খুঁজুন
, ,

ক্ষমতার বিড়ম্বনা ও সুদিনে সংকট

ড. মো. শওকত হোসেন
প্রকাশিত: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ
ক্ষমতার বিড়ম্বনা ও সুদিনে সংকট

দার্শনিক হবসের ‘লেভিয়াথান’ নামক একটি গ্রন্থ আছে। রাষ্ট্রবিষয়ক নানাবিধ আলোচনার মধ্যে রাষ্ট্র নির্মাণের পেছনের পরিস্থিতির কিছু কাল্পনিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছেন তিনি এই বিখ্যাত গ্রন্থে। তার মতে, রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পূর্বে প্রকৃতির রাজ্য বিরাজিত ছিল। এই প্রকৃতির রাজ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, এখানে মানুষ ছিল অবাধভাবে স্বাধীন। সবাই যথেচ্ছা সুযোগের সন্ধানে লিপ্ত ছিল। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সুগঠিত কর্তৃপক্ষ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করত না; যে যার মত সুযোগ নেওয়ার উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল সেই প্রকৃতির রাজ্যে।

তথাপিও যেমন খুশি তেমন ইচ্ছা অবাধ স্বাধীনতার এই জামানা মানুষের জন্য শান্তিময় ছিল না, বরং তা ছিল সংঘাতময়। এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ হচ্ছে : মানুষের চাহিদা অপরিসীম, মানুষ অল্পে তৃপ্ত হয় না। সুযোগ অবারিত থাকলে যে যার মতো করে সর্বোচ্চ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আর এই অবস্থা কারো জন্য সুখকর হয় না, এই কারণে যে, কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। তাই তথাকথিত নিকটজন বলতে কেউ থাকেনা। সবাই সবার সাথে প্রতিযোগিতা করে; আর এই প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রকৃতির রাজ্যের অবস্থা ব্যাখ্যায় এক কথায় এই বাস্তবতাকে হবস চিহ্নিত করেছেন প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রত্যেকের যুদ্ধ হিসেবে। আসলে অবাধ সুযোগ সংঘাতকেই যেন স্বাগত জানায়।

রাষ্ট্র উৎপত্তির পেছনের ইতিহাস যাই হোক না কেন, আর সেক্ষেত্রে হবসের প্রকল্প সত্য হোক বা মিথ্যা হোক- সে আলোচনা এখন আর খুব দরকারি না। কেননা বাস্তবতা হলো এখন রাষ্ট্র আছে। পৃথিবীময় মানুষ এখন এক একটি রাজনৈতিক সমাজে বসবাস করছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে মানুষের সমাজজীবন পরিচালিত হচ্ছে। তবে সব রাষ্ট্রের বাস্তবতা এক রকম নয়। সরকার ব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী অনেকাংশে রাষ্ট্রের প্রকৃতি নির্ভর করে। আর শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের গতি-প্রকৃতি ও জনগণের সুবিধা-অসুবিধা।

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সাংবিধানিকভাবে এই রাষ্ট্রে জনগণকেই বলা হয় সকল ক্ষমতার অধিকারী। জনগণ প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। যদিও সেই সরকারে জনগণের কর্তৃত্ব বা অধিকার কতটা সুরক্ষা পায় তাও নির্ভর করে শাসক শ্রেণির মানসিকতা, দক্ষতা ও রাজনৈতিক দর্শনের উপর। সংসদীয় গণতন্ত্রে আসন ভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার তারতম অনুযায়ী সরকারের ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। ২০২৬- এর নির্বাচনের পরে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। এমনকি সংসদে দুই তৃতীয় অংশের বেশি আসন নিয়ে এক নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে দলটি। এই বাস্তবতায় সরকারের ক্ষমতা এখন একচ্ছত্র। আর যেহেতু এটি একটি দলীয় সরকার, তাই সরকারি দলের নেতা কর্মী সমর্থক ও সুনজরপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের সামনে এখন সৃষ্টি হয়েছে অবারিত সুযোগ, অপার সম্ভাবনা। সংগত কারণেই এই বাস্তবতায় এইসব সুযোগধারী বা সম্ভাবনাময়ী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও তৈরি হয়েছে এক ধরনের নিরলস প্রতিযোগিতা। অনেকেই বিরতিহীনভাবে দৌড়াচ্ছেন। কোনটা রেখে কোনটা নেবেন, কোথায় গিয়ে থামবেন-তা কেউ কেউ বুঝে উঠতে পারছেন না।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘হেথা নয়- অন্য কোথা, অন্য কোথা— অন্য কোনখানে?’ কেউ পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না, কেউ কম পাচ্ছেন, আবার কেউ যা পাওয়ার কথা তার চেয়েও বেশি পাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন যে, পেয়ে খুশি হওয়া মানুষের চেয়ে না পেয়ে বা অল্প পেয়ে অখুশি মানুষের সংখ্যাই বেশি। আরো ছোট করে বললে সরকার দলের অসংখ্য চাহিদাওয়ালা মানুষই থেকে যাচ্ছে নাখোশ, এমনকি ক্ষুব্ধ। দলের উপর, দলের কোনো কোনো নেতার উপর, সরকারের উপর, এমনকি সহযোদ্ধা প্রিয়জনদের উপরও অনেকেই হয়ে উঠছেন ক্রমশ আস্থাহীন।

