খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো!

ড. ইকবাল আহমেদ
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:৩১ অপরাহ্ণ
ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো!

ডিজিটাল মানব হওয়ার দৌড়ে আমরা এখন আর শুধু মানুষ নই, আমরা এখন কনটেন্ট। আর সেই কনটেন্টের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী হলো আমাদের প্রিয় সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক। একসময় যাকে বলা হতো ‘ভার্চুয়াল স্পেস’, আজ তা এতটাই বাস্তব হয়ে উঠেছে যে, পাবলিক আর প্রাইভেটের মাঝখানের সীমারেখা প্রায় মুছে গেছে। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি ফেসবুক ব্যবহার করছি, নাকি ফেসবুকই আমাদের ব্যবহার করছে? এ দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও কৌতুককর ও একই সঙ্গে উদ্বেগজনক। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আগে আয়নায় মুখ দেখা হয় না, দেখা হয় ফেসবুকের নিউজফিডে। কে কী খেল, কে কোথায় গেল, কার সংসারে ঝামেলা, কার বাচ্চা আজ কী খেয়েছে—সবই এখন ‘পাবলিক নলেজ’। ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো যেন আর ব্যক্তিগত নেই; বরং লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের মাপকাঠিতে তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয়।

একসময় ব্যক্তিগত দুঃখ ছিল ঘরের চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ। এখন দুঃখও স্ট্যাটাস হয়—‘মনটা আজ খুব খারাপ’—এরপর অপেক্ষা, কে কতটা সমবেদনা জানাল। কেউ যদি কমেন্ট না করে, তাহলে দুঃখটা যেন আরও বৈধতা হারায়। সুখের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বিয়ে, জন্মদিন, সন্তান জন্ম; এমনকি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরও এখন ‘লাইভ আপডেট’। মনে হয়, ফেসবুক ছাড়া এসব ঘটনা ঘটলেই-বা তার অস্তিত্ব কী?

এ দেশের বাস্তবতায় ফেসবুক এখন আর নিছক একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক আদালত। একটি স্ট্যাটাস, একটি পুরোনো ছবি বা পাঁচ বছর আগের কোনো মন্তব্য—এ সবকিছু মিলিয়ে একজন মানুষকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার পূর্ণাঙ্গ উপকরণ তৈরি হয়ে যায়। কে দেশপ্রেমিক, কে দেশদ্রোহী; কে প্রগতিশীল, কে প্রতিক্রিয়াশীল; এসব রায় অনেক সময় দেওয়া হয় একটি স্ক্রিনশটের ওপর ভিত্তি করে। প্রমাণের দরকার নেই, প্রসঙ্গ বোঝার প্রয়োজন নেই; দরকার শুধু ভাইরাল হওয়ার মতো একটি বাক্য।

