খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে ‘জিনের বাদশা’ সেজে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ, পিবিআইয়ের জালে ২ প্রতারক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ‘জিনের বাদশা’ সেজে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ, পিবিআইয়ের জালে ২ প্রতারক

কখনো ‘জিনের বাদশা’, কখনো তান্ত্রিক-কবিরাজ, আবার কখনো পরিচিত ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ক্লোন করে কম দামে চাল বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করত একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চক্রটির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ফরিদপুর। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বুধবার (২১ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে ফরিদপুরের পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম জানান, রাজবাড়ী সদর উপজেলার বিনোদপুর এলাকার চাল ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম এই চক্রের প্রতারণার শিকার হন। ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ তাঁর পরিচিত ‘বিজয় বাবু’র মোবাইল নম্বর ক্লোন করে ফোন দিয়ে ৩৩ টন চাল কম দামে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে জরুরি টাকার কথা বলে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে বিভিন্ন নম্বরে কয়েক দফায় মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। নির্ধারিত সময়ে চাল না পেয়ে এবং প্রকৃত বিজয় বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন রশিদুল ইসলাম।

এ ঘটনায় প্রথমে স্থানীয় থানায় মামলা হলেও দীর্ঘ আট মাসেও রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। পরে বাদীর নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি পিবিআই ফরিদপুরকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলামের দিকনির্দেশনায় এবং উপ-পরিদর্শক মাজিদুল হক খানের তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রায় এক বছর পর মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়। পরে ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিবিআই সূত্র জানায়, চক্রটি ভুয়া পরিচয়ে সিম নিবন্ধন করে প্রতারণার পর সেগুলো ফেলে দিত। গভীর রাতে নারীকণ্ঠে ‘জিনের বাদশা’ সেজে ভয়ভীতি দেখানো এবং তান্ত্রিক-কবিরাজ পরিচয়ে গোপন রোগ নিরাময়ের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া ছিল তাদের প্রতারণার অন্যতম কৌশল।

চক্রটিতে প্রায় পাঁচজন সদস্য ছিল। তাদের কেউ ফোন করে মানুষকে ফাঁদে ফেলত, কেউ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) নম্বর সরবরাহ করত, আবার অন্যরা বিভিন্ন এলাকা থেকে টাকা তুলে সংগ্রহ করত।

পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আদালতে জবানবন্দিতে প্রতারণার বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। এ ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব, সন্দেহজনক ফোনকল কিংবা প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর জন্য তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সদরপুরে ২ জেলের কারাদণ্ড, ১ লাখ মিটার জাল ধ্বংস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৩ অপরাহ্ণ
সদরপুরে ২ জেলের কারাদণ্ড, ১ লাখ মিটার জাল ধ্বংস

মা-ইলিশ সংরক্ষণের বিশেষ অভিযানে ফরিদপুরের সদরপুরে ২ জেলেকে ৭ দিন করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সঙ্গে অভিযানে জব্দ করা ১ লাখ মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।

​বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত উপজেলার চরমানাইর, নারিকেলবাড়িয়া ও চরনাসিরপুর ইউনিয়নের পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

​উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. পলাশ উদ্দিনের দিকনির্দেশনায় উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর ও সদরপুর থানা পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান চালায়। এতে নেতৃত্ব দেন মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আবরার।

​আটক জেলেরা হলেন—মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার চারিপাড়া এলাকার রব মোল্লার ছেলে রমজান মোল্লা (২৫) এবং একই উপজেলার সিঙ্গাইর হাটি এলাকার আলী মৃধার কর্মকর্তার ছেলে আলাউদ্দিন (৩০)।

​প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, অভিযান চলাকালে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে মা-ইলিশ শিকারের সময় ওই দুই জেলেকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তাদের প্রত্যেককে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

​অভিযানে জব্দ করা ১ লাখ মিটার জালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা, যা পরে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়া অভিযানে উদ্ধার করা ১২ কেজি ইলিশ মাছ স্থানীয় বিভিন্ন এতিমখানায় বিতরণ করা হয়।

​এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. পলাশ উদ্দিন বলেন, “মা-ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। নদ-নদীতে অবৈধ জাল ব্যবহার ও ইলিশ শিকারে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

​উল্লেখ্য, মা-ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে গত ৮ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার।

