শেষে “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর” বলে স্লোগান দেন শেখ মুজিবুর রহমান।

যদিও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ১৯৭৫ সালে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন তৈরি করেন।

১৯৭৫ সালে সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও রাজনীতিতে দেখা যায় ধর্মের ব্যবহার।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় সংবিধানের মৌলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর চূড়ান্ত আস্থা এবং বিশ্বাস’ সংযুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে মি. আহমদের ভাষায় “সংবিধানের ইসলামিকরণ” শুরু হয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদটি যেখানে সকল ধরনের সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল, একটি ধর্মে বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, তা তুলে দেয়া হয়।

কোলাবরেশন অ্যাক্ট বাতিল করে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে সহায়তা করা হয়। এমনকি জিয়াউর রহমান একটি প্রক্লেমেশন আদেশের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় দল গঠনের ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা তুলে দেন।

এতে আরও বলা হয়, নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এরশাদ জনগণের ধর্মীয় আবেগকে তার সরকারের সমর্থনের ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও ধর্মকে সামনে আনে রাজনৈতিক দলগুলো। সেসময় শাহজালালের মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আজান বন্ধ হয়ে যাবে, মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি দেয়া হবে। একইসাথে নির্বাচনের সময় তাদের দলের একটি স্লোগান ছিল, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ধানের শীষে বিসমিল্লাহ”।

সেই নির্বাচনে জয়ী হয় দলটি।

পরের নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে একইভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে তাদের একটি স্লোগান ছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’।

অন্যদিকে ওমরাহ হজ করে এসে মাথায় কালো কাপড়, লম্বা হাতার ব্লাউজ আর হাতে তসবিহ নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন শেখ হাসিনা। সেই নির্বাচনে তিনিও নির্বাচনী সফর শুরু করেন শাহজালালের মাজার জিয়ারত করে। প্রার্থনারত অবস্থায় তার ছবি ছাপিয়ে করা হয়েছিল পোস্টার।

নির্বাচনে ধর্ম ব্যবহারের এই দৌরাত্ম্য নব্বইয়ের দশকে শেষ হয়নি। চলেছে পরবর্তী সময়েও।

২০২৩ সালে ইসলামী আন্দোলনের মেয়র পদপ্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেছিলেন, “আপনি যদি হাতপাখা প্রতীকে ভোট দেন, তাহলে ভোটটা পাবে ইসলাম এবং আল্লাহর নবী”।

একই বছর সিলেটের এক নির্বাচনী জনসভায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “এই নৌকা নূহ নবির নৌকা।”

তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ধর্মকে ব্যবহারের সবচেয়ে বড় নজির দেখা যাচ্ছে এবারের নির্বাচনে।

ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভোটের নামে ‘জান্নাতের টিকিট’ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

কয়েকদিন আগে ‘বিড়িতে সুখটানের মধ্যেও দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত দিলে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারে’ বলে মন্তব্য করেন ঝালকাঠিতে জামায়াতের প্রার্থী ফয়জুল হক।

আবার প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোকে নবী ইব্রাহিমের চেয়ে বড় কোরবানি বলে মন্তব্য করেন আরেক জামায়াত নেতা।

যদিও ধর্মকে ব্যবহারের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। গত মাসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, “আমরা ধর্মকে কখনই ব্যবহার করি নাই, করবো না”।

নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহারের প্রবণতা কেন?

অজ্ঞতার কারণেই ধর্মকে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “দেশের বেশিরভাগ মানুষ হচ্ছে অজ্ঞ, মূর্খ। তারা মুসলমান কিন্তু আরবি জানে না, কুরআন বোঝে না”।

ফলে সহজেই তাদের অনুভূতিকে ‘সুড়সুড়ি’ দিয়ে তাদের বশ করা যায় কিংবা উসকানি দেয়া যায়। “তো সেটা সবাই ব্যবহার করে”।

কিন্তু ধর্মের ব্যবহার কি আসলেই নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেয়?

