খুঁজুন
রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন, ১৪৩২

খামেনিকে হত্যা করা হলো যেভাবে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১০:২৫ এএম
খামেনিকে হত্যা করা হলো যেভাবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে।

রোববার (১ মার্চ) দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ তাসনিম ও ফার্স সংবাদ সংস্থা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি রোববার সকালে জানায়, ‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাত বরণ করেছেন’।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার পর খামেনি মারা গেছেন বলে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।দুটি মার্কিন সূত্র ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার ভোরে ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা চালানোর সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় খামেনি ও তার শীর্ষ সহযোগীরা নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সচিব আলি শামখানি ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপোর।

ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হামলার ঠিক আগে শামখানি ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সচিব আলি লারিজানির সঙ্গে খামেনি একটি সুরক্ষিত স্থানে বৈঠক করছিলেন।

শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবনের স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করেছিল আল জাজিরা। স্যাটেলাইটে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, খামেনির প্রাসাদটি ধসে গেছে। এটির চারপাশ কালো হয়ে গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। তবে হামলার প্রকৃতি, ব্যবহৃত অস্ত্র কিংবা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন খামেনির মেয়ে, জামাতা ও নাতি। এ ঘটনার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, আয়াতুল্লাহ খামেনি নিজেও নিহত হয়েছেন।

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘খামেনি, ইতিহাসের অন্যতম দুষ্টু ব্যক্তি, মারা গেছেন। এটি শুধু ইরানের জনগণের জন্য ন্যায়বিচার নয়, বরং সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেই মহান আমেরিকানদের জন্যও ন্যায়বিচার, যারা খামেনি ও তার রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী দলের হাতে নিহত বা ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। তিনি আমাদের গোয়েন্দা ও অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার নজর এড়াতে পারেননি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আমরা নিশ্চিত করেছি যে তিনি বা তার সঙ্গে নিহত অন্য নেতারা কিছুই করতে পারেননি।’

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘এটি ইরানের জনগণের জন্য নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় সুযোগ। আমরা শুনছি যে তাদের আইআরজিসি, সামরিক বাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ও পুলিশ বাহিনীর অনেকেই আর যুদ্ধ করতে চান না এবং আমাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা (ইমিউনিটি) চাইছেন।’

তিনি যোগ করেন, ‘‘যেমন আমি গত রাতে বলেছি, ‘এখন তারা নিরাপত্তা পেতে পারে, পরে তারা শুধু মৃত্যুই পাবে!’ আশা করা যায়, আইআরজিসি ও পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে ইরানি দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে একীভূত হবে এবং একসঙ্গে কাজ করে দেশকে তার প্রাপ্য মহত্ত্বে ফিরিয়ে আনবে।’’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে ৭ দিনের সরকারি ছুটি ও ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠলেন?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠলেন?

তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।

বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় ইরানের শাসন পদ্ধতি বেশ আলাদা। সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বা সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হলেও দেশের মূল ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে।

সাম্প্রতিক বছরগুলােতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে।

এমনকি দেশটির অন্য কােন নেতা নন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিই কেন আমেরিকা বা ইসরায়েলের টার্গেটে সেই প্রশ্নও বহু বছর ধরে আলােচনায় আছে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার শাসনের এই ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে। একটি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্রকে উৎখাত করা হয়। তাকে উৎখাতের পর ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর দেশটি দুজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা পেয়েছে। তাদের পদবী হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়, শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে যার অর্থ সিনিয়র ধর্মীয় নেতা।

সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ ছিলেন।

এছাড়া দেশের সব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সম্মতি দরকার হত। এমনকি ইরান পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী হবে কিনা অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতা করবে কিনা, এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তিনি দিতেন।

ইরানের সর্বোচ্চ এই ধর্মীয় নেতা মারা যাওয়ার পর পরবর্তী নেতা কে হবেন কিংবা কীভাবে নির্বাচিত হবেন সে প্রশ্নও সামনে আসছে।

ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় দেশটির জনগণের নেতা নির্বাচনে কার্যত কোন এখতিয়ার থাকে না।

এমনকি সামাজিক মাধ্যমে কেউ মি. খামেনির সমালোচনা করলে সেজন্যও তাকে জেলে যেতে হতে পারে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কে?

