খুঁজুন
, ,

পবিত্র রমজানে পাপে জড়ালে কী ক্ষতি হয়? ইসলাম যা বলে

মাওলানা আবদুল হাকিম
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ
পবিত্র রমজানে পাপে জড়ালে কী ক্ষতি হয়? ইসলাম যা বলে

জীবনের সব ধরনের পাপ থেকে পরিশুদ্ধতা অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ রমজান। পবিত্র এ মাসে মহান রবের ইবাদত-উপাসনায় আলোকিত হয় মুমিনের জীবন। সফল তো তারাই, যারা অতীতের পাপমোচন করাতে পারে অবারিত রহমত অর্জনের এ মাসে। তবে ব্যর্থ তারা, যারা রমজান মাস পেয়েও নিজের পাপমোচন করাতে পারে না।

রোজা রেখেও পাপে জড়ানোর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এদের ব্যাপারে স্বয়ং জিবরাইল (আ.) বদদোয়া করেছেন এবং নবী কারিম (সা.) রাহমাতুল্লিল আলামিন হয়েও ‘আমিন’ বলে সমর্থন জানিয়েছেন।

হাদিসে বর্ণিত আছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববীর মিম্বারের একেকটি সিঁড়িতে পা রাখার সময় ‘আমিন আমিন আমিন’ তিনবার বলেছিলেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আজকে এমন একটি কাজ আপনি করলেন, যা কখনো করতে দেখিনি। এর কারণটা কী? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, কী বিষয়ে? সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি ‘আমিন আমিন আমিন’ তিনবার বললেন। তখন নবী কারিম (সা.) বললেন, আমি যখন মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেয়েও (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। তখন আমি তাকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’ (হে আল্লাহ কবুল করো)। অতঃপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে রমজান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি তাকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’। হজরত জিবরাইল (আ.) আবারও বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার কাছে আমার নাম আলোচিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না। আমি তার বক্তব্যকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’। (ইবনে হিব্বান: ৯০৮; আল-আদাবুল মুফরাদ: হাদিস ৬৪৬)

অথচ আমাদের যেন বিকার নেই। ভাবনা নেই। রমজান মাস পেয়েও লাগামহীন পাপে বিভোর অনেকে। বড় আক্ষেপের বিষয়, এ পবিত্র মাসেও ভেসে আসে গান-বাজনার আওয়াজ। কেউ কেউ প্রকাশ্যে পানাহার করে বেড়ায়। নামাজ-রোজার কথা ভুলে গিয়ে চলে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। অবসরতা কাটাতে কোথাও জমে ওঠে জুয়া ও আড্ডার আসর। এসব রমজানের পবিত্রতা ও মহত্ত্বকে ধ্বংস করে। কেউ দিনভর রোজা রাখে, আবার গিবত, পরনিন্দা ও মিথ্যা কথাসহ বিভিন্ন পাপ কাজেও লিপ্ত থাকে। এমন ব্যক্তির ভাগ্যে শুধু ক্ষুধাই জোটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কত রোজাদার আছে, যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত সালাত আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।’ (ইবনে মাজা: ১৬৯০)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও তদানুযায়ী আমল করা বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি: ১৯০৩)

পাপের উপসর্গ নিয়ে বেড়ে উঠেছে যার জীবন, অন্যায়ের প্রবণতা মিশে আছে রক্ত কণিকায়, পবিত্র রমজান মাসেও যে ব্যক্তি পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারছে না—তার উচিত আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনায় মনোনিবেশ করা। কেননা দোয়া হলো মুমিনের হাতিয়ার। যেভাবে আল্লাহ শারীরিক অসুস্থতা থেকে সুস্থ করেন, সেভাবেই তিনি আত্মার ব্যাধির প্রতিকার করেন। আল্লাহর দরবারে ঝরা অশ্রু, বৃথা যায় না কখনো। পাপের ভারে ন্যুব্জ বান্দা যখন আল্লাহকে ডাকে তখন তিনি সাড়া দেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ডাকো আমায়, সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘কে তিনি যিনি আর্তের ডাক শোনেন, যখন সে তাকে ডাকে এবং কে তার দুঃখ দূর করেন!’ (সুরা নামল: ৬২)। পাপের আঁধারে নিমজ্জিত ব্যক্তির পক্ষে রাতারাতি পাপমুক্ত হওয়া দুষ্কর, এর জন্য চাই ধৈর্য ও অবিরাম চেষ্টা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে পরিচালিত হওয়ার চেষ্টা করে, আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনকাবুত: ৬৯)

পাপের আনন্দ শেষ হয়ে থেকে যায় এর অশুভ পরিণাম। ইবাদতের কষ্ট শেষ হয়ে থেকে যায় এর শুভ পরিণাম। তাই পাপের শাস্তি ও এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে চিন্তার মাধ্যমে পাপমুক্ত হওয়া সহজ। আখেরাতের অপেক্ষমাণ কঠিন আজাব ছাড়াও এ পৃথিবীতে পাপের নগদ শাস্তি হলো—দুঃখ, দুর্দশা, অশান্তি, অস্থিরতা ও হতাশা। এ ছাড়া পাপের কারণে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার দূরত্ব তৈরি হয়; পাপী ব্যক্তি থেকে তার রহমতের দৃষ্টি উঠে যায়। তারা বিপদাপদ ও বিপর্যয়ে আপতিত হয়, দুরারোগ্য রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং রুজিরোজগারের সংকটে জর্জরিত হয়। গুনাহ যেমনভাবে মানুষের শারীরিক কষ্ট ও শাস্তির কারণ, তেমনিভাবে তা আত্মিক রোগব্যাধিরও কারণ। কারও থেকে একটি গুনাহ সংঘটিত হলে সেটি আরেকটি গুনাহতে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, গুনাহের একটি নগদ শাস্তি হলো, এর দ্বারা সে আরেকটি গুনাহের শিকার হয়। অনুরূপভাবে নেক কাজের একটি নগদ পুরস্কার হলো, একটি নেক কাজ আরেকটি নেক কাজের দিকে টেনে নেয়। (মায়ারেফুল কোরআন: ৭/৭০১)।

রমজানে অভিশাপ্ত শয়তানকে বন্দি করে রাখা হলেও প্রত্যেকের সঙ্গে ‘নফসে আম্মারা’ কিন্তু ঠিকই রয়েছে, যা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং কুপ্রবৃত্তির প্রতি আহ্বান করে। তাই সব ধরনের গুনাহের উপকরণ থেকে দূরে থাকতে হবে, বিশেষত দৃষ্টি হেফাজত করতে হবে।

রমজান সংযমের মাস, সাধনার মাস, ত্যাগের মাস। কিন্তু আমরা রমজানের এ বার্তাকে ভুলে গিয়ে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের অনুসৃত পথ পরিহার করে সেহরি ও ইফতারে এতটাই ভোজনবিলাসী হয়ে উঠি—যা রমজানের সংযম, সাধনা ও ত্যাগের বার্তাকে ভুলিয়ে দেয়। ফলে আমাদের কুপ্রবৃত্তি দুর্বল না হয়ে আরও হিংস্র ও পাশবিক হয়ে ওঠে। কাম, লিপ্সা, মোহ আরও বেড়ে যায়। সুকুমারবৃত্তিগুলো বিকশিত না হয়ে আরও নিস্তেজ হয়ে যায়।

রমজানে গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে সৎ সঙ্গ গ্রহণ করতে হবে। কেননা মানুষ পাপ কাজে অসৎ সঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই পাপ থেকে বেঁচে থাকতে সৎ ও ভালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। মহানবী (সা.) ভালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তুমি মুমিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেজগার লোকে খায়।’ (আবু দাউদ: ৪৮৩২)।

আমাদের সবার মনে সর্বদা এ চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে—প্রতিমুহূর্তে আমরা যা করছি আল্লাহতায়ালা তা দেখছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন।’ (সুরা হুজরাত: ১৮)। আর এভাবে আল্লাহর ধ্যান দিলে জাগরূক রাখতে পারলেই পাপমুক্ত জীবনযাপন সম্ভব। তখন কেউ কারও ওপর জুলুম করবে না, একে অন্যের হক নষ্ট করবে না। আল্লাহতায়ালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করবে না এবং যাবতীয় অন্যায়-অপরাধ ও পাপাচারে লিপ্ত হবে না। এরই নাম তাকওয়া। রহমতের এ বসন্তকালে আসুন আমরা খোদাভীতি অর্জন করি এবং নিজেদের পাপকর্মের জন্য খাঁটি মনে তওবা করে ভবিষ্যতেও যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করে একটি পুণ্যময় রমজান কাটাই। তবেই অনিন্দ্য সুন্দর হবে আমাদের ইহকাল-পরকাল।

লেখক: ইমাম ও খতিব

 

ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১:৩৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

ফরিদপুরের সালথায় ৯ বছর বয়সী ৩য় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শওকত মিয়া (৩৮) নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

​বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আবুল বাসার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর কড়া পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

​দণ্ডপ্রাপ্ত শওকত মিয়া ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের সিরাজ মিয়ার ছেলে।

মামলার বিবরণ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২ মে বিকেলে সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের ৩য় শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছরের ওই শিশুটি বাড়ির পাশে নিজেদের শাক-সবজির (ডাটা) ক্ষেত দেখতে গিয়েছিল। এসময় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিবেশী শওকত মিয়া শিশুটিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাশের একটি নির্জন পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে।

​শিশুটির রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থা দেখে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ (ওসিএসি)-এ ভর্তি করায়। ঘটনার পরদিনই নির্যাতিতা শিশুটির বাবা বাদী হয়ে সালথা থানায় শওকত মিয়াকে একমাত্র আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

