খুঁজুন
, ,

সন্তানকে দ্বিনি মূল্যবোধে পরিচালিত করার কৌশল

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
সন্তানকে দ্বিনি মূল্যবোধে পরিচালিত করার কৌশল
পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি আর এই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পিতা। সন্তানের ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও জীবনবোধ গঠনে পিতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। কোরআন-সুন্নাহে মাতা-পিতার দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, বিশেষত সন্তানের লালন-পালন, শিক্ষা, নৈতিক উন্নয়ন ও পারিবারিক কল্যাণের বিষয়ে। নবী ও রাসুলদের জীবনী ইসলামী আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন।

 

তাদের পারিবারিক আচরণ ও সন্তান প্রতিপালনের পদ্ধতি মুসলিম সমাজের জন্য অনুসরণযোগ্য আদর্শ। এই প্রেক্ষাপটে ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর জীবনঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

সহিহ বুখারির বর্ণনায় এক দীর্ঘ হাদিসে ইবরাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে একজন পিতার দায়িত্ব, দূরে থেকেও সন্তানের খোঁজখবর নেওয়ার কৌশল, পারিবারিক জীবনে হিকমতপূর্ণ হস্তক্ষেপ এবং ঈমানি ও নৈতিক মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে।

হাদিসটি হলো ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবরাহিম (আ.) ইসমাঈলের মা (হাজেরা) ও তাঁর দুধের শিশু ইসমাঈলকে সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরের নিকট এবং জমজমের ওপরে একটি বড় গাছের নিচে (বর্তমান) মসজিদের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় তাঁদের রাখলেন।

 

তখন মক্কায় না ছিল জনমানব, না ছিল কোনো পানি। সুতরাং সেখানেই তাঁদের রেখে গেলেন এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে স্বল্প পরিমাণ পানি দিয়ে গেলেন। তারপর ইবরাহিম (আ.) ফিরে যেতে লাগলেন।…ইসমাঈল (আ.)-এর বিয়ের পর ইবরাহিম (আ.) তাঁর রেখে যাওয়া পরিজনকে দেখার জন্য এখানে এলেন।

 

কিন্তু এসে ইসমাঈলকে পেলেন না। পরে তাঁর স্ত্রীর কাছে তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলেন। স্ত্রী বলেন, ‘তিনি আমাদের রুজির সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন।’ আবার তিনি পুত্রবধূর কাছে তাঁদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বধূ বললেন, ‘আমরা অতিশয় দুর্দশা, দুরবস্থা, টানাটানি এবং ভীষণ কষ্টের মধ্যে আছি।

’ তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে নানা অভিযোগ করলেন। 

তিনি তাঁর পুত্রবধূকে বললেন, ‘তোমার স্বামী বাড়ি এলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলে নেয়।’ এই বলে তিনি চলে গেলেন। ইসমাঈল যখন বাড়ি ফিরে এলেন, তখন তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর আগমন সম্পর্কে একটা কিছু ইঙ্গিত পেয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কাছে কেউ কি এসেছিলেন?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, এই এই আকৃতির একজন বয়স্ক লোক এসেছিলেন। আপনার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তাঁকে আপনার খবর দিলাম। আবার আমাকে আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমি তাঁকে জানালাম যে আমরা খুবই দুঃখ-কষ্ট ও অভাবে আছি।’

ইসমাঈল বললেন, ‘তিনি তোমাকে কোনো কিছু অসিয়ত করে গেছেন কী?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আপনাকে তাঁর সালাম পৌঁছাতে এবং আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলেন।’ ইসমাঈল (আ.) বললেন, ‘তিনি ছিলেন আমার পিতা এবং তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, যেন তোমাকে আমি তালাক দিয়ে দিই। কাজেই তুমি তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও।’ সুতরাং ইসমাঈল (আ.) তাঁকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ‘জুরহুম’ গোত্রের অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। অতঃপর যত দিন আল্লাহ চাইলেন ইবরাহিম (আ.) তত দিন তাঁদের থেকে দূরে থাকলেন। পরে আবার দেখতে এলেন। কিন্তু ইসমাঈল (আ.) সেদিনও বাড়িতে ছিলেন না। তিনি পুত্রবধূর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং ইসমাঈল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। স্ত্রী জানালেন, তিনি আমাদের খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন।

ইবরাহিম (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কেমন আছ?’ তিনি তাঁর কাছে তাঁদের জীবনযাত্রা ও সাংসারিক অবস্থা সম্পর্কেও জানতে চাইলেন? পুত্রবধূ জবাবে বলেন, ‘আমরা ভালো অবস্থায় এবং সচ্ছলতার মধ্যে আছি।’ এ বলে তিনি আল্লাহর প্রশংসাও করলেন। ইবরাহিম (আ.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের প্রধান খাদ্য কী?’ পুত্রবধূ জবাবে বলেন, ‘মাংস’। এর পর বলেন, ‘তোমাদের পানীয় কী?’

বধূ বলেন, ‘পানি’। ইবরাহিম (আ.) দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! এদের মাংস ও পানিতে বরকত দাও।’…আলাপ শেষে ইবরাহিম (আ.) পুত্রবধূকে বললেন, ‘তোমার স্বামীকে আমার সালাম বলবে এবং তাকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ বহাল রাখে।’…অতঃপর ইসমাঈল (আ.) যখন বাড়ি এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের কাছে কেউ এসেছিলেন কি?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, একজন সুন্দর আকৃতির বৃদ্ধ এসেছিলেন।

(অতঃপর স্ত্রী তাঁর প্রশংসা করলেন এবং বললেন) তারপর তিনি আপনার সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আমি তখন তাঁকে আপনার খবর বললাম। অতঃপর তিনি আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি তাঁকে খবর দিলাম যে আমরা ভালোই আছি।’ স্বামী বললেন, ‘আর তিনি তোমাকে কোনো অসিয়ত করেছেন কী?’ স্ত্রী বলেন, ‘তিনি আপনাকে সালাম বলেছেন এবং আপনার দরজার চৌকাঠ অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশ দিয়ে গেছেন।’ ইসমাঈল (আ.) তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘তিনি আমার আব্বা, আর তুমি হলে চৌকাঠ। তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসেবে বহাল রাখি।’ (বুখারি, অধ্যায় : আম্বিয়া, অনুচ্ছেদ : ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর কথা, হাদিস : ২৭০৭)
হাদিসের আলোকে বলা যায়—

১. তাওয়াক্কুলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ: ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে হাজেরা (আ.) ও শিশু ইসমাঈল (আ.)-কে মক্কার জনমানবহীন স্থানে রেখে যান এবং খেজুর ও পানি দিয়ে যান। এতে বোঝা যায়, পিতার দায়িত্ব  হলো—নিজের সাধ্যানুযায়ী ব্যবস্থা করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করা।

২. দূরে থেকেও সন্তানের খোঁজখবর নেওয়া: লেখাপড়া বা জীবিকার তাগিদে সন্তান দূরে অবস্থান করলে বা সন্তান বড় হলেও সন্তানের সার্বিক খোঁজখবর নিতে হবে। ইসমাঈল (আ.) প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত হওয়ার পরও ইবরাহিম (আ.) বারবার মক্কায় এসে সন্তানের অবস্থা দেখেছেন। পিতার দায়িত্ব শুধু শিশুকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, সন্তান বড় হলেও তার জীবনযাত্রা, ঈমান ও পরিবার সম্পর্কে সচেতন থাকা দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

৩. সন্তানের পারিবারিক জীবনের প্রতি নজর রাখা: ইবরাহিম (আ.) সরাসরি পুত্রবধূদের সঙ্গে কথা বলে সংসারের অবস্থা, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও অভিযোগপ্রবণতা পর্যবেক্ষণ করেন। পিতা সন্তানের দাম্পত্য জীবনের নৈতিক মান পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।

৪. নৈতিক ও দ্বিনি মানদণ্ডে সিদ্ধান্ত দেওয়া: ইসমাঈল (আ.)-এর প্রথম স্ত্রী ছিলেন অভিযোগকারী ও অকৃতজ্ঞ। দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন কৃতজ্ঞ ও আল্লাহর প্রশংসাকারী। ইবরাহিম (আ.) কোনো পার্থিব মানদণ্ডে নয়, বরং সবর, শোকর ও ঈমানি চরিত্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেন। এতে বোঝা যায়, পিতার দায়িত্ব হলো সন্তানের জীবনকে দ্বিনি মূল্যবোধে পরিচালিত করা।

৫. হিকমতের মাধ্যমে উপদেশ প্রদান: ইবরাহিম (আ.) সরাসরি বলেননি—‘তোমার স্ত্রীকে তালাক দাও, বরং বলেছেন, দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলো/বহাল রাখো।’ এভাবে পিতার উপদেশ হওয়া উচিত শালীন, দূরদর্শী ও হিকমতপূর্ণ। যাতে সন্তানের সম্মান ও স্বাধীনতাও বজায় থাকে।

৬. সন্তানের কল্যাণে দোয়া করা: ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেন—‘হে আল্লাহ! এদের মাংস ও পানিতে বরকত দাও।’ সন্তানের জন্য দোয়া করা পিতার অন্যতম মহান দায়িত্ব, যা সন্তান ও সমাজ উভয়ের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।

৭. সন্তানের অনুপস্থিতিতেও খোঁজ নেওয়া: ইবরাহিম (আ.) ছেলে ইসমাঈল (আ.)-কে না পেলেও তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন। সন্তানের অবস্থা জানার জন্য পরিবার-পরিবেশ থেকেও তথ্য নেওয়া যায়।

৮. জীবিকা ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা: ইবরাহিম (আ.) প্রশ্ন করেছেন—‘তোমরা কেমন আছ? খাদ্য কী? পানীয় কী?’ পিতা সন্তানের হালাল রিজিক, জীবনযাত্রা ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য সম্পর্কে সচেতন থাকবেন।

৯. কৃতজ্ঞতা ও অভিযোগের ভাষা পর্যবেক্ষণ: একই প্রশ্নে ইসমাঈল (আ.)-এর দুই স্ত্রী দুই রকম জবাব দেন। একজন অভিযোগ করেন আর অন্যজন আল্লাহর প্রশংসা করেন। খোঁজ নেওয়ার সময় কথাবার্তার ভঙ্গি ও মানসিকতা লক্ষ করাও পিতার দায়িত্ব।

১০. প্রয়োজন ছাড়া গোপনীয়তা ভঙ্গ না করা: ইবরাহিম (আ.) সরাসরি ইসমাঈল (আ.)-এর কাছে স্ত্রীর দোষ বলেননি। পিতার খোঁজখবর নেওয়া হবে সংযম ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে এবং পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি না করে।

পরিশেষে বলা যায়, একজন পিতা হলেন সন্তানের ঈমান, চরিত্র, পরিবার ও ভবিষ্যতের নৈতিক অভিভাবক। পিতার দায়িত্ব শুধু ভরণ-পোষণ নয়, বরং দোয়া, দিকনির্দেশনা, তত্ত্বাবধান ও হিকমতপূর্ণ হস্তক্ষেপ। আর সন্তানের খোঁজখবর হবে—নিয়মিত, বিচক্ষণ, দ্বিনি মানদণ্ডে এবং সম্মান ও মমতার সঙ্গে। এটাই ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ, আর এ আদর্শই সব পিতার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১:৩৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

ফরিদপুরের সালথায় ৯ বছর বয়সী ৩য় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শওকত মিয়া (৩৮) নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

​বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আবুল বাসার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর কড়া পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

​দণ্ডপ্রাপ্ত শওকত মিয়া ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের সিরাজ মিয়ার ছেলে।

মামলার বিবরণ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২ মে বিকেলে সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের ৩য় শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছরের ওই শিশুটি বাড়ির পাশে নিজেদের শাক-সবজির (ডাটা) ক্ষেত দেখতে গিয়েছিল। এসময় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিবেশী শওকত মিয়া শিশুটিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাশের একটি নির্জন পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে।

​শিশুটির রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থা দেখে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ (ওসিএসি)-এ ভর্তি করায়। ঘটনার পরদিনই নির্যাতিতা শিশুটির বাবা বাদী হয়ে সালথা থানায় শওকত মিয়াকে একমাত্র আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

​ঘটনা তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর সালথা থানা পুলিশ আসামি শওকত মিয়াকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় সাক্ষী গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে দীর্ঘ ৬ বছর পর আদালত আজ এ রায় প্রদান করেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট অর্চনা দাস বলেন, “একটি অবুঝ শিশুকে নির্যাতন করে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছিল, আজকের এই রায়ের মাধ্যমে তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। এই শাস্তি সমাজে অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে এবং শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা এ রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”

ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

ফরিদপুরের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’র অবাধ ব্যবহার দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। জেলার সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, সদরপুর, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা ও আলফাডাঙ্গাসহ প্রায় সব উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরার এই নিষিদ্ধ ফাঁদের বিস্তার ঘটেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এসব চায়না দুয়ারি বসিয়ে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ নির্বিচারে শিকার করা হলেও মৎস্য বিভাগের দৃশ্যমান অভিযান খুব একটা চোখে পড়ে না। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন খাল, বিল ও নদীর শাখা-প্রশাখায় বাঁশ, জাল ও প্লাস্টিকের জাল দিয়ে তৈরি চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। পানির প্রবাহের মুখে এসব ফাঁদ স্থাপন করায় ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ পর্যন্ত আটকা পড়ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা হৃদয় মোল্যা বলেন, “এ বছর মৎস্য বিভাগকে চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালাতে দেখিনি। নদী-খালে অসংখ্য চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। এগুলো না সরালে কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় মাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”

সালথা উপজেলার রহিম শেখ বলেন, “আগে বর্ষা মৌসুমে খাল-বিলে জাল ফেললেই নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।”

নগরকান্দা উপজেলার আব্দুল জলিলের ভাষ্য, “অনেক সময় প্রকাশ্যেই চায়না দুয়ারি বসানো হয়। স্থানীয় লোকজন জানালেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিয়মিত অভিযান হলে এভাবে কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করতে সাহস পেত না।”

বোয়ালমারী উপজেলার হায়দার মাতুব্বর বলেন, “চায়না দুয়ারি শুধু বড় মাছ নয়, ছোট পোনা পর্যন্ত ধরে ফেলে। এতে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

ভাঙ্গা উপজেলার কায়সার খাঁন বলেন, “সরকার প্রতি বছর মাছের উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ বন্ধ করা না গেলে সেই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।”

আলফাডাঙ্গা উপজেলার কেরামত আলী বলেন, “মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, যারা বারবার এই ফাঁদ ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”

চরভদ্রাসন উপজেলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকর্মী আবদুস সবুর কাজল বলেন, “চায়না দুয়ারি এখন ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলের জন্য নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই অবৈধ ফাঁদে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, এমনকি রেণুপোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে নয়, নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখতে পাবে।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি এমন একটি স্থায়ী ফাঁদ, যা পানির প্রবাহের মুখে বসানো হয়। এতে বড় মাছের পাশাপাশি রেণুপোনা, কিশোর মাছ এবং ডিমওয়ালা মা মাছও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের ফাঁদ ব্যবহার নিষিদ্ধ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, জেল অথবা উভয় ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও সহজে বেশি মাছ ধরার আশায় অনেকেই এই অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শুধু অভিযান চালিয়ে চায়না দুয়ারি নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রথমেই এসব চায়না দুয়ারি কোথায় তৈরি ও সরবরাহ হচ্ছে, সেই উৎস চিহ্নিত করে উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু দুয়ারি জব্দ বা ধ্বংস করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। গত পাঁচ বছরে ফরিদপুরে চায়না দুয়ারির ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগকে আরও কঠোর ও নিয়মিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”*

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মৎস্যজীবী সংগঠন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ফাঁদের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান অভিযান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাইতো, জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদকে রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমরা চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ফাঁদ অপসারণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

ফরিদপুরের সদরপুরে মাদক সেবন করে এলাকাবাসীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করায় আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) নামে দুই তরুণকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বুধবার (২২ জুলাই) রাত ৮ টার দিকে উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকার রাজার চর ওয়াজ হাওলাদার কান্দি এলাকায় সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আমিনুল কাজী উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের মো. আশরাফ কাজী ছেলে ও আজিজুল শেখ একই গ্রামের খলিল শেখের ছেলে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) প্রায়ই মাদক সেবন করে পরিবারসহ এলাকার আশপাশের লোকজনের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল ও অপ্রীতিকর আচরণ করেন। এরই প্রেক্ষিতে বুধবারও তারা মাদক ক্রয় করার সময় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের দুজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। এসময় তল্লাশীকালে দুজনের কাছ থেকে ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়।

স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। জব্দকৃত ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহযোগিতা করেন সদরপুর থানার একদল পুলিশ সদস্য ।

সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া বলেন, সমাজে মাদকের বিস্তার রোধে এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।