এই বাস্তবতা দার্শনিক হবসের প্রকৃতির রাজ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং সুবিধার সন্ধানে প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষের মধ্যে সম্পর্কের বাঁধন বিনষ্ট হয়ে সংঘাত যদি ব্যাপকতার হয়ে ওঠে, তবে তা নিতান্তই অশনি সংকেত। সরকারের বড় পদে গেলে বা সরকার পরিচালনার উচ্চ অবস্থায় অধিষ্ঠিত হলে অনেক সময় এই বাস্তবতাকে টের পাওয়া যায় না। কেননা সবাই তাদের কাছে তোষামোদি করেন, দলের প্রতি দেশের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট ও প্রেম দেখানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা যে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ভিতর থেকে দলের শক্তিকেই খর্ব করে ফেলে তা বাইরে থেকে অনেক সময় বোধগম্য হয় না।

এমন পরিস্থিতিতে বিরুদ্ধ পক্ষ অর্থাৎ সরকারবিরোধীরা, এমনকি দেশবিরোধীরাও সুযোগ করে নেওয়ার বা দলীয়ভাবে সংগঠিত হওয়ার এবং শক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পায়। সরকারি দলের পক্ষেও সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সেবা সুচারুভাবে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা ব্যাহত হয়। শাসক দলের নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী দল পরিচালনা এবং দলকে জনবান্ধব হিসেবে ধরে রাখাও ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে।

ভূমিধস বিজয় নিয়ে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের অনুসারীদের দৌড় সামলানো, সংঘাত এড়ানো এবং সমন্বিতভাবে সুযোগসমূহের যুক্তিযুক্ত সুনিপুণ বণ্টনের। দল ঠিক রাখতে হলে অনেককেই যেমন অখুশি করা যায় না, তেমনি নানামুখী চাহিদাধারীদের মধ্যে সুসমন্বয় করা একটি জটিল যজ্ঞ। ছোট মাঝারি নেতা কর্মী সমর্থকরা যখন দেখে দুঃসময়ে সকলেই একসাথে ছিল, নির্যাতন নিষ্পেষণ সবকিছু সহ্য করেছে, বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়েছে, কিন্তু সুসময়ে এসে মুষ্টিমেয় মানুষেরাই শুধু সৌভাগ্যের পরশ পাচ্ছে, তাহলে তাদের মনে না পাওয়ার যন্ত্রণা ক্রমশ বেড়ে চলবে, ক্ষোভ দানা বাঁধবে।

বর্তমান বাস্তবতায় অনেকেই অনেক আলোকিত আলয়ে সৌভাগ্যের সাহচর্য নিতে দেখা যাচ্ছে। আবার কাউকে কাউকে গাড়ির পেছনে দৌড়াতে, নিরাপত্তাকর্মীদের অথবা নিজ দলের অপেক্ষাকৃত বড় কর্তাদের ধাক্কা খেতে দেখা যাচ্ছে। যেসব নেতা অনেক বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে দৈনন্দিন ওঠা-বসা ও যোগাযোগ রাখতেন, তারা কেউ কেউ সৌভাগ্যবান হাওয়ায় ঐসকল পরিচিত জনের ফোন কল পর্যন্ত ইগনোর করছেন। তারা ভীষণ ব্যস্ত- দেশ জাতির বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে এসবের বিরূপ প্রতিফলন হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই।

সুস্থতা যে কত নিয়ামত এবং অসুখ যে কত যন্ত্রণাময়, তা যেমন সুস্থ অবস্থায় উপলব্ধি করতে হয়; তেমনি অবারিত সুদিন আসলে দুর্দিনের দুরবস্থা এবং অনাহুত অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত আগামীর কথা যথাযথভাবে চেতনায় রাখাটাই জরুরি কাজ হওয়া উচিত।

লেখক : অধ্যাপক (দর্শন বিভাগ), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

টেকনাফে গুলিতে নিহত তিতাসের জানাজা সম্পন্ন, ফরিদপুরে নানীর কবরের পাশে দাফন

নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৫ অপরাহ্ণ
টেকনাফে গুলিতে নিহত তিতাসের জানাজা সম্পন্ন, ফরিদপুরে নানীর কবরের পাশে দাফন

‘কাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ মুঠোফোনে মাকে বলা ছেলের শেষ কথাগুলো এখন বারবার মনে পড়ছে রেখা বেগমের। অভিযানে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ (২৮)। তবে সেই অভিযান থেকে আর ফেরা হয়নি তাঁর। 

কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তিতাসের মরদেহ আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল ৪.৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ফরিদপুরের নগরকান্দায় আনা হয়। সন্ধ্যায় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে গ্রামের স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