ব্যঙ্গের বিষয় হলো, আমরা নিজেরাই এ বিচারব্যবস্থার স্বেচ্ছাসেবী জজ! সকালে ঘুম থেকে উঠে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা কারও চরিত্র বিশ্লেষণ করে ফেলি, ‘এই লোক তো ফেসবুকে এটা লিখেছে, নিশ্চয়ই ওর মানসিকতা এমনই।’ বাস্তব জীবনে তার কাজ, অবদান, আচরণ—এসব গৌণ। ফেসবুক স্ট্যাটাসই হয়ে ওঠে মানুষের পূর্ণাঙ্গ সিভি। ফলে সমাজে তৈরি হয় এক ধরনের ডিজিটাল লেবেলিং কালচার, যেখানে মানুষকে বোঝার চেয়ে ট্যাগ লাগানোই সহজ।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এ প্রবণতা আরও বিপজ্জনক। একটি রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ মানেই এখন ঝুঁকি নেওয়া। স্ট্যাটাসের শব্দচয়ন ঠিক না হলে আপনি রাতারাতি ‘বিপজ্জনক’, ‘বিকৃত’ বা ‘এজেন্ডাবাজ’ হয়ে উঠতে পারেন। রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গায় যুক্তি নয়, চলে ব্যক্তিগত আক্রমণ। মতের সঙ্গে দ্বিমত করার বদলে মানুষকে হেয় করাই যেন প্রধান কৌশল। গণতন্ত্রের মৌলিক চর্চা হচ্ছে সহনশীলতা—এ ডিজিটাল কোলাহলে হারিয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন আসে, উন্নত দেশগুলো কি সত্যিই ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র চালায়, বিচার করে? উত্তরটা খুব সোজা—না। সেখানে সামাজিক মাধ্যম আছে, বিতর্ক আছে; এমনকি তীব্র মতবিরোধও আছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, নাগরিক মূল্যায়ন বা নীতিনির্ধারণের ভিত্তি কখনোই ফেসবুক পোস্ট নয়। উন্নত দেশগুলোতে নীতিনির্ধারণ হয় গবেষণা, তথ্য, পরিসংখ্যান এবং প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যম সেখানে মতপ্রকাশের একটি মাধ্যম মাত্র—রাষ্ট্রের বা বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়।

তাদের পার্থক্যটা এখানেই। সেখানে নাগরিকের প্রাইভেট স্পেসকে আইন ও সামাজিক রীতিনীতি দুভাবেই সম্মান করা হয়। একজন মানুষ কী ভাবছে, তা জানার অধিকার সবার আছে; কিন্তু সে ভাবনাকে টেনে এনে জনসমক্ষে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বানানো হয় না—যতক্ষণ না তা আইন ভাঙছে। আমাদের দেশে সেই সূক্ষ্ম পার্থক্যটাই বারবার উপেক্ষিত হয়। ফলে ফেসবুক হয়ে ওঠে সামাজিক উত্তেজনা তৈরির কারখানা।

এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায় শুধু ব্যবহারকারীর নয়; নীতিনির্ধারকদেরও বড় ভূমিকা আছে। প্রথমত, ডিজিটাল লিটারেসিকে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক ও সামাজিক মাত্রা যোগ করতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়েই শেখাতে হবে—কী শেয়ার করা উচিত, কী ব্যক্তিগত থাকা জরুরি এবং অনলাইনে ভিন্নমতকে কীভাবে সম্মান করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল অধিকার ও প্রাইভেসি নিয়ে স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। আইন এমন হতে হবে, যা অপব্যবহার রোধ করবে, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করবে না। অস্পষ্ট ও ভীতিকর আইন মানুষকে দায়িত্বশীল করে না; বরং তাকে আরও আক্রমণাত্মক বা আত্মসংযত—দুই চরমে ঠেলে দেয়। তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফেসবুকের বাইরে শক্তিশালী যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব ব্যাখ্যা, সব সিদ্ধান্ত যদি ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই এ প্ল্যাটফর্মকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে দেয়। উন্নত দেশগুলো এখানেই সচেতন যে, সোশ্যাল মিডিয়া সহায়ক, বিকল্প নয়।

সবশেষে আমাদের ব্যক্তিগতভাবেও একটি প্রশ্ন করা জরুরি, ‘আমরা কি সত্যিই ডিজিটাল মানব হতে চেয়েছিলাম, নাকি শুধু অনিরাপদ এক দর্শক, যে অন্যের জীবন স্ক্রল করতে করতে নিজের বিবেক হারিয়ে ফেলেছে?’ ফেসবুক আমাদের হাতিয়ার হতে পারত; কিন্তু আমরা তাকে বিচারক বানিয়ে ফেলেছি। পাবলিক আর প্রাইভেট স্পেসের এ ব্লারিং চলতে থাকলে একদিন হয়তো আবিষ্কার করব—আমাদের সমাজ খুবই কানেক্টেড, কিন্তু ভীষণভাবে বিভক্ত!!

লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা