খুঁজুন
, ,

সদকাতুল ফিতরের প্রয়োজনীয় মাসআলা

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ
সদকাতুল ফিতরের প্রয়োজনীয় মাসআলা

ইসলামে ‘সদকাতুল ফিতর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা শেষে ঈদুল ফিতরের আনন্দ যেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে অভাবী ও দুস্থরা সমানভাবে উপভোগ করতে পারে, সে জন্যই আ—্লাহ তাআলা এই সদকা ওয়াজিব করেছেন। এটি শুধু দরিদ্রের প্রতি করুণা নয়, বরং রোজাদারের রোজার ত্রুটিবিচ্যুতির পরিমার্জক এবং আ—্লাহর কৃত”তা প্রকাশের একটি মাধ্যম।

প্রবাসীদের ফিতরা আদায়ের নিয়ম
বর্তমানে অনেক প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করে স্বদেশে ফিতরা আদায় করতে চান।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা হলো ফিতরা আদায়কারী ব্যক্তি যেখানে অবস্থান করবেন, সেখানকার দ্রব্য মূল্যই হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ একজন প্রবাসী যদি সৌদি আরবে থাকেন এবং বাংলাদেশে তাঁর ফিতরা আদায় করতে চান, তবে তাঁকে সৌদি আরবের সর্বনিম্ন ফিতরার হার অনুযায়ী টাকা পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের সর্বনিম্ন হার (যেমন ১০০ টাকা) দিলে তাঁর ফিতরা আদায় হবে না—যদি সৌদিতে তার হার বেশি (যেমন ২০০ টাকা) হয়।
অনুরূপভাবে প্রবাসীর নাবালেগ সন্তানদের ফিতরা আদায়ের দায়িত্ব পিতার ওপর, তাই তাদের ফিতরাও পিতার অবস্থানস্থলের মূল্য অনুযায়ী হবে।
তবে প্রবাসীর স্ত্রী ও বালেগ সন্তানরা যদি দেশে থাকেন, তবে তাঁদের ফিতরা দেশের বাজারমূল্য অনুযায়ী আদায় করা যাবে, কারণ তাঁদের ফিতরা মূলত তাঁদের নিজেদের ওপরই আবশ্যক। (আল-বাহরুর রায়েক : ২/৩৫৫)

চাল দিয়ে ফিতরা আদায়ের সঠিক পদ্ধতি
আমাদের দেশে চাল প্রধান খাদ্য হওয়ায় অনেকে চাল দিয়ে সরাসরি ফিতরা দিতে চান। কিন্তু হাদিস শরিফে সরাসরি চালের কথা উ—্লেখ নেই। নবী করিম (সা.) পাঁচটি দ্রব্যের কথা উ—্লেখ করেছেন : গম, যব, খেজুর, কিশমিশ ও পনির।যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’ (৩২৭০.৬০ গ্রাম) এবং গম দ্বারা আদায় করলে আধা ‘সা’ (১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম) দিতে হবে। কেউ যদি চাল দিতে চান, তবে তাঁকে এই পাঁচটির যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ চাল দিতে হবে। সরাসরি এক সা’ বা আধা সা’ চাল দিলে ফিতরা সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে আদায় হবে না। (কিফায়াতুল মুফতি : ৪/৩১২)

মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায়ের বৈধতা
অনেকে মনে করেন খাদ্যদ্রব্য ছাড়া টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েজ নেই। অথচ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের আমল দ্বারা এটি প্রমাণিত।

বিশিষ্ট তাবেঈ আবু ইসহাক আস সাবিয়ি (রহ.) বলেন, আমি সাহাবায়ে কেরামকে খাবারের সমমূল্যের দিরহাম দিয়ে ফিতরা দিতে দেখেছি। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) পত্রে লিখেছিলেন আধা সা’ গম বা তার সমমূল্য আধা দিরহাম আদায় করতে। বর্তমান যুগে দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণে টাকার উপযোগিতা বেশি হওয়ায় ফকিহরা একে উত্তম বলেছেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ১০৩১৭; আদ্দুররুল মুখতার : ২/৩৬৬)
সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরার হার নির্বাচন
আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে সবাই শুধু গমের সর্বনিম্ন হার অনুযায়ী ফিতরা আদায় করেন। প্রকৃত পক্ষে যার সামর্থ্য আছে তার উচিত কিশমিশ, খেজুর বা পনিরের মূল্য অনুযায়ী ফিতরা দেওয়া। ঢালাওভাবে সামর্থ্যবানদের শুধু গমের মূল্যে ফিতরা দেওয়া সমীচীন নয়। নিজের আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী দামি দ্রব্যের হিসাব ধরাটাই তাকওয়ার পরিচয়।

জাকাত ও ফিতরার নিসাবের পার্থক্য
অনেকে মনে করেন যার ওপর জাকাত ফরজ নয়, তার ওপর ফিতরাও নেই। এটি ভুল। জাকাত শুধু সোনা-রুপা, নগদ টাকা ও ব্যবসার মালের ওপর হয়। কিন্তু সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় প্রয়োজন অতিরিক্ত সব ধরনের সম্পদের ওপর (যেমন : অতিরিক্ত জমি, আসবাব, ঘরবাড়ি)। ঈদের দিন সকালে যার কাছে এই পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব। তেমনিভাবে জাকাত দিতে পারেন না এমন ব্যক্তিও যদি নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হন, তবে তাঁকে ফিতরা নিতে দেওয়া যাবে না। (আদ্দুররুল মুখতার : ২/৩৬০)

