খুঁজুন
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২১ মাঘ, ১৪৩২

সংকট কাটেনি, অর্থনীতি এখনো শ্বাসকষ্টে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:২৩ এএম
সংকট কাটেনি, অর্থনীতি এখনো শ্বাসকষ্টে

দেশের রাজনীতি এখন গরম। দেশজুড়ে নির্বাচনী আবহ। সবাই অপেক্ষা করছে একটি রাজনৈতিক সরকারের। সবারই আশা, নতুন সরকার এলে সবার মধ্যে আস্থা ফিরবে।

ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল নিতে পারবেন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সময় থেকে বিপর্যস্ত অর্থনীতি বহু আকাঙ্ক্ষার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও গতিশীল না হওয়ায় সার্বিক অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়ে। ফলে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যিক পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা কখনো বলেন আইসিউতে আছে; কখনো বলেন (রপ্তানি ও রেমিট্যান্স ভালো থাকায়) ‘হৃৎপিণ্ড’ সচল, কিন্তু কিডনি ও লিভার (ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর ও রাজস্ব ঘাটতি) অকেজো। কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় (১০ শতাংশের নিচে থাকলে) এমন অর্থনীতিকে কেউ কেউ ‘আর্থিক রক্তশূন্যতা’ও বলছেন।

সব মিলিয়ে বিনিয়োগ মন্দা, বড় রাজস্ব ঘাটতি, বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, অদক্ষ এডিপি বাস্তবায়ন ও হতাশাজনক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারের কারণে একে অনেকে ‘মুমূর্ষু’ রোগীর সঙ্গেও তুলনা করছেন। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই অর্থনীতি বেশ চাপের মুখে। ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছে যাওয়া রিজার্ভ কমতে কমতে ২১ বিলিয়নে এসে থামে।

৮৬ টাকার ডলার কিনতে হচ্ছে ১২৪-১২৫ টাকায়। মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে যায়। সেটিকে অন্তর্বর্তী সরকার এসে কমানোর জন্য দফায় দফায় সুদের হার বাড়িয়ে ১৪-১৬ শতাংশে নিয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে এলেও তা অসহনীয় মাত্রায় রয়েছে। আর ডিসেম্বরে এসে তা আবারও বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছে।
অথচ মজুরি সে হারে বাড়ছে না। মজুরি বাড়ছে ৮.০৮ শতাংশ হারে। অথচ মজুরি বাড়ার কথা ছিল মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে বেশি হারে। এই মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হারকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে।

এর ফলে হয়েছে বিনিয়োগহীন মূল্যস্ফীতি। যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা স্থবিরতা বলা হয়। এ সময় অর্থনীতি উচ্চমূল্যস্ফীতি থাকে। বিনিয়োগ থাকে না। আবার বেকারত্বও থাকে। এসবই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান।

বেসরকারি খাতে বর্তমানে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.৫৮ শতাংশ, যা অনেক কম। এর মানে হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি সুদ আরোপ করে বাজারে টাকার প্রবাহ কমিয়ে রেখেছে। এর ফলে কেউ ঋণ নিতে পারছে না। কাঙ্ক্ষিত ঋণ না পাওয়ায় নতুন ব্যবসা বা কারখানা স্থাপন করা যাচ্ছে না। পুরনো ব্যবসারও সম্প্রসারণ থমকে আছে। এতে মানুষের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। আবার নতুন নতুন বেকারও হচ্ছে। বর্তমানে অর্থনীতিতে বেকারত্ব বাড়ছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বেকার হচ্ছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারখানা বন্ধ হচ্ছে।

