ফরিদপুরে পানি সংকটে চরম দুর্ভোগ, বিপাকে হাজারো পরিবার
ফরিদপুর পৌরসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে, যা দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। টানা কয়েক দিন ধরে শহরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়মিত পানি সরবরাহ বন্ধ বা অনিয়মিত থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার-হাজার বাসিন্দা। বিশেষ করে শান্তিবাগ, চরকমলাপুর, সিংপাড়া, পশ্চিম খাবাসপুর এবং গোয়ালচামটসহ আশপাশের এলাকাগুলোর মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পৌরসভার সরবরাহ করা পানি ঠিকমতো পাচ্ছেন না তারা। কোথাও একেবারেই পানি আসছে না, আবার কোথাও দিনে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা পানি সরবরাহ করা হচ্ছে—যা দিয়ে একটি পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে রান্নাবান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পানির এই সংকট শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও। অনেক মসজিদে পানি না থাকায় মুসল্লিরা ঠিকমতো অজু করতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে অনেক মসজিদে মাইকিং করে বাসা থেকে অজু করে আসার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এতে করে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অস্বস্তি ও ক্ষোভ।
চরকমলাপুর এলাকার বাসিন্দা উম্মে হাবিবা মৌ বলেন, “আমাদের এলাকায় পানির সংকট এখন চরমে পৌঁছেছে। বাসার রিজার্ভ ট্যাংক একেবারেই খালি হয়ে গেছে। প্রতিদিন দূর থেকে পানি এনে কোনোভাবে দিন পার করছি।”
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মামুনার রশিদ মামুন জানান, “প্রায় আট দিন ধরে আমাদের এলাকায় পানি নেই। এই অবস্থায় জনসাধারণ চরম কষ্টে আছে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান জরুরি।”
পশ্চিম খাবাসপুর এলাকার বাসিন্দা ও আইনজীবী মেহেরুননেসা স্বপ্না ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পাঁচ দিন ধরে পৌরসভার কোনো পানি সরবরাহ নেই। কোথায় অভিযোগ করবো, কীভাবে সমাধান পাবো—কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আমরা যেন পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছি।”
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দূরবর্তী টিউবওয়েল, পুকুর কিংবা প্রতিবেশী এলাকার পানির ওপর নির্ভর করছে। এতে করে বাড়ছে সময় ও শ্রমের অপচয়, পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়া, আমাশয়, ত্বকের রোগসহ নানা পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে—যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের কিছু এলাকায় নিয়মিত পানি সরবরাহ থাকলেও অন্য অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংকট চললেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এতে করে বৈষম্যের অভিযোগও উঠছে। তারা দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ফরিদপুর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) সৈয়দ মো. আশরাফ বলেন, “মূলত বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে পানি উত্তোলন ও পরিশোধন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যেসব এলাকায় সংকট বেশি, সেখানে দুটি পানির রিজার্ভ রয়েছে—একটি পরিচর্যা হাসপাতালের পাশে এবং অন্যটি শিশু পার্ক সংলগ্ন। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকায় আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি উত্তোলন করতে পারছি না।”
তিনি আরও জানান, “এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের তিন ঘণ্টা পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে হয়। এছাড়া বর্তমানে শুষ্ক মৌসুম চলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, ফলে উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।”
সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান হলে পানি সরবরাহ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আমরা আশা করছি। পাশাপাশি বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা, সেটিও আমরা খতিয়ে দেখছি।”
এদিকে সচেতন মহল বলছে, দ্রুত এই সংকট সমাধানে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে পানি সরবরাহের জন্য মোবাইল ট্যাংকার, গভীর নলকূপ স্থাপন কিংবা অস্থায়ী পানির উৎস চালু করার মতো উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
শহরের বাসিন্দারা বলছেন, পানি মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই এ ধরনের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন
Array