খুঁজুন
, ,

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই

আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের নানামূখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে আদিবাসী জনগণের অসামান্য অবদানকেও স্বীকৃতি জানায়। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য: “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো” যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণের ওপর আলোকপাত করে।

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের বর্তমান পরিস্থিতি

বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এ দেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এখানে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যুগ-যুগ ধরে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।

আমাদের সংবিধান ও সমঅধিকারের অঙ্গীকার

বাংলাদেশের সংবিধান সমতা ও ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সংবিধানে ‘জাতিসত্তা (Ethnicity) অথবা আদিবাসী (Indigenous Peoples)’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকৃত হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ (Indigenous Peoples)’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা, বিশেষ করে আইএলও -এর Committee of Experts on the Application of Conventions and Recommendations (CEACR), বার বার গুরুত্বারোপ করেছে যে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যেখানে আদিবাসী জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন।

আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা

সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। Kapaeeng Foundation -এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী নারীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতিফলন। তবে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।

প্রতিশোধের আশঙ্কা, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও সহায়ক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে না; বরং সহিংসতা, প্রান্তিকীকরণ এবং বৈষম্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই জরুরি ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে না।

 বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত

“বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত” – এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সহিংসতার অসংখ্য বেঁচে থাকা মানুষের জন্য বিচার শুধু ধীরগতির নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা অধরাই থেকে যায়। তদন্তে বিলম্ব, দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বহু ক্ষেত্রে অপরাধীদের জবাবদিহিতার অভাব বিচারপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: ঊনত্রিশ বছরের অপূর্ণ বাস্তবায়ন

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল অধিকতর স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা। পরবর্তী বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করলেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের মতে, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। এই বাস্তবায়ন ঘাটতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের এক নতুন সুযোগ

সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৯ -এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সাক্ষাতে অংশ নেয়। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ তুলে ধরে একটি সুপারিশপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ নতুন করে দেশের জাতীয় আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ নির্মাণ

সংলাপ, সহনশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহু জাতীয় সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। একই অঙ্গীকার এখন প্রয়োজন, যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীও সংবিধানের পূর্ণ সুরক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাদের কল্যাণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বিবেচনার দাবি রাখে:

ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকারকে একটি কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি।

ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে তারা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সকল অংশীজনের মধ্যে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা অপরিহার্য।

বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; বরং তারা এই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম অংশীদার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহু সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। দেশের প্রতি তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়, বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিতকারী নীতিমালার মাধ্যমে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের শক্তি কখনোই সাংস্কৃতিক একরূপতার ওপর নির্ভর করেনি। বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায়। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা করা কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই ভবিষ্যতের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com

মানুষ রবীন্দ্রনাথ : বিশ্বকবির অন্তর্জীবনের অনালোচিত অধ্যায়

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ
মানুষ রবীন্দ্রনাথ : বিশ্বকবির অন্তর্জীবনের অনালোচিত অধ্যায়

একজন মানুষকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় তার সাফল্য জানা নয়; বরং জানা, তিনি একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে কীভাবে ভালোবেসেছিলেন, কীভাবে হারিয়েছিলেন এবং কীভাবে বেঁচে ছিলেন। ২২ শ্রাবণ এলেই বাঙালির মন অন্য এক আবহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্র সংগীতের সুর ভেসে আসে চারদিক থেকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার কবিতার পঙ্‌ক্তি। সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতা ভরে ওঠে তার জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকর্মের বিশ্লেষণে। আমরা শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি নোবেলজয়ী কবিকে, বিশ্ব ভারতীর প্রতিষ্ঠাতাকে, বাংলা ভাষার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিককে।

কিন্তু প্রতি বছর এই শ্রদ্ধার ভিড়ে একটি প্রশ্ন নীরবে হারিয়ে যায়, আমরা কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করি, নাকি শুধু তার খ্যাতিকে? আমরা তার কবিতা পড়ি, কিন্তু তার কান্নার ইতিহাস পড়ি না। আমরা তার গান গাই, কিন্তু তার নীরবতার শব্দ শুনি না। আমরা তার সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করি, অথচ তার সংসার, তার পরিবার, তার ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং তার একাকীত্বকে খুব কমই আলোচনায় আনি। সম্ভবত এ কারণেই আজও “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ” আমাদের কাছে পরিচিত; কিন্তু “মানুষ রবীন্দ্রনাথ” অনেকটাই অচেনা।