সর্বশেষ একটি তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, শুধু ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর ও সাভার শিল্পাঞ্চলে ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এখানে বেকার হয়েছে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। একদিন আগে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারের একটি সেমিনারে রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ী নেতা এ কে আজাদ জানিয়েছে, ১২ লাখ মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছে। আর আগামী ছয় মাসে আরো ১২ লাখ মানুষ বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই চিত্র থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বেসরকারি খাত কিভাবে ধুঁকছে। দেশি বিনিয়োগকারীরা তো বিনিয়োগ করতে পারছেনই না, বিদেশি বিনিয়োগও আসছে না। সরকারের সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কমেছে। বেসরকারি খাতে এমন অবস্থা চলছে অথচ সরকারি খাত ঠিকই ব্যাংকের টাকা নিয়ে খরচ মেটাচ্ছে। সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ২৩ শতাংশ। যখন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হয় না, উল্টো সরকার ব্যাংকের টাকা নিজে নিয়ে খরচ করে, তখন মূল্যস্ফীতি কমানোর যে কিতাবি কথা সেটিও কাজ করে না।

অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’। এর অর্থ হলো-একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কথা বলে বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে চায়, আবার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকের টাকা ঋণ নিয়ে খরচ করছে। অর্থাৎ ব্যাংকের টাকা সরকার নিয়ে নেওয়ায় বেসরকারি খাত টাকা পাচ্ছে না।

বলা যায়, বিনিয়োগে স্থবিরতা। এটি যখন হয়, তখন অর্থনীতিতে নানামুখী সংকট দেখা দেয়। এর ফলে কম্পানি ও ব্যক্তির আয় কমে। এতে রাজস্ব আয়ও কমে। যেটি এখন দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আদায় করার কথা ছিল দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি হওয়ার কারণেই সরকারকে ঋণ নিয়ে খরচ মেটাতে হচ্ছে। তহবিল সংকটে এডিপি বাস্তবায়নও থমকে আছে। প্রকল্পে অগ্রগতি নেই। বরাদ্দে কাটছাঁট চলছে। অর্থবছরের ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ১৭.৫৪ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সবনিম্ন। এডিপি ঠিকমতো বাস্তবায়ন না হলে প্রবৃদ্ধি থমকে যায়। এখন তাই চলছে। এডিপি বাস্তবায়ন না হলে সাধারণ মানুষেরও আয় কমে, সরকারেরও রাজস্ব আয় কমে।

সরকারের আয় মানে কর-জিডিপি অনুপাত কম হলে সরকারের বিনিয়োগও কমে। কর-জিডিপি ১০ শতাংশে থাকতে হয়। বাংলাদেশে আছে ৮ শতাংশের নিচে। এটির অর্থ হলো-সরকারের পক্ষে বড় উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া কিংবা সামাজিক নিরাপত্তায় বড় কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাওয়া। সেটিই এখন ঘটছে বাংলাদেশে। এটিকেই অর্থনীতিবিদরা ‘রাজস্বের রক্তশূন্যতা’ বলছেন।

ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা কাটানো যায়নি। এ খাতে খেলাপি ঋণকে ‘ক্যান্সার’ বলা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ যখন ১৭-২০ শতাংশ হয় এবং কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারে না, তখন সেই অর্থনীতিকে সুস্থ বলা কঠিন।

বাংলাদেশে টাকা না দিতে পারা পাঁচটি ব্যাংককে মার্জ করা হয়েছে। এর ভুল বার্তাও গেছে। বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত শেষ। এখানে লেনদেন করা ঝুঁকিপূর্ণ। সামনে আরো কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে মার্জ করার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি কয়েকটি রেখে সব ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়ার মতো কথাও শোনা যাচ্ছে। এসবই ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা নির্দেশ করছে। আর এটি ইমজে সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের কাছে তারল্য ও জ্বালানি হচ্ছে ‘অক্সিজেন’। এই দুটির সংকটকে তাঁরা ‘শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা’ বলছেন। এখন তারল্য ও জ্বালানি সংকট চলছে। ব্যবসায়ীদের মতে, একটি কারখানার জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস হলো অক্সিজেন। বর্তমানে গ্যাসসংকটে অনেক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। উৎপাদন না থাকলে ব্যাংকঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে যায়। তখন অর্থনীতি নাজুক হয়ে যায়। যাকে তাঁদের কেউ কেউ ‘মুমূর্ষু’ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং বিনিয়োগ মন্দা মিলে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা লুটপাটের সংস্কৃতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ কমানোর জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে এর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।