“নব্বইয়ের দশকের দুই’তিনটা নির্বাচন ধরলে, মনে হয় ধর্মভিত্তিক পোশাক, স্লোগান কিছু ভোটারকে প্রভাবিত করেছে এবং ওই দলগুলোর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে”, বলেন অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা।

তবে অনেকের মতে, ধর্মীয় পোশাক পরলে আসলেই যদি জনসাধারণ প্রভাবিত হতো, তাহলে আগের নির্বাচনগুলোতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোই সরকার গঠন করতো। বরং তাদের ভোটের হিসাব এদিক দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রই দিচ্ছে।

“(ভোটার)কনভিন্স হলেতো শুরু থেকে জামায়াতে ইসলামীই ক্ষমতায় থাকতো। ইসলামী আন্দোলন বা যারা আছে তারাতো ভোটের বাজারে কখনোই সুবিধা করতে পারে নাই”, বলছিলেন মহিউদ্দিন আহমদ।

“আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির লক্ষ্য থাকে মুসলমানরা যাতে তাদের খাটি মুসলমান মনে করে ভোট দেয়। তখন তারা একটু ইসলামী লেবাস নেয় আর কি”।

নির্বাচনী আচরণবিধিতে আছে ধর্ম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহারের এত নজির থাকলেও ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নির্বাচনী আচরণবিধিতে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

নির্বাচনী আচরণবিধির ১৫ ধারা অনুযায়ী মসজিদ, মন্দির, ক্যায়াং (প্যাগোডা), গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।

নির্বাচনী আচরণবিধি ৭-এর (চ) অনুযায়ী, প্রচারণার ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুনের ছবি হতে হবে পোট্রেট, দেয়া যাবে প্রার্থনারত বা অন্য কোনো ভঙ্গিমার ছবি।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

এআই-নির্ভর অপতথ্য কীভাবে নির্বাচনকে বিপর্যস্ত করতে পারে?

সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৭ এএম
এআই-নির্ভর অপতথ্য কীভাবে নির্বাচনকে বিপর্যস্ত করতে পারে?

নির্বাচন শুধু ব্যালটের লড়াই নয়, এটি বিশ্বাসের পরীক্ষা। ভোটার যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তখন তিনি ধরে নেন- যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা সত্য। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্বাসটাই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে। নির্বাচনী নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে নীরবে কাঁপিয়ে দিচ্ছে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও, অডিও ও ছবি- যাকে আমরা ডিপফেক বলি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে যে অভিজ্ঞতা সামনে এসেছে, তা এক কথায় উদ্বেগজনক। অপতথ্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু এআই অপতথ্যকে দিয়েছে ভয়ংকর গতি, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিস্তার। আগে একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত; এখন কয়েক মিনিটেই তা লাখো মানুষের স্ক্রিনে পৌঁছে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে ভোটার আচরণ, প্রার্থীর ভাবমূর্তি এবং পুরো নির্বাচনী পরিবেশের ওপর।

ডিপফেক মূলত ডিপ লার্নিংভিত্তিক এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, যা দেখতে ও শুনতে একদম আসল সত্যের মতো। যেমন- কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলছেন বা এমন কাজ করছেন- ভিডিওতে তা স্পষ্ট দেখা যায়- কিন্তু বাস্তবে তিনি কখনোই তা করেননি। এখানেই বিপদ। মানুষ চোখে দেখা জিনিসকে সহজে বিশ্বাস করে। লেখা বা পোস্টের তুলনায় ভিডিওর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি।

ডিপফেকের পাশাপাশি আছে চিপফেক- এআই নয়, বরং সস্তা সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি বিকৃত কনটেন্ট। সত্য ভিডিও বা ছবি কেটে-ছেঁটে, প্রসঙ্গ বদলে, ভুল ক্যাপশন জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। ফলাফল প্রায় একই- ভোটার বিভ্রান্ত হয়, সত্য আড়ালে চলে যায়।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-১ আসনের একটি ঘটনা বাংলাদেশের ডিপফেক বাস্তবতার ভয়াবহ দিকটি সামনে আনে। ভোটের দিন সকালে এক প্রার্থীর ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলতে দেখা যায়। অনেক ভোটার বিভ্রান্ত হন। নির্বাচন এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল; তার ওপর এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর অপতথ্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা- সবখানেই নির্বাচনে ডিপফেক ব্যবহারের নজির আছে। কোথাও ভোটারদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কোথাও প্রার্থীর চরিত্র হনন করা হয়েছে, কোথাও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে।

সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম এখন ভিডিও। গ্রাফিকস, ছবি বা লিখিত পোস্টের তুলনায় ভিডিও অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ ভিডিও আবেগে আঘাত করে, দ্রুত বিশ্বাস তৈরি করে এবং শেয়ার হয় বেশি। বাংলাদেশে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্যের হার চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একই মিথ্যা ভিডিও বা বক্তব্য একযোগে বহু পেইজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হচ্ছে। এটিই সংঘবদ্ধ অপপ্রচার। এখানে ব্যক্তি নয়, কাজ করছে নেটওয়ার্ক- যাকে অনেকে বলেন বটবাহিনী।

এআই অপতথ্য এতটা কার্যকর হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো ডিজিটাল লিটারেসির দুর্বলতা। বাংলাদেশের বড় অংশের মানুষ এখনো জানেন না কীভাবে অনলাইনের তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে আসল-নকল আলাদা করতে হয়। ফলে ডিপফেক বা চিপফেক সহজেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

সমস্যা আরও গভীর, যখন দেখা যায় রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি এমনকি কিছু গণমাধ্যমও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো যাচাইহীন তথ্যকে সত্য ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন বা প্রকাশ করছেন। এতে অপতথ্যের বৈধতা যেন আরো বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ তখন ধরে নেন- নেতা বা মিডিয়া বললে নিশ্চয়ই সত্য।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে মূলত দুই ধরনের গোষ্ঠী কাজ করে। একদল রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে উৎসাহিত। তাদের লক্ষ্য ক্ষমতা, প্রভাব বা প্রতিশোধ। অন্য দলটি অর্থের বিনিময়ে কাজ করে- এটি তাদের কাছে একটি ব্যবসা। এ ছাড়া রয়েছে ভুয়া পরিচয়ের অসংখ্য পেইজ ও অ্যাকাউন্ট, যেগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে। একটি মিথ্যা তথ্য আগে ছড়ানো হয়, তারপর সেটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে একই কনটেন্ট বারবার পোস্ট করা হয়। অ্যালগরিদম তখন সেটিকে ‘ট্রেন্ডিং’ মনে করে আরো ছড়িয়ে দেয়। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে বসেও বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এতে দেশের ভেতরের পরিস্থিতি আরো অস্থির হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ডিপফেক এবং এআই অপতথ্যকে শুধু নির্বাচনী সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। কারণ এর মাধ্যমে—

• ভোটারদের ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা যায়

• সহিংসতা উসকে দেয়া যায়

• রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নষ্ট করা যায়

• নির্বাচন পরবর্তী অস্থিরতা তৈরি করা যায়

বিশ্বের কিছু দেশে ডিপফেক ও সাইবার আক্রমণের কারণে নির্বাচন পেছানোর নজিরও আছে। অর্থাৎ এটি শুধু তথ্যযুদ্ধ নয়, এটি গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে একটি নীরব যুদ্ধ।

বাংলাদেশে অপতথ্য মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে সাইবার নজরদারি, ফ্যাক্টচেকিং, বিশেষ সেল গঠন ইত্যাদি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই উদ্যোগগুলো কি বাস্তব ঝুঁকির তুলনায় যথেষ্ট? ডিপফেক প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি আমাদের সক্ষমতা বাড়ছে? অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, নজরদারি থাকলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। অপতথ্য ছড়ানোর পর ব্যবস্থা নেয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কয়েকটি বিষয় নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে-

• ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ- সবাইকে শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে সন্দেহ করতে হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত কর্মসূচি নেয়া জরুরি।

• রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য অপতথ্যকে হাতিয়ার করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার।

• গণমাধ্যমকে আরো সতর্ক হতে হবে। সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট যাচাই ছাড়া প্রকাশ করলে মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

• আইনি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদার করতে হবে। ডিপফেক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

এআই নিজে কোনো শত্রু নয়। এটি একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। কিন্তু নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে এআই যদি অপতথ্যের অস্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। আজ যদি আমরা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিই, কাল এর ফল হবে ভয়াবহ। নির্বাচন মানে শুধু ক্ষমতা বদল নয়, এটি নাগরিকের বিশ্বাসের প্রতিফলন। সেই বিশ্বাস ভাঙলে রাষ্ট্রই দুর্বল হয়। তাই ডিপফেক এবং এআই অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর কোনো বিকল্প ইস্যু নয়- এটি গণতন্ত্র রক্ষার মূল লড়াই।

সিরাজুল ইসলাম : লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক