জামায়াতের বিরোধিতায় কেন হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনছে বিএনপি?
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি, প্রচারণা চালানোর সময় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ টানছেন; করছেন সমালোচনা।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকা বাংলাদেশে বহুল আলোচিত বিষয়। অপরদিকে, বিএনপি সবসময় বলে আসছে যে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল।
এদিকে, ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় জামায়াতে ইসলামী-ই হলো এবারের নির্বাচনে বিএনপি’র সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একটা দীর্ঘ সময় ধরে দুই দল জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অবস্থান করার পরও বিএনপি এর আগে একাধিকবার জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে নির্বাচন করেছে, আন্দোলন করেছে, সরকার গঠন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের বিরোধিতা করার জন্য এখন মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনার পেছনে বিএনপি’র রাজনৈতিক কৌশল, ভোটের অঙ্ক ও বর্তমান বাস্তবতা – সবকিছুই কাজ করছে।
তবে এটি আদর্শগত পুনর্মূল্যায়ন, নাকি নির্বাচনের প্রয়োজনে অবস্থান বদল?
এর উত্তরে বিএনপি বলছে, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দলের “নীতিগত অবস্থান”। তবে জামায়াতের মতে, একটা “মীমাসিংত বিষয়” নিয়ে কথা বলাটা এখন অবান্তর।
নির্বাচনী প্রচারণায় মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে জোর
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত তিনটি রাজনৈতিক দল হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এর মাঝে এনসিপি এবার জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোট থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখন ভোটের মাঠে রয়ে যাচ্ছে দলটির এক সময়ের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
কিন্তু নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দুই দলের মাঝে বাগযুদ্ধ ও তিক্ততা তত বেড়ে চলেছে। যদিও এর আগে দুই দলের নেতারা বলেছিলেন যে, তারা দোষারোপের রাজনীতি করবেন না।
একদিকে জামায়াত যেমন অতীতে বিএনপির আমলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার বিষয়টি সামনে আনছে।
গত ২২শে জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু হলে সেদিনই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটের এক নির্বাচনী সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বলেছেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে “মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি।”
তিনি বলেছেন, “আরে ভাই, আপনাদেরকে তো মানুষ একাত্তরে দেখেছে; ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।”
ওইদিনের আগে-পরে তারেক রহমান তার বিভিন্ন বক্তব্যে এ প্রসঙ্গে একই কথা বলেছেন।
শুধু তিনি নন, বিএনপি’র শীর্ষ নেতাও একাত্তর ও জামায়াত প্রসঙ্গে একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন।
বুধবার, ২৮শে জানুয়ারিও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এই দলটা ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো। এই দলটা সেই দল, যারা আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে নাই।”
”যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাদের হাতে কি দেশ চালানোর দায়িত্ব দেওয়া যায়?” – ঠাকুরগাঁওয়ের ওই সভায় তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে এই প্রশ্ন করেন।
জামায়াত ও বিএনপি’র দীর্ঘদিনের পথচলা
২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের এই দীর্ঘ শাসনামলে রাজনীতির মাঠে বিএনপি ও জামায়াত, দুই দলই অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় ছিল। এই সময়ের মাঝে বিএনপি চেয়ারপার্সন প্রয়াত খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য বিএনপি নেতারাও হামলা, মামলা, কারাবরণের শিকার হয়েছেন।
অপরদিকে, মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযুক্তদের তখন বিচার শুরু হয়। অনেক শীর্ষ জামায়াত নেতার মৃত্যুদণ্ডও হয়।
সুতরাং, সেই পরিস্থিতির কারণে এই পুরোটা সময়ে সরকার বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে দুই দলকে পাশাপাশি দেখা গেছে। কিন্তু তার আগেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো।
অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামীসহ যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো, তাদের পুনর্বাসন করেছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলে তখন স্বাধীনতাবিরোধীদের সুযোগ দিয়েছিলেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল, আওয়ামী লীগ বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিরোধিতার দিক থেকে আদর্শিকভাবে এই দুই দল এক এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে পুনর্বাসন করার ক্ষেত্রে “প্রধান ক্রেডিট” বিএনপি’র।
মূলত, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুযায়ী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। যেহেতু জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির মূল উপজীব্য ধর্ম; তাই বাংলাদেশে তখন তাদের অস্তিত্ব দৃশ্যত বিলীন হয়ে যায়।
কিন্তু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। তার মৃত্যুর পর ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
এরপর জামায়াতে ইসলামীর আত্মপ্রকাশ করা ছিল শুধুই সময়ের ব্যাপার। কিন্তু জামায়াত ইসলামী সাথে সাথে আত্মপ্রকাশ করেনি। তারা কিছুটা কৌশলী ভূমিকা অবলম্বন করে।
যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধচারণ তখনো সবার মনে টাটকা ছিল, সেজন্য দলটি তাৎক্ষণিকভাবে জামায়াতে ইসলামী নামে আত্মপ্রকাশ করেনি।
এজন্য তারা ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দল বেছে নেয়। ১৯৭৬ সালের ২৪শে অগাস্ট জামায়াতে ইসলামী ও আরো কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আই.ডি.এল) নামের একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করে।
জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা এই দলটির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসেন। আই.ডি.এল’র ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয়লাভ করেন।
সেবারই প্রথম জামায়াতে ইসলামীর নেতারা স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে আসেন। এরপর থেকে জামায়াতে ইসলামী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশও করেছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা প্রকাশ্যে ছিল।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, সেখানে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে।
সেই নির্বাচনে বিএনপি বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের ছিল না। ফলে জামায়াতে ইসলামী’স সাথে জোট বেঁধে তখন সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর ২০০১ সালেও বিএনপি-জামায়াত জোট বেঁধে নির্বাচন করেছিল ও সরকার গঠন করেছিল।
সেই সময়ের চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন তৎকালীন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।
এ দুজনকেই পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
‘জামায়াত সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে হয় জঙ্গী’
মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিএনপি হঠাৎ করে যেভাবে সমালোচনা করছে, এটিকে জামায়াত বলছে – আর কোনোভাবে না পেরে বিএনপি এখন “ভোঁতা হাতিয়ার” ব্যবহার করছে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষায়, “জামায়াতে ইসলামীকে আদর্শিক, রাজনৈতিক, নৈতিক, চারিত্রিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে তারা এই ভোঁতা হাতিয়ারকে ব্যবহার করছে; যা এই জাতি এখন আর গ্রহণ করতে চায় না।”
তার মতে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের জীবদ্দশায় “যে বিষয়টি জাতীয় ঐক্যের আলোকে মীমাংসা করে গেছেন, সকলকে নিয়ে একসাথে দেশ গড়ার উদাহরণ তৈরি করেছেন”, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র উত্তরসূরীরা পরবর্তীতে সেই মীমাংসিত ইস্যুকে “দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে।”
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াত যুগপৎভাবে আন্দোলন করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তারা জোট বেঁধেছিল ছিলো শুধু বিএনপি’র সাথেই।
বিএনপি’র সাথে জামায়াতের এই দীর্ঘ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, “প্রত্যেকের সঙ্গে জামায়াত যখন থাকে, তখন জামায়াত সঙ্গী হয়, আর যখন থাকে না, তখন জঙ্গী হয়। এটাই হলো তাদের ন্যারেটিভ। এটা ব্যাড পলিটিক্যাল মোটিফ।”
“১৯৯১ সালে বিএনপি কেন কেন জামায়াতের সাহায্য নিলো?” প্রশ্ন করে তিনি আরও জানতে চান, “তখন বেগম জিয়ার পক্ষে তার নেতৃবৃন্দ গোলাম আজমের কাছে সরকার গঠনে সাহায্যের জন্য লোক পাঠিয়েছিলেন…তখন কোন ব্যাখ্যায় তারা এলেন?”
এদিকে, এই জামায়াত নেতা যদিও বলছেন যে তাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা মীমাংসিত।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মফিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “মীমাংসিত হলে তো আর আলোচনা হতো না। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে তো এরকম আলোচনা নাই। এটাই প্রমাণ করে যে মীমাংসিত না, অমীমাংসিত ইস্যু।”
“এখানে গণহত্যার মতো বিষয় আছে। কিন্তু সেটা যদি কেউ ডিনায়ালের মাঝে থাকে আর বলে যে মীমাংসা হয়ে গেছে, সেখানে বিচার ও সত্যের বিষয় চলে আসে,” যোগ করেন তিনি।
‘কলঙ্ক মোছার দায়িত্ব তো আমরা নেই নাই তখন’
জামায়াতের সাথে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক আন্দোলন করা এবং দলটির সাথে মিলে জোট সরকার গঠনের পর হঠাৎ করে বিএনপি এখন মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে জামায়াতের সমালোচনা করছে কেন?
জানতে চাইলে বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সেসময় জামায়াত বাংলাদেশে লিগ্যাল পার্টি ছিল। জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগও আন্দোলন করছে। আর আমরা একটা স্ট্র্যাটেজিক ইলেকশন পার্টনার তৈরি করেছি।”
তিনি বলেন, ওই জোট করা হয়েছিলো শুধুমাত্র “নির্বাচনে ভোটের সমীকরণের জন্য।”
“এর অর্থ এই না যে তাদের (জামায়াত) কলঙ্ক মুছে গেছে। কলঙ্ক মোছার দায়িত্ব তো আমরা নেই নাই তখন। আমরা স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার তৈরি করেছিলাম কেবল,” ফের বলেন তিনি।
নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বড় দল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “যারা দেশকেই বিশ্বাস করে নাই, তারা সেই দেশের শাসন ক্ষমতা হাতে নিবে? জাতিকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে তাদের ভূমিকা কী ছিল?”
তার ভাষ্য, বিএনপি মনে করে না ওই সময়ে নির্বাচনের প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধেছিলো বলে বিএনপি এখন তাদেরকে কিছু বলতে পারবে না।
মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতের সমালোচনা করতে বিএনপিকে আগে কখনো দেখা যায়নি কেন?
জানতে চাইলে এই বিএনপি নেতা বলেন, “এখনও আসতো না। যদি না তারা আস্ফালন করতো, মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেশনকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করতো, যদি তারা ক্ষমা চাইতো। তারা এগুলোর কিছুই করেনি। বরং, জামায়াতের নেতারা মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেশনকে চেঞ্জ করতে চায়। তাই, প্রতিবাদটা সরব রাখতে হবে, যাতে তারা যেন-তেনভাবে এই প্রজন্মকে বোঝাতে না পারে।”
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করাটা বিএনপি’র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের “নীতিগত অবস্থান” বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপি’র উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক?
বিএনপি যদিও বলছে যে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তাদের সাথে জামায়াতের আদর্শিক ভিন্নতা আছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি’র এই সমালোচনার মূল কারণ আসন্ন নির্বাচন। বিশেষ করে, বিএনপি চাইছে আওয়ামী লীগের ভোটগুলো যেন তাদের পক্ষে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীনের ব্যাখ্যায়, “বাংলাদেশের অনেক মানুষের আবেগের জায়গা মুক্তিযুদ্ধ। বিএনপির অনেকেও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণা করে। আর, জুলাই আন্দোলনের পক্ষের অনেকে এবং অনেক আওয়ামীলীগ বিরোধীও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণা করে। সুতরাং, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতকে আক্রমণ করাটাকে একটা কৌশল হিসেবে নিয়েছে বিএনপি।”
“শুধুমাত্র জামায়াতকে কেন্দ্র করে বিএনপি কিছু করছে না এখানে। আওয়ামী লীগ যেহেতু নাই এবং প্রতিপক্ষ জামায়াত, তাই বিএনপি’র সাথে এখন দু’টো অস্ত্র। মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্ম। আর মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের তো বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, তাই আওয়ামী লীগের ভোটার টানতে এটা করছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক সাব্বির আহমেদও এই ভোটব্যাংক প্রসঙ্গে একই কথা বলেন।
তবে তিনি এও বলেন, “জামায়াত বিএনপি থেকে আলাদা হয়ে গেছে, এটা বিএনপি মানতে পারছে না। এটা তারা বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে। আর নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্পর্ক হলো শত্রু-শত্রু। তখন এটা হবেই, কিছু করার নেই। প্রচারণায় জামায়াতের দুর্বলতা বিএনপি ব্যবহার করবে, আবার জামায়াত বিএনপির দুর্বলতাকে ব্যবহার করবে।”
যদিও বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে বিএনপি’র জামায়াতের সমালোচনা নির্বাচনী প্রচারণার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
কারণ “এটা ইউনিভার্সাল, এটা চিরকাল থাকবে। জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায় নাই, বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করেছে, এটা আমরা বারেবারে বলবো,” যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রকল্পের একজন গবেষক ছিলেন আফসান চৌধুরী। একাত্তরের ঘটনাবলী নিয়ে অনেকগুলো বইও লিখেছেন তিনি।
মি. চৌধুরীর মতে, “আমাদের দেশে আমরা ইতিহাসকে রাজনীতি বানিয়ে ফেলেছি। এটা শুধু (জামায়াতের সমালোচনা) নির্বাচনের বিষয় না। এটা সকল কালে হয়ে গেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এটা (সমালোচনা করছে) এবং নির্বাচনের পরেও এটা করবে।”
তবে অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, এখন এক দল আরেক দলকে বিষেদগার করলেও শেষমেশ এদের “জোটে ফাটল ধরার সম্ভাবনা কম। কারণ আগের মতো এখনও বাংলাদেশে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের পেছনে বিএনপি’র ভূমিকা রয়েছে।”
পাঁচই অগাস্টের পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের বেশ শক্ত প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে জামায়াতের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছাত্র শিবির বিশাল জয় পেয়েছে।
ফলে সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের অবর্তমানে জামায়াতকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখছে বিএনপি। এ কারণেই দুই দলই তাদের বক্তব্যে নানাভাবে একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সূত্র : বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত লিখুন
Array