অন্যদিকে সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে স্থবির করে দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের এই মন্দা অবস্থার কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা এখন বিনিয়োগের চেয়ে টিকে থাকার লড়াই করছেন বেশি। কারণ জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং আমদানির ক্ষেত্রে ডলার সংকটের ধকল এখনো পুরোপুরি কাটেনি।’

কোনো কোনো ব্যবসায়ী অর্থনীতির এই পরিস্থিতিকে যেহেতু স্টাগফ্লেশন বা স্থবিরতার সঙ্গে তুলনা করছেন, তার মানে হলো—এটি অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ অবস্থাগুলোর একটি। এমন অবস্থায় মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়। শেয়ারবাজার থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেয়। বর্তমানে শেয়ারবাজার একেবারে নড়বড়ে অবস্থায়। লেনদেন দুই হাজার কোটি থেকে ৫০০ কোটির ঘরে নেমে এসেছে। সূচক ৫৭০০ পয়েন্ট থেকে ৫০০০ পয়েন্টের নিচে চলে এসেছে। আর এ রকম একটি অবস্থাকেও ব্যবসায়ীরা ‘মুমূর্ষু’ অবস্থা বলছেন।

রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তা ও নিট খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘সরকারের কাজের কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। যখন দেখি ৪৫ বছরের মধ্যে রাজস্ব বাজেটে ঘাটতির সময় আমলাদের বেতন দ্বিগুণ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এটা কিভাবে করেন তাঁরা? সমালোচনার পর সরে এসেছেন। কিন্তু চাপটা রেখে যাবেন পরের সরকারের জন্য। যদি পরের সরকারের ওপরই রেখে দেবেন, তাহলে মৌমাছির চাকে কেন ঢিল দিলেন? টাকাটা কোথা থেকে আসবে? সবকিছু অপরিকল্পিত। আশা করেছিলাম, এ সরকার অর্থনীতিটাকে ভালো করবে। কিছুই হলো না। রেমিট্যান্স ছাড়া সব খারাপ। কবে ভালো হবে জানি না। রপ্তানিও এখন চ্যালেঞ্জে। এর মধ্যে আবার সুতা আমদানিতে ৪০ শতাংশ বেশি শুল্ক আরোপের কথা বলা হচ্ছে। অদ্ভুত সব ব্যাপার!’

তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০২৬ সালে এসেও অর্থনীতি একটি জটিল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। রাজস্ব আয়ে মন্দার কারণে প্রচুর ঋণ করছে। বর্তমানে মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। রপ্তানি আয় ভালো অবস্থায় থাকলেও সেটিও গত তিন মাস ধরে টানা কমছে। ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৪ শতাংশ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, মার্কিন শুল্কের প্রভাব রয়েছে। এখন নতুন করে সুতা আমদানিতে ৪০ শতাংশ বেশি শুল্ক আরোপের কথা বলা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।

অর্থনীতির স্লথগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ২০ লাখ। বর্তমানে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৭ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের ঘরে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতেন। সেটিও এখন নাজুক। বিশেষ করে ফ্লোরপ্রাইস’ তুলে দেওয়ার পর থেকে অনেক শেয়ারের দর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পতন হয়েছে। যার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব রয়েছেন। সাংঘর্ষিক নীতি, আস্থাহীনতা আর কারসাজির ভয়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের চেয়ে ব্যাংকে টাকা রেখে ১১ থেকে ১২ শতাংশ মুনাফা তুলবেন-সেটিকেই মন্দের ভালো বলে মেনে নিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এই ‘সংকট’ অবস্থা থেকে টেনে তুলতে হলে আমূল এবং গুণগত সংস্কারের ওপর জোর দিতে হবে। রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় সরকারকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ আরো কমিয়ে দিচ্ছে। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে হলে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, এনবিআরের আমূল সংস্কার এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড এখনো সচল থাকলেও এর প্রধান অঙ্গগুলো অকেজো হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যার নিরাময় কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আপসহীন সংস্কারের মাধ্যমেই সম্ভব।”

সূত্র: কালের কণ্ঠ

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সম্পর্কে যা জানা জরুরি: ছড়ায় কীভাবে, লক্ষণ ও প্রতিকার?

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:০১ এএম
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সম্পর্কে যা জানা জরুরি: ছড়ায় কীভাবে, লক্ষণ ও প্রতিকার?

হেপাটাইটিস বি একটি মারাত্মক কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য লিভারজনিত ভাইরাস সংক্রমণ। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) থেকে এ রোগ হয়, যা স্বল্পমেয়াদি (একিউট) কিংবা দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) আকার ধারণ করতে পারে। উপসর্গ অনেক সময় দেরিতে প্রকাশ পাওয়ায় একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘নীরব ঘাতক’ও বলা হয়। বাংলাদেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক বেশি।

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ জীবনের কোনো এক সময়ে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৩০ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ নিয়ে বসবাস করছেন। প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগের জটিলতায়।

কীভাবে ছড়ায় হেপাটাইটিস বি

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত ও শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন—

সংক্রমিত রক্তের সংস্পর্শ

একই সুচ বা সিরিঞ্জ একাধিকবার ব্যবহার (বিশেষ করে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে)

অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক

প্রসবের সময় মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ

অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন (বর্তমানে অনেক কম)

ট্যাটু, বডি পিয়ার্সিং বা অনিরাপদ চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল যন্ত্র ব্যবহার

টুথব্রাশ, রেজারসহ ব্যক্তিগত সামগ্রী ভাগাভাগি

অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান

স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরাও সংক্রমিত রক্তের সংস্পর্শে এলে ঝুঁকিতে থাকেন।

হেপাটাইটিস বি-এর লক্ষণ

অনেক ক্ষেত্রেই সংক্রমণের পর প্রথম ১–৪ মাস কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গ একেবারেই নাও থাকতে পারে। তবে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা

জ্বর

ক্ষুধামান্দ্য

বমি বমি ভাব বা বমি

পেটে ব্যথা

গাঢ় রঙের প্রস্রাব

সন্ধি বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা

ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)

রোগ গুরুতর হলে লিভার বিকল হলে মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়

হেপাটাইটিস বি সনাক্ত করতে চিকিৎসকেরা কয়েকটি পরীক্ষার পরামর্শ দেন—

রক্ত পরীক্ষা (HBsAg, অ্যান্টিবডি)

লিভার ফাংশন টেস্ট

পিসিআর টেস্ট (ভাইরাসের পরিমাণ নির্ণয়)

আল্ট্রাসাউন্ড

প্রয়োজনে লিভার বায়োপসি

দ্রুত রোগ সনাক্ত হলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

চিকিৎসা কীভাবে হয়

একিউট হেপাটাইটিস বি:

অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হয় না। বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণই যথেষ্ট।

ক্রনিক হেপাটাইটিস বি:

অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রয়োজন হয়। মুখে খাওয়ার ও ইনজেকশন—দুই ধরনের চিকিৎসাই রয়েছে। মুখে খাওয়ার ওষুধ সাধারণত দীর্ঘদিন বা আজীবন চালিয়ে যেতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধ ভাইরাস পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম।

চিকিৎসার পর সুস্থ থাকতে করণীয়

চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা

পুষ্টিকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ

পর্যাপ্ত পানি পান

অ্যালকোহল পরিহার

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম

উপসর্গ বাড়লে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া

হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়

হেপাটাইটিস বি একটি নিরাপদ ও কার্যকর টিকার মাধ্যমে প্রায় ১০০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য।

