খুঁজুন
বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৯ বৈশাখ, ১৪৩৩

ফরিদপুরে ইজিবাইক চোরচক্রের জাল ভেঙে দিল পুলিশ: ১৮টি ইজিবাইক উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১২

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:২৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ইজিবাইক চোরচক্রের জাল ভেঙে দিল পুলিশ: ১৮টি ইজিবাইক উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১২

ফরিদপুরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ ইজিবাইক চোরচক্রের মূল রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। আন্তঃজেলা এই চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে ১৮টি ইজিবাইকসহ বিপুল পরিমাণ খণ্ডিত যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রটি চুরি করা ইজিবাইক কেটে অংশবিশেষ আলাদা করে আবার নতুনভাবে জোড়া লাগিয়ে বিক্রি করত—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. রায়হান গফুর, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজমীর হোসেনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশ জানায়, ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় দায়ের করা একটি ইজিবাইক চুরির মামলার সূত্র ধরে এই চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। মামলার বাদী জাহিদুল ইসলাম (৪০), পেশায় একজন ইজিবাইক চালক। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার দিকে তিনি শহরের কোর্টপাড় জামে মসজিদের সামনে তার ইজিবাইক তালাবদ্ধ করে ব্যক্তিগত কাজে আদালতে যান। প্রায় ৪৫ মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন তার ইজিবাইকটি আর সেখানে নেই। পরে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি কোতয়ালী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এ ঘটনায় পেনাল কোডের ৩৭৯ ধারায় মামলা রুজু হয় এবং তদন্তভার দেওয়া হয় এসআই মো. নুর হোসেনের ওপর।

তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আলাল ফকির (২৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের নাম প্রকাশ করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে একে একে চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন—মোজাম্মেল মণ্ডল (৪৬), মো. ইলিয়াস হোসেন (৫০), মো. আবুল হোসেন মোল্লা (৬০), তানভীর শেখ (৩০), আওয়াল বিশ্বাস (৬৫), বদিউজ্জামান মোল্লা (২৭), মৃদুল মীর মালোত (২৯), মিলন খান (৪২), মো. আশরাফ (২৮), শহিদ সিকদার (৩৮), মো. জুয়েল রানা (৩৪) এবং মো. রনি মিয়া (৩১)। তারা ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাগুরা ও জামালপুর জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে চুরি ও চোরাই ইজিবাইক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্যমতে, এই চক্রটি অত্যন্ত কৌশলী উপায়ে অপরাধ পরিচালনা করত। প্রথমে তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে ইজিবাইক চুরি করত। এরপর গোপন গ্যারেজে নিয়ে ইজিবাইক ভেঙে চ্যাসিস, বডি, গ্লাস, কেবিনসহ বিভিন্ন অংশ আলাদা করা হতো। পরে এসব খণ্ডিত অংশ একটির সঙ্গে আরেকটি জোড়া লাগিয়ে নতুন ইজিবাইক তৈরি করা হতো। চোরাই ইজিবাইক শনাক্ত করা কঠিন করতে ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর পরিবর্তন করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করা হতো। এরপর কম দামে সাধারণ মানুষের কাছে এসব ইজিবাইক বিক্রি করা হতো।

তদন্তে আরও জানা যায়, চক্রটি ভুয়া গ্যারেজের আড়ালে এই কার্যক্রম পরিচালনা করত। এসব গ্যারেজে চোরাই ইজিবাইক মেরামতের নামে কেটে টুকরো করা, নম্বর পরিবর্তন এবং নতুনভাবে জোড়া লাগানোর কাজ চলত। তারা ভুয়া সিলমোহরযুক্ত প্যাড ব্যবহার করে ইচ্ছামতো ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর বসিয়ে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করত। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছিল।

