ডিজেলের দামে কৃষির খরচে আগুন, লোকসানের শঙ্কায় ফরিদপুরের কৃষক
জ্বালানি তেলের বাজার মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পদ্মাপাড়ের কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই ও বাজারে পরিবহন—কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপে ডিজেলচালিত যন্ত্রপাতির ব্যবহার আবশ্যক হওয়ায় উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। উৎপাদনের প্রতিটি খাতে ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত শস্যের বাজারদর না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় প্রান্তিক ও মাঝারি চাষিরা।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় চাষাবাদকৃত মোট রোপা আমন ও অন্যান্য ফসলি জমির একটি বড় অংশে সেচ ব্যবস্থার জন্য ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিন ও পাওয়ার পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। পদ্মার চরাঞ্চল এবং সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও সদর উপজেলার মতো বিস্তীর্ণ কৃষি বেল্টে বৈদ্যুতিক সেচের সুবিধা অপ্রতুল হওয়ায় ডিজেলই কৃষকদের একমাত্র ভরসা। ফলে তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি সরাসরি আঘাত হেনেছে কৃষকদের পকেটে।
কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে গড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকায় উন্নীত হওয়ায় প্রতি বিঘায় শুধুমাত্র জ্বালানি বাবদ কৃষকের বাড়তি গুনতে হচ্ছে প্রায় ৬৬০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা।
ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের কৃষক মান্নান মাতুব্বর বলেন, “আমি এ বছর ৮ বিঘা জমিতে আমন ধান এবং পাট চাষ করেছি। আগের খরচের হিসাব অনুযায়ী সেচ পাম্প মালিকেরা এখন বিঘাপ্রতি সেচ মাশুল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ট্রলি ও হারভেস্টার মালিকরাও বাড়তি ভাড়া হাঁকাচ্ছেন। ফসল ঘরে তোলার আগেই আমাদের বাজেট লাল বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি মণ ধান উৎপাদনে ও প্রসেসিংয়ে গড়ে ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা খরচ হলেও ডিজেল, সার ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় বর্তমানে তা ৯৫০ থেকে ১,০৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। কিন্তু বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ নতুন বা পুরনো ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৯৫০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় রোপা আমন ধানের চাষ হয়েছে ৮৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে। তবে, সেচ নয় অধিকাংশ বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল রোপা আমন ধান। তবে, আউশধান ৪ হাজার ১৫২ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। যেগুলো সেচের উপর নির্ভরশীল। জেলায় বোরোধান আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে।
নগরকান্দা উপজেলার কৃষক মো. শামীম হোসেন জানান, “বীজ, সার, শ্রমিক ও ডিজেলের যে চড়া দাম, তাতে ১ মণ ধান উৎপাদনে ১,০০০ টাকার বেশি লেগে যাচ্ছে। অথচ হাটে নিয়ে সেই দাম পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মূলত কোনো মতে টিকে থাকার জন্য চাষাবাদ করছি, লাভের মুখ দেখা এখন স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।”
ফরিদপুর জেলা শুধু ধান নয়, বরং পেঁয়াজ, পাট, সরিষা ও বিভিন্ন শীতকালীন সবজি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরা জানান, জমি চষা এবং চারা রোপণের সেচ কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের ঘণ্টাপ্রতি চাষের ভাড়া বহুগুণ বেড়েছে। ফলে রোপা আমন বা বোরো মৌসুমের পাশাপাশি রবিশস্য উৎপাদনেও অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বইতে হবে তাদের।
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, বর্ষা বা আমন মৌসুমে বৃষ্টির কারণে সেচ তুলনামূলক কম লাগে। কিন্তু আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ১০০% কৃত্রিম ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়, যার বড় একটি অংশই চলে ডিজেলচালিত পাম্পে। দুই-তিন মাস পরেই বোরো ধানের বীজতলা প্রস্তুত শুরু হবে। আমন মৌসুমেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে সম্পূর্ণ সেচনির্ভর বোরো মৌসুমে খরচ কোথায় গিয়ে ঠেকবে—তা ভেবে আতঙ্কে রয়েছেন ফরিদপুরের কৃষকেরা।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষকদের সার্বিক উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। আমরা কৃষকদের পার্লাইনিং, পার্চিং ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানির অপচয় কমানোর পরামর্শ দিচ্ছি। একই সাথে সরকার যদি কৃষক পর্যায়ে সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে ধানের ন্যায্য ও বাড়তি সমর্থক মূল্য নির্ধারণ করে, তবে তারা এই সংকট ও লোকসান থেকে রেহাই পাবেন।”

আপনার মতামত লিখুন
Array