বাংলাদেশে ২০০৩–২০০৫ সাল থেকে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের জন্মের পর বিনামূল্যে এ টিকা দেওয়া হচ্ছে। পূর্ণবয়স্করাও যেকোনো বয়সে ০, ১ ও ৬ মাসে মোট ৩ ডোজ টিকা নিয়ে সুরক্ষা পেতে পারেন।

তবে টিকা নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হয়—আগে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন কি না বা শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না। একবার সংক্রমিত হলে টিকা আর কার্যকর নয়।

সম্ভাব্য জটিলতা

দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগ

সিরোসিস

লিভার ক্যান্সার

লিভার ফেইলিওর

অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া

বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস বি ভয়ংকর হলেও সময়মতো সচেতনতা, টিকা ও চিকিৎসার মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মানাই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সূত্র : যুগান্তর

ভোটের পর নতুন সরকারের সামনে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৬ এএম
ভোটের পর নতুন সরকারের সামনে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ এগিয়ে আসার সাথে সাথে আলোচনায় আসতে শুরু করেছে যে ভোট পরবর্তী নতুন সরকারের জন্য কোন কোন বিষয়গুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

ব্রাসেলস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ তাদের এক নিবন্ধে নতুন সরকারের জন্য অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার মতো জটিল বিষয়’।

অবশ্য সংস্থাটি এটিও বলছে যে, নির্বাচিত সরকার হওয়ার কারণে সমস্যা সমাধানে কাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিতে পারবে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর মব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণটা এবং এটি করতে যে রাষ্ট্র বা সরকারের সক্ষমতা আছে প্রাথমিকভাবে সেটি প্রমাণ করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যু ছাড়াও ভারতের সাথে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক চাপ সামলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নেওয়াটাই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

ক্রাইসিস গ্রুপের দিক থেকেও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জগুলোর তালিকায় এসব ইস্যু ঠাঁই পেয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে দৃশ্যত মূল প্রতিযোগিতা হচ্ছে বিএনপি জোট ও জামায়াতে ইসলামীর জোটের মধ্যে এবং দুই জোটই ক্ষমতায় যাওয়ার আশা করছে।

২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করেছে।

যেসব চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে ক্রাইসিস গ্রুপ

ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালট্যান্ট টোমাস কিনের একটি নিবন্ধ সোমবার প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দেড় বছরে বাংলাদেশে সামগ্রিক চলমান ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।

এই নিবন্ধেই তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সম্ভাব্য যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তার একটি ধারণা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বেশ কয়েকটি কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এই ভোট বাংলাদেশকে শুধু সাংবিধানিক কাঠামোতেই ফেরাবে না, বরং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো সত্যিকার জনরায়ের ভিত্তিতে একটি সরকারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে।

“দুর্বল প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ধীরগতির অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবসহ একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ নতুন প্রশাসনকে মোকাবেলা করতে হবে। তাকে সামলাতে হবে ভারতের সাথে সম্পর্কের ইস্যুসহ যুক্তরাষ্ট্র চীন প্রতিযোগিতার প্রভাব ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ জটিল পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক,” ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে।

টোমাস কিন লিখেছেন, হাসিনার পতনের পর হিযবুত-তাহরিরের মতো উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এদের মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আছে।

তার মতে, নির্বাচনের পরে নতুন সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার জটিল ইস্যুও মোকাবেলা করতে হবে, কারণ ইতিহাস ও শক্ত ভোট ভিত্তির কারণে আওয়ামী লীগকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সম্ভব নয়।

“২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে দলের কর্মকাণ্ডের কারণে নতুন নেতৃত্বের অধীনে হলেও আওয়ামী লীগকে আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আওয়ামী লীগের কোনোভাবে প্রত্যাবর্তনের শর্ত নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে উঠলে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে”।

টোমাস কিন লিখেছেন, তিনি মনে করেন এটি করতে হলে আওয়ামী লীগকে আগে সহিংসতার জন্য অনুশোচনা করতে হবে, যা করতে শেখ হাসিনা এখনো অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।

তবে এক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছাতে ভারত ও অন্য বিদেশি প্রভাবশালী সরকারগুলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, দেশের তরুণদের আশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে আগামী বছরগুলোতে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি আসতে পারে।

এগুলোই প্রধান চ্যালেঞ্জ?