​ঘটনা তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর সালথা থানা পুলিশ আসামি শওকত মিয়াকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় সাক্ষী গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে দীর্ঘ ৬ বছর পর আদালত আজ এ রায় প্রদান করেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট অর্চনা দাস বলেন, “একটি অবুঝ শিশুকে নির্যাতন করে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছিল, আজকের এই রায়ের মাধ্যমে তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। এই শাস্তি সমাজে অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে এবং শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা এ রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”

ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

ফরিদপুরের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’র অবাধ ব্যবহার দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। জেলার সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, সদরপুর, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা ও আলফাডাঙ্গাসহ প্রায় সব উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরার এই নিষিদ্ধ ফাঁদের বিস্তার ঘটেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এসব চায়না দুয়ারি বসিয়ে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ নির্বিচারে শিকার করা হলেও মৎস্য বিভাগের দৃশ্যমান অভিযান খুব একটা চোখে পড়ে না। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন খাল, বিল ও নদীর শাখা-প্রশাখায় বাঁশ, জাল ও প্লাস্টিকের জাল দিয়ে তৈরি চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। পানির প্রবাহের মুখে এসব ফাঁদ স্থাপন করায় ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ পর্যন্ত আটকা পড়ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা হৃদয় মোল্যা বলেন, “এ বছর মৎস্য বিভাগকে চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালাতে দেখিনি। নদী-খালে অসংখ্য চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। এগুলো না সরালে কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় মাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”

সালথা উপজেলার রহিম শেখ বলেন, “আগে বর্ষা মৌসুমে খাল-বিলে জাল ফেললেই নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।”

নগরকান্দা উপজেলার আব্দুল জলিলের ভাষ্য, “অনেক সময় প্রকাশ্যেই চায়না দুয়ারি বসানো হয়। স্থানীয় লোকজন জানালেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিয়মিত অভিযান হলে এভাবে কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করতে সাহস পেত না।”

বোয়ালমারী উপজেলার হায়দার মাতুব্বর বলেন, “চায়না দুয়ারি শুধু বড় মাছ নয়, ছোট পোনা পর্যন্ত ধরে ফেলে। এতে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

ভাঙ্গা উপজেলার কায়সার খাঁন বলেন, “সরকার প্রতি বছর মাছের উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ বন্ধ করা না গেলে সেই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।”

আলফাডাঙ্গা উপজেলার কেরামত আলী বলেন, “মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, যারা বারবার এই ফাঁদ ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”

চরভদ্রাসন উপজেলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকর্মী আবদুস সবুর কাজল বলেন, “চায়না দুয়ারি এখন ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলের জন্য নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই অবৈধ ফাঁদে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, এমনকি রেণুপোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে নয়, নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখতে পাবে।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি এমন একটি স্থায়ী ফাঁদ, যা পানির প্রবাহের মুখে বসানো হয়। এতে বড় মাছের পাশাপাশি রেণুপোনা, কিশোর মাছ এবং ডিমওয়ালা মা মাছও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের ফাঁদ ব্যবহার নিষিদ্ধ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, জেল অথবা উভয় ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও সহজে বেশি মাছ ধরার আশায় অনেকেই এই অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শুধু অভিযান চালিয়ে চায়না দুয়ারি নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রথমেই এসব চায়না দুয়ারি কোথায় তৈরি ও সরবরাহ হচ্ছে, সেই উৎস চিহ্নিত করে উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু দুয়ারি জব্দ বা ধ্বংস করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। গত পাঁচ বছরে ফরিদপুরে চায়না দুয়ারির ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগকে আরও কঠোর ও নিয়মিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”*

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মৎস্যজীবী সংগঠন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ফাঁদের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান অভিযান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাইতো, জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদকে রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমরা চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ফাঁদ অপসারণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

ফরিদপুরের সদরপুরে মাদক সেবন করে এলাকাবাসীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করায় আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) নামে দুই তরুণকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বুধবার (২২ জুলাই) রাত ৮ টার দিকে উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকার রাজার চর ওয়াজ হাওলাদার কান্দি এলাকায় সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আমিনুল কাজী উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের মো. আশরাফ কাজী ছেলে ও আজিজুল শেখ একই গ্রামের খলিল শেখের ছেলে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) প্রায়ই মাদক সেবন করে পরিবারসহ এলাকার আশপাশের লোকজনের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল ও অপ্রীতিকর আচরণ করেন। এরই প্রেক্ষিতে বুধবারও তারা মাদক ক্রয় করার সময় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের দুজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। এসময় তল্লাশীকালে দুজনের কাছ থেকে ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়।

স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। জব্দকৃত ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহযোগিতা করেন সদরপুর থানার একদল পুলিশ সদস্য ।

সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া বলেন, সমাজে মাদকের বিস্তার রোধে এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।