ফরিদপুরে কবরের ফুলগাছ চুরি, প্রতিশোধ নয়—১,৫০০ ফুলগাছে পুরো গ্রাম সাজালেন যুবক
বাবা ও দাদির কবরের পাশে ভালোবাসা আর স্মৃতির নিদর্শন হিসেবে লাগানো ফুলগাছ একদিন হঠাৎ চুরি হয়ে যায়। এমন ঘটনায় যে কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারেন, চোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারেন। কিন্তু ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের যুবক হাওলাদার শামীম আহমেদ বেছে নিয়েছেন এক ভিন্ন পথ। প্রতিশোধ নয়, তিনি জবাব দিয়েছেন ভালোবাসা দিয়ে। কবর থেকে চুরি হওয়া কয়েকটি ফুলগাছের বদলে পুরো গ্রামজুড়ে রোপণ করেছেন ১ হাজার ৫০০টি ফুলগাছ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে প্রয়াত বাবা ও দাদির স্মৃতিকে ঘিরে কবরের পাশে হাসনাহেনা, কামিনী ও শিউলীসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ লাগান শামীম। প্রতিদিন নিয়মিত পরিচর্যা ও যত্নে গাছগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। এর মধ্যে একটি গাছে ফুলও ফুটেছিল। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
এক সকালে কবরস্থানে গিয়ে তিনি দেখেন, সেখানে লাগানো ফুলগাছগুলো আর নেই। কেউ রাতের অন্ধকারে গাছগুলো তুলে নিয়ে গেছে। এমন ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি। তবে চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ বা প্রতিশোধের চিন্তা না করে তিনি বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করেন।
শামীমের ভাষায়, “প্রথমে খুব খারাপ লেগেছিল। পরে ভাবলাম, যে মানুষ গাছগুলো নিয়ে গেছে, সে হয়তো ফুল ভালোবাসে। যদি ফুলের প্রতি তার ভালোবাসা থাকে, তাহলে আরও বেশি ফুল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত।”
এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের। নিজস্ব অর্থায়নে তিনি পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের প্রায় ৫০০টি বাড়ির সামনে তিনটি করে মোট ১,৫০০টি ফুলগাছ রোপণের উদ্যোগ নেন। ইতোমধ্যে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে হাসনাহেনা, কামিনী, শিউলীসহ নানা প্রজাতির সৌন্দর্যবর্ধক গাছ লাগানো হয়েছে।
গ্রামবাসীরা বলছেন, এমন উদ্যোগ শুধু গ্রামের সৌন্দর্যই বাড়াবে না, বরং পরিবেশ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফুলগাছের সুবাস ও সৌন্দর্যে গ্রাম আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। পাশাপাশি অন্যদের মাঝেও গাছ লাগানোর আগ্রহ তৈরি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বর্তমান সময়ে যখন পরিবেশ দূষণ ও সবুজের সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন একজন তরুণের এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। ব্যক্তিগত ক্ষতিকে তিনি সামাজিক কল্যাণে রূপ দিয়েছেন, যা অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় উদাহরণ হতে পারে।
শামীমের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই এলাকায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, একটি ছোট ঘটনা থেকে জন্ম নেওয়া এই মহৎ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও অনেক মানুষকে পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করবে।
বাবা ও দাদির কবর থেকে হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি ফুলগাছ হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে শামীম যে ভালোবাসার বাগান গড়ে তুলেছেন, তা শুধু একটি গ্রামের নয়, মানবিকতারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন
Array