খুঁজুন
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

নাব্যতা সংকটে তিন মাস ধরে বন্ধ ফরিদপুরের নৌ বন্দর, বেকার কয়েক হাজার শ্রমিক

সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫৯ এএম
নাব্যতা সংকটে তিন মাস ধরে বন্ধ ফরিদপুরের নৌ বন্দর, বেকার কয়েক হাজার শ্রমিক

ফরিদপুরের পদ্মা পাড়ের মানুষ এমন পদ্মা নদীর চিত্র এর আগে কোনদিন দেখতে হয়েছে বলে তারা মনে করতে পারছেন না। এবার তাদের দেখতে হচ্ছে পদ্মা নদীর পানি শূন্যতায় পুরো পদ্মা যেন হাহাকারের এক প্রতিধ্বনি। ফরিদপুরের পদ্মায় চর তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে এ যেন এক ধূসর মরুভূমির ছবি। অবলীলায় পায়ে হেঁটেই পদ্মা পার হয়ে যাওয়ার দৃশ্য এ অঞ্চলে যেন নতুন কোন গল্প।

কবিতার ভাষায় বলতে হয়, “চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা, একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক, রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।” কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার এই চারটি লাইনের সাথে ফরিদপুরের পদ্মা নদীর মিল এখন অনেকটাই।

শীতের শুরুতেই ফরিদপুরের পদ্মা নদীতে নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। এরপর থেকে গত প্রায় তিন মাস যাবত বন্ধ রয়েছে নৌবন্দরের প্রায় সফল কার্যক্রম। ‌অচল হয়ে রয়েছে দক্ষিণ অঞ্চল সহ ফরিদপুর অঞ্চলের একমাত্র সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরটি। নদীর মাঝে জেগে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য ডুবোচর ও পানি শূন্যতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো ও বড় ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। দূরদূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসা এসব পণ্যবাহী জাহাজ পদ্মা নদীর বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে যাচ্ছে। চরে আটকা পড়ে থাকার কারণে নৌবন্দরে ভিড়তে পারছে না। এতে অচল হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের একমাত্র নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত ঘাটটি। আর এ কারণে হাজারের বেশি কুলি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকা থমকে গেছে।

নৌ ঘাট সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সিঅ্যান্ডবি (C&B) ঘাট নৌবন্দরটি শত বছরের পুরোনো হলেও, এটি পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর হিসেবে ২০১৫ সালে সরকারিভাবে আত্মপ্রকাশ ও ঘোষিত হয়। পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হয় বন্দরটি। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর এবং সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার সাথে সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনের বন্দরটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি রপ্তানি হলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বছরের একটি বড় সময় ধরে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এই সংকট শুধু বন্দরের কর্মী ও ব্যবসায়ীদের জীবনেই প্রভাব ফেলছে না বরং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফরিদপুরের বিখ্যাত সোনালী আঁশ খ্যাত পাট এই বন্দর হয়েই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রপ্তানি হয়। সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্টবাহী জাহাজ এই বন্দর থেকে খালাস করা হয়।

গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই নৌবন্দর থেকে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। কিন্তু ডুবো চর ও নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে, চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাড়ছে না রাজস্ব। এরপর থেকে বিআইডব্লিউটি নিজেই রাজস্ব আদায় করে থাকে ঘাট থেকে। এই অর্থবছরের ২০২৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নৌ বন্দরটি ইজারা দেয়া হয় দুই কোটি ৮৫ লক্ষ টাকায়।‌ বর্তমানে মো. মজিবুর রহমান নামে ইজারাদার প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হচ্ছেন। ‌তিনি গত তিন মাসে বিভিন্নভাবে ২৫টি চিঠি বিআইডব্লিউটিএ এর কাছে লিখলেও তার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ তারা করেননি। উল্টো একটি ড্রেজার মেশিন নদীর ভিতর রেখে নদীতে আসা-যাওয়ার সমস্যা করে রেখেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকদের কাছে।

পণ্যবাহী নৌযান ভিড়তে না পারায় নৌবন্দরের শুল্ক আদায়ও নেই। পণ্যবাহী নৌযানের মালিকরা ও পণ্য আমদানিকারকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। নৌবন্দরের শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়েছেন। এছাড়া দিনের পর দিন নৌ বন্দর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মাঝ পদ্মা নদীতে অরক্ষিত স্থানে জাহাজ, কার্গোগুলো থাকায় পড়তে হচ্ছে বিবিধ সমস্যায়। ঘাটে জাহাজ এবং কার্গো গুলো না আসতে পারায় বর্তমানে দূরবস্থা চরমে পৌঁছেছে। নাব্যতা সংকট সমাধানে কয়েকটি স্থানে বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজার মেশিন বসিয়ে খনন কাজ না করলে নৌবন্দরটি ব্যবসায়িকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়ে যাবে। ‌