একজন লেখকের সাহিত্যকে তার জীবন থেকে পুরোপুরি আলাদা করা যায় না। কলমে যে শব্দ জন্ম নেয়, তার শিকড় থাকে জীবনের অভিজ্ঞতায়। আনন্দ, প্রেম, বিচ্ছেদ, মৃত্যু, প্রাপ্তি, অপূর্ণতাÑসবকিছু মিলিয়েই একজন শিল্পীর সৃষ্টিজগৎ নির্মিত হয়। রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন। তার সাহিত্যকে বুঝতে হলে শুধু গীতাঞ্জলি, গোরা কিংবা ঘরে-বাইরে পড়লেই হবে না; জানতে হবে তার ঘরের ভেতরের মানুষটিকেও।

আমরা যাকে “বিশ্বকবি” বলে সম্মান জানাই, তিনি একদিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির একটি শিশু ছিলেন। তিনি একজন পিতার স্নেহে বড় হয়েছেন, আবার সেই পিতাকেও হারিয়েছেন। তিনি দাম্পত্যজীবনে ভালোবেসেছেন, আবার অকালে জীবনসঙ্গিনীকে হারিয়ে দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা বয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি সন্তানদের জন্য নতুন শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, অথচ নিজের জীবদ্দশায় সন্তানহারা পিতার অসহনীয় শোকও বহন করেছেন।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, কোনো মহান মানুষই তার মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন নন। বরং তার মহত্ত্বের ভিত গড়ে ওঠে সেই মানবিক অভিজ্ঞতার ওপরই। রবীন্দ্রনাথের জীবনও ছিল তেমনি। তার সৃষ্টির আলো যতটা উজ্জ্বল, তার ব্যক্তিগত জীবনের ছায়াগুলোও ততটাই গভীর। সেই ছায়ার মধ্যে রয়েছে শৈশবের নিঃসঙ্গতা, পারিবারিক দায়িত্ব, দাম্পত্যের কোমলতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থান। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি কখনো সেই বেদনাকে কেবল ব্যক্তিগত রাখেননি; নিজের অশ্রুকে তিনি মানবতার ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। তাই তার লেখা পড়লে মনে হয়, তিনি যেন শুধু নিজের কথা বলেননি, সমস্ত মানুষের হৃদয়ের ভাষাই লিখেছেন।

আমরা তার প্রয়াণ বার্ষিকীতে ফুল দিই, মালা দিই, গান গাই। কিন্তু হয়তো খুব কম মানুষই ভাবিÑযে মানুষটির প্রতিকৃতির সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তারও একটি সংসার ছিল। দিনের শেষে তিনিও ঘরে ফিরতেন। তারও ছিল অপেক্ষা, উদ্বেগ, আনন্দ, অপূর্ণতা এবং দীর্ঘশ্বাস। তিনি শুধু নোবেলজয়ী কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক স্ত্রীর স্বামী। তিনি ছিলেন পাঁচ সন্তানের পিতা। তিনি ছিলেন এক পুত্র, যিনি পিতার মৃত্যুতে শোকাহত হয়েছেন। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি ব্যক্তিগত ক্ষতকে কখনো অভিযোগে নয়, সৃষ্টিতে রূপ দিয়েছেন। সম্ভবত এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও আমাদের এত কাছের। কারণ তিনি শুধু প্রতিভার জন্য মহান নন; তিনি মহান তার সহিষ্ণুতার জন্য, তার মানবিকতার জন্য এবং গভীরতম ব্যক্তিগত বেদনাকেও বিশ্বমানবের সম্পদে রূপান্তর করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য।

