খুঁজুন
, ,

খালেদা জিয়ার মৃত্যু থেকে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড: ২০২৫ সালের আলোচিত ঘটনাপঞ্জি

শাহনেওয়াজ রকি:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:২০ পূর্বাহ্ণ
খালেদা জিয়ার মৃত্যু থেকে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড: ২০২৫ সালের আলোচিত ঘটনাপঞ্জি

চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল ঘটনাবহুল। বছর শেষের ঠিক আগের দিন মারা যান তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এর আগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে তুমুল আলোচনা ছিল বছর জুড়ে।

এছাড়া জুলাই সনদ ঘােষণা, শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু এবং সেটি কেন্দ্র করে দেশের দুইটি সংবাদপত্র প্রথম আলাে ও ডেইলি স্টার, ছায়ানটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের বিষয়টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

সারা বছর আলোচনায় ছিল নির্বাচন, জুলাই সনদ, মব-ভায়োলেন্সের মতো বিষয়। চলুন জেনে নিই এই বছরের আলোচিত কিছু ঘটনা।

খালেদা জিয়ার মৃত্যু

বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ৩০শে ডিসেম্বর ভােরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

কিডনি, হৃদরােগ এবং নতুন করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৪০ দিন যাবত তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শােক এবং একদিনের সাধারণ ছুটি ঘােষণা করেছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সময় সেখানে তার ছেলে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ছেলের বউ জুবাইদা রহমান, নাতনী জাইমা রহমান এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে নভেম্বরের ২৩ তারিখে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে ‘সংকটাপন্ন’ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া।

২১শে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি, সেদিনই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা মিসেস জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে ভিড় করেন।

সেসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে দলের সর্বস্তরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমেও তার সবশেষ অবস্থা নিয়ে নানা গুঞ্জন দেখা যায়।

একপর্যায়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তাকে এসএসএফের নিরাপত্তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

এক পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা ও তৎপরতা শুরু হয়। তখন তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে লন্ডন পাঠানোর কথাও জানানো হয়, ঠিক করা হয় দিনক্ষণও।

এরপর পাঁচই ডিসেম্বর লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন তার পুত্রবধূ ও তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান।

তবে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে শেষপর্যন্ত তাকে দেশে রেখেই চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তার এই শারীরিক অবস্থায় মাকে দেখতে তার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরবেন কী না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

এরমধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই বলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন তারেক রহমান। সেটি নিয়েও তৈরি হয় নানা আলোচনা ও প্রশ্ন।

সবশেষ গত ২৫শে ডিসেম্বর ১৭ বছরের বেশি সময় পরে দেশে ফেরেন তারেক রহমান।

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙ্গা

গণ অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাস পর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

ক্ষমতাচ্যুত হবার ছয় মাস পর ছাত্র সমাজের উদ্দেশে শেখ হাসিনা ভাষণ দেবেন– এমন খবর আসার পর জুলাই আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

শেখ হাসিনা বক্তব্য দিলে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের ভবনে ভাঙচুর চালানো হবে উল্লেখ করেও সামাজিক মাধ্যমে নানা পোস্ট দেয়া হয়।

তবে ভাষণের আগেই ৫ই ফেব্রুয়ারি, রাতে সেখানে ভাঙচুর শুরু হয় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

ভবনটি থেকে সেসময় অবকাঠামোর বিভিন্ন জিনিস লুটের ঘটনাও ঘটে। এই ভাঙচুর পরদিনও চলে এবং এক্সকাভেটরও ব্যবহার করা হয়।

এ ধরনের ঘটনা উসকে দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে দায়ী করা হয় কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে।

তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকেও দায়ী করেন কেউ কেউ।

এনসিপির আত্মপ্রকাশ

বছরের দ্বিতীয় মাসেই আত্মপ্রকাশ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল- জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক দল গঠন করবেন, এমন আলোচনা ছিল।

প্রথম দিকে রাজনৈতিক দলগঠনের বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু না বললেও শেষ পর্যন্ত বেশ ঘটা করেই আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি।

দলটির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকেও পদত্যাগ করেন।

২৮শে ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে এনসিপি। দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব হন আখতার হোসেন।

বাংলাদেশে জাতিসংঘ মহাসচিব

এ বছরের ১৩ই মার্চ চার দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস।

সফরের দ্বিতীয় দিন তার ‘রামাদান সলিডারিটি’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে একদিন রোজা রাখেন তিনি এবং প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার সাথে উখিয়াতে ইফতার করেন।

