খুঁজুন
, ,

দশম বর্ষে পদার্পণ করল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে আলফাডাঙ্গা’

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
দশম বর্ষে পদার্পণ করল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে আলফাডাঙ্গা’

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত অন্যতম বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে আলফাডাঙ্গা’-র নবম বর্ষপূর্তি ও দশম বর্ষে পদার্পণ অনুষ্ঠান অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (০২ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলা সদরের জেলা পরিষদ ডাকবাংলো কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

​বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা সংগঠনটির গত নয় বছরের মানবিক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা বলেন, “স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মানেই নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানো। হৃদয়ে আলফাডাঙ্গার সদস্যরা গত নয় বছর ধরে যেভাবে নিজেদের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে নিঃস্বার্থভাবে জনগণের সেবা করে যাচ্ছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। সত্যিকারের সেবক এরাই যারা একটি নান্দনিক আলফাডাঙ্গা গড়ার স্বপ্ন দেখে এবং তা বাস্তবায়নে কাজ করে।”

২০১৭ সালের ২ এপ্রিল আলফাডাঙ্গা উপজেলার একঝাঁক উদ্যোমী তরুণ ‘আমরাই গড়বো নান্দনিক আলফাডাঙ্গা’ স্লোগানকে সামনে রেখে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংগঠনটির সদস্যরা তাদের পড়াশোনা ও কর্মজীবনের পাশাপাশি তারুণ্যদীপ্ত উদ্যমে বিভিন্ন জনহিতকর কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। তাদের এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও একনিষ্ঠতা উপজেলাজুড়ে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে।

দশম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামীতে সেবামূলক কাজ আরও গতিশীল করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।

ফরিদপুর জেলা জিওপির আংশিক কমিটির অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর জেলা জিওপির আংশিক কমিটির অনুমোদন

গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ফরিদপুর জেলা শাখার আংশিক কমিটি আগামী এক বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

অনুমোদিত কমিটিতে সভাপতি—ফরহাদ হোসেন এবং সহ-সভাপতি—ফিরোজ শেখ, মমিন চৌধুরী, জিয়া খান, আলমগীর শিকদার, আনিসুজ্জামান বাবুল শরীফ, দেলোয়ার হোসেন ও তারেক আজিজ।

সাধারণ সম্পাদক—রুবেল শেখ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক—মো. ফরহাদ মিয়া, আলমগীর শেখ, জিয়া শেখ, শিমুল মোল্যা, মিন্টু হোসেন ও সাইদুল ইসলাম।

সাংগঠনিক সম্পাদক—শেখ জাহিদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক—মোহাম্মদ মতিয়ার, মো. ওমর ফারুক, সুমন ইসলাম নীরব, ইমদাদুল ইসলাম (বিন্দু) ও মো. শহিদ মোল্লা টুকু।

এ ছাড়া দপ্তর সম্পাদক—আলআমিন হোসেন লিখন; অর্থ সম্পাদক—মো. শহিদুল্লাহ; প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক—মো. জনি বিশ্বাস; সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক—নূরু মিয়া ও খলিলুর রহমান।

আইন সম্পাদক—অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম; মানবাধিকার সম্পাদক—আলমগীর হোসেন; ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মর্যাদা বিষয়ক সম্পাদক—মাওলানা শাওন আলী মীর; মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়স্বার্থ বিষয়ক সম্পাদক—কামরুল হাসান; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্পাদক—আফজাল আকাম।

যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক—বক্কার হাওলাদার; ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক—রাসেল খান; শ্রম ও কর্মসংস্থান সম্পাদক—মো. মিরাজ শিকদার মিন্টু এবং কার্যকরী সদস্য—সাইদুল ইসলাম।

দলীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অনুমোদিত এ আংশিক কমিটি এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।

শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?

একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো – একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?

সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশ

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮ শিশু তথনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না।

সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।

ইউনিসেফসহ (UNICEF) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

নিখোঁজ শিশু কোনো সাধারণ নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা নয়

শিশু নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সবসময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।

জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।

পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকে

সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।

প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – কেউ তাদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়

নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে।

সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে

যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।

এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে – তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।

স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি।

তথ্য-প্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারে

একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে।

ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে।

হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে

Child Helpline 1098 শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ – বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।

শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্ব

শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম – সবারই ভূমিকা রয়েছে।

স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধ

একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।

এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয় – সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।

শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে।

শিশু নিরাপত্তা; শিশুর একটি অধিকার

শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয় – “শিশুটি কোথায়?” আরও জিজ্ঞেস করতে হবে – “কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?”

আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ – তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।

নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddzam@gmail.com

‘ভারী থলে ও পথের পাহাড়’

মো. আবু সাঈদ বিশ্বাস
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
‘ভারী থলে ও পথের পাহাড়’

বিকেলের শেষ আলো পাহাড়ের ঢালে এসে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা লালচে হয়ে নিচে নামছে। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছিল রাশেদ। পায়ের নিচে পাতাগুলো মড়মড় করে উঠছিল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না।

তার মনটা আজকাল এমনিতেই ভারী।

জীবনের বয়স মাত্র ছাব্বিশ। অথচ মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এই বয়সেই যেন অনেকগুলো বছর বয়ে ফেলেছে সে। একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল! নিজের একটা ব্যবসা করবে, ভালোভাবে দাঁড়াবে, পরিবারকে স্বচ্ছন্দে রাখবে—সবই ভেবেছিল।

কিন্তু কয়েক বছর আগে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নাবিল ব্যবসার টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল। রাশেদের নিজের জমানো টাকা তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল ধার করা টাকাও। এক মুহূর্তে সব এলোমেলো হয়ে গেল।

টাকা হারানোর কষ্টের চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছিল মানুষের কথা।

“ব্যবসা করার আগে একটু বুদ্ধি থাকা দরকার ছিল।”

“বন্ধুকে এত বিশ্বাস করলে এমনই হয়।”

“তোমার দ্বারা এসব হবে না।”

কথাগুলো কেউ হয়তো মুহূর্তের রাগে বলেছিল, কেউ হয়তো মজা করে। কিন্তু রাশেদ সেগুলো ভুলতে পারেনি।

এরপর যতবার নতুন করে কিছু শুরু করতে চেয়েছে, ততবারই পুরোনো ব্যর্থতা তাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে। ধীরে ধীরে সে নিজেকেই বিশ্বাস করা বন্ধ করে দিল।

রাতে ঘুমাতে গেলেই পুরোনো ঘটনাগুলো মনে পড়ত। কখনো বন্ধুর প্রতারণা, কখনো আত্মীয়ের কথা, কখনো নিজের ব্যর্থতা।

“সেদিন যদি এমনটা না হতো…”

“আমি যদি তখন ওকে বিশ্বাস না করতাম…”

“আরেকটু সুযোগ পেলে হয়তো…”

এই ‘যদি’ আর ‘হয়তো’র ভেতরেই কেটে যাচ্ছিল তার দিন।

শেষ পর্যন্ত একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধের কথা মনে পড়ল—সুলেমান শেখ।

পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটা ঘরে একা থাকেন তিনি। বয়স অনেক। জীবনে কম কষ্ট পাননি। তবু মানুষটার মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি আছে। গ্রামের কেউ বিপদে পড়লে তার কাছে যায়। তিনি বেশি কথা বলেন না, কিন্তু তার দু-একটি কথাই অনেক সময় মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।

আজ বিকেলে রাশেদ তাই তার কাছে এসেছে।

সুলেমান শেখ রাশেদের কথা মন দিয়ে শুনলেন। কোথাও বাধা দিলেন না। সব কথা শেষ হলে কিছুক্ষণ চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ঘরের এক কোণ থেকে একটা খালি চটের থলে এনে রাশেদের হাতে দিলেন।

—আমার সঙ্গে চলো।

রাশেদ কিছুটা অবাক হলো।

—কোথায়?

—চললেই দেখবে।

বৃদ্ধ সামনে হাঁটতে শুরু করলেন। রাশেদও পেছনে পেছনে চলল।

কিছুদূর গিয়ে তারা পাহাড়ি টিলার গোড়ায় এসে দাঁড়াল।

সুলেমান শেখ মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আজ চূড়ায় উঠব।

রাশেদ পাহাড়ের দিকে তাকাল। পথটা বেশ খাড়া।

বৃদ্ধ বললেন,

—পথে যত পাথর দেখবে, সব কুড়িয়ে এই থলেতে ভরবে।

রাশেদ অবাক হয়ে বলল,

—সব পাথর?

—হ্যাঁ। যত পারো।

রাশেদ কিছু বুঝতে না পেরে থলেটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।

পথের শুরুতেই একটা লালচে পাথর চোখে পড়ল। সেটা হাতে নিতেই তার মনে পড়ে গেল এক আত্মীয়ের কথা—

“তোমার দ্বারা কিছু হবে না।”

সে পাথরটা থলেতে রেখে দিল।

আরও কিছুদূর গিয়ে একটা কালো পাথর পেল। সেটি হাতে নিতেই মনে পড়ল নাবিলের কথা। সেই বিশ্বাসঘাতকতার রাত।

পাথরটাও থলেতে গেল।

তারপর আরও পাথর।

কোনো পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে গেল অপমানের স্মৃতি, কোনোটা ব্যর্থতার, কোনোটা হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের। রাশেদের মনে হচ্ছিল, সে যেন পথ থেকে পাথর নয়, নিজের জীবনের পুরোনো ঘটনাগুলোই তুলে তুলে থলেতে ভরছে।

পাহাড় যত ওপরে উঠছিল, থলেটা তত ভারী হচ্ছিল।

একসময় রাশেদের কাঁধে ব্যথা শুরু হলো। চটের ফিতেটা চামড়ায় ঘষা খেয়ে জ্বালা করছিল। হাঁপাতে হাঁপাতে সে একসময় থেমে গেল।

—আমি আর পারছি না।

সুলেমান শেখও থামলেন।

—কী হলো?

