খুঁজুন
, ,

ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতার নানা দিক

আলেমা হাবিবা আক্তার
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৪৬ অপরাহ্ণ
ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতার নানা দিক

ইসলাম মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদান করে। আল্লাহ মানবজাতিকে যে সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তার দাবিও মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

তবে ইসলামে ব্যক্তির স্বাধীনতা নিঃশর্ত নয়। কেননা নিঃশর্ত স্বাধীনতা মানুষের পশু প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করে।

ফলে সে নিজের ও অন্যের ক্ষতি করে, তার ভ্রুক্ষেপহীন আচরণ মনুষ্যত্বকে অপমান করে। শুধু ইসলাম নয়, পৃথিবীর কোনো ধর্ম, সমাজ ও সভ্যতায় ব্যক্তিস্বাধীনতা নিঃশর্ত নয়।

সমাজেই ধর্মীয় বিধান ও আইনি বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে মানুষের মন্দ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ রয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তির স্বাধীনতা নিছক কোনো বস্তুগত বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে ব্যক্তির আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রশ্নটিও গভীরভাবে জড়িত।

ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল দর্শন হলো ব্যক্তি গাইরুল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া সবকিছু) থেকে মুক্তি লাভ করবে এবং সে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে দূরে থাকবে। সুতরাং ইসলাম ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের স্বাধীনতা স্বীকার করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়। ইসলাম সেই ব্যক্তির স্বাধীনতা স্বীকার করে না যে সমাজে ফেতনা ও বিশৃঙ্খলা ছড়াতে চায়। বিপরীতে আধুনিক সমাজের কেউ কেউ মানুষের এমন অবাধ স্বাধীনতার দাবিদার, যা মানুষের মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে এবং তাকে প্রবৃত্তির বলি বানায়; তারা এমন স্বাধীনতার কথা বলে, যা মানুষের দেহ ও আত্মার জন্য অপমানজনক।
ব্যক্তিস্বাধীনতার নানা দিক

ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতার কয়েকটি দিক ও দর্শন তুলে ধরা হলো—

১. মানুষ স্বাধীন সত্তার অধিকারী : ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ স্বাধীন সত্তার অধিকারী। তাকে দাসে পরিণত করা এবং তার সঙ্গে দাসসুলভ আচরণ করা অন্যায়। মানুষ দাসত্ব করবে কেবল তার মহান স্রষ্টার। এ জন্য মিসরের প্রশাসক আমর ইবনুল আস (রা.)-এর ছেলে এক নাগরিককে বেত্রাঘাত করলে ওমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা কখন মানুষকে দাসে পরিণত করলে, অথচ তাদের মা তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছে।’
(আল ফারুক ওমর (রা.) : ২/১৯৮)

এ কারণেই পবিত্র কোরআনে মানুষকে এই প্রার্থনা শেখানো হয়েছে, ‘আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।’
(সুরা : ফাতিহা, আয়াত : ৫)

২. জ্ঞান আহরণের স্বাধীনতা : ইসলাম সর্বশ্রেণির মানুষের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও গবেষণার দরজা উন্মুক্ত রেখেছে এবং ইসলাম মানুষকে শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান আহরণে উদ্বুদ্ব করেছে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টিজগত নিয়ে গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণা করার আহবান জানানো হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত-দিনের পরিবর্তনে, যা মানুষের উপকার করে তাসহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানগুলোতে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে বারিবর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় জ্ঞান জাতির জন্য নিদর্শন আছে।’
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৪)

৩. রাজনৈতিক স্বাধীনতা : মানুষের ব্যক্তিজীবনে রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিশেষ গুরুত্ব আছে। ইসলাম মানুষের এই অধিকার প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যক্তি শাসক নির্বাচনে মতামত দিতে পারে, শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে শাসককে ভালো-মন্দের পরামর্শ দিতে পারে, শাসকের যৌক্তিক সমালোচনা করতে পারে, কোনো জুলুম ও অবিচারের শিকার হলে তার প্রতিকার রাষ্ট্রের কাছে চাইতে পারে, শাসক যদি আল্লাহর অবাধ্য হয় তবে ব্যক্তিও তার অবাধ্য হতে পারে। আর জনগণের মতামতের মূল্যায়ন করতে আল্লাহর নির্দেশনা হলো, ‘আর কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ কোরো।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