ইউনূস-তারেক বৈঠক

চলতি বছরের ১৩ই জুনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

ওই বৈঠকের পরই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

লন্ডনে অধ্যাপক ইউনূস ও তারেক রহমানের বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিৃবতিতে এ বিষয়ে জানানো হয়।

সেক্ষেত্রে অবশ্য ওই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি‌ অর্জন করা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করা হয়।

সেসময় বলা হয়েছিল, বৈঠকের পর নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল তা কেটে গেছে।

বৈঠকে তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গটিও উঠে আসে বলে জানানাে হয় সংবাদ সম্মেলনে।

এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “তারেক রহমান সাহেব যখনই ইচ্ছা উনি দেশে ফিরে যেতে পারবেন। সুতরাং এটার সিদ্ধান্ত উনিই নেবেন সময় মতো”।

যদিও এই বৈঠক নিয়ে সেসময় অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।

গোপালগঞ্জে এনসিপি কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ

গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে হামলা, সংঘর্ষে পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

দেশব্যাপী পদযাত্রার অংশ হিসেবে এনসিপির নেতারা আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত গোপালগঞ্জে ১৬ই জুলাই সমাবেশ করতে গিয়ে একপর্যায়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

এনসিপির এই পদযাত্রা কর্মসূচি গোপালগঞ্জে যাওয়ার আগে নাম পরিবর্তন করে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ করা হয়, তখন থেকেই কর্মসূচি ঘিরে শঙ্কা ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় তারা গোপালগঞ্জ ছাড়েন।

এর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে হামলাকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের পর প্রথমে শহরে ১৪৪ ধারা এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়।

এনসিপি’র কর্মসূচি ঘিরে গোপালগঞ্জে সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়।

গোপালগঞ্জে সহিংসতার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বতী সরকারের তরফ থেকে এই বিবৃতি দেয়া হয়।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, গণ অভ্যুত্থান আন্দোলনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে তরুণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশে বাধা দিয়ে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।

জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ

জুলাই গণ অভ্যুত্থানে যারা মারা গেছেন, তাদের জাতীয় বীর এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা পাবে আইনি সুরক্ষা- এমন বিধান রেখে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এই ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচই অগাস্ট জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এই ভূখণ্ডের মানুষের সংগ্রামের নানা ধাপ তুলে ধরা হয়। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের নানা কর্মকাণ্ড এবং জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ত্যাগের বিষয়গুলোও উঠে আসে।

যদিও জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ এবং এতে কী কী থাকবে এই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য তৈরি হতে দেখা যায়।

শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু বিষয় অমীমাংসিত রেখেই পাঁচই অগাস্ট জুলাই ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করে রাজনৈতিক দলগুলো।

এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কয়েক দফায় আলোচনার পর ১৭ই অক্টোবর জুলাই সনদ ঘোষণা করা হয়।

সেই সনদ বাস্তবায়নে যেসব সুপারিশ করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, তা বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এমনকি এনসিপিসহ কয়েকটি দল ওই সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত ছিল।

দলগুলো অভিযোগ করে যে সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বিভিন্ন সুপারিশে দলগুলোর যে বক্তব্য নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে থাকার কথা সেগুলো রাখা হয়নি। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় জুলাই সনদে থাকা সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোট কখন হবে তা নিয়ে।

এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক জোরালো ওঠে। যদিও পরবর্তীতে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে ও জাতীয় নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ ইস্যুতে গণভোট গ্রহণের সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

উত্তরায় বিমান বিধ্বস্ত

চলতি বছরের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা ছিল ২০২৫ সালের ২১শে জুলাইয়ে ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা।

ওই ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ ৩৬ জন নিহত এবং প্রায় দেড় শতাধিক আহত হয়।

নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল শিশু।

এতোগুলো শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় সারাদেশের মানুষ শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হন, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী।

তাদের মধ্যে অগ্নিদগ্ধ অনেককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।

আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের বেশিরভাগই শিশু শিক্ষার্থী।

এ ঘটনার ২২শে জুলাই একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার।

বিমান বন্দরে আগুন

এই বছরের ১৮ই অক্টোবরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয় বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কার্গো ভিলেজে।

প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে সেই আগুন জ্বলেছে। আগুন নেভাতে কাজ করতে হয়েছে ৩৭টি ইউনিটকে। ভয়াবহ এই আগুনের কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা অন্য বিমানবন্দরে অবতরণও করাতে হয়েছে।