তিতাসের মরদেহ বহনকারী সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারটি শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে নগরকান্দা সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে অবতরণ করে। সেখানে পদ্মা সেনানিবাসের ১৫ আর-ই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের মেজর সোহেলের নেতৃত্বে সেনাসদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে। মরদেহ পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়িতে ভিড় করেন। এ সময় মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ ও স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারসহ স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শুক্রবার (০৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব তিতাসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে সেখানে উপস্থিত হয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় তিতাসের ইউনিটের কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাজিদসহ সেনাবাহিনীর সদস্য, পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় লস্করদিয়া স্থানীয় গোরস্থানে। সেখানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ক্যাপ্টেন সাজিদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তিতাসের কবরে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এ সময় কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে সেনাসদস্যরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি আকাশের দিকে ছোড়েন। এভাবেই রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয় টেকনাফে দায়িত্ব পালনকালে নিহত এই সেনাসদস্য তিতাস শেখকে।

তিতাসের মৃত্যুর পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা রেখা বেগম। গত বুধবার রাতে মুঠোফোনে মাকে অভিযানে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিতাস। বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের এমন কথায় দোয়া করেছিলেন মা। কিন্তু সেটিই যে তাঁদের শেষ কথা হবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে কান্নায় থামছে না তাঁর।

অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তিতাসের। তাঁদের সংসারে কোনো সন্তান এখনো আসেনি। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু ডিসেম্বর আসার আগেই স্বামীকে হারাতে হলো। আর সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা আফজাল শেখ।

তিতাসের পরিবারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। বাবার পথ অনুসরণ করে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। পরিবারের তিন সদস্যের সেনাবাহিনীতে যুক্ত থাকার মধ্যে তিতাসের এমন মৃত্যুতে স্বজনদের শোকের পাশাপাশি এলাকায়ও শোকের মাতম তৈরি হয়েছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তিতাসের বুকের বাঁ পাশের ওপরের অংশে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিতাস সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য ছিলেন। তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর মরদেহ রামু সিএমএইচে রাখা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার হেলিকপ্টারে করে নিজ এলাকায় পাঠানো হয় তাঁকে।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দায় পৌঁছায়। পরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
সন্ত্রাসীদের বুলেটে নিহত সেনা সদস্য তিতাস: একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল

আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৮)। চার বছরের দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর অদম্য স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের একটি মাত্র বুলেট তাঁর সেই সাজানো স্বপ্নের দুনিয়া নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে ঠিকই ফিরছেন তিতাস, তবে তা কোনো আনন্দ নিয়ে নয়—বরং একটি নিথর, প্রাণহীন মরদেহে।

​প্রিয় স্বজনের এমন নির্মম বিদায়ের অপেক্ষায় থাকা তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগমের আহাজারিতে লস্করদিয়ার আকাশ-বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে।

​শেষ মায়ের দোয়া ও মর্মান্তিক পরিণতি

​স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে শেষবারের মতো কথা হয় তিতাসের। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নিতে হবে জানিয়ে তিনি মায়ের কাছে দোয়া চান। কে জানত, এটাই হবে মায়ের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ কথোপকথন! বৃহস্পতিবার রাতেই তিতাসের মৃত্যুর সংবাদ এসে সব ওলটপালট করে দেয়।

​নিহত তিতাস শেখ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। সেনাপরিবারের সন্তান তিতাসের বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তিতাস ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

​স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া ও মা রেখা বেগম। পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং তিতাসের এমন করুণ মৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীও।

​রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শোক প্রকাশ

​সেনা সদস্য তিতাস শেখের এই মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

​এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিতাস শেখ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ জাতি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

​প্রতিমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশসেবায় নিয়োজিত থেকে সেনা সদস্য তিতাসের এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও তাঁর সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশবাসীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করলেন ইউএনও, সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধ্বংস

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পদ্মা নদীর মধ্যে নির্মিত ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ অভিযান চালিয়ে এসব বাঁধ উচ্ছেদ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর চর শালিপুর ও সিট মির্জাপুরের খাঁ এলাকার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জেলেরা মাছ শিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে পদ্মা নদীতে এই অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করে আসছিলো। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী জেলেরা অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবিতে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম খাঁন বাবুলের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভকে তদন্ত করে এই অবৈধ বাঁধের বিষয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেন। সংসদ সদস্যের নির্দেশনার পর আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পদ্মা নদীর ২০টি অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ করে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জেলেরা।

স্থানীয় জেলেরা বলেন, ভবিষ্যতে যেন কেউ আবার পদ্মা নদীতে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে মাছের অবাধ বিচরণ ও সাধারণ জেলেদের জীবিকার পথে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, প্রবাহমান জলাশয়ে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়া মৎস্য আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব বাঁধ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচল ব্যাহত করার পাশাপাশি জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বাঁধ উচ্ছেদে জব্দকৃত সকল অবৈধ কারেন্ট জাল এবং চায়না দুয়ারী নদীর পারে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।