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পণ্ডিতের ঘরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করেন, পরে যান শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে।

১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন।

তরুণ আলী খামেনি খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। তার নিজের ভাষায়, তিনি যা করেছেন এবং এখন যা বিশ্বাস করেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।

আলী খামেনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর, আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে সহায়তাও করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯৮১ সালের জুন মাসে, তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার ওপর ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

দুই মাস পর, একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে।

রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আট বছর ধরে আনুষ্ঠানিক এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি।

ওই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন।

সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরে

১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে।

যদিও তিনি সংবিধানে নির্ধারিত শিয়া ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদমর্যাদা বা ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জন করতে পারেননি।

পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়। সংশোধনীনে বলা হয়েছিল যে, সর্বোচ্চ নেতাকে “ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। পরে রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়েছিল।

ইরানের সংবিধানে তখন আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।

ইরানের সংবিধানও পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির হাতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল।

নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। যাদের অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেননি।

১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। মি. খাতামি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন।

মি. খাতামি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তখন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

মি. খাতামির পরে তার উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। মি. আহমাদিনেজাদকে কেউ কেউ আয়াতুল্লাহ খামেনির অনুসারী মনে করতেন।

কিন্তু অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতি নিয়ে আহমাদিনেজাদ সরকারের অবস্থান তখন ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

একই সাথে মি. আহমাদিনেজাদ নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সাথে তার বিরোধিতা হয়।

সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনঃ-নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়।

সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ওই নির্বাচনের ফলাফল বৈধ বলে ঘোষণা দেন এবং তীব্র আন্দোলন দমনে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই দমন অভিযানে অনেক বিরোধী কর্মী নিহত হন, গ্রেফতার হন হাজার হাজার মানুষ।

২০১৩ সালে ইরানের উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেন। এই চুক্তি খামেনির সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়।

তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে বাধা দেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। রুহানি সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে একটি ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে।

সোলেইমানি আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন।

এই হামলার পর খামেনি সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

পরে তিনি বলেছিলেন, ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল ‘আমেরিকার গালে চপেটাঘাত’।

খামেনি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন, “এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।”

শীর্ষ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনি বহুবারই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০১৮ সালে তিনি ইসরায়েলকে “একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার” আখ্যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরায়েলকে মুছে ফেলার ফেলার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্ট বা ‘ইহুদি গণহত্যা’ আদৌ ঘটেছিল কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

২০১৪ সালে তার টুইটার অ্যাকাউন্টে উদ্ধৃত একটি বার্তায় বলা হয়েছিল: “হলোকাস্ট এমন এক ঘটনা যার বাস্তবতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, আর যদি ঘটেও থাকে, সেটা কীভাবে ঘটেছিল, তাও স্পষ্ট নয়।”

২০২০ সালে, আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং ইরানের সরকার দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল।

প্রথম সংকটটি শুরু হয় ওই বছর আটই জানুয়ারি। তখন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ভুল করে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা ১৭৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি নাগরিক।

ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার ফলে ইরানের ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কট্টরপন্থী সংবাদপত্রগুলি তার পদত্যাগের দাবি জানায় এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভের নতুন ঢেউ ওঠে দেশটিতে।

সেসময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলির ব্যবহারও করে বলে অভিযোগ ছিল।

সে সময় শুক্রবারের জুমার নামাজের বিরল এক খুতবায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, “বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত”। তবে তিনি তখন সামরিক বাহিনীর পক্ষই নিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুরা এই ট্র্যাজেডিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ইরানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ছড়িয়ে পড়ে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রথমে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখেছিলেন, বলেছিলেন যে ইরানের শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।

সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বাছাই হয় কীভাবে?