পুলিশের অভিযানে মোট ১৮টি ইজিবাইক উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি সচল এবং ৬টি অচল। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে ৪টি চ্যাসিস, ১টি বডির কাটা অংশ, ৭টি গ্লাস ফ্রেম, ৩টি কেবিন, ২টি মাঝের বেড়া, ২টি পিছনের বেড়া, ২টি বাম্পার, ১টি সকেট জাম্পার, ১টি কাটার মেশিন এবং ৫ ট্রাক পরিমাণ খণ্ডিত যন্ত্রাংশ। বুধবার সকালে আরও একটি ইজিবাইক জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ফরিদপুরের বোয়ালমারী, মধুখালী, শরীয়তপুরের নড়িয়া এবং মাগুরার মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব ইজিবাইক উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া ইজিবাইকগুলোর মধ্যে একটি ২০২৫ সালের একটি চুরি মামলার বলে শনাক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা একটি সংঘবদ্ধ আন্তঃজেলা চোরচক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ইজিবাইক চুরি করে তা খণ্ডিত অংশে ভেঙে ফেলে এবং পুনরায় জোড়া লাগিয়ে নতুন ইজিবাইক হিসেবে বিক্রি করত। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছিল। তিনি আরও জানান, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত আরও সদস্য থাকতে পারে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেছে, অস্বাভাবিক কম দামে ইজিবাইক কেনা থেকে বিরত থাকতে এবং ক্রয়ের আগে বৈধ কাগজপত্র যাচাই করতে। কোনো সন্দেহজনক তথ্য পেলে নিকটস্থ থানায় জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।

পুলিশের এই সফল অভিযানে ফরিদপুরসহ আশপাশের জেলায় ইজিবাইক চুরির প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সৃষ্টি নয়, স্রষ্টাই একমাত্র উপাস্য

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ
সৃষ্টি নয়, স্রষ্টাই একমাত্র উপাস্য

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
أَمِ ٱتَّخَذُوۤاْ آلِهَةً مِّنَ ٱلأَرْضِ هُمْ يُنشِرُونَ (٢١)
সরল অনুবাদ :
তারা যেসব মাটির দেবতা গ্রহণ করেছে, সেগুলি কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম?

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

আরবের মুশরিকরা মাটির তৈরী যেসব দেবতা গ্রহন করেছিলো সেগুলো যে সম্পূর্ণ মিথ্যা-বানোয়াট সেটা বুঝানো উদ্দেশ্য। তাই জিজ্ঞাসা করা হয়েছে অস্বীকৃতির জন্য।

অর্থাৎ, যারা কোন জিনিসেরই ক্ষমতা রাখে না তাদেরকে কিভাবে মুশরিকরা আল্লাহর শরিক বানায় ও তাদের ইবাদত করে? (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
يُنشِرُونَ মানে হচ্ছে, কোন পড়ে থাকা প্রাণহীন বস্তুকে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়া। (কুরতুবি)

এতে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, যেসব সত্তাকে তারা ইলাহ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং যাদের তারা নিজেদের উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করছে তাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে যে, নিষ্প্রাণ বস্তুর বুকে সামান্য প্রাণ সঞ্চার করতে পারে? যদি এক আল্লাহ ছাড়া এটা আর কেউ করতে সক্ষম না হন- আর মুশরিকরা তো নিজেরাই একথা স্বীকার করে যে, আল্লাহ ছাড়া এটা করতে আর কেউ সক্ষম না – তাহলে এতকিছুর পরও তারা কিভাবে এগুলোকে উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করছে এবং কেন করছে? (ইবন কাসির, ফাতহুল কাদির, তাফসিরে জাকারিয়া)

শিক্ষা ও বিধান

১. মানুষ যেসব মাটির বা সৃষ্টি করা জিনিসকে উপাস্য বানায়, তারা কোনো ক্ষমতার অধিকারী নয়।

প্রকৃত ক্ষমতা শুধু আল্লাহর।
২. মূর্তি বা যা সৃষ্টি করা হয়েছে তা কখন-ই কোনো কিছুকে জীবন দিতে পারে না।
তাই এই আয়াতের উত্তর হলো- স্পষ্ট: না। জীবন দেওয়া ও নেওয়া একমাত্র আল্লাহর কাজ।

৩. অন্ধ অনুসরণ নয়—যুক্তি দিয়ে ভাবতে হবে। যদি কোনো ‘দেবতা’ জীবন দিতে না পারে, তবে সে কিভাবে উপাস্য হতে পারে?
৪. মানুষ যা নিজেরাই সৃষ্টি করে (যেমন মূর্তি), তা কখনোই সৃষ্টিকর্তা হতে পারে না। সৃষ্টি আর স্রষ্টার পার্থক্য এই আয়াতে স্পষ্ট। তাই সব মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করা উচিত।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও করণীয়