ঠাকুরবাড়ি ছিল শুধু একটি অভিজাত পরিবারের বাসভবন নয়; ছিল উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। সেখানে সাহিত্যচর্চা ছিল, সঙ্গীত ছিল, নাটক ছিল, দর্শন ছিল, সমাজসংস্কারের আলোচনা ছিল, আবার ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চিন্তার অবাধ প্রবাহ। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর কাছে পৃথিবীকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সর্বকনিষ্ঠ সন্তানদের একজন। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব আধ্যাত্মিক, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং গভীর চিন্তার মানুষ। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের মা সারদা দেবী ছিলেন সংসারের নীরব কেন্দ্র বিন্দু। কিন্তু ব্যস্ত ও বৃহৎ পরিবারের নিয়মে ছোটবেলার রবীন্দ্রনাথ মায়ের সান্নিধ্য খুব বেশি পাননি। কৈশোরেই মায়ের মৃত্যু তার জীবনে এক নিঃশব্দ শূন্যতার সৃষ্টি করে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছিল অনেক। বড় ভাই-বোনদের মধ্যে কেউ ছিলেন দার্শনিক, কেউ সাহিত্যিক, কেউ সুরকার, কেউ চিত্রকর, কেউ সমাজসংস্কারক। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প-িত ও দার্শনিক, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভারতীয় আইসিএস কর্মকর্তা, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন নাট্যকার, সুরকার ও শিল্পচর্চার অন্যতম প্রাণ পুরুষ। এই বহুমাত্রিক পরিবেশ রবীন্দ্রনাথের শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তবু এই ঐশ্বর্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও তার শৈশব পুরোপুরি আনন্দময় ছিল না।

বিশাল বাড়ির নিয়মকানুন, গৃহ শিক্ষকের কঠোরতা এবং অভিভাবকদের ব্যস্ততার কারণে তিনি অনেক সময় একাকীত্ব অনুভব করতেন। পরে তার স্মৃতিকথা জীবন স্মৃতি-তে সেই শৈশবের নিঃসঙ্গতার নানা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই নিঃসঙ্গতাই হয়তো তাকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে গিয়েছিল, কল্পনার জগতে ডুব দিয়েছিল এবং শব্দের সঙ্গে তার আজীবনের বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিল।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছেলেকে শুধু বিদ্যা শিক্ষা দেননি; দিয়েছিলেন প্রকৃতিকে দেখার চোখ।

কৈশোরে পিতার সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। পাহাড়, আকাশ, বন, নক্ষত্র আর নীরবতার মধ্যে তিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন প্রকৃতির বিশালতা এবং মানুষের ক্ষুদ্রতাকে। পরবর্তী জীবনে তার কবিতা, গান ও দর্শনে প্রকৃতির যে গভীর উপস্থিতি দেখা যায়, তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই অভিজ্ঞতার মধ্যেই। তবে ঠাকুরবাড়ির আরেকটি শিক্ষা ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণÑমানুষের প্রতি সম্মান। ধর্ম, জাত, ভাষা কিংবা ভৌগোলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখার যে উদার মানসিকতা রবীন্দ্রনাথের রচনায় বারবার ফিরে এসেছে, তারও সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় পারিবারিক পরিবেশে। সেই কারণেই তিনি একদিকে যেমন গভীরভাবে বাঙালি, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বমানবের কণ্ঠস্বর।

পরিবার তার কাছে ছিল কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়; ছিল মূল্যবোধের বিদ্যালয়। এখান থেকেই তিনি শিখেছিলেন শৃঙ্খলা, শিল্পচেতনা, মানবিকতা, আত্মসমালোচনা এবং স্বাধীন চিন্তার সাহস। এই শিক্ষাই পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাদর্শে রূপ নেয়, যেখানে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে গুরুত্ব পায় প্রকৃতি, সৃজনশীলতা এবং মুক্ত চিন্তা। হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য এত গভীরভাবে মানবিক। কারণ তিনি শুধু বই থেকে শেখেননি; তিনি শিখেছিলেন জীবন থেকে, পরিবার থেকে, সম্পর্ক থেকে এবং নীরবতা থেকে।