ফরিদপুরে ডোবায় ডুবে প্রাণ গেল দেড় বছরের শিশুর

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ডোবায় ডুবে প্রাণ গেল দেড় বছরের শিশুর

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ডোবার পানিতে ডুবে শেখ আরাফাত নামে দেড় বছর বয়সী এক শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে।

​বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের খালাশী ডাঙ্গী গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

​নিহত আরাফাত ওই গ্রামের বাসিন্দা শেখ রাসেলের ছোট ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার ছোট ছিল। তার রাইছা (৫) ও রোজামনি (৩) নামে দুই বোন রয়েছে।

​স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, সকালে শিশু আরাফাত তার বোনের সঙ্গে বাড়ির উঠানে খেলছিল। কিছুক্ষণ পর পরিবারের সদস্যরা তাকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়ির পেছনের ডোবার পানিতে তাকে ভাসতে দেখা যায়।

​পরে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চরভদ্রাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।

​শিশুটির এই অকাল মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ফারহানা কেমন আছে?

জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
ফারহানা কেমন আছে?

বিয়ের ফটোগ্রাফি করতে করতে সতেরো বছরে একটা জিনিস শিখেছি। মানুষ সবচেয়ে বেশি কাঁদে সেই মুহূর্তে, যখন তাকে কাঁদার অনুমতি দেওয়া হয় না। সেদিনও একটা বিয়ে ছিল। বোয়ালমারীর একটা কমিউনিটি সেন্টারে। বরপক্ষ এসেছে গাজীপুর থেকে, কনেপক্ষের অধিকাংশ মানুষ বোয়ালমারীর।

আলোকসজ্জা, ফুল, মঞ্চ, খাবার, সব মিলিয়ে বেশ বড় আয়োজন। কনে ফারহানার বয়স সাতাশ। বর একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, বিয়েটা নিয়ে তার কোনো অস্বস্তি নেই। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হাসছে, ছোটদের সঙ্গে ছবি তুলছে, মেকআপ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে বারবার চোখ মুছতে নিষেধ করছে সবাইকে। শুধু একটা ব্যাপার আমার চোখে পড়ল। মঞ্চের বাঁ দিকে, খাবারের টেবিলগুলোর পেছনে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন বয়স্ক এক মহিলা। পরনে ধূসর শাড়ি। মাথার চুলগুলো বেশির ভাগই সাদা। তাঁর হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ। ব্যাগটা তিনি বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বসেছিলেন।

মহিলার সঙ্গে কেউ কথা বলছিল না। কেউ তাঁকে খাবারও দিতে আসেনি। প্রথমে ভেবেছিলাম, দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয় হবেন। বিয়েবাড়িতে এমন মানুষ থাকেন, যাঁদের নাম বর-কনে দুজনের কেউই ঠিকমতো জানেন না। কিছুক্ষণ পর ফারহানা মঞ্চ থেকে নেমে সোজা তাঁর কাছে গেল। আমি ক্যামেরা নিয়ে পেছন পেছন গেলাম। ভেবেছিলাম, একটা সুন্দর আবেগের ছবি পাব। ফারহানা মহিলার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। “আন্টি, খেয়েছেন?” মহিলা মাথা নাড়লেন। “তোমার বিয়ে দেখি, তারপর খাব।”
“বিয়ে তো হয়ে যাচ্ছে। এবার খান।” মহিলা হাসলেন। তাঁর হাসিতে দাঁত কম দেখা গেল, কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। “তুমি যাও। সবাই তোমারে খুঁজতেছে।”

ফারহানা উঠে দাঁড়াল না। সে মহিলার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। আমি ক্যামেরা তুললাম। ঠিক তখনই ফারহানা মুখ তুলে আমাকে বলল, “ভাইয়া, এই ছবিটা তুলবেন না, প্লিজ।” আমি ক্যামেরা নামিয়ে ফেললাম। কেন বলল, জিজ্ঞেস করিনি। রাত সাড়ে দশটার দিকে বর-কনের বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হলো। ফারহানার মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। বাবা বারবার চোখ মুছছিলেন, অথচ পরিচিত কেউ কাছে এলেই হাসার চেষ্টা করছিলেন।

বান্ধবীরা ঘিরে ধরে ছবি তুলছিল। কেউ বলছিল, ফোন করিস। কেউ বলছিল, আমাদের ভুলে যাস না। সবাই ফারহানাকে কোথাও না কোথাও ধরে রাখতে চাইছিল। শুধু ধূসর শাড়ির মহিলাটি চুপচাপ উঠে দাঁড়ালেন। কাউকে কিছু না বলে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম।

লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট একটা প্যাকেট বের করলেন। সাদা কাগজে মোড়ানো। প্যাকেটটা একবার খুলে দেখলেন, আবার যত্ন করে গুছিয়ে রাখলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি কনের আত্মীয়?” মহিলা আমার দিকে তাকালেন। চোখে ক্লান্তি, মুখে মৃদু হাসি। “আত্মীয় না।” “তাহলে?” তিনি উত্তর দিলেন না। লিফট এসে গেল। দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে বললেন, “বাবা, বিয়ের ছবি তুললে মানুষগুলারে একটু ভালো কইরা তুলবা। বিয়ের পরে ছবিগুলা অনেক দিন থাকে। মানুষ সব সময় থাকে না।” আমি তাঁকে আর আটকাতে পারিনি। পরদিন দুপুরে ফারহানা ফোন করল। “ভাইয়া, কাল যে বয়স্ক মহিলাটা এসেছিলেন, উনার কোনো ছবি উঠেছে?”

আমি বললাম, “আপনিই তো নিষেধ করলেন।” ফারহানা বললো, “তবুও।” আমি ল্যাপটপে ছবিগুলো খুললাম। একটা ছবিতে মঞ্চের কোণে তাঁকে দেখা যাচ্ছে। অস্পষ্ট, কিন্তু চেনা যায়। “একটা উঠেছে। আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” ফারহানা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল- “উনি আমার প্রাক্তন প্রেমিকের মা।” আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম। “আমার প্রাক্তন প্রেমিকের নাম আসিফ। আমাদের পরিচয় অনলাইনে। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। প্রথম দিন ওদের বাসায় গিয়ে আমি এতটা অস্বস্তিতে ছিলাম যে ঠিকমতো খেতেও পারিনি। আন্টি নিজের হাতে ভাত মেখে দিয়েছিলেন।

বলেছিলেন, আমার ছেলে তো সারাক্ষণ বাইরে থাকে। তুমি এলে আমার একটু কথা বলার মানুষ হয়।” ফারহানা হেসে ফেলল। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না। “তারপর থেকে আমি ওদের বাসায় গেলে আন্টি আমার পছন্দের খাবার রান্না করতেন। আসিফের সঙ্গে ঝগড়া হলে আন্টির কাছে নালিশ করতাম। আন্টি ছেলেকে বকতেন। পরে আসিফ ফোন করে বলত, তুমি আমার মাকে নিজের দলে নিয়ে নিলে?” আমি শুনছিলাম। “আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

দুই পরিবারেও কথা হয়েছিল। তারপর একদিন আসিফ অফিস থেকে ফেরার পথে স্ট্রোক করল।” শেষ কথাটা সে এমনভাবে বলল, যেন খুব সাধারণ কোনো খবর দিচ্ছে। আমি কিছু বলতে পারলাম না। “আসিফের মৃত্যুর পর অনেক দিন আমি ওদের বাসায় যাইনি। কীভাবে যাব? যে বাড়িতে গেলে আন্টি আমাকে দেখে বলতেন, আমার ছেলের বউ আসছে।

সেই বাড়িতে আমি কী পরিচয়ে ঢুকব? একদিন সাহস করে গিয়েছিলাম। আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, তুমি আর আইসো না, মা।” ফারহানা থামল। “বিয়ের কয়েক দিন আগে আন্টির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমাকে দেখে বললেন, তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনলাম। আমি বললাম, হ্যাঁ। উনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ভালো থাইকো, মা।” আমি চুপ করে রইলাম। “আমি উনাকে বিয়েতে আসতে বলেছিলাম। জানি না কেন।

হয়তো মনে হয়েছিল, আসিফের জীবনের একটা অংশকে বাদ দিয়ে আমি নতুন জীবন শুরু করতে পারব না। আবার হয়তো নিজের অজান্তেই চেয়েছিলাম, আমার বিয়েতে আসিফের পরিবারের কেউ থাকুক।” ফারহানার গলা এবার খুব নিচু। “কাল যখন উনি এসে ঐ চেয়ারটায় বসেছিলেন, আমার খুব ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে উনাকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু আমার চারপাশে এত মানুষ, এত প্রশ্ন, এত আয়োজন।