আদায়ের সময় ও বণ্টন পদ্ধতি
সদকাতুল ফিতর আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে। তবে রমজানের শেষ দশকে বা দু-তিন দিন আগেও আদায় করা যায়, যেন দরিদ্ররা কেনাকাটা করতে পারে। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে দিতে না পারেন, তবে পরে হলেও তা আদায় করতে হবে, কারণ এটি একটি ওয়াজিব হক। (বুখারি, হাদিস : ১৫০৯; আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৬)

ফিতরা কাদের দেওয়া যাবে ও যাবে না?
ফিতরা পাওয়ার হকদার শুধু অভাবী মুসলমান। আত্মীয়দের মধ্যে যারা অভাবী (যেমন—ভাই, বোন, চাচা, ফুফু) তাদের দেওয়া সবচেয়ে উত্তম, এতে সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, উভয় সওয়াব পাওয়া যায়। অমুসলিমদের ফিতরা দেওয়া জায়েজ নয়। নিজের ঊর্ধ্বতন (পিতা-মাতা, দাদা-দাদি) এবং নিজের অধস্তন (ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি) এবং স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ফিতরা দেওয়া বৈধ নয়।
বাড়ির কাজের লোক যদি অভাবী হয়, তবে তাকে ফিতরা দেওয়া যাবে, তবে শর্ত হলো এটি তার পারিশ্রমিক বা বোনাস হিসেবে দেওয়া যাবে না। ফিতরা দিতে হবে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। এ ছাড়া মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, রাস্তাঘাট বা জনকল্যাণমূলক কাজে ফিতরা ব্যয় করলে ফিতরা আদায় হবে না। কারণ ফিতরার টাকা সরাসরি গরিবের মালিকানায় পৌঁছানো জরুরি। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৬৯৪৭; রদ্দুল মুহতার : ২/২৫৮)

রোজা না রাখলে ফিতরার বিধান
কেউ কেউ মনে করেন কোনো কারণে রোজা রাখতে না পারলে ফিতরা দিতে হয় না। এটি ভুল। সদকাতুল ফিতর একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। রোজা রাখা বা না রাখার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যদি কেউ অসুস্থতা বা অন্য কোনো ওজরে রোজা রাখতে না পারেন, কিন্তু তিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তাঁকে অবশ্যই ফিতরা আদায় করতে হবে।

আদায়ের সময় ও বিলম্বের হুকুম
ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগেই ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। তবে রমজানের শেষ দিকে বা দু-তিন দিন আগেও আদায় করা উত্তম, যেন দরিদ্ররা ঈদের কেনাকাটা করতে পারে। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে দিতে না পারেন, তবে তাঁকে পরে অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথাসময়ে আদায় না করার কারণে হাদিসে বর্ণিত বিশেষ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হবে। রাসুলু—্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে নামাজের আগে আদায় করবে তা মাকবুল সদকা, আর যে নামাজের পর দেবে তা সাধারণ সদকা।’
(বুখারি, হাদিস : ১৫০৯; আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)

একজনের ফিতরা কয়েকজনকে দেওয়া
সদকাতুল ফিতর বণ্টনের ক্ষেত্রে শরিয়তে শিথিলতা রয়েছে। একটি ফিতরা একাধিক দরিদ্র ব্যক্তিকে ভাগ করে দেওয়া জায়েজ। উদাহরণস্বরূপ, একজনের ফিতরার টাকা ১০০ টাকা হলে তা ২০-৩০ টাকা করে তিন-চারজনকেও দেওয়া যাবে। তবে একটি পূর্ণ ফিতরা একজন দরিদ্রকে দেওয়া উত্তম। একইভাবে কয়েকজনের ফিতরা একত্র করে একজন দরিদ্রকেও দেওয়া বৈধ। (বাদায়েউস
সানায়ে : ২/২-৮; আল-বাহরুর রায়েক : ২/২৫৫)

আধুনিক মাধ্যমে (বিকাশ/নগদ) ফিতরা প্রেরণ
বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে ফিতরা পাঠালে ‘ক্যাশ আউট’ চার্জ দাতা নিজেকেই বহন করতে হবে। কারণ ফিতরার পুরো টাকা গরিবের হাতে পৌঁছানো শর্ত। চার্জ বাবদ টাকা কেটে রাখা হলে ওই পরিমাণ ফিতরা আদায় হবে না। একইভাবে ফিতরার খাদ্যদ্রব্য পাঠাতে পরিবহন ভাড়া বা শ্রমিকের মজুরি দাতার নিজস্ব সম্পদ থেকে দিতে হবে, ফিতরার টাকা থেকে নয়। (ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ : ৬/২১৭)

সদকাতুল ফিতর আমাদের ইবাদতের ত্রুটি মোচন করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সঠিক মাসআলা জেনে বিশুদ্ধ নিয়তে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম মানের দ্রব্যমূল্য হিসাব করে এই ওয়াজিব ইবাদতটি পালন করা।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। মৃত যুবকের নাম মো. ইমতিয়াজ আহমেদ প্রান্ত (২৮)। তিনি মধুখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোন্দারদিয়া এলাকার মৃত ইসকেন্দার হায়দারের ছেলে।

জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তথ্যমতে, শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় মাদক বিক্রির অভিযোগে প্রান্তকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন জানান, আটকের ঘণ্টা খানেক পর প্রান্ত হঠাৎ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার (২১ জুন) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী বলেন, হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও সিটিস্কানে দেখা যায়, প্রান্ত ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হয়েছেন। তার মাথায় বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার শরীরে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন বা নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযানের সময় প্রান্তকে গাঁজাসহ আটক করা হয়। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, তিনি ব্রেনস্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছেন। তারপরও মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তের বিরুদ্ধে মধুখালী থানায় পূর্বেও মাদক-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান শেষ হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