শনিবার বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে লাগা আগুনে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাসহ আমদানিকারকদের পণ্য সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার আমদানি পণ্য পুড়ে গেছে বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।

গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনায় আগুন কোনো নাশকতার অংশ কি না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

শেখ হাসিনার রায়

এই বছরের ১৭ই নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অনুপস্থিতিতে মােট তিনজনের বিরুদ্ধে রায় দেয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এই রায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

পৃথক পৃথক বিবৃতিতে মানবাধিকার নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুইজনের অনুপস্থিতিতেই বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পছন্দের আইনজীবী দেওয়ার সুযোগ ছিল না যেটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরোধিতা করেছে, কেননা দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের সাজা বাতিলের আহ্বান জানিয়ে আসছে জাতিসংঘ।

একইসাথে তারা বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

এছাড়া, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দুই জনের অনুপস্থিতিতে বিচারের ‘নজীরবিহীন গতি’ এবং রায় এই মামলার ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ‘উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ’ তৈরি করে বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

এই রায় ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ লকডাউন ও শাটডাউনের মতো কর্মসূচি ঘোষণা দেয়।

এ সময়কালে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা

বছর জুড়ে আলোচিত বিষয় ছিল নির্বাচন। নির্বাচনের সময় নিয়েও ছিল নানা আলোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক।

১১ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

তিনি জানান, ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

নির্বাচন হবে কি, হবে না, এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেসব বিতর্ক চলছিল এর মধ্যদিয়ে তার অবসান ঘটে।

শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন একজন সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি।

তফসিল ঘোষণার পরদিনই একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর উপর এমন হামলা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং সর্বশেষ সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক সপ্তাহ পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শরিফ ওসমান হাদি।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, এবং বাংলাদেশের দুইটি প্রভাবশালী দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনা ঘটে।

হাদির জানাজাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ব্যাপক জনসমাগম হয় এবং বিপুল মানুষ তার জানাজায় অংশ নেয়।

তারেক রহমানের দেশে ফেরা

১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে চলতি বছরের ২৫শে ডিসেম্বর সপরিবারে বাংলাদেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ঢাকার ৩০০ ফিটের সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত জমায়েত হন বিএনপির বিপুল নেতা-কর্মী-সমর্থক।

ঢাকায় ফিরে পূর্বাচল তিনশাে ফিট সড়কে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তারেক রহমান।

সেখানে তিনি বলেন, “দেশের জন্য তার একটি ‘পরিকল্পনা’ আছে।” তবে, দলের নেতাকর্মীদের তিনি সতর্ক করে বলেন, “যেকোনো মূল্যে উসকানির মুখে শান্ত থাকতে হবে। আমরা দেশে শান্তি চাই”।

তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি।

২০০৭ সালে তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেফতার হন এবং ২০০৮ সালে জামিন পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে গিয়েছিলেন।

মব ভায়োলেন্স, ধর্ষণ ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

এসব ঘটনার পাশাপাশি বছরের নানা সময়ে দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, মব ভায়োলেন্স এবং ধর্ষণের বেশ কিছু ঘটনা আলোচনায় উঠে এসেছে।

এর মধ্যে মাগুরায় বোনের বাড়িতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে শিশুর মৃত্যু, কুমিল্লায় এক নারীর শ্লীলতাহানির ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া এবং ময়মনসিংহে এক বাউলকে হেনস্তার ভিডিও দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিলো, ২০২৪ সালের ৪ঠা অগাস্টের পর থেকে পরবর্তী ৫ মাসেই সারাদেশের ৪০টি মাজারে (মাজার/সুফি কবরস্থান, দরগা) ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিলো পুলিশ।

এসব হামলায় মাজার বা দরগায় ভাঙচুর, মাজারের সম্পত্তি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিলো, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর (মাজার ও দরগাহ) নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠকরা।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

ফরিদপুরে ফুটপাত দখলে নাকাল পথচারী, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে হাঁটছেন নগরবাসী

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ৮:১২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে ফুটপাত দখলে নাকাল পথচারী, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে হাঁটছেন নগরবাসী

ফরিদপুর পৌর এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাত দখল করে দোকানপাট, ভাসমান ব্যবসা ও অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারীরা। হাঁটার জন্য নির্মিত ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে শিশু, শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে, তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চললেও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।

সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জনতা ব্যাংক মোড়, হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারসংলগ্ন সড়ক, থানা মোড়, গোয়ালচামট, রাজবাড়ী রাস্তার মোড়, টেপাখোলা সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে বসেছে ভাসমান দোকান। কোথাও ফলের দোকান, কোথাও চা-স্টল, আবার কোথাও পোশাক, জুতা কিংবা সবজির অস্থায়ী দোকান। অনেক স্থায়ী দোকানদারও তাদের পণ্য ফুটপাতে সাজিয়ে রেখেছেন। ফলে পথচারীদের জন্য ফুটপাত কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

শহরের আলীপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগই নেই। বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটতে হয়। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও বাসের ভিড়ে প্রতিদিন ভয় নিয়ে চলাচল করতে হয়। ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে বের হলে আরও বেশি আতঙ্কে থাকতে হয়।”

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার বলেন, “কলেজে যাতায়াতের সময় ফুটপাত ব্যবহার করতে পারি না। দোকান আর ক্রেতাদের ভিড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে থাকে। বাধ্য হয়ে গাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়।”

গোয়ালচামট এলাকার গৃহিণী নাসরিন বেগম বলেন, “বাজার করতে গেলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। শিশুদের নিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। ফুটপাত সাধারণ মানুষের জন্য, কিন্তু এখন সেটি ব্যবসার জায়গায় পরিণত হয়েছে।”

রিকশাচালক আব্দুল কাদের বলেন, “ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় মানুষ রাস্তায় হাঁটে। এতে যানবাহনের গতি কমে যায় এবং প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটছে।”

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের দাবি, জীবিকার তাগিদেই তারা ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। তাদের ভাষ্য, বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা এখানে বসছেন। তবে তারা স্বীকার করেন, এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান বলেন, ফুটপাত মূলত পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের কারণে এর উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা না করায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েকদিন কিংবা কয়েকঘন্টার পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ফুটপাত দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভাসমান ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে নগরবাসী নিরাপদে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারবেন।

তিনি আরও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করবে। অন্যথায় প্রতিদিনের এই ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সভাপতি আবরাব নাদিম ইতু বলেন, “ফুটপাত কোনোভাবেই ব্যবসা করার জায়গা নয়। এটি পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটছে, যা দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ করাও প্রয়োজন।”

ফরিদপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “পৌরসভা নিয়মিতভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে অভিযান পরিচালনা করছে। তবে উচ্ছেদের পর অনেকেই আবার ফুটপাত দখল করে বসে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। খুব শিগগিরই প্রশাসনের সহযোগিতায় সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি যেসব ভাসমান ব্যবসায়ী জীবিকার জন্য ফুটপাতে বসেন, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।”

‘নারীরা পারে’—কথায় নয়, কাজেই প্রমাণ দিল ফরিদপুরের নন্দিতা সুরক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫৩ অপরাহ্ণ
‘নারীরা পারে’—কথায় নয়, কাজেই প্রমাণ দিল ফরিদপুরের নন্দিতা সুরক্ষা

নারীর অধিকার, স্বাস্থ্য, আইনি সচেতনতা ও নেতৃত্ব বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে ফরিদপুরের নারী উন্নয়নভিত্তিক সামাজিক সংগঠন নন্দিতা সুরক্ষা। তবে সংস্থাটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব শুধু এর কার্যক্রমে নয়, বরং নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোতেও। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী থেকে মাঠপর্যায়ের প্রতিটি কর্মীই নারী, যাদের অধিকাংশই তরুণ।

দেশে নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও নন্দিতা সুরক্ষা দেখিয়ে দিয়েছে, নারীরা শুধু উন্নয়ন কার্যক্রমের উপকারভোগী নন; পরিকল্পনা, নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপেও তারা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক তাহিয়াতুল জান্নাত রেমি বলেন, অনেকেই জানতে চান—‘আপনাদের প্রতিষ্ঠানে সব কর্মী নারী কেন? এটি কি পুরুষদের প্রতি বৈষম্য নয়?’ বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এমন নয়।

তিনি বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে সমাজে বারবার শুনে এসেছি—নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারে না, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না কিংবা বড় দায়িত্ব সামলাতে পারে না। এসব নেতিবাচক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি সম্পূর্ণ নারী-নেতৃত্বাধীন দল গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারবেন। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।”

রেমি আরও জানান, সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে কখনোই নারী বা পুরুষ—কোনো লিঙ্গকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না। যোগ্যতাই একমাত্র বিবেচ্য। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার নিয়োগের কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই পদে নারী ও পুরুষ উভয়েই আবেদন করেছিলেন। স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার ভিত্তিতে একজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এটি কাকতালীয় হলেও তাদের জন্য গর্বের বিষয়।

