খুঁজুন
রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন, ১৪৩২

সবুজ বাইপাস সড়কটিতে এখন ময়লার ভাগাড়, বিপাকে সালথার মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
সবুজ বাইপাস সড়কটিতে এখন ময়লার ভাগাড়, বিপাকে সালথার মানুষ

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়কটি একসময় ছিল প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ঘেরা একটি মনোরম পথ। সবুজ গাছপালা, খোলা বাতাস আর শান্ত পরিবেশের কারণে বিকেলবেলা হাঁটাহাঁটি কিংবা অবসর সময় কাটানোর জন্য এটি ছিল স্থানীয়দের প্রিয় স্থান।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সৌন্দর্য হারিয়ে এখন সড়কটি পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে জমে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনার স্তূপ। বাজারের পচা ফলমূল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও নিষিদ্ধ পলিথিনসহ নানা ধরনের ময়লা ফেলা হচ্ছে এখানে। এসব বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ, যা পথচারীদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই নাক-মুখ চেপে কিংবা মাস্ক ব্যবহার করে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যক্তি রাতের আঁধারে ভ্যানযোগে বাজারের ময়লা এনে সড়কের পাশে ফেলে রেখে যায়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন ময়লার স্তূপ আরও বড় হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয় পথচারী শামিম হোসেন বলেন, “এই সড়কটি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এই পথ ব্যবহার করে। আগে এটি ছিল খুবই সুন্দর, কিন্তু এখন দুর্গন্ধে চলাচল করাই কঠিন হয়ে গেছে।”

আরেক পথচারী সোহেল মোল্যা বলেন, “একসময় এই রাস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবাইকে আকর্ষণ করত। এখন সেখানে শুধু ময়লার স্তূপ। দাঁড়িয়ে থাকাও যায় না। বাধ্য হয়ে মাস্ক ব্যবহার করতে হচ্ছে।”

বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, “এভাবে ময়লা ফেলার কারণে আমাদের ব্যবসা ও চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”

বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সরোয়ার হোসেন বাচ্চু জানান, পূর্বে প্রশাসনের নির্দেশনায় এখানে ময়লা ফেলা হলেও পরে তা বন্ধ করে নদীর পাশে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার কথা বলা হয়। বর্তমানে যদি কেউ নিয়ম ভেঙে এখানে ময়লা ফেলে, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “সালথা সদর বাজারের ময়লা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। খুব শিগগিরই একটি নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সড়কটি পরিষ্কার করে নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ না করলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অগ্নিঝরা মার্চের সূচনায় ফরিদপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ৬:১৬ পিএম
অগ্নিঝরা মার্চের সূচনায় ফরিদপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা

অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম প্রহরকে ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ কার্যক্রমটি পরিচালনা করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন যুবলীগের একজন নেতা।

রবিবার (০১ মার্চ) সকালে ফরিদপুর জেলা শহরে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শরিফুল হাসান প্লাবন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালেই তিনি কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে দেখা যায় তাকে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন জানান, এ সময় তার সঙ্গে কয়েকজন অনুসারীও ছিলেন। তারা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করেন এবং ছবি তোলেন। পরে সেই দৃশ্য ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগ বলে মন্তব্য করলেও, আবার কেউ কেউ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতার এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্চ মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। তবে আইনগত বা সাংগঠনিক অবস্থান বিবেচনায় এ ধরনের কার্যক্রম কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোনো নেতার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, অগ্নিঝরা মার্চ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এ মাসের প্রতিটি দিনই জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবহ।

সালথায় পাটবীজ উৎপাদনে সাফল্যের নতুন দিগন্ত, কৃষকের মুখে হাসি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১:৫৯ পিএম
সালথায় পাটবীজ উৎপাদনে সাফল্যের নতুন দিগন্ত, কৃষকের মুখে হাসি

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় পাটবীজ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পরিকল্পিত চাষাবাদ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি কর্মকর্তাদের নিবিড় তদারকির ফলে চলতি অর্থবছরে উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উন্নতমানের পাটবীজ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এতে করে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে এবং পাটচাষে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

উপজেলা পাট উন্নয়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০ একর জমিতে নাবী পাটের আবাদ করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল মানসম্মত দেশীয় পাটবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি করা। মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বীজ নির্বাচন, সঠিক সময়ে বপন, সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমন বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলন পাওয়া গেছে।

