ফরিদপুরে আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ‘হাঁস খেলা’
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যখন স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলাধুলা, ঠিক তখনই সেই হারানো সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ফরিদপুরের একদল তরুণ ও স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের উদ্যোগে ফরিদপুর সদরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনন্য আয়োজন ‘হাঁস খেলা’। নতুন এই আয়োজনকে ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ, আর পুকুরপাড়ে ভিড় করেন শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু।
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ফরিদপুর পৌরসভার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাইতুল আমান আদর্শ একাডেমি স্কুল সংলগ্ন একটি পুকুরে অনুষ্ঠিত হয় এই ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতা।
জানা গেছে, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ খেলার আয়োজন দেখে অনুপ্রাণিত হন স্থানীয় বাসিন্দা শেখ আব্দুল গফুর প্রামাণিক (৫৭)। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতা ও উৎসাহে বাস্তবে রূপ নেয় তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
খেলায় অংশ নেন এলাকার তরুণ, যুবক ও প্রবীণসহ মোট ২১ জন প্রতিযোগী। সুষ্ঠুভাবে প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য তাদের সাতজন করে তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। প্রতিটি রাউন্ডে একটি হাঁস পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং ২০ মিনিটের মধ্যে যে প্রতিযোগী হাঁসটিকে ধরে ফেলতে পারেন, তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। খেলার সময় হাঁসটি যদি নিজে থেকে পাড়ে উঠে আসে, তাহলে সেটিকে আবার পানিতে ছেড়ে দেওয়া হতো। ফলে হাঁস ও প্রতিযোগীদের দৌড়ঝাঁপ, পানিতে সাঁতার আর লুকোচুরির মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ।
তিনটি গ্রুপ থেকে চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হন তিনজন। প্রথম স্থান অর্জন করেন স্থানীয় বাইতুল আমান আদর্শ একাডেমির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ইয়াসিন (১৫)। দ্বিতীয় হন কানাইপুর এলাকার সম্রাট মোল্লা (১৭), যিনি দর্জির কাজ শিখছেন। তৃতীয় স্থান অর্জন করেন বাইতুল আমান এলাকার স্যানিটারি মিস্ত্রি সিদ্দিক মোল্লা (৫৩)। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আয়োজকেরা।
ফরিদপুর সদরে এ ধরনের আয়োজন এই প্রথম হওয়ায় সকাল থেকেই উৎসুক মানুষের ঢল নামে পুকুরপাড়ে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল। দর্শকদের করতালি, হাসি-আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
খেলা দেখতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এমন লোকজ খেলাধুলা প্রায় অচেনা। এই আয়োজন শুধু বিনোদনই নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা শেখ রিপন বলেন, “এটি পুরো এলাকার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। প্রথম আয়োজনেই যে বিপুল সাড়া পেয়েছি, তা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। আগামী বছর আরও বড় পরিসরে হাঁস খেলার আয়োজন করতে চাই। প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি আস্ত খাসি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।”
মূল উদ্যোক্তা শেখ আব্দুল গফুর প্রামাণিক বলেন, “অনেক দিন ধরেই এমন একটি আয়োজন করার স্বপ্ন ছিল। ইন্টারনেট ও টেলিভিশনে বিভিন্ন জায়গার লোকজ খেলা দেখে নিজের এলাকাতেও এমন কিছু করার ইচ্ছা জাগে। সবার সহযোগিতায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে। মানুষের ভালোবাসা ও উপস্থিতি আমাদের মুগ্ধ করেছে। ভবিষ্যতে প্রতি বছর আরও বড় পরিসরে এই আয়োজন অব্যাহত রাখতে চাই।”
স্থানীয়দের মতে, এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আপনার মতামত লিখুন
Array