বর্তমানে নন্দিতা সুরক্ষার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন RWVL-B প্রকল্পের ম্যানেজার জান্নাতুল ফেরদৌসী, প্রজেক্ট অফিসার তানিয়া আক্তার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার মমতাজ আক্তারী, চরাঞ্চলের নারী নেত্রী ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম (ফিল্ড অর্গানাইজার) এবং অফিস সহকারী নিপা বেগম। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংস্থার কার্যক্রম দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

বর্তমানে RWVL-B, SPACE ও Shuchona প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্থাটি নারীর অধিকার, আইনি সচেতনতা, স্বাস্থ্যসেবা, নেতৃত্ব বিকাশ, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে।

এছাড়া নারীদের মধ্যে সার্ভিক্যাল ক্যান্সার ও ব্রেস্ট ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, লিগ্যাল লিটারেসি (আইনি সচেতনতা) এবং নেতৃত্ব বিকাশমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে। ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ১৮টি গ্রামের প্রায় ৬০০ নারীকে নিয়ে দুই মাস অন্তর (বাই-মান্থলি) সার্কেল মিটিং আয়োজনের মাধ্যমে তাদের অধিকার, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অংশগ্রহণ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।

সংস্থার সভাপতি ফাইজা ফারজানা নিত্য বলেন, “যে সমাজে এখনও নারীর সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হয়, সেখানে নন্দিতা সুরক্ষা একটি বাস্তব উদাহরণ। নারীরা সুযোগ, আস্থা ও নেতৃত্বের পরিবেশ পেলে শুধু নিজেদের জীবনই বদলে দিতে পারেন না, বরং সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন।”

তিনি আরও বলেন, “নন্দিতা সুরক্ষার গল্প কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প নয়; এটি নারীর সম্ভাবনা, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব এবং সামাজিক পরিবর্তনের এক অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা।”

ফরিদপুরে নারী নেতৃত্বের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নারীদের জন্য সমান সুযোগ ও নেতৃত্বের ক্ষেত্র তৈরি হলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

ফরিদপুরে গরুর ডাকে ঘুম ভাঙলো মালিকের, ধাওয়ায় গরু ফেলে পালাল চোর

নগরকান্দা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৪:১৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে গরুর ডাকে ঘুম ভাঙলো মালিকের, ধাওয়ায় গরু ফেলে পালাল চোর

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার একটি গ্রামে গভীর রাতে গরু চুরির চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে গরুর ডাকেই। গোহালে ঢুকে শিকল কেটে গরু নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও গরুর অস্বাভাবিক ডাক ও শব্দে মালিকের ঘুম ভেঙে যায়।

পরে পরিবারের সদস্যদের ধাওয়ায় চোর গরু রেখেই পালিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হওয়ায় ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বুধবার (২২ জুলাই) দিবাগত রাত প্রায় ৪টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার লস্কারদিয়া ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের লাভলু শেখের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) সিসিটিভির ৩ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি বড় আকারের লোহার কাটার দিয়ে গোহালের শিকল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর গোহালের দরজার ছিটকিনি খুলতে গিয়ে বিকট শব্দ হয়। এতে গরুগুলো আতঙ্কিত হয়ে ছুটাছুটি শুরু করে এবং জোরে ডাকতে থাকে। একপর্যায়ে গরুর ডাক শুনে ঘুম ভেঙে যায় বাড়ির মালিকের। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা বাইরে বেরিয়ে এসে চিৎকার শুরু করলে চোর গরু ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়।

গরুর মালিক লাভলু হোসেন জানান, বাড়ি ও গোহালজুড়ে নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো রয়েছে। রাতের অন্ধকারে চোর তিনটি গরু চুরির উদ্দেশ্যে আসে। প্রথমে একটি সাদা রঙের ছোট বাছুরকে টেনে-হিঁচড়ে গোহাল থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বাছুরটির চিৎকার ও অন্য গরুগুলোর ডাকাডাকিতে পরিবারের সদস্যরা জেগে ওঠেন। পরে সবাই ‘চোর-চোর’ বলে চিৎকার করলে চোরের দল বাছুরটি রেখেই পালিয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় গরু চুরির ঘটনা বেড়েছে। ফলে খামারি ও গৃহস্থদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, রাতের টহল জোরদার এবং গরু চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখে অনেকেই গৃহপালিত পশুর নিরাপত্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরছেন। স্থানীয়দের আশা, ভিডিও ফুটেজের সূত্র ধরে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।