ফরিদপুরের সোনালি আঁশ খ্যাত পাট এই বন্দর হয়েই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বহির্বিশ্বে রফতানি হয়। এছাড়াও সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, ভারতের গরু ও চালসহ চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মিরকাদিম থেকে এই নৌপথেই চাল আমদানি হয়। নারায়ণগঞ্জ বন্দর থেকে প্রচুর সিমেন্টবাহী জাহাজ ও কার্গো এই বন্দর থেকে খালাস করা হয়।

এদিকে নৌবন্দরে ভিড়তে না পেরে নৌবন্দর থেকে নদীর মাঝ নদীতে পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো ও বড় ট্রলার ডুবো চরে আটকা পড়ে রয়েছে। সেখান থেকে ছোট ছোট ট্রলারে করে পণ্য নিয়ে আসায় খরচ বাড়ছে ব্যবসায়ীদের। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।

নৌ বন্দরের শ্রমিক লালন বলেন, ঘাটে জাহাজ ভিড়তে না পারায় বেকার হয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। আমার বাড়ি নওগাঁ, এখানে শ্রমিকের কাজ করি। প্রতিদিন কাজ না থাকায় নিজের খাওয়া দাওয়ার সমস্যা হয়, বাড়িতে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না। সরকার আমাদের দিক বিবেচনা করে অতি দ্রুত ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু করুক এটাই এখন তার দাবি।

আরেক শ্রমিক নুরুল শেখ বলেন, এই কাজের ওপর সংসার চলে। জাহাজ না আসায় রোজগার কমে গেছে। দুই সন্তান পড়ালেখা করে। সংসারের খরচ তাদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় বাড়ি থেকে টাকা এনে চলতে হয়। এখন তারা আর পেরে উঠছেন না বেকার থাকার কারণে।

রমজান নামে এক কুলি জানান, গত তিন মাস যাবৎ একদম বেকার হয়ে গিয়েছি। আমাদের অবস্থা দেখার কেউ নেই। ঘাট আমাদের আয় রোজগারের একমাত্র জায়গা। সেই জায়গাটি সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে এখন বন্ধ রয়েছে। সরকারের কাছে দাবী জানাই অতি দ্রুত ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

ঘাটের বড় ব্যবসায়ী আলম শেখ বলেন, দক্ষিণবঙ্গসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ব্যবসায়িক পণ্য আনা নেওয়ার জন্য এই নৌবন্দরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নৌবন্ধটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন তারা। গত তিন মাসে আমাদের ব্যবসার ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুধু আমার। ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে অতি দ্রুত বিআইডব্লিউটিএ ডেজিং ব্যবস্থা চালু করে নদী পথকে স্বাভাবিক রাখার দাবি তার।

ব্যবসায়ী ও ঘাট ইজারাদার মুজিবর শেখ বলেন, নদীতে নাব্যতা সংকট এবং নদীতে চর পড়ে যাওয়ায় পণ্যবাহী নৌযান বন্দরে আসতে পারছে না। এই অর্থবছরের ২০২৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নৌ বন্দরটি ইজারা নেয়া হয়েছে দুই কোটি ৮৫ লক্ষ টাকায়।‌ বর্তমানে আমার প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হচ্ছি। ‌ গত তিন মাসে বিভিন্নভাবে ২৫টি চিঠি বিআইডব্লিউটিএ এর কাছে লিখেছি। বিআইডব্লিউটিএ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ তারা করেননি। উল্টো একটি ড্রেজার মেশিন নদীর ভিতর রেখে নদীতে আসা-যাওয়ার সমস্যা করে রেখেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। আমাদের ক্ষতিপূরণ দাবি এবং একই সাথে ড্রেজার বসিয়ে নদীর নাব্যতা সংকট দূর করার দাবি জানাচ্ছি।

ফরিদপুর সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরের বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, নাব্যতা সংকটের কারণে ফরিদপুর নৌবন্দরের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অতি দ্রুত ড্রেজিং এর দরকার বলে মনে করেন তারা।

এদিকে নাব্যতা বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা নৌ বন্দরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার রায় মোবাইল ফোনটি রিং বাজলেও না ধরে কেটে দেন।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা বলেন, নাব্যতা সংকটের কারণে চরম ক্ষতিতে পড়ছে নৌবন্দরটি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। দ্রুতই খননের কাজ শুরু হবে বলে আশা রাখি। নির্বাচনের সময় ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি হয়তো পিছিয়ে গেছে। আশা করছি এখন যেসব জায়গায় চরের সৃষ্টি হয়েছে সে সব জায়গায় ড্রেজার বসিয়ে খনন করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ঠিক করা হবে। আর এই বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএ দেখে তারা বিষয়টি দ্রুত করবে এমনটাই আমরা জানতে পেরেছি বলে তিনি জানান। ‌

ফরিদপুর সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরের নাব্যতা সংকট উত্তরণে অতি দ্রুত ড্রেজিং সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকার নেবে এমনটাই প্রত্যাশা ঘাট সংশ্লিষ্টদের।

বোয়ালমারীতে গাছের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ গেল শিশুর

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম
বোয়ালমারীতে গাছের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ গেল শিশুর

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা গাছের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে হুসাইন (০৯) নামের এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের দিকে বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নের বড়গা এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। শিশুটি উপজেলার বড়গা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা সোহেল শেখের ছেলে এবং বারাংকুলা কওমী মাদরাসার ছাত্র।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হুসাইন বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে মাদ্রাসায় ফিরছিল। এলাকার গাছ ব্যবসায়ী কদর মোল্যার রাস্তার পাশে ফেলে রাখা মেহগনি গাছের গুড়ির উপর খেলা করতে গিয়ে হঠাৎ গুড়ির উপর থেকে নিচে চাপা পড়ে হুসাইন। রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারী ও আশপাশের লোকজন দেখতে পেয়ে হুসাইনকে উদ্ধার করে বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শিমুল মোল্যা বলেন, গাছের গুড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে সময় নিচে পড়ে মারা যায়। কোথাও কাটা-ফাটা নাই। ছেলের মৃত্যুর জন্য তার বাবা কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নাই বলে জানিয়েছেন।

চাঁদা না পেয়ে ফরিদপুরে বাস কাউন্টারে হামলা, ম্যানেজারকে রক্তাক্ত জখম

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:২২ পিএম
চাঁদা না পেয়ে ফরিদপুরে বাস কাউন্টারে হামলা, ম্যানেজারকে রক্তাক্ত জখম

ফরিদপুরে চাঁদার দাবিকৃত টাকা না পেয়ে একটি পরিবহন কাউন্টারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বিকাশ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার নাজির বিশ্বাসকে (৪৫) দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা প্রায় ১১টার দিকে ফরিদপুর শহরের পৌর বাস টার্মিনালে অবস্থিত বিকাশ পরিবহনের কাউন্টারে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ৬ জন দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় তাদের হাতে রামদা, লোহার দণ্ডসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল।

আহত নাজির বিশ্বাস নড়াইলের লোহাগাড়া উপজেলার লাহুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘ তিন বছর ধরে বিকাশ পরিবহনের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রতিষ্ঠানের মালিকের মৃত্যুর পর থেকে তিনিই কার্যত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। প্রতিদিন এখান থেকে দূরপাল্লার উদ্দেশ্যে প্রায় ১২টি ট্রিপ পরিচালিত হয় বলে তিনি জানান।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাজির বিশ্বাস জানান, দীর্ঘদিন ধরেই একটি চক্র তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। প্রথমে তারা প্রতিটি ট্রিপ থেকে ৮টি করে সিট দাবি করে এবং প্রতিটি সিটের জন্য ১০০ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরে তারা প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে এবং সর্বশেষ দুই লাখ টাকা এককালীন দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

তিনি আরও জানান, ঘটনার দিন সকালে দুর্বৃত্তরা এসে হুমকি দিয়ে যায়—চাহিদা পূরণ না করলে পরিবহন চলতে দেওয়া হবে না। কিছুক্ষণ পর তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ফিরে এসে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। একপর্যায়ে লোহার রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং রামদা দিয়ে কোপ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেন। এতে তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে।

নাজির বিশ্বাস দাবি করেন, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় মিলন, সবুজ ও প্রিন্স নামে তিনজনকে তিনি চিনতে পেরেছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিক ও সহকর্মীরা।

এ বিষয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

ফরিদপুর থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী—যেভাবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক উত্থান?

হারুন-অর-রশীদ ও মো. নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:৪২ পিএম
ফরিদপুর থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী—যেভাবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক উত্থান?

ফরিদপুর-২ (সালথা–নগরকান্দা) আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে অবশেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর শপথ নিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম।

নতুন সরকারের ২৪ সদস্যের প্রতিমন্ত্রী তালিকায় তার নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির ঘটনা নয়; বরং তৃণমূল রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

শপথ গ্রহণের এই মুহূর্তে শামা ওবায়েদ শুধু একজন সংসদ সদস্য বা দলের সাংগঠনিক নেতা নন, বরং দেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত একজন নীতিনির্ধারক। ফলে তার ওপর প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি দায়িত্বও হয়েছে বহুগুণ বেশি।

উত্তরাধিকার থেকে নেতৃত্বে উত্তরণ:

শামা ওবায়েদ ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় শুরু হয় পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও প্রভাবশালী রাজনীতিক কে এম ওবায়দুর রহমানের কন্যা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কে এম ওবায়দুর রহমান ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে পরিচিত। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণ এখনো দলীয় নেতাকর্মীদের অনুপ্রাণিত করে।

তবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক পথচলা কেবল উত্তরাধিকার নির্ভর নয়। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা তাকে নতুনভাবে রাজনীতির ময়দানে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম অংশগ্রহণ করে পরাজিত হলেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং পরাজয়কে শক্তিতে পরিণত করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন।

তৃণমূল রাজনীতির শক্ত ভিত:

রাজনীতিতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে শামা ওবায়েদ বেছে নেন তৃণমূলকেন্দ্রিক কৌশল। ফরিদপুরের নগরকান্দা ও সালথা উপজেলায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন পুনর্গঠন, কর্মীসংগ্রহ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তার উদ্যোগ দলীয়ভাবে প্রশংসিত হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, তিনি মাঠে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করতেন। ফলে ধীরে ধীরে তিনি একজন ‘মাঠমুখী নেতা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তার সক্রিয় ভূমিকা দলের উচ্চপর্যায়ের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিপুল ভোটে জয়, জনসমর্থনের প্রতিফলন:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে ৩২ হাজার ৩৮৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হন। এই জয় শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিশ্রম ও জনসংযোগের প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, শামা ওবায়েদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। ফলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হতে সক্ষম হন।

তার বিজয়ের পর থেকেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। শপথ গ্রহণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে।

মন্ত্রিসভায় নারী নেতৃত্বের প্রতীক:

নতুন মন্ত্রিসভায় তিনজন নারী প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে একজন শামা ওবায়েদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের নারী নেতৃত্বের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্বের বিকাশে তার অন্তর্ভুক্তি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

সালথা উপজেলা বিএনপি সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শামা শুধু ওবায়দুর রহমানের কন্যা নন, তিনি নিজেই একজন দক্ষ সংগঠক। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তার এই পদোন্নতি প্রাপ্য।”

শিক্ষিত ও আধুনিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি:

শামা ওবায়েদ ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা। ১৯৭৩ সালের ১৪ মে ফরিদপুরের নগরকান্দায় লস্করদিয়ায় জন্মগ্রহণ করা শামা ওবায়েদ ঢাকার ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে প্রায় ছয় বছর করপোরেট খাতে কাজ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাভাবনা ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা তাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে রাখবে।

ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক ভারসাম্য:

রাজনৈতিক ব্যস্ততার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও শামা ওবায়েদ একজন সফল নারী। তার স্বামী সোভন ইসলাম একজন ব্যবসায়ী। তিনি দুই সন্তানের জননী। পারিবারিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার সক্ষমতা তাকে আরও দৃঢ় নেতৃত্বে পরিণত করেছে।

তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনেও তিনি পরিবারকে সময় দেন এবং সন্তানদের শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন তার ব্যক্তিত্বকে আরও পরিপূর্ণ করেছে।

অঙ্গীকার ও দায়িত্বের নতুন অধ্যায়:

নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, “আমি রাজনীতিতে সুবিধা নিতে আসিনি; মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনই আমার লক্ষ্য।”

এখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। দেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বৈদেশিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তাকে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রত্যাশাও পূরণ করতে হবে।

বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ:

সালথা উপজেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আসাদ মাতুব্বর ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, শামা ওবায়েদের এই পদোন্নতি ভবিষ্যতে তাকে আরও বড় দায়িত্বের পথে নিয়ে যেতে পারে। তার সাংগঠনিক দক্ষতা, মাঠমুখী রাজনীতি এবং জনসংযোগের ক্ষমতা তাকে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অনেকে মনে করছেন, যদি তিনি সফলভাবে তার বর্তমান দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবেও তার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

ফরিদপুর থেকে জাতীয় মঞ্চে:

ফরিদপুরের আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ—শামা ওবায়েদের এই যাত্রা অনেক তরুণ নেতার জন্য অনুপ্রেরণার গল্প। তার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে, শুধু পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগই একজন নেতাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার সামনে এখন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই অধ্যায়ে তাকে প্রমাণ করতে হবে—তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নন, বরং একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক ও জননেত্রী।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন চোখ শামা ওবায়েদের দিকে—তিনি কতটা সফলভাবে এই নতুন দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটিই দেখার বিষয়।