এ বছর প্রায় ২ হাজার কেজি উন্নতমানের পাটবীজ উৎপাদন হয়েছে, যা স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাইরের বাজারেও সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, আগে তারা মূলত পাটের আঁশ উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দিতেন। তবে এবার সরকারি কর্মকর্তাদের পরামর্শে পাটবীজ উৎপাদনে এগিয়ে এসেছেন। এতে তুলনামূলক কম খরচে বেশি লাভ হচ্ছে।

সামজুদ্দিন মাতুব্বর নামে এক কৃষক বলেন, “আগে শুধু আঁশের জন্য পাট চাষ করতাম, কিন্তু এবার বীজ উৎপাদন করে ভালো দাম পাচ্ছি। এতে লাভের পরিমাণও বেশি।”

রহিম মোল্যা নামের আরেক কৃষক জানান, পাটবীজ উৎপাদনে ঝুঁকি কম এবং বাজারমূল্য ভালো থাকায় আগামী বছর আরও বেশি জমিতে বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন তারা। এতে কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুল বারী বলেন, “সালথার মাটি ও জলবায়ু পাটবীজ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ বছর আমরা পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করেছি এবং আশানুরূপ সফলতা পেয়েছি। কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে পাটবীজ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, মানসম্মত দেশীয় পাটবীজ উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কৃষকেরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি দেশীয় পাটবীজের ঘাটতি পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ উদ্যোগ।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, “পাট আমাদের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল। সালথায় পাটবীজ উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা গেলে এটি কৃষকদের জন্য টেকসই আয়ের একটি বড় উৎস হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে পাটবীজ উৎপাদন বাড়ানো গেলে ফরিদপুরের সালথা উপজেলা ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম পাটবীজ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে কৃষির উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠলেন?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠলেন?

তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।

বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় ইরানের শাসন পদ্ধতি বেশ আলাদা। সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বা সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হলেও দেশের মূল ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে।

সাম্প্রতিক বছরগুলােতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে।

এমনকি দেশটির অন্য কােন নেতা নন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিই কেন আমেরিকা বা ইসরায়েলের টার্গেটে সেই প্রশ্নও বহু বছর ধরে আলােচনায় আছে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার শাসনের এই ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে। একটি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্রকে উৎখাত করা হয়। তাকে উৎখাতের পর ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর দেশটি দুজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা পেয়েছে। তাদের পদবী হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়, শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে যার অর্থ সিনিয়র ধর্মীয় নেতা।

সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীফ ছিলেন।

এছাড়া দেশের সব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সম্মতি দরকার হত। এমনকি ইরান পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী হবে কিনা অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতা করবে কিনা, এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তিনি দিতেন।

ইরানের সর্বোচ্চ এই ধর্মীয় নেতা মারা যাওয়ার পর পরবর্তী নেতা কে হবেন কিংবা কীভাবে নির্বাচিত হবেন সে প্রশ্নও সামনে আসছে।

ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় দেশটির জনগণের নেতা নির্বাচনে কার্যত কোন এখতিয়ার থাকে না।

এমনকি সামাজিক মাধ্যমে কেউ মি. খামেনির সমালোচনা করলে সেজন্যও তাকে জেলে যেতে হতে পারে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কে?

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পণ্ডিতের ঘরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করেন, পরে যান শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে।

১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন।

তরুণ আলী খামেনি খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। তার নিজের ভাষায়, তিনি যা করেছেন এবং এখন যা বিশ্বাস করেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।

আলী খামেনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর, আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে সহায়তাও করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯৮১ সালের জুন মাসে, তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার ওপর ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

দুই মাস পর, একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে।

রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আট বছর ধরে আনুষ্ঠানিক এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি।

ওই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন।

সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরে

১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে।

যদিও তিনি সংবিধানে নির্ধারিত শিয়া ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদমর্যাদা বা ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জন করতে পারেননি।

পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়। সংশোধনীনে বলা হয়েছিল যে, সর্বোচ্চ নেতাকে “ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। পরে রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়েছিল।

ইরানের সংবিধানে তখন আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।

ইরানের সংবিধানও পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির হাতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল।

নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। যাদের অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেননি।

১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। মি. খাতামি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন।

মি. খাতামি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তখন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

মি. খাতামির পরে তার উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। মি. আহমাদিনেজাদকে কেউ কেউ আয়াতুল্লাহ খামেনির অনুসারী মনে করতেন।

কিন্তু অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতি নিয়ে আহমাদিনেজাদ সরকারের অবস্থান তখন ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

একই সাথে মি. আহমাদিনেজাদ নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সাথে তার বিরোধিতা হয়।

সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনঃ-নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়।

সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ওই নির্বাচনের ফলাফল বৈধ বলে ঘোষণা দেন এবং তীব্র আন্দোলন দমনে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই দমন অভিযানে অনেক বিরোধী কর্মী নিহত হন, গ্রেফতার হন হাজার হাজার মানুষ।

২০১৩ সালে ইরানের উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেন। এই চুক্তি খামেনির সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়।

তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে বাধা দেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। রুহানি সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে একটি ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে।

সোলেইমানি আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন।

এই হামলার পর খামেনি সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান।

পরে তিনি বলেছিলেন, ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল ‘আমেরিকার গালে চপেটাঘাত’।

খামেনি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন, “এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।”

শীর্ষ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনি বহুবারই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০১৮ সালে তিনি ইসরায়েলকে “একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার” আখ্যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরায়েলকে মুছে ফেলার ফেলার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্ট বা ‘ইহুদি গণহত্যা’ আদৌ ঘটেছিল কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

২০১৪ সালে তার টুইটার অ্যাকাউন্টে উদ্ধৃত একটি বার্তায় বলা হয়েছিল: “হলোকাস্ট এমন এক ঘটনা যার বাস্তবতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, আর যদি ঘটেও থাকে, সেটা কীভাবে ঘটেছিল, তাও স্পষ্ট নয়।”

২০২০ সালে, আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং ইরানের সরকার দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল।

প্রথম সংকটটি শুরু হয় ওই বছর আটই জানুয়ারি। তখন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ভুল করে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা ১৭৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি নাগরিক।

ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার ফলে ইরানের ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কট্টরপন্থী সংবাদপত্রগুলি তার পদত্যাগের দাবি জানায় এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভের নতুন ঢেউ ওঠে দেশটিতে।

সেসময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলির ব্যবহারও করে বলে অভিযোগ ছিল।

সে সময় শুক্রবারের জুমার নামাজের বিরল এক খুতবায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, “বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত”। তবে তিনি তখন সামরিক বাহিনীর পক্ষই নিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুরা এই ট্র্যাজেডিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ইরানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ছড়িয়ে পড়ে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রথমে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখেছিলেন, বলেছিলেন যে ইরানের শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।

সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বাছাই হয় কীভাবে?

২০২১ সালে ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা এব্রাহিম রাইসি।

গত বছর মানে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৯শে মে ইব্রাহিম রাইসি এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেলে প্রেসিডেন্ট পদটি শূন্য হয়ে যায়।

রাইসির মৃত্যুর পর জুলাইয়েই ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সংস্কারপন্থী নেতা মাসুদ পেজেশকিয়ান।

গত কয়েক বছর ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনি নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছিলেন। ফলে তিনি মারা গেলে বা পদত্যাগ করলে কে হবেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা, গত কয়েক বছর ধরেই সে প্রশ্ন ঘিরে দেশটিতে নানা জল্পনা-কল্পনা ছিল।

এক সময় আয়াতোল্লোহ খামেনির পরবর্তীতে ইব্রাহিম রাইসিকেই পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হবেন বলেই মনে করা হচ্ছিল।

২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষের সময় তাকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম জানিয়েছিলেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপাের্টে বলা হয়েছিল।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এ পদে কে থাকবেন তা নির্ধারণ করেন বিশেষজ্ঞমণ্ডলী বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস নামে ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার একটি পরিষদ।

ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতোল্লা আলি খামেনিই ছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে আসীন দ্বিতীয় ব্যক্তি।

এই মণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচন করা হয় প্রতি আট বছর অন্তর। কিন্তু কারা গোষ্ঠীর সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন তা নির্ভর করে দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল নামে একটি কমিটির অনুমোদনের ওপর।

আর এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।

অর্থাৎ এই দুটি পরিষদ বা মণ্ডলীর ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে। গত তিন দশক ধরে আলী খামেনি নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষজ্ঞ মণ্ডলীর নির্বাচিত সদস্যরা যেন রক্ষণশীল হয় – যারা তার উত্তরসূরি নির্বাচনের সময় তারই নির্দেশ মেনে চলবে।

নির্বাচিত হবার পর, সর্বোচ্চ নেতা তার পদে আজীবন বহাল থাকতে পারেন।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হবে একজন আয়াতুল্লাহকে, অর্থাৎ যিনি একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা। কিন্তু আলী খামেনিকে যখন নির্বাচন করা হয়েছিল, তিনি আয়াতুল্লাহ ছিলেন না।

তখন তিনি যাতে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল।

সূত্র : বিবিসি বাংলা