খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছিল গৃহবধূর মরদেহ

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছিল গৃহবধূর মরদেহ

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের শৈলমারী গ্রামে সুমাইয়া শিমু (২৫) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের পরিবারের দাবি, সুমাইয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তবে স্বামীর পরিবার এটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছে।

শনিবার (০১ আগস্ট) সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার (৩১ জুলাই) সন্ধ্যার আগে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে আলফাডাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

নিহত সুমাইয়া শিমু শৈলমারী গ্রামের মোস্তফা শেখের মেয়ে এবং একই গ্রামের কাঠমিস্ত্রি জসিম কাজীর স্ত্রী। তাদের সাত বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের জেরে জসিম কাজী ও সুমাইয়া পালিয়ে বিয়ে করেন। সে সময় সুমাইয়ার পরিবার অপহরণের অভিযোগে মামলা করলেও প্রায় দুই বছর আগে উভয় পরিবার তাদের সংসার মেনে নেয়। তবে স্বামীর নেশা করা, অনিয়মিত কাজ করা এবং সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে বিরোধ লেগে থাকত।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার প্রতিবেশীর একটি অনুষ্ঠানে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়। দুপুরে সুমাইয়া তার ছেলে মাহিরকে বড় বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় বড় বোন শাহিনুর জসিমকে ফোন করলে তিনি খারাপ আচরণ করেন এবং সুমাইয়াকে হত্যার হুমকিও দেন বলে অভিযোগ করেন। সন্ধ্যার আগে জসিম নিজেই ফোন করে জানান, সুমাইয়া আত্মহত্যা করেছেন।

সুমাইয়ার বোন শাহিনুর ও সুরাইয়া দাবি করেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা দেখেন মরদেহ ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছে। তাদের ভাষ্য, ঘরের আড়ার উচ্চতা বিবেচনায় সুমাইয়ার পক্ষে ওইভাবে ফাঁস নেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া ঘটনার পর জসিম ঘর তালাবদ্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান বলেও অভিযোগ করেন তারা।

অন্যদিকে জসিমের মা ছিয়ারন বেগম বলেন, “ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। পরে শুনেছি আমার ছেলের স্ত্রী গলায় ফাঁস দিয়েছে। আমার ছেলে এমন কাজ করতে পারে না, সে নির্দোষ।”

আলফাডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ আল-আমিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে। শনিবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। অভিযোগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সালথায় জামু ফকির হত্যার পর থমকে গ্রেপ্তার, চলছে চাঁদাবাজি ও ত্রাসের রাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫৩ অপরাহ্ণ
সালথায় জামু ফকির হত্যার পর থমকে গ্রেপ্তার, চলছে চাঁদাবাজি ও ত্রাসের রাজত্ব

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের কুমারকান্দা গ্রামে নৃশংসভাবে নিহত পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকির (৪২) হত্যার দীর্ঘদিন পার হতে চললেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। একদিকে প্রিয়জনকে হারিয়ে সুবিচারের আশায় বুক বাঁধছে নিহতের পরিবার, অন্যদিকে এই বিষাদ ও সুযোগ নিয়ে এলাকায় চলছে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের রামরাজত্ব। মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে নিরপরাধ মানুষ ও প্রবাসীদের পরিবার থেকে চাঁদা আদায়, প্রতিপক্ষের ক্ষেতের পাট কাটতে বাধা এবং বাজারে দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে।

​নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ, তদন্তের বর্তমান অবস্থা, নিহতের স্বজনদের আকুতি এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরা হলো এই বিশেষ প্রতিবেদনে।

হত্যাকাণ্ডের পেছনের ইতিহাস: যেভাবে ঘটেছিল নৃশংসতা:

​২০২৬ সালের ২৪ জুন রাতে কুমারকান্দা গ্রামের রহমান ফকিরের ছেলে পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকির স্থানীয় একটি জমিজমা সংক্রান্ত সালিশ বৈঠকে অংশ নেন। দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মালিকানা এবং স্থানীয় মসজিদের একটি ঘটনা নিয়ে জামু ফকিরের সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরোধ চলছিল। সালিশ বৈঠক শেষে রাতে একা বাড়ি ফেরার পথে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

​প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়, রাস্তার পাশের একটি পাটক্ষেতে নিয়ে জামু ফকিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার শরীরে ৪০টিরও বেশি কোপের চিহ্ন পাওয়া যায়। খুনিরা তার হাত-পা কেটে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয় এবং ঘটনা আড়াল ও অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য মরদেহটি কুমারকান্দার প্রধান সড়কের ওপর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

​পরদিন ২৫ জুন সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় পথচারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে সালথা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

পাঁচ দিনের সন্তান কোলে রেখে জামু ফকির খুন:

​হত্যাকাণ্ডের পর যদুনন্দী ইউনিয়নের কুমারকান্দা গ্রামে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। কোলে দেড় মাসের শিশুসন্তানকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিচার চাইছিলেন নিহতের স্ত্রী রুমা বেগম (রুপা)।

​তিনি কান্না সামলে বলেন, “আমার কোলজুড়ে তখন মাত্র পাঁচ দিনের বাচ্চা। সেই সময় আমার স্বামীকে এভাবে পশুপাখির মতো কুপিয়ে হত্যা করা হলো। তার শরীরে ৪০টিরও বেশি কোপের দাগ ছিল। ঘটনা ঘটার পর প্রশাসন আমাদের দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু আজ দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে মূল আসামিরা অধরা। আসামিরা অনেক টাকা-পয়সার মালিক এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই আমরা বিচার পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় ও আতঙ্কে ভুগছি।”

​নিহতের স্বজনরা জানান, হত্যার আগেও জামু ফকিরের ওপর একাধিকবার অত্যাচার চালানো হয়েছিল। নিহতের চাচাতো ভাই মিজান ফকির বলেন, “জামুকে হত্যার কিছুদিন আগে তার বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার নিজ জমির মেহগনি গাছ পর্যন্ত কাটতে দেওয়া হয়নি। এরপরই পরিকল্পিতভাবে তাকে খুন করা হলো। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের পুলিশ কেন ধরছে না, আমরা বুঝতে পারছি না।”

​আরেক চাচাতো ভাই ওবায়দুর ফকির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের এলাকায় সাধারণত খুনের ঘটনা ঘটলে প্রতিপক্ষের বাড়িতে লুটপাট করা হয়। কিন্তু আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কারো বাড়িতে সামান্য ক্ষতিও করিনি। অথচ পুলিশ আমাদের বলে আসামিদের খুঁজে বের করে দিতে! আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখ থেকে এমন কথা শোনা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

লাশের রাজনীতি ও চাঁদাবাজির বিস্ফোরক অভিযোগ:

​জামু ফকির হত্যার পর থেকে যদুনন্দী এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসী ও আসামিপক্ষের পরিবারের অভিযোগ, এ হত্যাকাণ্ডকে হাতিয়ার বানিয়ে এলাকার একাংশ প্রভাবশালী নেতা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা শুরু করেছে।

​বিশেষ করে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান হুমায়ুন খাঁ, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ওরফে নজরুল বিডিআর এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কাইয়ুম মোল্যার বিরুদ্ধে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

প্রধান প্রধান অভিযোগসমূহ:

মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি: হত্যা মামলায় নাম জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নির্দোষ গ্রামবাসী এবং প্রবাসী পরিবারগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যারা টাকা দিচ্ছেন, কেবল তারাই এলাকায় থাকতে পারছেন।

পাট কাটতে বাধা: প্রতিপক্ষ ও সাধারণ কৃষকদের ক্ষেতের পাট কাটতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে মোটা অংকের চাঁদা পরিশোধ করলে পাট কাটার সুযোগ মিলছে।

দোকানে ডাবল তালা: বাজারের একাধিক মুদির দোকানে জোরপূর্বক জোড়া তালা ঝুলিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

প্রবাসীদের ব্ল্যাকমেইল: ইউনিয়নটির প্রবাসীদের পরিবারকে টার্গেট করে অর্থ হাতানোর সরাসরি অভিযোগ এসেছে।

​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী জানান, ওই তিন নেতার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে এসব নেতাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ও বাদীপক্ষের বক্তব্য:

​এসব গুরুতর অভিযোগের জবাবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বাদী ও নিহতের ছেলে রুমান ফকির এবং স্ত্রী রুমা বেগম বিষয়গুলো আংশিক স্বীকার করলেও তা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়েছে বলে দাবি করেন।

​দোকানে তালা দেওয়ার বিষয়ে রুমান ফকির বলেন, “আমরা দোকানে জোড়া তালা লাগিয়েছি যাতে প্রতিপক্ষের লোকজন নিজেরাই মালামাল সরিয়ে নিয়ে উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা চুরির অপবাদ দিতে না পারে।” আর পাট কাটতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তারা বলেন, “তারা নিজেরা পাট কাটলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু অন্য এলাকা থেকে লোক ভাড়া করে এনে পাট কাটাচ্ছে। এতে তারা নিজেরা ঝামেলা করে আমাদের ওপর দোষ চাপাতে পারে, তাই বাধা দেওয়া হয়েছে।” তবে কোনো প্রকার চাঁদাবাজির সঙ্গে তারা যুক্ত নন বলে স্পষ্ট দাবি করেন।

​অন্যদিকে, অভিযুক্ত নেতারা তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

অভিযোগের ব্যাপারে যদুনন্দী ইউনিয়নের ​সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কাইয়ুম মোল্যা বলেন, “আমি আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। তাই আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে। আমি বরং এলাকা শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।”

​এদিকে অভিযোগের ব্যাপারে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান হুমায়ুন খাঁ বলেন, “জামু আমাদের দলের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। তাকে খুন করার পরও আমরা এলাকা শান্ত রেখেছি। এই গ্রামে কোনো লুটপাট বা সহিংসতা হতে দিইনি। যেখানে মার্ডার হয়, সেখানে আসামিদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়; কিন্তু আমরা একটি সুতাও নাড়াতে দিইনি। আমার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ মিথ্যা।”

অন্যদিকে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ওরফে নজরুল বিডিআর বলেন, “আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা হয়রানির কোনো তথ্য-প্রমাণ তদন্তে পেলে আমি রাজনীতি থেকেই পদত্যাগ করব। আমি এ ধরনের রাজনীতি করি না। নিহত জামুর পরিবার আমার কোনো কমান্ড মানছে না, তারা অন্যদিকে পরিচালিত হচ্ছে। তাই আমি তাদের মামলার বিষয়ে বা মিলাদেও অংশ নেইনি।”

শক্ত অবস্থান ও অপকর্মের দায় নেবে না বিএনপি:

​বিএনপি নেতাদের নাম জড়িয়ে এমন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় ও জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, দল কোনোভাবেই অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না।

এ​ব্যাপরে সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার বলেন, দল কখনোই কোনো অন্যায়কারী বা দলের নাম ভাঙিয়ে খাওয়া চাঁদাবাজদের ছাড় দেয় না। কেউ ব্যক্তিগত অপরাধ করলে দল তার দায়ভার নেবে না।”

এব্যাপারে কয়েকদিন আগে সালথা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আসাদ মাতুব্বর বলেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার সুযোগ কারো নেই। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যদি কেউ অন্যায় করে থাকে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

এ ব্যাপারে সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ​খায়রুল বাসার আজাদ বলেন বলেন, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে—দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপরাধ করলে কোনো ছাড় নেই। তাই কেউ অপরাধ করলে দল তার দায়ভার নিবে না।”

ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ​এ.কে.এম কিবরিয়া স্বপন বলেন, “এ ধরনের অপকর্ম বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খোঁজ নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।”

পুলিশের পদক্ষেপ ও তদন্তের অগ্রগতি:

​জামু ফকির হত্যা মামলায় পুলিশ এ পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে, যিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মামলার বাকি মূল আসামিরা এখনো পলাতক রয়েছে।

​হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিষয়ে সালথা থানা এবং জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:

এ ​ব্যাপারে সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান বলেন, “জামু ফকির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের ধরতে আমাদের কয়েকটি ইউনিট একযোগে কাজ করছে। তবে মূল আসামিরা কোনো ধরনের মোবাইল ফোন বা প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে যদি কেউ সাধারণ মানুষকে হয়রানি, চাঁদাবাজি বা অরাজকতা সৃষ্টি করে, অভিযোগ পেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ ব্যাপারে ​ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা-সালথা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদ বলেন, “একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। আমরা আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করেছি। একইসঙ্গে এলাকায় নিরীহ মানুষকে মামলার ভয় দেখানো, প্রবাসীদের কাছে চাঁদা দাবি কিংবা কৃষকের পাট কাটতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

সার্বিক পরিস্থিতি ও জনমনে আতঙ্ক:

​হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও সালথার যদুনন্দী ইউনিয়নে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসেনি। একদিকে বিচার না পাওয়ার শঙ্কা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার, অন্যদিকে গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে কয়েকটি গ্রাম। এর ওপর স্থানীয় গুটিকয়েক নেতার ‘মামলা বাণিজ্যে’ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের স্বজনরা।

​এলাকাবাসীর আকুল আবেদন—পুলিশ প্রশাসন যেন অবিলম্বে জামু ফকিরের প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে এবং একইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজি ও হয়রানির সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে যদুনন্দীতে শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনে।

ফরিদপুরে গভীর রাতে জানালা ভেঙে স্কুলছাত্রীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে গভীর রাতে জানালা ভেঙে স্কুলছাত্রীকে অপহরণের পর গণধর্ষণ

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় বসতঘরের জানালা ভেঙে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে (১৫) অপহরণের পর গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের হাতে আটক দুই যুবককে মোটরসাইকেলসহ পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দিবাগত রাত ১টার দিকে উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগীর চাচা আবু তালেব জানান, কিশোরীর মা তার দাদির চোখের চিকিৎসার জন্য ফরিদপুরের একটি হাসপাতালে ছিলেন। এ সময় বাড়িতে কিশোরী, তার অপর বোন ও ছোট ভাই অবস্থান করছিল। রাত ১টার দিকে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তারা প্রথমে দরজা খুলতে চাপ দেয়। ভেতর থেকে দরজা না খোলায় জানালা ভেঙে কিশোরীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।

তিনি আরও জানান, স্বজন ও প্রতিবেশীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরা হামলার হুমকি দিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে কিশোরীকে মোটরসাইকেলে করে পাশের গ্রামের একটি পুকুরপাড়ে নিয়ে গিয়ে তিন যুবক পালাক্রমে ধর্ষণ করে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর রাত ৩টার দিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কিশোরীকে বাড়ির উঠানে ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে অভিযুক্তরা। এ সময় এলাকাবাসী ধাওয়া দিয়ে দুইজনকে মোটরসাইকেলসহ আটক করে গণপিটুনি দিয়ে সদরপুর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
আটকরা হলেন হেলাল মৃধা (২০) ও রইস শিকদার (১৬)।

ভুক্তভোগীর মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “শাশুড়ির অপারেশনের কারণে আমি হাসপাতালে ছিলাম। খবর পেয়ে বাড়ি এসে মেয়ের অবস্থা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমার মেয়েকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে
নির্যাতন করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সকলের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) শামছুল আজম বলেন, “ঘটনার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এলাকাবাসীর হাতে আটক দুইজন বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।”

‘ভালোবাসার গল্প’

শরীফ খান
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৩ অপরাহ্ণ
‘ভালোবাসার গল্প’

আজও যখন বকুল ফুল নীরবে ঝরে পড়ে, মনে হয় সময় তার অদৃশ্য ডানায় ভর করে দুই যুগ পেছনে ফিরে যায়। বাতাসে ভেসে আসে বেলী ফুলের মৃদু সুবাস, আর পুকুরপাড়ের সেই পুরোনো হিজল গাছটি আজও নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সে যেন জানে—সব গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয় না; কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকাই তাদের নিয়তি।

যুগ যুগ আগে আমাদের ভালোবাসার সূচনা হয়েছিল। কত স্বপ্ন, কত প্রতীক্ষা, কত অদেখা পথের আহ্বান ছিল সেই দিনগুলোতে। মনে হয়েছিল, জীবনের দীর্ঘ নদী আমরা পাশাপাশি হেঁটেই পার হব। কিন্তু সময়ের নিজস্ব এক নির্মম ব্যাকরণ আছে; সে সব প্রতিশ্রুতিকে পূর্ণতার ঠিক আগে থামিয়ে দিতে জানে।

জীবন আমাদের ভিন্ন ভিন্ন তীরে পৌঁছে দিয়েছে। অথচ হৃদয়ের গভীরতম কক্ষে একটি প্রদীপ আজও জ্বলে আছে—নিভৃত, নির্মল, অবিচল। সেই আলোয় এখনো বেঁচে আছে আমাদের প্রথম ভালোবাসা; কোনো দাবি নেই, কোনো অভিমান নেই, শুধু নীরব অস্তিত্ব।

আজ তোমার ৪৩তম জন্মদিন। বহুদিন ধরে মনে ছিল, তোমাকে কিছু দেব। এমন কিছু, যার মূল্য অর্থে নয়, অনুভূতিতে; যা বহন করবে বহু বছরের মমতা, নীরব অপেক্ষা আর অক্ষয় শুভকামনা। তাই তোমার জন্য আমার এই হালকা বেগুনি শাড়ি।

এই কোমল বেগুনি রঙে মিশে আছে গোধূলির নিস্তব্ধতা, শ্রাবণের ভেজা আকাশের মায়া, আর সেই অনুভূতিগুলোর মিষ্টি আলো, যাদের ভাষা নেই, অথচ গভীরতা আছে। এই রঙ যেন বলে—ভালোবাসা সবসময় কাছে পাওয়ার নাম নয়; কখনও কখনও দূরে থেকেও কারও জীবনের জন্য নিঃশব্দে আলো হয়ে থাকার নামই ভালোবাসা।

আমার প্রিয় ফুল বকুল, বেলী, হিজল। বকুল ফুল আমাকে শিখিয়েছে—ঝরে পড়েও সুবাস বিলিয়ে যেতে হয়। বেলী ফুল শিখিয়েছে—নির্মল অনুভূতির কোনো ক্যালেন্ডার নেই; সময় তার সৌন্দর্য কেড়ে নিতে পারে না। আর হিজল গাছ প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—জল, ঝড়, ঋতু কিংবা সময়—সবকিছুর পরও কিছু শিকড় মাটির গভীরে অটুট থেকে যায়।

আমাদের ভালোবাসা হয়তো পূর্ণতার গল্প হয়ে ওঠেনি। একই ছাদের নিচে জীবন কাটানোর স্বপ্ন বাস্তবের পৃষ্ঠায় লেখা হয়নি। কিন্তু তাই বলে সেই অনুভূতিগুলো কখনো মিথ্যে হয়ে যায়নি। বরং সময় তাদের অহংকার ধুয়ে দিয়েছে, ব্যথাকে পরিণত করেছে প্রার্থনায়, আর ভালোবাসাকে রূপ দিয়েছে এক নিঃস্বার্থ আশীর্বাদে।

আজ তোমার জন্মদিনে আমার একটাই প্রার্থনা—তুমি ভালো থেকো। তোমার প্রতিটি সকাল বকুলের সুবাসে ভরে উঠুক। প্রতিটি বিকেল হোক বেলী ফুলের কোমল প্রশান্তিতে আলোকিত। প্রতিটি পথচলায় হিজল গাছের মতো দৃঢ়তা তোমার সঙ্গী হোক। জীবনের প্রতিটি ঋতু তোমাকে দিক শান্তি, প্রাপ্তি আর অনন্ত আলো।

কোনো একদিন যখন এই হালকা বেগুনি শাড়িটি পরবে, হয়তো এক মুহূর্তের জন্য তোমার মনে ভেসে উঠবে বহু বছর আগের একটি বিকেল। হয়তো মনে পড়বে—একটি ভালোবাসার গল্প, যার কোনো সমাপ্তি লেখা হয়নি, তবু যা কখনো শেষ হয়ে যায়নি। কারণ কিছু সম্পর্ক মিলনের মধ্য দিয়ে নয়, স্মৃতির মধ্য দিয়েই অনন্ত হয়ে থাকে।

এতো বছর পরেও তোমার জন্য আমার ভালোবাসা কোনো প্রাপ্তির ইতিহাস নয়, কোনো অপূর্ণতার অভিযোগও নয়। এটি এক নীরব প্রার্থনা, এক অনন্ত শুভকামনা—যেখানে তুমি সবসময় সুখী থাকবে, সুস্থ থাকবে, হাসিমুখে বাঁচবে।

হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মল রূপ—যেখানে অধিকার নেই, আছে শুধু আশীর্বাদ; যেখানে প্রাপ্তি নেই, আছে শুধু অন্তহীন মঙ্গলকামনা।

আর সেই মঙ্গলকামনার ভেতরেই আমার ভালোবাসা আজও নিঃশব্দে বেঁচে আছে।