আমি পারিনি।” ওপাশে কান্নার শব্দ শুনলাম। আমি কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। কল কেটে গেল। তিন দিন পর আবার কল এল। ফারহানা কাঁদছিল। ”ভাইয়া, আপনি কি আমার সঙ্গে একবার যাবেন?” “কোথায়?” “আন্টি মারা গেছেন।” জানি না কেন, আমি সেই ছবিটা বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। একজন ধূসর শাড়ির মহিলা, বিয়ের মঞ্চের কোণে বসে আছেন, হাতে ছোট্ট প্যাকেট। আমরা বিকেলে জানাজায় গেলাম। ছোট্ট উঠানে কয়েকজন প্রতিবেশী, দু-একজন আত্মীয়। ফারহানা এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ তাকে আলাদা করে প্রশ্ন করেনি, কেউ জানতে চায়নি সে কী পরিচয়ে এসেছে। দাফনের পর সবাই যখন চলে যাচ্ছিল, ফারহানা তখনও কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

আমি কাছে গিয়ে বললাম, ”চলুন।” সে মাথা নাড়ল। “আরেকটু থাকি, ভাইয়া।” আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর সে কবরের মাটি ছুঁয়ে খুব আস্তে বলল- “আন্টি, ভালো থাকবেন।” তারপর আর কোনো কথা বলল না। আমি জানি না, মৃত মানুষ কিছু শুনতে পান কি না। কিন্তু সেদিন ফারহানার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, সে এমন একজনকে বিদায় দিচ্ছে, যাঁর কাছে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি এতদিন বেঁচে ছিল।

ছয় মাস পর ফারহানা আমাকে তার বাসায় ডাকল। বসার ঘরের দেয়ালে বিয়ের বড় ছবিটা টাঙানো। সে আর তার স্বামী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের মুখে হাসি। ছবিটার ঠিক নিচে ছোট্ট একটা ফ্রেমে ধূসর শাড়ির সেই মহিলা। আমি ছবিটা দেখে অবাক হয়ে বললাম, “এটা এখানে রেখেছেন?” ফারহানা হাসল।

“আমার স্বামীই টাঙিয়ে দিয়েছেন।” আমি কিছু বললাম না। সে বলল, “জানেন, ভাইয়া, আমার স্বামী একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কি এখনও আসিফকে ভালোবাসো?” আমি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ফারহানা নির্বিকার গলায় বলল, “আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ। কিন্তু আমি তোমাকেও ভালোবাসি। এই দুই ভালোবাসা এক রকম না। একটার সঙ্গে আমার একটা জীবন শেষ হয়ে গেছে, আরেকটার সঙ্গে আমি নতুন জীবন শুরু করেছি।” সে দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকাল। ”আমার স্বামী অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, তাহলে আসিফের মাকে তোমার মায়ের মতোই দেখো। উনি তো আর কাউকে পাননি।” ফারহানার চোখ ভিজে উঠল।

আমি উঠে দাঁড়ানোর সময় ছবিটার কাছে গেলাম। ধূসর শাড়ির মহিলার চোখে সেই একই শান্ত দৃষ্টি। বিয়ের মঞ্চের কোণে বসে আছেন, হাতে ছোট্ট প্যাকেট। আমি ছবিটা অনেকবার দেখেছি। কিন্তু সেদিন প্রথম মনে হলো, তিনি আসলে ফারহানার বিয়েতে শুধু ছেলের প্রেমিকাকে দেখতে যাননি। তিনি গিয়েছিলেন নিজের ছেলের হয়ে শেষবারের মতো উপস্থিত থাকতে। যে বিয়েতে তাঁর ছেলের থাকার কথা ছিল, সেখানে ছেলের মা এসে বসেছিলেন।

ছেলের জায়গায় নয়, একটা কোণে। কাউকে বিরক্ত না করে, কোনো দাবি না জানিয়ে। আমি আজও ছবিটা মুছে ফেলিনি। মাঝে মাঝে খুলে দেখি। আর মনে মনে ভাবি, পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় মানুষ হয়তো সেই মা, যিনি জানেন তাঁর ছেলে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না, তবু ছেলের ভালোবাসার মানুষটার বিয়েতে গিয়ে একবার দেখে আসেন, মেয়েটা ভালো আছে কি না। কারণ, তাঁর নিজের ছেলে আর কোনো দিন এসে জিজ্ঞেস করবে না, “মা, ফারহানা কেমন আছে?”