শতবর্ষের ঐতিহ্যকে শ্রেষ্ঠত্বের তকমা: ফরিদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ‑২০২৬ উপলক্ষে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজকে গৌরবময়ভাবে “ফরিদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ” ঘোষণা করা হয়েছে। ফরিদপুর জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন মানদণ্ডে বিচার করে রাজেন্দ্রকে এ বছর শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
দীর্ঘ ঐতিহ্য, শিক্ষাগত উৎকর্ষতা ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের কারণে এই স্বীকৃতি পেয়ে কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর এস.এম. আব্দুল হালিম এর নেতৃত্বে কলেজটি নতুন দিকনির্দেশনা ও অগ্রগতির দিকে আরও দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠান আর সমাজসেবীর দৃঢ় প্রেরণা:
ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম পুরনো ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাত। এর ইতিহাস ১৯১৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত ফিরে যায়, যখন বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা ও আইনজীবী বাবু অম্বিকাচরণ মজুমদার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এই কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি ফরিদপুরে উচ্চশিক্ষার সুব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।
কলেজের স্থপনা তহবিল সংগ্রহে ফরিদপুর জেলার বাইশরশির জমিদার রমেশ চন্দ্র রায় চৌধুরী উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা করেন। তিনি তাঁর পিতা রাজেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরীর নামে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫০,০০০ টাকা অর্থদানে সম্মত হন, যার ফলে কলেজের নামকরণ ‘রাজেন্দ্র কলেজ’ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে মাধ্যমিক পাশ শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজটি খোলা হলেও দ্রুতই এটি সমগ্র অঞ্চলের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ফজলুল হক, দেবেন্দ্র নাথ দত্তসহ বরেণ্য শিক্ষকরা বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান শুরু করেন।১৯২১ সালে বিএ (BA), ১৯২৩ সালে আইএসসি ও পরবর্তীতে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ চালু করা হয়।
সরকারী কলেজে রূপান্তর:
১৯৬৮ সালে কলেজটি সরকারিভাবে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ হিসেবে ঘোষিত হয়। এরপর থেকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রী ও অনার্স পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয় এবং শিক্ষার মান বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে কলেজে প্রায় ৩০,০০০ শিক্ষার্থী ও ১৬০ জন শিক্ষক বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন।
শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রগতি:
কলেজের বিভিন্ন বিভাগ শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষা প্রদান করছে। বিশেষ করে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আরও উচ্চ পর্যায়ের গবেষণা ও অধ্যয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থাপত্য হিসেবে কলেজ শহর ও বায়তুল আমান নামে দুটি ক্যাম্পাসে বিস্তৃত।
নায়ক—অধ্যক্ষ প্রফেসর এস.এম. আব্দুল হালিম:
বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর এস.এম. আব্দুল হালিমের দক্ষ নেতৃত্বে, কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন জীবনীশক্তি প্রবাহিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নতুন নতুন শিক্ষা উদ্যোগ, কর্মশালা, সেমিনার ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে।
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের প্রেক্ষাপট:
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ একটি সবার সম্মিলিত উদ্যোগ, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের সাফল্য, কাযর্ক্রম ও সমাজকল্যাণমূলক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হয়। এ বছর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের “ফরিদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ” নির্বাচিত হওয়া এই সপ্তাহকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে। শিক্ষা সপ্তাহে কলেজটি বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী ও সেমিনারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড:
শুধু পাঠ্যক্রমেই নয়, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও সমাজসেবায়ও সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ভূমিকা প্রতিভাবান। রক্তদান শিবির, পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচি, সমাজসেবা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো কর্মকাণ্ডে কলেজের ক্লাব ও সংগঠনগুলি সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা:
এ কলেজ ভবিষ্যতে আরও উন্নত মানের শিক্ষা প্রদান, নতুন নতুন গবেষণা ক্ষেত্রসহ শিক্ষার আধুনিকীকরণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আত্মপ্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, ডিজিটাল শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং শিল্প ও প্রযুক্তি শিক্ষার উন্নয়নে কলেজ কর্তৃপক্ষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি শিক্ষা, ঐতিহ্য ও অনুপ্রেরণার এক অনন্য সংমিশ্রণ। দীর্ঘ শতবর্ষের ইতিহাসে আজও এটি শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে, আর জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ‑২০২৬ এ “ফরিদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ” নির্বাচিত হয়ে সেই গৌরব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ব্যাপারে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এস.এম আব্দুল হালিম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “ফরিদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ নির্বাচিত হওয়া আমাদের জন্য অসাধারণ গৌরবের বিষয়। কলেজটির শতবর্ষের ঐতিহ্য, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষক ও কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এই অর্জনের মূল ভিত্তি। আমরা শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান দিই না, বরং শিক্ষার্থীদের মননশীল, দায়িত্ববান এবং সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করি।”
তিনি বলেন, “জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ‑২০২৬ এর এই স্বীকৃতি আমাদেরকে আরও দায়িত্বশীল করেছে। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, ভবিষ্যতেও শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য প্রতিটি সম্ভাব্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে। আমার আশা, এই অর্জন আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে, যাতে তারা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও শিক্ষার মান ও মর্যাদা তুলে ধরে।”

আপনার মতামত লিখুন
Array