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, নতুন প্রশাসনের সামনে আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একই সাথে দেশ শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পুরনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ভিন্নতাটা তুলে ধরে জনমনে আস্থা অর্জন করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

“কর্তৃত্ববাদ পরবর্তী সময়ে মবসহ আইন শৃঙ্খলার যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সেই বিবেচনায় আইন শৃঙ্খলা ঠিক করা এবং রাষ্ট্র ও সরকার যে সেটি করতে সক্ষম সেই আস্থা জনমনে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ তাদের থাকবে,” বলেছেন তিনি।

ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধেও বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা খাতে সংস্কার প্রায় অগ্রগতি পায়নি এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফেরেনি।

এছাড়া পুলিশের দুর্বল অবস্থানের কারণে মব সন্ত্রাস, বিশেষ করে দল বেঁধে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা বেড়েছে। র‌্যাব, ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থাগুলোতে সংস্কার হয়নি বলে ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশটির অন্তত তিনটি মানবাধিকার সংগঠন ২০২৫ সালের অর্থাৎ গত এক বছরের যে মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, মব ভায়োলেন্স বা সন্ত্রাস বছর জুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

এসব সংগঠন বলছে, ২০২৫ সাল জুড়ে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশজুড়ে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের মানুষ এবং মাজার, দরগা ও বাউলদের ওপর হামলা, নিপীড়নের ঘটনা ক্রমাগত বাড়লেও এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও মবের মতো ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং ভয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। ঢাকায় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনাতেও সরকারের দিক থেকে কার্যকর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা, পুলিশ, সচিবালয়সহ কোথাও কোন চেইন অব কমান্ড নেই।

“এ বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তিটাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন জায়গায় কিছু ব্যক্তি দানব হয়ে ওঠেছে এবং তারা যা খুশী করছে। দেখার বিষয় হবে পরবর্তী সরকার কিভাবে এটি মোকাবেলা করে,” বলেছেন মি. রহমান।

এবার সংসদ নির্বাচনের সাথে গণভোটও হবে সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে। ফলে নির্বাচনে যারাই জিতবেন তারা রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, সংসদে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রপরিচালনা- এই তিন ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন।

কিন্তু এক্ষেত্রে অতীতের সরকার ও রাজনীতির যে সংস্কৃতি সেটির পরিবর্তে জনপ্রত্যাশা পূরণে কতটা ভিন্নতা তারা দেখাতে পারেন সেটিও নতুন সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।

তবে ক্রাইসিস গ্রুপের নিবন্ধে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমঝোতার যে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে ডঃ ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন সরকারকে প্রতিবেশী ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আওয়ামী লীগের নিজের পদক্ষেপের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হবে।

ইতোমধ্যেই ঢাকায় বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার জানাজার দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকায় আসা এবং পরে ভারতের লোকসভায় মিসেস জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশকে – ভারত সরকারের দিক থেকে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার আগ্রহের একটি ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন অনেকে।

“আওয়ামী লীগের ইস্যুটি দলটির নিজের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। পাশাপাশি বড় প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের বিষয়টিও নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে,” বলছিলেন ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।

অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ যেমন নিতে হবে, তেমনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রভাবশালী কিছু দেশ যেভাবে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে নতুন সরকারকে সেটিও সামলাতে হবে।

“স্থবির ব্যবসা বাণিজ্যকে সচল করা এবং পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও নতুন সরকারকে নিতে হবে,” বলছিলেন মি. রহমান।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

চর্বি খেলেই কি হৃদরোগ? জানুন সত্যটা

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৫০ এএম
চর্বি খেলেই কি হৃদরোগ? জানুন সত্যটা

খাবারে চর্বি বা ফ্যাটের নাম শুনলেই অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকে মনে করেন, ফ্যাট খেলেই হৃদরোগ হবে বা ওজন বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। সব ফ্যাট একরকম নয়।

কিছু ফ্যাট শরীরের জন্য ক্ষতিকর হলেও কিছু ফ্যাট আবার হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ফ্যাট পুরোপুরি বাদ না দিয়ে কোন ফ্যাট খাবেন আর কোনটি এড়িয়ে চলবেন, সেটাই জানা বেশি জরুরি।

শরীরের জন্য ফ্যাট কেন দরকার

ফ্যাট শরীরের একটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। এটি শরীরে শক্তি জোগায়, ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে শোষণে সাহায্য করে এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ত্বক ও চুল ভালো রাখতেও ফ্যাট দরকার। তবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ফ্যাট খেলে ওজন বাড়ে, যা হৃদরোগসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

কোন ফ্যাটগুলো কম খাওয়া উচিত

সব ফ্যাট সমান নয়। কিছু ফ্যাট নিয়মিত বেশি খেলে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।

স্যাচুরেটেড ফ্যাট

এই ধরনের ফ্যাট সাধারণত প্রাণিজ খাবারে বেশি পাওয়া যায়। যেমন

– গরু বা খাসির চর্বিযুক্ত মাংস

– মুরগির চামড়া

– পুরো দুধ, মাখন, পনির, আইসক্রিম

– নারিকেল তেল ও পাম তেল

স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। এতে ধমনিতে চর্বি জমে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই এই ফ্যাট একেবারে বাদ না দিলেও সীমিত রাখা ভালো।

ট্রান্স ফ্যাট

ট্রান্স ফ্যাটকে সবচেয়ে ক্ষতিকর ফ্যাট বলা হয়। এটি সাধারণত প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা খাবারে থাকে। যেমন

– ফাস্ট ফুড

– ডিপ ফ্রাই খাবার

– বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি

– কিছু মার্জারিন

এই ফ্যাট খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং ভালো কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয়। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই ট্রান্স ফ্যাট যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো।

কোন ফ্যাটগুলো হৃদযন্ত্রের জন্য ভালো

সব ফ্যাট খারাপ নয়। কিছু ফ্যাট নিয়মিত ও পরিমিত খেলে হৃদযন্ত্র ভালো থাকে।

মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট

এই ফ্যাট রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। হৃদরোগের ঝুঁকিও কমায়। পাওয়া যায়

– অলিভ অয়েল

– চিনাবাদাম তেল

– বাদাম

– অ্যাভোকাডো

পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট

এই ফ্যাট শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না, তাই খাবার থেকেই নিতে হয়। এর মধ্যে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদযন্ত্রের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

ওমেগা থ্রি পাওয়া যায়

– সামুদ্রিক মাছ যেমন সারডিন, স্যামন

– আখরোট

– চিয়া বীজ ও তিসি

ওমেগা সিক্স ফ্যাটও শরীরের জন্য দরকার, তবে সেটিও পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে।

পরিমাণের দিকে নজর দিন

ভালো ফ্যাট হলেও বেশি খেলে সমস্যা হতে পারে। কারণ ফ্যাটে ক্যালরি বেশি। তাই রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে সেদ্ধ, ভাপানো বা হালকা রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া ভালো। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল ও মাছের পরিমাণ বাড়ালে হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা সহজ হয়।

ফ্যাট মানেই ক্ষতিকর এই ধারণা ঠিক নয়। কোন ফ্যাট ভালো আর কোনটি খারাপ, তা জানা থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ট্রান্স ফ্যাট এড়িয়ে চলা, স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম খাওয়া এবং ভালো ফ্যাট পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলেই হৃদযন্ত্র ভালো থাকবে।

সচেতন খাবার নির্বাচনই সুস্থ জীবনের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

সূত্র : Health Line