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ
হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও করণীয়

তীব্র দাবদাহ চলছে দেশজুড়ে। গরমে কেউই স্বস্তিতে নেই।

শুধু গরম লাগা বা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ার কষ্ট নয়, এই তীব্র গরমে হতে পারে হিট স্ট্রোক বা এরকম নানা শারীরিক জটিলতা। তবে একটু চেষ্টা করলেই এই প্রচণ্ড গরমেও এসব জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

‘হিট স্ট্রোক’ কথাটির মাধ্যমেই বোঝা যায় যে, তাপ থেকে স্ট্রোক হতে পারে। গরমে যেকোনো সময় যে কেউই হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন।

হিট স্ট্রোককে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মারাত্মক শারীরিক অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। হিট স্ট্রোকের রোগীর দ্রুত চিকিৎসা না হলে মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, কিডনি ও শরীরের নানা অঙ্গে তার প্রভাব পড়তে পারে।

আক্রান্ত ব্যক্তির অঙ্গে অসাড়তা, কোমা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

হিট স্ট্রোকের লক্ষণ কী কী?

* শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়া, ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটও হয়ে যেতে পারে। এ সময় তেমন ঘাম হয় না।

* শরীরের ভারসাম্যে সমস্যা হতে পারে, কথা জড়িয়ে যেতে পারে, ব্যবহারে অসংলগ্নতা টের পাওয়া যায়।

* মাথা ঘোরা ও বমি হতে পারে।

* ত্বকের রং হঠাৎই লাল হয়ে যেতে পারে, শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে ত্বকের রংও লাল হয়ে যায়।

* শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে যায়, হৃদস্পন্দনও বেড়ে যেতে পারে।

* মাথায় প্রবল ব্যথা অনুভব হতে পারে।

* প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

* খিঁচুনি ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।

হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে দ্রুত যা করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কারো মধ্যে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত তাকে ছায়ার মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। গায়ের অতিরিক্ত কাপড় খুলে ফেলে রোগীকে শীতল করার ব্যবস্থা করতে হবে। মোজা-জুতা খুলে ফেলতে হবে।

আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রা কমাতে ঠাণ্ডা বা বরফ মিশ্রিত পানি দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। বিশেষ করে রোগীর বগল, কুঁচকি, ঘাড়সহ নানা স্থান ভেজা তোয়ালে দিয়ে বারবার মুছে দিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে শুইয়ে দিয়ে পা একটু উঁচু বা মাথা একটু নিচের দিকে রাখাটা ভালো।

রোগীর জ্ঞান থাকলে পানি, ডাবের পানি, ফলের শরবত অথবা খাবার স্যালাইন পান করতে দিতে হবে। যদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, তবে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া লাগবে। এ অবস্থায় ঘরে চিকিৎসা করার সুযোগ নেই।

প্রতিরোধে করণীয়

* সূর্যের রোদের সবচেয়ে প্রখরতার সময়টুকু এড়িয়ে চলুন, প্রয়োজনে সে সময় ছাতা নিয়ে বের হোন। কিংবা বড় কোনো হ্যাট ও সানগ্লাস রাখুন বাইরে বের হওয়ার সময়।

* শরীরে পানিশূন্যতা যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখুন। গরমে ও রোদে প্রচুর পরিমাণ পানি, ডাবের পানি, স্যালাইন খান।

* দুপুরের প্রচণ্ড রোদে ভারী কাজ বা শারীরিক ব্যায়াম করবেন না।

* গরমে বাইরে বেরোলে সাদা বা হালকা রঙের কাপড় পরুন।

* গরমের সময় চা, কফি, সিগারেট যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন, এগুলো শরীরে পানিশূন্যতা বাড়িয়ে দেয়।

* শরীর ঠান্ডা রাখে এমন খাবার খান

 

ট্রাম্প অপশক্তির এক বাস্তব রূপ

তহমিনা মিলি
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ
ট্রাম্প অপশক্তির এক বাস্তব রূপ

কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার মনে নানা ধরনের বিচিত্র ছবি ভেসে উঠছে। কিছু পুরোনো সিনেমার চরিত্র, যা শৈশবে দেখেছিলাম। কিছু সাহিত্য বা বিখ্যাত শিল্পকর্মের অংশ। এগুলোর মধ্যে একটি মিল আছে, সেগুলোয় অতিরঞ্জিত, প্রায় অস্বাভাবিক এক ধরনের অশুভ তৎপরতা দেখা যায়।

এ ছবিগুলো যেন বাস্তবের ভয়াবহ দৃশ্যগুলোকে বোঝার চেষ্টা করছে। গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে বের করা মৃতদেহ, ইরানে একটি স্কুলে বোমা হামলায় নিহত শিশুদের ছবি, দক্ষিণ লেবাননে লাখো মানুষের ঘরছাড়া হওয়া। মনে পড়ে যায় এক চলচ্চিত্রের দৃশ্য, যেখানে একজনকে চোখ খোলা রেখে জোর করে সবকিছু দেখানো হচ্ছে, সে চোখ বন্ধ করতে পারছে না।

সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো, এ নির্মমতা কত সহজে ঘটছে, যেন এটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এ মৃত্যু ও বিশৃঙ্খলার মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন উপস্থিতি। তাকে এমন এক চরিত্রের মতো মনে হয়, যে খেলা শুরু করতে চায়; কিন্তু তার পরিণতি নিয়ে ভাবে না।

ট্রাম্পের আচরণকে কোনো নির্দিষ্ট কৌশল বা পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা কঠিন। তার সিদ্ধান্তে নিরীহ মানুষের মৃত্যু এবং পুরো সভ্যতাকে হুমকি দেওয়ার মতো বক্তব্য বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত চিন্তা নেই। তার কাজগুলো অনেক সময় হঠাৎ আবেগ ও ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে আসে।

অনেকে মনে করেন, ট্রাম্পের এই স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির অভাব তাকে আগের স্বৈরশাসকদের মতো বিপজ্জনক করে তোলে না। কারণ অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা পরিকল্পিতভাবে কাজ করত। যেমন কেউ কেউ বলেন, কাউকে ফ্যাসিস্ট বলতে হলে তার সেই উদ্দেশ্য থাকতে হবে। তাদের মতে, ট্রাম্প অদক্ষ, অস্থির এবং অনেক সময় বিভ্রান্তিকর, কিন্তু তাকে ফ্যাসিস্ট বলা যায় না।

ট্রাম্প ফ্যাসিবাদের প্রচলিত ধরনও অনুসরণ করেন না। তিনি বড় বড় সমাবেশ করেন না, ইউনিফর্ম পরেন না বা বারান্দা থেকে উত্তেজনামূলক ভাষণ দেন না। তিনি এখনো পুরোপুরি সংবিধান ভেঙে ফেলেননি বা গণতন্ত্র ধ্বংস করেননি। তাকে অনেক সময় এক ধরনের অদ্ভুত, হাস্যকর চরিত্র মনে হয়, যার ভেতরের ভাবনা তার সামাজিক মাধ্যমে রাগী পোস্ট বা এলোমেলো বক্তৃতায় প্রকাশ পায়। তিনি ইরান যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেন বিশাল এক ইস্টার খরগোশের পাশে দাঁড়িয়ে, আবার নিজেকে যিশুর মতো দেখিয়ে ছবি পোস্ট করেন। অনেক সময় বলা হয়, তিনি শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যান। যেন এমন এক চরিত্র, যে প্রথমে তাড়া করে, পরে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হলে সরে যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মন্দ কি আসলে এমনই নয়? বড় কোনো পরিকল্পনা নয়, বরং ছোট মানসিকতা ও ভয়ের প্রতিফলন। সহিংসতার ফল নয়, বরং তা প্রয়োগ করার মধ্যেই যে সন্তুষ্টি পাওয়া যায় সেটাই এখানে মুখ্য। ট্রাম্পের নিজের প্রশংসা করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রতি ক্ষোভ, গণমাধ্যমের সমালোচনায় রাগ, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি, সবকিছুই যেন এক ধরনের অপমানবোধ ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা।

এ ছোট মানসিকতার মধ্যেই এক ধরনের সীমাহীন অশুভ উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। ১৯৩১ সালে, অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি পার্টি জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর এক মার্কিন সাংবাদিক তার সাক্ষাৎকার নেন। তিনি পরে লেখেন, প্রথমে মনে হয়েছিল তিনি জার্মানির ভবিষ্যৎ স্বৈরশাসকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার মনে হয়, এ মানুষটি আসলে খুবই তুচ্ছ এবং গুরুত্বহীন।

আরেক সাংবাদিক বেনিতো মুসোলিনিকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, তার ভঙ্গিমা, অঙ্গভঙ্গি এবং ভাষণ অনেক সময় হাস্যকর মনে হতো। কিন্তু এই হাস্যকর দিকটি তাকে কম বিপজ্জনক করে তোলে না। কারণ কোনো কিছু মজার বা অদ্ভুত মনে হলেও, সেটি যে বিপজ্জনক নয়, এমনটা ভাবা ভুল।

আমরা সাধারণত ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে অনেক বেশি গুরুতর ও সুসংগঠিত হিসেবে দেখি, যা বর্তমান সময়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি না। এর কারণ হলো, মানুষের পক্ষে হাস্যকর বা অদ্ভুত রূপে প্রকাশ পাওয়া মন্দকে চিনতে কঠিন লাগে। এভাবেই তা ধীরে ধীরে আমাদের সামনে আসে। তাই আমরা পরে অবাক হয়ে ভাবি, অতীতে এত বড় অপরাধ কীভাবে ঘটতে পারল। আসলে মন্দ খুব কমই স্পষ্ট খলনায়কের রূপ নিয়ে আসে। এটি আসে ভাঙা মানুষের রূপে, যাদের শক্তি থাকে নিজেদের পূর্ণ করার এক অদম্য ইচ্ছায়, পরিণতি যাই হোক না কেন। ট্রাম্পের অদ্ভুত আচরণের পাশাপাশি এ বাস্তবতাও আছে যে, তার হাতে রয়েছে পারমাণবিক ধ্বংসের ক্ষমতা এবং সংঘাত বাড়ানোর প্রবল প্রবণতা।

মন্দের ভেতরে থাকে হালকাভাব, উদাসীনতা এবং ভঙ্গুরতা, আবার একই সঙ্গে থাকে নির্মমতা ও বিরামহীন আগ্রাসন। মনে পড়ে একটি সিনেমার কথা। সেখানে দেখানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যেখানে বছরে এক দিন সব অপরাধ বৈধ। এর উদ্দেশ্য মানুষের ভেতরের ক্ষোভ ও অন্ধকার বের করে দেওয়া, যাতে বছরের বাকি সময় শান্ত থাকে। কিন্তু সেখানে মানুষ শুধু অপরাধ করেই থেমে থাকে না। তারা নানা পোশাক পরে, মুখোশ ব্যবহার করে, গান বাজায় এবং যেন এক ধরনের উৎসবের মতো করে এই সহিংসতা উপভোগ করে।

এই গল্পটি দেখায়, অপরাধ শুধু কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সঙ্গে থাকে এক ধরনের প্রদর্শন। মানুষ যখন বড় অপরাধ করে, তখন সেটিকে তুচ্ছভাবে উপস্থাপন করার মধ্যেই তারা এক ধরনের শক্তি অনুভব করে। কাজটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই স্বাধীনতা বা অনুমতি। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর পদক্ষেপ নয়, সেটিকে উদযাপনের মতো করে উপস্থাপন করাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ ধরনের উল্লসিত নিষ্ঠুরতার সামনে কাউকে খুশি করার চেষ্টা বা মজা নেওয়া কোনো সমাধান নয়। এটিকে ছোট করে দেখা বা বলা যে, এতে কোনো আদর্শ বা কৌশল নেই, তাই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, এমন ধারণাও ভুল। দেশের ভেতরে ও বাইরে যে নির্মমতা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, তা থামাতে হলে শক্তভাবে এবং দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নইলে এটি সবকিছু গ্রাস করে ফেলবে।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার কলামিস্ট। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি