‘বসন্তের কোনো এক উদাস দুপুরে’
বসন্তের দুপুরগুলো কেমন যেন আলাদা হয়—না গরম, না ঠান্ডা; যেন বাতাসের ভেতরেও একটা নরম ক্লান্তি লেগে থাকে। রোদ থাকে, কিন্তু সেই রোদ ঝলসে দেয় না; বরং মাটির ওপর নরম করে হাত রেখে যায়। এমনই এক দুপুরে, গ্রামের এক প্রাচীন শিমুলগাছের ডালে বসে ছিল একটি কাঠঠোকরা পাখি।
গাছটা ছিল গ্রামের প্রান্তে, পুরোনো পুকুরটার ধারে। শিমুলগাছটি যেন নিজের মতো করে বসন্তকে সাজিয়ে তুলেছিল। তার ডালভরা লাল-কমলা ফুলগুলো দূর থেকে দেখতে আগুনের মতো লাগে। কাছে গেলে বোঝা যায়—ওগুলো আগুন নয়, ওগুলো জীবনের রঙ। আর সেই ফুলের মাঝেই কাঠঠোকরা পাখিটি ঠোঁট দিয়ে আলতো করে ফুল ছুঁয়ে দেখছিল, যেন ফুলের ভেতর লুকোনো মধুর স্বাদ খুঁজছে। এই দৃশ্যটা দেখছিল রাশেদ।
রাশেদ শহর থেকে এসেছে। ঢাকা শহরের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, ধোঁয়া আর দৌড়ঝাঁপের জীবন থেকে সে কয়েক দিনের জন্য মুক্তি নিতে এসেছে তার দাদুর গ্রামে। ছোটবেলায় এখানে অনেকবার এসেছে, কিন্তু তারপর পড়াশোনা, চাকরি—সবকিছু মিলিয়ে এই গ্রাম যেন তার জীবনের বাইরে চলে গিয়েছিল।
কিন্তু এবার সে ফিরে এসেছে—কিছুটা ইচ্ছায়, কিছুটা বাধ্য হয়ে।
তার জীবনে যেন সবকিছু হঠাৎ করে থেমে গেছে। চাকরিতে সমস্যার পর সমস্যা, প্রেম ভেঙে যাওয়া, বন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া—সব মিলিয়ে সে যেন নিজের ভেতরেই আটকে গেছে। শহরের ভিড়ে থেকেও সে একা হয়ে পড়েছিল। তাই হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েই সে চলে আসে এই গ্রামে।
দাদু তাকে দেখে খুশি হয়েছিল, কিন্তু খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। শুধু বলেছিল, —“কিছুদিন থাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রাশেদ তখন বুঝতে পারেনি—কীভাবে সব ঠিক হবে?
সেই উত্তর খুঁজতেই হয়তো আজ সে এই শিমুলগাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। পাখিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাশেদের মনে হলো—পাখিটা যেন কিছু বলতে চায়। তার গায়ে হলুদ, কালো আর সাদা রঙের মিশেল; মাথায় লাল ঝুঁটি—অদ্ভুত সুন্দর। ঠোঁট দিয়ে সে বারবার গাছের ডালে ঠোকর দিচ্ছে, তারপর আবার ফুলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
—“তুই কী খুঁজছিস?” নিজের অজান্তেই বলে উঠল রাশেদ। পাখিটা যেন থেমে তাকাল। সত্যিই কি তাকাল, নাকি শুধু রাশেদের কল্পনা—সে বুঝতে পারল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো, —“ওরা খাবার খোঁজে। গাছের ভেতর থেকে পোকা বের করে খায়।”
রাশেদ ঘুরে তাকাল। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে—মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা, চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি। হাতে একটা বাঁশের ঝুড়ি।
—“তুমি কে?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটা হাসল, —“আমি মিতা। এই গ্রামেই থাকি। তুমি নতুন এসেছ, তাই না?”
রাশেদ মাথা নাড়ল, —“হ্যাঁ। অনেক বছর পর এলাম।”
মিতা শিমুলগাছটার দিকে তাকাল, —“এই গাছটা আমার খুব প্রিয়। বসন্ত এলে আমি প্রায় প্রতিদিন এখানে আসি।”
রাশেদ বলল, —“পাখিটা খুব সুন্দর।”
—“হুম,” মিতা বলল, “ওরা খুব পরিশ্রমী। সারাদিন গাছ ঠোকরায়, খাবার খোঁজে। কখনো থামে না।”
রাশেদ একটু হেসে বলল, —“আমাদের মতো না। আমরা থেমে যাই।”
মিতা তাকাল তার দিকে, —“তুমি থেমে গেছ?”
প্রশ্নটা এত সরাসরি ছিল যে রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“হ্যাঁ, হয়তো। মনে হয় কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না।”
মিতা কিছু বলল না। শুধু শিমুলগাছের একটা ফুল ছিঁড়ে হাতে নিল। ফুলটার দিকে তাকিয়ে বলল, —“দেখো, এই ফুলগুলো কত সুন্দর। কিন্তু এরা খুব অল্প সময় থাকে। তারপর ঝরে যায়।”
—“তাই?” রাশেদ বলল।
—“হ্যাঁ। কিন্তু গাছটা কি দুঃখ পায়? না। আবার নতুন পাতা আসে, নতুন ফুল আসে।”
রাশেদ মৃদু হেসে বলল, —“গাছ তো মানুষ না।”
মিতা মাথা নাড়ল, —“কিন্তু মানুষ গাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।”
সেদিনের পর থেকে রাশেদ প্রায় প্রতিদিন বিকেলে ওই শিমুলগাছের নিচে আসে। আর প্রায় প্রতিদিনই মিতার সঙ্গে দেখা হয়।
মিতা খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু তার কথা গুলো গভীর। সে গ্রামের মানুষ, কিন্তু তার চিন্তাগুলো যেন অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
একদিন রাশেদ তাকে জিজ্ঞেস করল, —“তুমি পড়াশোনা করো?”
—“করতাম,” মিতা বলল, “কলেজ পর্যন্ত। তারপর আর হয়নি।”
—“কেন?”
মিতা একটু থেমে বলল, —“বাবা অসুস্থ। সংসার সামলাতে হয়।”
রাশেদ চুপ করে গেল। শহরে বসে সে অনেক স্বপ্ন দেখেছে—ক্যারিয়ার, টাকা, সফলতা। কিন্তু এখানে এসে সে দেখছে, জীবনের অন্য একটা রূপ আছে—যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই একটা বড় অর্জন।
সেই দিনও কাঠঠোকরা পাখিটা গাছে বসে ছিল। রাশেদ তাকিয়ে বলল, —“ওটা কি প্রতিদিনই আসে?”
—“হ্যাঁ,” মিতা বলল, “ওর বাসা এই গাছেই কোথাও।”
—“ও কখনো ক্লান্ত হয় না?”
মিতা হাসল, —“হয়তো হয়। কিন্তু ও থামে না।”
একদিন দুপুরে হঠাৎ ঝড় উঠল। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। হাওয়া বইতে শুরু করল জোরে। শিমুলগাছটা দুলতে লাগল, ফুলগুলো একে একে ঝরে পড়তে লাগল।
রাশেদ তখন গাছের নিচেই ছিল। সে ভেবেছিল আজ হয়তো মিতা আসবে না। কিন্তু ঠিক তখনই সে দেখল—মিতা দৌঁড়ে আসছে।
—“এই ঝড়ে তুমি এখানে কেন?” রাশেদ চিৎকার করে বলল।
—“গাছটা দেখতে!” মিতা বলল, “ঝড়ে অনেক ডাল ভেঙে যায়।” হঠাৎ একটা বড় ডাল ভেঙে পড়ে গেল মাটিতে। রাশেদ চমকে উঠল।
ঝড়ের শব্দের ভেতরেও সে একটা কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পেল। মাটিতে পড়ে থাকা ডালের পাশে একটা ছোট্ট পাখির বাচ্চা কাঁপছে।
—“দেখো!” রাশেদ বলল।
মিতা দৌঁড়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে তুলে নিল, —“এটা কাঠঠোকরার বাচ্চা।”
রাশেদের বুকটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল। সে উপরে তাকাল—গাছের ডালে সেই কাঠঠোকরা পাখিটা অস্থির হয়ে উড়ছে।
—“এখন কী করব?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মিতা বলল, —“ওকে আবার বাসায় তুলতে হবে।”
—“কিন্তু বাসা কোথায়?”
মিতা চারদিকে তাকাল। তারপর গাছের একটা ফাঁপা অংশ দেখিয়ে বলল, —“ওখানে।”
—“ওটা তো অনেক উঁচু!”
—“তবু চেষ্টা করতে হবে।”
রাশেদ কখনো গাছে ওঠেনি। শহরের মানুষ হিসেবে তার জীবনে গাছে ওঠার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আজ সে দ্বিধা করল না।
মিতা নিচে দাঁড়িয়ে রইল, হাতে পাখির বাচ্চাটা। রাশেদ ধীরে ধীরে গাছে উঠতে লাগল। ঝড়ের হাওয়ায় গাছ দুলছে, হাত পিছলে যাচ্ছে, তবু সে থামল না।
একসময় সে সেই ফাঁপা জায়গাটার কাছে পৌঁছাল। ভেতরে তাকিয়ে দেখল—আরও দুটো বাচ্চা আছে।
—“এখানে দাও!” সে নিচে চিৎকার করল।
মিতা সাবধানে বাচ্চাটাকে উপরে তুলল। রাশেদ সেটাকে নিয়ে বাসার ভেতরে রাখল।
ঠিক তখনই কাঠঠোকরা পাখিটা তার কাছেই এসে বসে পড়ল। খুব কাছে। এত কাছে যে রাশেদ তার চোখ দেখতে পেল।
পাখিটার চোখে ভয় ছিল, উদ্বেগ ছিল—কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বিশ্বাসও ছিল।
রাশেদের মনে হলো—সে যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে।
ঝড় থেমে যাওয়ার পর তারা দু’জন গাছের নিচে বসে রইল। চারদিকে ঝরে পড়া ফুল। লাল-কমলা রঙে ভরে গেছে মাটি।
মিতা বলল, —“তুমি আজ খুব ভালো কাজ করেছ।”
রাশেদ চুপ করে রইল। তার ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি কাজ করছিল।
—“জানো,” সে বলল, “অনেক দিন পর মনে হচ্ছে আমি কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পেরেছি।”
মিতা মৃদু হাসল, —“তুমি সব সময়ই পারো। শুধু নিজেকে বিশ্বাস করতে হয়।”
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। বসন্ত ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগোতে লাগল। শিমুলগাছের ফুল কমে আসতে লাগল, নতুন পাতা গজাতে শুরু করল।
একদিন বিকেলে রাশেদ গাছের নিচে এসে দেখল—মিতা নেই।
সে অপেক্ষা করল। কিন্তু মিতা এল না।
পরদিনও না।
তৃতীয় দিন সে খোঁজ নিতে গেল। গ্রামের মানুষদের কাছে জানতে পারল—মিতার বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
রাশেদের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—মিতাকে সে কতটা মিস করছে।
সেই রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না। তার মনে হতে লাগল—এই গ্রাম, এই গাছ, এই পাখি—সবকিছু যেন মিতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল—সে শহরে যাবে।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হচ্ছিল—সে যেন আবার সেই পুরোনো জীবনে ফিরে এসেছে। চারদিকে দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা।
সে মিতাকে খুঁজে পেল একটা বেঞ্চে বসে।
—“মিতা,” সে ডাকল।
মিতা তাকাল। তার চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত।
—“তুমি এখানে?” সে অবাক হয়ে বলল।
রাশেদ বলল, —“তোমার খোঁজ নিতে এসেছি।”
মিতা কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।
—“চিন্তা করো না,” রাশেদ বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মিতা মৃদু হাসল, —“তুমিও তো একদিন এটাই বলেছিলে—সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন কি বিশ্বাস করো?”
রাশেদ একটু থেমে বলল, —“হ্যাঁ। এখন করি।”
—“কেন?”
—“কারণ আমি দেখেছি—ঝড়ের পরও গাছে আবার ফুল ফোটে।”
মিতা তাকাল তার দিকে। তার চোখে এবার একটু আলোর ঝিলিক।
কয়েকদিন পর মিতার বাবা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। তারা গ্রামে ফিরে এল।
সেদিন বিকেলে আবার তারা শিমুলগাছের নিচে দাঁড়াল।
গাছটায় এখন আর আগের মতো ফুল নেই। কিন্তু নতুন পাতা এসেছে—তরতাজা সবুজ।
কাঠঠোকরা পাখিটা আবার এসেছে। এবার তার সঙ্গে তিনটা ছোট্ট পাখি—ওর বাচ্চারা।
রাশেদ হাসল, —“ওদের দেখো।”
মিতা বলল, —“ওরা উড়তে শিখছে।”
—“হুম,” রাশেদ বলল, “একদিন ওরাও উড়ে যাবে।”
মিতা বলল, —“সবাইকে একদিন উড়তে হয়।”
রাশেদ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“আমাকেও যেতে হবে।”
মিতা তাকাল, —“শহরে?”
—“হ্যাঁ,” রাশেদ বলল, “আমার জীবনটা আবার শুরু করতে হবে।”
মিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“যাও। কিন্তু মাঝে মাঝে ফিরে আসবে?”
রাশেদ হাসল, —“অবশ্যই।”
বসন্ত শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু রাশেদের জীবনে যেন একটা নতুন ঋতু শুরু হয়েছে।
সে এখন আর আগের মতো ভেঙে পড়া মানুষ নয়। সে জানে—জীবনে ঝড় আসবে, ফুল ঝরে যাবে, কিন্তু আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করা যায়।
আর কোথাও না কোথাও—কোনো এক শিমুলগাছের ডালে—একটা কাঠঠোকরা পাখি তখনও ঠোকর দিয়ে যাবে, জীবনকে থামতে দেবে না।
বসন্তের সেই উদাস দুপুরটা তাই আর শুধু উদাস নয়—সেটা হয়ে উঠেছে নতুন শুরুর গল্প।
– লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

আপনার মতামত লিখুন
Array