১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর, মাত্র বাইশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় ভবতারিণী দেবীর সঙ্গে। বিয়ের পর তার নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী। সে সময়ের সামাজিক রীতিতে অল্প বয়সেই এই বিবাহ সম্পন্ন হলেও সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পরিণত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং নীরব সহযাত্রায়। সাহিত্যচর্চা, জমিদারির দায়িত্ব এবং বহুমুখী কর্মব্যস্ততার আড়ালে সংসারের যে দৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, তার বড় অংশই নীরবে বহন করেছিলেন মৃণালিনী দেবী। ইতিহাসে তার নাম খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। তিনি কোনো সাহিত্যিক ছিলেন না, কোনো জননেত্রীও নন। তবু রবীন্দ্রনাথের জীবনের ইতিহাস লিখতে গেলে তার নাম এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। কারণ বড় মানুষের জীবনে অনেক সময় সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন সেই মানুষটি, যিনি আলোয় আসেন না।

দাম্পত্য জীবনে তাদের সংসার আলো করে জন্ম নেয় পাঁচ সন্তানÑমাধুরীলতা (বেলা), রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা এবং শমীন্দ্রনাথ। একজন পিতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন স্নেহশীল, কিন্তু প্রচলিত অর্থে কঠোর অভিভাবক নন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুর মনকে শাসন নয়, বিকাশের সুযোগ দিতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয়, শিল্পচর্চা, স্বাধীন চিন্তা এবং প্রশ্ন করার সাহস, এসবই ছিল তার শিক্ষাদর্শের মূলভিত্তি। পরে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাব্যবস্থায় সেই বিশ্বাস বাস্তব রূপ পায়।

কিন্তু নিয়তি যেন তার সংসারের জন্য এক ভিন্ন গল্প লিখে রেখেছিল। ১৯০২ সালে মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু ঘটে। জীবনের যে মানুষটি নিঃশব্দে তার পাশে ছিলেন, তিনি হঠাৎই বিদায় নিলেন। এই মৃত্যু শুধু একজন স্ত্রীর মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে গভীর শূন্যতাগুলোর একটি। এই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ১৯০৩ সালে কন্যা রেণুকা চলে গেলেন। তারপর ১৯০৫ সালে পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। ১৯০৭ সালে ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথের অকাল প্রয়াণ। পরবর্তীকালে জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতার মৃত্যুও তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে এতগুলো প্রিয়জনকে হারানো যে কোনো মানুষকে ভেঙে দিতে পারত।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক এখানেই! তিনি শোককে অস্বীকার করেননি, আবার শোকের কাছে আত্মসমর্পণও করেননি। তিনি ব্যক্তিগত বেদনাকে কখনো প্রদর্শনের বিষয় বানাননি। বরং সেই বেদনা ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে তার কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে এবং দর্শনে। তার রচনায় মৃত্যু কখনো কেবল সমাপ্তি নয়; কখনো তা রূপান্তর, কখনো বিচ্ছেদের মধ্যেও মিলনের আকাক্সক্ষা, কখনো জীবনের গভীরতর উপলব্ধি।

রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পরিবারের প্রতি তার মমত্ব ছিল অকৃত্রিম। কর্ম ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সন্তানদের শিক্ষা, চরিত্রগঠন এবং মানসিক বিকাশ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। তার কাছে পিতৃত্ব ছিল কেবল অভিভাবকত্ব নয়; ছিল একজন মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব।

আজকের দিনে আমরা যখন সফলতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করি, তখন প্রায়ই মানুষের পারিবারিক পরিচয়কে তুচ্ছ করে দেখি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবন আমাদের অন্য শিক্ষা দেয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে বিশ্বমানের সাহিত্যিক, সমাজচিন্তক, শিক্ষাবিদ এবং একজন নিবেদিত পারিবারিক মানুষ হতে পারেন। এই পরিচয়গুলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরকে সমৃদ্ধ করে।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য শুধু নন্দনতত্ত্বের চর্চা নয়; এটি জীবনদর্শনের দলিল। তার কবিতায় মৃত্যু ভয়ের প্রতীক নয়, বরং অনিবার্য সত্যের গ্রহণযোগ্যতা। তার গানে বিচ্ছেদ কেবল বেদনা নয়, আত্মার গভীর সংলাপ। তার প্রবন্ধে মানুষ কোনো জাতি, ধর্ম বা ভূখ-ের সীমায় আবদ্ধ নয়; মানুষ সেখানে বিশ্বমানবতার অংশ। এ কারণেই গীতাঞ্জলি পড়লে মনে হয়, কবি কেবল ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলছেন না; তিনি নিজের ভাঙা হৃদয়ের সঙ্গেও কথা বলছেন।ডাকঘর-এ শিশুমন যেমন মুক্তির স্বপ্ন দেখে, তেমনি সেখানে জীবনের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার এক আধ্যাত্মিক আকাক্সক্ষাও প্রকাশ পায়। তার বহু গান ও কবিতায় শোক ব্যক্তিগত থেকে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সেখানে আর একার থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রতিটি মানুষের অনুভূতির ভাষা।

রবীন্দ্রনাথের জীবন আমাদের আরও একটি গভীর শিক্ষা দেয়, মহত্ত্ব কখনো কেবল প্রতিভা দিয়ে নির্মিত হয় না; চরিত্র, সহিষ্ণুতা এবং মানবিকতা তাকে পূর্ণতা দেয়। নোবেল পুরস্কার তাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছে, কিন্তু তাকে অমর করেছে তার মনুষ্যত্ব। কারণ তার সাহিত্য মানুষের বিভাজন শেখায় না; শেখায় সংযোগ। তিনি সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে কলম ধরেছিলেন।

আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে যতই এগিয়ে যাক, মানুষের ভেতরের একাকীত্ব, ভয়, বিচ্ছিন্নতা এবং মূল্যবোধের সংকট যেন আরও প্রকট হচ্ছে। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন এখানেই। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত ক্ষতি মানুষকে নিষ্ঠুর করতেই হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। গভীর শোকও মানুষকে আরও সহানুভূতিশীল, আরও উদার, আরও সৃজনশীল করে তুলতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভার সর্বোচ্চ প্রকাশ তখনই ঘটে, যখন তা মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত হয়। হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও শুধু বাঙালির নন; তিনি বিশ্বের। তার পরিচয় কোনো একটি ভাষা, একটি জাতি বা একটি ভূখ-ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যার শব্দে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের জীবনের প্রতিধ্বনি খুঁজে পায়।

এই লেখার শুরুতে একটি প্রশ্ন ছিল, আমরা কি রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করি, নাকি শুধু তার খ্যাতিকে? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আরও স্পষ্ট! কারণ বিশ্বকবি হয়ে কেউ জন্ম নেন না। জীবনসংগ্রামের দীর্ঘ পথ পেরিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকবি।

২২ শ্রাবণে তাই আমাদের শ্রদ্ধা শুধু তার সাহিত্যকেই নয়, তার মানুষটিকেও। কারণ তার কলম অমর হয়েছে শব্দে, কিন্তু সেই শব্দের জন্ম হয়েছে জীবনের গভীরতম অভিজ্ঞতা থেকে। রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পড়ার সময় এসেছে, কবিতা দিয়ে নয়, মানুষ দিয়ে। সেই মানুষটির নাম শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

লেখক: সহ-সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

আজ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ, জানা যাবে যেভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০১ পূর্বাহ্ণ
আজ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ, জানা যাবে যেভাবে

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের অপেক্ষার অবসান হচ্ছে আজ। সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফলাফল উদ্বোধন করবেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

একই সময়ে পরীক্ষার্থীরা অনলাইন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে পারবেন। রোববার (৯ আগস্ট) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় এ তথ্য।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ফলাফল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পরীক্ষার ফল হস্তান্তর করবেন।

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান শনিবার জানান, সোমবার সকাল ১০টায় একযোগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে নিজ নিজ বোর্ডের ফল পাওয়া যাবে।

এ ছাড়া দুটি অভিন্ন ওয়েবসাইট— eduboardresult.gov.bdeducationboardresults.gov.bd—থেকেও ফল জানা যাবে। পরীক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও ফল সংগ্রহ করতে পারবেন।

মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমেও ফল জানা যাবে। এ জন্য মেসেজ অপশনে গিয়ে প্রথমে ‘SSC’ লিখে স্পেস দিয়ে বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর, এরপর স্পেস দিয়ে রোল নম্বর এবং আরেকটি স্পেস দিয়ে পরীক্ষার বছর লিখে ১৬১৪০ নম্বরে পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে পরীক্ষার ফল জানিয়ে দেওয়া হবে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের জন্য এসএমএসের ফরম্যাট হবে ‘SSC DHA ROLL YEAR’। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ‘SSC MAD ROLL YEAR’ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীদের ‘SSC TEC ROLL YEAR’ লিখে ১৬১৪০ নম্বরে পাঠাতে হবে। প্রতিটি এসএমএসের জন্য ১ টাকা ৩৯ পয়সা চার্জ প্রযোজ্য হবে। এ চার্জের মধ্যে সব ধরনের কর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিতে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছে। এর মধ্যে সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষায় ফরম পূরণ করে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী।

এদিকে ফল পুনর্নিরীক্ষণ জন্য আগামী ১১ আগস্ট থেকে আবেদন করা যাবে। আবেদন গ্রহণ চলবে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির শনিবারের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ফল প্রকাশের পর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন নেওয়া হবে। আবেদন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানা যাবে।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রকাশিত ফল সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়েবসাইটের ‘Result’ কর্নারে গিয়ে বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের ‘EIIN’ ব্যবহার করে ফল ডাউনলোড করে প্রকাশ করতে পারবে।

পরীক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডগুলোর কমন ওয়েবসাইট, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট ও নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ফল সংগ্রহ করতে পারবেন। এসএমএসের মাধ্যমেও ১৬১৪০ অথবা ১৬২২২ নম্বরে ফল জানা যাবে।

ফরিদপুরে গাছের মেলায় সবুজের ঢল, বাড়ছে ক্রেতার ভিড়

মানিক কুমার দাস, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে গাছের মেলায় সবুজের ঢল, বাড়ছে ক্রেতার ভিড়

সবুজের সমারোহ আর নানা জাতের গাছের সমাহারে জমে উঠেছে ফরিদপুরের বৃক্ষ মেলা। মেলা শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রতিদিনই বাড়ছে ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী মানুষের আনাগমনে মুখর হয়ে উঠছে মেলা প্রাঙ্গণ। পছন্দের গাছ কিনতে দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসছেন বৃক্ষপ্রেমীরা।

সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়ছে। মেলার প্রতিটি স্টলেই সাজানো রয়েছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফুল, ফল, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা। ছোট আকারের চারা থেকে শুরু করে বড় ও শোভাবর্ধনকারী গাছ—সবকিছুই রয়েছে ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায়।

মেলায় গাছের দাম শুরু হয়েছে মাত্র দুই টাকা থেকে। প্রজাতি, আকার ও বয়সভেদে কিছু গাছের দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ফলে স্বল্প আয়ের ক্রেতা থেকে শুরু করে শৌখিন বৃক্ষপ্রেমী—সব শ্রেণির মানুষের জন্যই রয়েছে গাছ কেনার সুযোগ।

স্টল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের মেলায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে বিভিন্ন জাতের ফুলের চারার। এর পাশাপাশি আম, পেয়ারা, লেবু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলজ গাছ এবং বনজ ও ঔষধি গাছও ভালো বিক্রি হচ্ছে। দেশি প্রজাতির পাশাপাশি হাইব্রিড ও উন্নত জাতের গাছের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। গাছের সঙ্গে বিভিন্ন আকার, নকশা ও দামের টবও বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতারা জানান, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে মেলায় ক্রেতা সমাগম ও বিক্রি কিছুটা কমে গিয়েছিল। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় আবারও ক্রেতাদের উপস্থিতি বেড়েছে। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মেলায় তুলনামূলক বেশি ভিড় হচ্ছে।

মেলায় ঘুরতে আসা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও গাছ কেনার ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কিছু গাছের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় তারা নিজেদের পছন্দের গাছ কিনে বাড়ির আঙিনা কিংবা ছাদে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

বৃক্ষপ্রেমীদের মতে, এমন মেলা শুধু গাছ কেনাবেচার সুযোগ তৈরি করে না; বরং মানুষের মধ্যে বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে নানা বয়সী মানুষের পদচারণা, গাছের বৈচিত্র্য আর জমজমাট বেচাকেনায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে ফরিদপুরের বৃক্ষ মেলা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মেলার শেষ সময় পর্যন্ত ক্রেতা সমাগম ও বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন আয়োজক ও বিক্রেতারা।