২০২১ সালে ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা এব্রাহিম রাইসি।

গত বছর মানে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৯শে মে ইব্রাহিম রাইসি এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেলে প্রেসিডেন্ট পদটি শূন্য হয়ে যায়।

রাইসির মৃত্যুর পর জুলাইয়েই ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সংস্কারপন্থী নেতা মাসুদ পেজেশকিয়ান।

গত কয়েক বছর ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনি নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছিলেন। ফলে তিনি মারা গেলে বা পদত্যাগ করলে কে হবেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা, গত কয়েক বছর ধরেই সে প্রশ্ন ঘিরে দেশটিতে নানা জল্পনা-কল্পনা ছিল।

এক সময় আয়াতোল্লোহ খামেনির পরবর্তীতে ইব্রাহিম রাইসিকেই পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হবেন বলেই মনে করা হচ্ছিল।

২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষের সময় তাকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম জানিয়েছিলেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপাের্টে বলা হয়েছিল।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এ পদে কে থাকবেন তা নির্ধারণ করেন বিশেষজ্ঞমণ্ডলী বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস নামে ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার একটি পরিষদ।

ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতোল্লা আলি খামেনিই ছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে আসীন দ্বিতীয় ব্যক্তি।

এই মণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচন করা হয় প্রতি আট বছর অন্তর। কিন্তু কারা গোষ্ঠীর সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন তা নির্ভর করে দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল নামে একটি কমিটির অনুমোদনের ওপর।

আর এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।

অর্থাৎ এই দুটি পরিষদ বা মণ্ডলীর ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে। গত তিন দশক ধরে আলী খামেনি নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষজ্ঞ মণ্ডলীর নির্বাচিত সদস্যরা যেন রক্ষণশীল হয় – যারা তার উত্তরসূরি নির্বাচনের সময় তারই নির্দেশ মেনে চলবে।

নির্বাচিত হবার পর, সর্বোচ্চ নেতা তার পদে আজীবন বহাল থাকতে পারেন।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হবে একজন আয়াতুল্লাহকে, অর্থাৎ যিনি একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা। কিন্তু আলী খামেনিকে যখন নির্বাচন করা হয়েছিল, তিনি আয়াতুল্লাহ ছিলেন না।

তখন তিনি যাতে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

সবুজ বাইপাস সড়কটিতে এখন ময়লার ভাগাড়, বিপাকে সালথার মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
সবুজ বাইপাস সড়কটিতে এখন ময়লার ভাগাড়, বিপাকে সালথার মানুষ

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়কটি একসময় ছিল প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ঘেরা একটি মনোরম পথ। সবুজ গাছপালা, খোলা বাতাস আর শান্ত পরিবেশের কারণে বিকেলবেলা হাঁটাহাঁটি কিংবা অবসর সময় কাটানোর জন্য এটি ছিল স্থানীয়দের প্রিয় স্থান।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সৌন্দর্য হারিয়ে এখন সড়কটি পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে জমে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনার স্তূপ। বাজারের পচা ফলমূল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও নিষিদ্ধ পলিথিনসহ নানা ধরনের ময়লা ফেলা হচ্ছে এখানে। এসব বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ, যা পথচারীদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই নাক-মুখ চেপে কিংবা মাস্ক ব্যবহার করে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যক্তি রাতের আঁধারে ভ্যানযোগে বাজারের ময়লা এনে সড়কের পাশে ফেলে রেখে যায়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন ময়লার স্তূপ আরও বড় হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয় পথচারী শামিম হোসেন বলেন, “এই সড়কটি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এই পথ ব্যবহার করে। আগে এটি ছিল খুবই সুন্দর, কিন্তু এখন দুর্গন্ধে চলাচল করাই কঠিন হয়ে গেছে।”

আরেক পথচারী সোহেল মোল্যা বলেন, “একসময় এই রাস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবাইকে আকর্ষণ করত। এখন সেখানে শুধু ময়লার স্তূপ। দাঁড়িয়ে থাকাও যায় না। বাধ্য হয়ে মাস্ক ব্যবহার করতে হচ্ছে।”

বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, “এভাবে ময়লা ফেলার কারণে আমাদের ব্যবসা ও চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”

বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সরোয়ার হোসেন বাচ্চু জানান, পূর্বে প্রশাসনের নির্দেশনায় এখানে ময়লা ফেলা হলেও পরে তা বন্ধ করে নদীর পাশে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার কথা বলা হয়। বর্তমানে যদি কেউ নিয়ম ভেঙে এখানে ময়লা ফেলে, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “সালথা সদর বাজারের ময়লা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। খুব শিগগিরই একটি নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সড়কটি পরিষ্কার করে নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ না করলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ: টিকে থাকবে নাকি বাতিল?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ৭:১৭ এএম
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ: টিকে থাকবে নাকি বাতিল?

বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে জারি করা স্পর্শকাতর বেশকিছু অধ্যাদেশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিএনপি সরকারের।

তবে নবনির্বাচিত এই সরকার দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বহাল রেখে এর আইনি ভিত্তি দিতে পারে।

তাদের আপত্তি আছে, আলোচিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশসহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তির ভবিষ্যত নিয়ে। এগুলোর ভাগ্যে কী রয়েছে- চলছে এমন আলোচনা।

আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলছেন, অল্প সময়ে এত অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে; সেক্ষেত্রে প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য গড়ে পাঁচ দিনের কম সময় লেগেছে।

এখন নতুন বা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে আগামী ১২ই মার্চ।

শাহদীন মালিক উল্লেখ করেন, সংসদ বসা থেকে ৩০ দিনের মধ্যে যে অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দেওয়া সম্ভব হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মৃত’ বা বাতিল হয়ে যাবে।

যদিও বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশগুলো তারা যাচাই-বাছাই করছে।

কিন্তু কতটি বা কোন অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দেবে তারা, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।

অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তার প্রশ্ন কেন আসছে?

জুলাই গণ-অভ্যত্থানে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের তিনদিন পর গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

এই সরকারের প্রতি সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সে সময় সক্রিয় সব রাজনৈতিক দল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া সেই সরকার যখন কিছু আদেশ এবং একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করেছে, তখনই স্পর্শকাতর কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির আপত্তি ছিল।

বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য আদেশ জারি করার সময়ই আপত্তি জানিয়েছিল বিএনপি। দলটি এমন আদেশ জারির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল।

ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠনের পরও ওই ইস্যুতে পুরোনো অবস্থানেই রয়েছে বলে মনে হয়েছে।

তাদের সেই অবস্থানের প্রকাশও দেখা গেছে, বিএনপি এবং এর মিত্র দলগুলো মিলে ২১২জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

যদিও জামায়াত ও এনসিপির জোটের নির্বাচিতরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন।

বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রশ্নে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন এখনো হয়নি। তাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা করবেন।

আইনজ্ঞদের অনেকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোট হয়েছে। তাতে হ্যাঁ বিজয়ী হয়েছে। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশ নিয়েই যেহেতু বিএনপির আপত্তি, ফলে এ সম্পর্কিত আদেশ ও অধ্যাদেশের ভাগ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছে।

এই আইনজীবীর বক্তব্যও বিএনপির অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বলেন, “অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানের কোনো অংশ বাতিল বা পরিবর্তন করা যায় না। সেখানে বেশকিছু অধ্যাদেশ করা হয়েছে, যেগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক”।

এদিকে, বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, গণভোট, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩২ বছর করা, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করাসহ স্পর্শকাতর কিছু বিষয়ে অধ্যাদেশের ব্যাপারে তাদের সরকার এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এটুকুই বলেছেন, তারা সব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছেন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্য সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেবে না বর্তমান সরকার। তারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং একেবারে প্রয়োজনীয় কিছু অধ্যাদেশ বাছাই করছেন। সেগুলোই সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করে আইনে পরিণত করা হবে।

আইনজ্ঞরা বলছেন, বিএনপি সরকার যেহেতু এখনো স্পষ্ট করছে না তাদের অবস্থান, যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলছে- ফলে শেষপর্যন্ত কতটা অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি তারা দেবে, এমন কথা যেমন উঠছে, আলোচনায় আসছে অনিশ্চয়তার প্রশ্ন।

দায়মুক্তিতে আপত্তি নেই বিএনপির

যে অধ্যাদেশ নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, আপত্তি তুলেছিলেন মানবাধিকার সংগঠক ও আইনজীবীদের অনেকে- সেটি হচ্ছে দায়মুক্তির অধ্যাদেশ।

জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সপ্তাহ তিনেক আগে ২৫ শে জানুয়ারি জারি করা হয় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’।

এই অধ্যাদেশে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহার করা হবে। এছাড়া নতুন কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে আইনত বাধা (বারিত) হবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধও সংগঠিত হয়েছে। কিন্তু অধ্যাদেশের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া সংবিধান পরিপন্থি।

তাদের এমন অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন জুলাই আন্দোলনকারীরা।