৪. সমাজজীবনে স্বাধীনতা : ইসলাম ব্যক্তিকে সমাজজীবনে স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। ফলে সে সমাজের মানুষকে মন্দ থেকে বারণ করতে পারবে এবং নেক কাজে উৎসাহিত করতে পারবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন নর ও মুমিন নারী একে অন্যের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, তাদেরই আল্লাহ কৃপা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী।’
(সুরা : তাওবা, আয়াত : ৭১)

৫. ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা : ইসলাম মানুষের ধর্মীয় জীবনের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ইসলাম মনে করে, ব্যক্তি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং পরকালে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি তাকেই করতে হবে। তবে কেউ ইসলাম গ্রহণের পর তা ত্যাগ করার অধিকার রাখে না। কেননা এতে মহান আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও দ্বিন ইসলামের অসম্মান হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘দ্বিন সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই; সত্যপথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহে ঈমান আনবে সে এমন এক মজবুত হাতল ধরবে যা কখনো ভাঙবে না। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাময়।’
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৬)

৬. ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাধীনতা : পৃথিবীর মানুষ বিচিত্র ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করে। প্রত্যেকের জীবনধারা ও রীতিনীতি ভিন্ন। ইসলাম মৌলিক কিছু শর্তে পৃথিবীর ভাষা, বর্ণ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নিদর্শন হলো আসমানগুলো ও পৃথিবীর সৃষ্টি, তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জানীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’
(সুরা : রোম, আয়াত : ২২)

মোট কথা, ইসলাম মানবপ্রকৃতি ও মানবকল্যাণের শর্তে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীনতা স্বীকার করে। ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূলকথা হলো, মানুষ আল্লাহর দাসত্বের অধীনে থেকে যাবতীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১:৩৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

ফরিদপুরের সালথায় ৯ বছর বয়সী ৩য় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শওকত মিয়া (৩৮) নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

​বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আবুল বাসার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর কড়া পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

​দণ্ডপ্রাপ্ত শওকত মিয়া ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের সিরাজ মিয়ার ছেলে।

মামলার বিবরণ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২ মে বিকেলে সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের ৩য় শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছরের ওই শিশুটি বাড়ির পাশে নিজেদের শাক-সবজির (ডাটা) ক্ষেত দেখতে গিয়েছিল। এসময় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিবেশী শওকত মিয়া শিশুটিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাশের একটি নির্জন পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে।

​শিশুটির রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থা দেখে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ (ওসিএসি)-এ ভর্তি করায়। ঘটনার পরদিনই নির্যাতিতা শিশুটির বাবা বাদী হয়ে সালথা থানায় শওকত মিয়াকে একমাত্র আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

​ঘটনা তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর সালথা থানা পুলিশ আসামি শওকত মিয়াকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় সাক্ষী গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে দীর্ঘ ৬ বছর পর আদালত আজ এ রায় প্রদান করেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট অর্চনা দাস বলেন, “একটি অবুঝ শিশুকে নির্যাতন করে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছিল, আজকের এই রায়ের মাধ্যমে তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। এই শাস্তি সমাজে অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে এবং শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা এ রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”

ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

ফরিদপুরের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’র অবাধ ব্যবহার দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। জেলার সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, সদরপুর, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা ও আলফাডাঙ্গাসহ প্রায় সব উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরার এই নিষিদ্ধ ফাঁদের বিস্তার ঘটেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এসব চায়না দুয়ারি বসিয়ে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ নির্বিচারে শিকার করা হলেও মৎস্য বিভাগের দৃশ্যমান অভিযান খুব একটা চোখে পড়ে না। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন খাল, বিল ও নদীর শাখা-প্রশাখায় বাঁশ, জাল ও প্লাস্টিকের জাল দিয়ে তৈরি চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। পানির প্রবাহের মুখে এসব ফাঁদ স্থাপন করায় ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ পর্যন্ত আটকা পড়ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা হৃদয় মোল্যা বলেন, “এ বছর মৎস্য বিভাগকে চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালাতে দেখিনি। নদী-খালে অসংখ্য চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। এগুলো না সরালে কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় মাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”

সালথা উপজেলার রহিম শেখ বলেন, “আগে বর্ষা মৌসুমে খাল-বিলে জাল ফেললেই নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।”

নগরকান্দা উপজেলার আব্দুল জলিলের ভাষ্য, “অনেক সময় প্রকাশ্যেই চায়না দুয়ারি বসানো হয়। স্থানীয় লোকজন জানালেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিয়মিত অভিযান হলে এভাবে কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করতে সাহস পেত না।”

বোয়ালমারী উপজেলার হায়দার মাতুব্বর বলেন, “চায়না দুয়ারি শুধু বড় মাছ নয়, ছোট পোনা পর্যন্ত ধরে ফেলে। এতে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

ভাঙ্গা উপজেলার কায়সার খাঁন বলেন, “সরকার প্রতি বছর মাছের উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ বন্ধ করা না গেলে সেই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।”

আলফাডাঙ্গা উপজেলার কেরামত আলী বলেন, “মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, যারা বারবার এই ফাঁদ ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”

চরভদ্রাসন উপজেলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকর্মী আবদুস সবুর কাজল বলেন, “চায়না দুয়ারি এখন ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলের জন্য নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই অবৈধ ফাঁদে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, এমনকি রেণুপোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে নয়, নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখতে পাবে।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি এমন একটি স্থায়ী ফাঁদ, যা পানির প্রবাহের মুখে বসানো হয়। এতে বড় মাছের পাশাপাশি রেণুপোনা, কিশোর মাছ এবং ডিমওয়ালা মা মাছও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের ফাঁদ ব্যবহার নিষিদ্ধ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, জেল অথবা উভয় ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও সহজে বেশি মাছ ধরার আশায় অনেকেই এই অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শুধু অভিযান চালিয়ে চায়না দুয়ারি নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রথমেই এসব চায়না দুয়ারি কোথায় তৈরি ও সরবরাহ হচ্ছে, সেই উৎস চিহ্নিত করে উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু দুয়ারি জব্দ বা ধ্বংস করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। গত পাঁচ বছরে ফরিদপুরে চায়না দুয়ারির ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগকে আরও কঠোর ও নিয়মিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”*

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মৎস্যজীবী সংগঠন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ফাঁদের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান অভিযান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাইতো, জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদকে রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমরা চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ফাঁদ অপসারণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

ফরিদপুরের সদরপুরে মাদক সেবন করে এলাকাবাসীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করায় আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) নামে দুই তরুণকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বুধবার (২২ জুলাই) রাত ৮ টার দিকে উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকার রাজার চর ওয়াজ হাওলাদার কান্দি এলাকায় সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আমিনুল কাজী উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের মো. আশরাফ কাজী ছেলে ও আজিজুল শেখ একই গ্রামের খলিল শেখের ছেলে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) প্রায়ই মাদক সেবন করে পরিবারসহ এলাকার আশপাশের লোকজনের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল ও অপ্রীতিকর আচরণ করেন। এরই প্রেক্ষিতে বুধবারও তারা মাদক ক্রয় করার সময় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের দুজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। এসময় তল্লাশীকালে দুজনের কাছ থেকে ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়।

স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। জব্দকৃত ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহযোগিতা করেন সদরপুর থানার একদল পুলিশ সদস্য ।

সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া বলেন, সমাজে মাদকের বিস্তার রোধে এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।