রাশেদ থলেটা মাটিতে নামিয়ে বলল,

—এটা অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে। এত পাথর নিয়ে আর ওঠা যাচ্ছে না।

বৃদ্ধ থলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—কী, খুব ভারী হয়ে গেছে?

—আর বলবেন না! কাঁধে ব্যথা হয়ে গেছে।

—তাহলে নামিয়ে রাখছ না কেন?

রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনিই তো তুলতে বলেছিলেন!

সুলেমান শেখ হেসে বললেন,

—বলেছিলাম। তাই বলে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে নাকি?

রাশেদ চুপ করে গেল।

বৃদ্ধ থলেটার দিকে ইশারা করলেন।

—আচ্ছা বলো তো, এই পাথরগুলো কি তোমার কোনো কাজে লাগবে?

—না। শুধু কষ্টই হচ্ছে।

—তাহলে ফেলে দাও। পথ চলতে গেলে সবকিছু সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হয় না।

কথাটা শুনে রাশেদ স্থির হয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ বললেন,

—জীবনেও এমন হয়, বাবা। কেউ একটা কথা বলে কষ্ট দিল, কোথাও ব্যর্থ হলে, কেউ ঠকাল—আমরা সেসব ভুলতে পারি না। বারবার মনে করি। তারপর নিজের মনটাই ভারী করে ফেলি।

রাশেদ মাথা নিচু করে শুনছিল।

—যা হয়েছে, তা তো আর বদলাতে পারবে না। তবে সেখান থেকে কিছু শিখে সামনে যেতে পারবে। পুরোনো কথা মনে পড়তেই পারে। কিন্তু প্রতিদিন সেগুলোকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটার দরকার কী?

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

রাশেদ ধীরে ধীরে থলেটা কাঁধ থেকে নামাল।

একবার মুখ খুলে ভেতরের পাথরগুলোর দিকে তাকাল।

এতগুলো পাথর—এতগুলো স্মৃতি!

কত বছর ধরে সে এগুলো বুকের ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছে!

সে থলেটা উল্টে দিল।

পাথরগুলো একে একে গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কোনোটা ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল, কোনোটা আরও নিচে গিয়ে থেমে রইল।

রাশেদ অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।

তার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হলো। কিন্তু সেই শূন্যতার মধ্যে ভয় ছিল না। বরং ছিল স্বস্তি।

সে গভীর করে শ্বাস নিল।

সুলেমান শেখ উঠে দাঁড়ালেন।

—চলো।

রাশেদও উঠে দাঁড়াল।

পাহাড়ের চূড়া তখনও অনেকটা দূরে। পথও আগের মতোই খাড়া, পাথুরে আর দুর্গম। কিন্তু রাশেদের কাছে এবার পথটাকে অন্যরকম লাগছিল।

কিছুদূর উঠে সে একবার পেছনে তাকাল।

নিচে পড়ে থাকা পাথরগুলো আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না।

তার মনে হলো—মানুষের জীবনের সব বোঝা বাইরের কেউ কাঁধে তুলে দেয় না। কিছু বোঝা সে নিজেই কুড়িয়ে নেয়। তারপর অভ্যাসের বশে সেগুলো বয়ে বেড়ায়।

পাহাড়ের চূড়ার কাছে পৌঁছাতেই বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে এল। দূরের গ্রাম, গাছপালা আর আঁকাবাঁকা পথগুলো ওপর থেকে ছোট হয়ে দেখা গেল।

রাশেদ থেমে দাঁড়াল।

তার জীবনের সমস্যা আজও শেষ হয়নি। হারানো টাকা ফিরে আসেনি। যে মানুষ তাকে ঠকিয়েছে, সে ক্ষমাও চায়নি। পুরোনো কথাগুলোও পৃথিবী থেকে মুছে যায়নি।

কিন্তু আজ একটা জিনিস বদলে গেছে।

রাশেদ আর সেগুলোকে নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে না।

সে সামনে তাকাল।

পাহাড়ের ওপারে বিশাল আকাশ।

রাশেদ ধীরে ধীরে চূড়ার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

এবার তার কাঁধে কোনো থলে নেই।

শুধু সামনে খোলা পথ।