যদিও অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সে সময় ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ চাইলে সরকারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে পারবেন। তবে এতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি মানবাধিকার সংগঠকেরা।

কিন্তু আলোচিত এই দায়মুক্তির অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেবে বিএনপি সরকার, এমন ধারণা পাওয়া গেছে।

এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, দায়মুক্তির এই অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়ার চিন্তা তাদের রয়েছে।

এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যত্থানে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ১৪০০ প্রাণহানি ও অনেকে আহত হয়েছেন। ফলে এখানে আবেগ-অনুভূতির বিষয় আছে। সেটি বিবেচনায় নিচ্ছে বিএনপি সরকার।

বিএনপি এই অধ্যাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নেবে না, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্য দলগুলো দায়মুক্তির অধ্যাদেশের পক্ষেই রয়েছে। বিএনপিও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে এই অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি পাওয়ার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা কম।

তবে সরকারের একাধিক সূত্র এ-ও বলেছে, গণ-অভ্যত্থানের সময় পুলিশ হত্যার ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করার চিন্তাও রয়েছে বিএনপি সরকারে।

এদিকে, আইনজীবী শাহদীন মালিক বলছেন, “দায়মুক্তির অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করা হলেও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে”।

গণভোট প্রশ্নে কী করবে বিএনপি

সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে গণভোট নিয়ে নির্বাচনের আগে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট ছিল না, এমন অভিযোগ তুলেছিল জামায়াতসহ অন্য দলগুলো।

অবশ্য নির্বাচনী প্রচারণার এক পর্যায়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে হ্যাঁ ভোট চেয়েছিলেন।

এখন বিএনপির সরকার গণভোট সম্পর্কিত অধ্যাদেশের ব্যাপারে কী অবস্থান নেবে, তাও স্পষ্ট করছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা বলছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার আগেই উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে তারা বিষয়টাতে সিদ্ধান্ত নেবেন।

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হয়েছে। ফলে এ সর্ম্পকিত অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং সংস্কারের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।

এছাড়াও জুলাই আন্দোলনের ‘স্পিরিটের’ বিপক্ষে বিএনপি যেতে পারবে না। এমন বাস্তবতায় স্পর্শকাতর এই বিষয়টিতেও বিএনপিকে পক্ষে অবস্থান নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

চাকরিতে ঢোকার বয়সের সীমা বৃদ্ধি, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার অধ্যাদেশ যখন জারি করা হয়, তখন বিএনপি, জামায়াতসহ কোনো দলই আপত্তি করেনি।

দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সক্রিয় সব দলেরই ওই অধ্যাদেশের ব্যাপারে এক ধরনের সায় ছিল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তবে বিএনপির রাজনৈতিক সরকার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে কতটা জায়গা দেবে, সে ব্যাপারে আলোচনা আছে। নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রথম সংবাদসম্মেলনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে পারা না পারা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তারেক রহমান বলেছেন, আইন অনুযায়ী হবে।

তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ওই অধ্যাদেশের ব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট করেনি বিএনপি। ফলে এ নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানতে অপেক্ষা করতে হবে।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩২ বছর করা হয়েছে যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে, সেই অধ্যাদেশকেও স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করছে বিএনপি সরকার। এ অধ্যাদেশ নিয়েও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে তারা।

তবে এই অধ্যাদেশ বাতিল করা হলে তরুণদের ভেতরে বিএনপির প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ফলে বিএনপি সরকারকে এই বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

আইনজীবী শাহদীন মালিক যেমনটা বলছিলেন যে, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনেক অধ্যাদেশ আছে, যেগুলো নিয়ে উচ্চআদালতে চ্যালেঞ্জ করা সুযোগ আছে। অনেক অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। ফলে এগুলোর ভাগ্য নির্ধারণের পথে জটিলতা আছে।

বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্টরাও জটিলতার কথা বলছেন।

তবে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রেক্ষাপট, বাস্তবতা ও সর্বোপরি আইনগত দিক বিবেচনা করে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশ নয়, নির্দিষ্ট সংখ্যক অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

আইনজ্ঞরা বলছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা যে সব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়া হবে না, সে সব অধ্যাদেশের অধীনে যে কর্মকাণ্ড হয়েছে-তার বৈধতা হারাবে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা