খুঁজুন
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

‘বসন্তের কোনো এক উদাস দুপুরে’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ
‘বসন্তের কোনো এক উদাস দুপুরে’

বসন্তের দুপুরগুলো কেমন যেন আলাদা হয়—না গরম, না ঠান্ডা; যেন বাতাসের ভেতরেও একটা নরম ক্লান্তি লেগে থাকে। রোদ থাকে, কিন্তু সেই রোদ ঝলসে দেয় না; বরং মাটির ওপর নরম করে হাত রেখে যায়। এমনই এক দুপুরে, গ্রামের এক প্রাচীন শিমুলগাছের ডালে বসে ছিল একটি কাঠঠোকরা পাখি।

গাছটা ছিল গ্রামের প্রান্তে, পুরোনো পুকুরটার ধারে। শিমুলগাছটি যেন নিজের মতো করে বসন্তকে সাজিয়ে তুলেছিল। তার ডালভরা লাল-কমলা ফুলগুলো দূর থেকে দেখতে আগুনের মতো লাগে। কাছে গেলে বোঝা যায়—ওগুলো আগুন নয়, ওগুলো জীবনের রঙ। আর সেই ফুলের মাঝেই কাঠঠোকরা পাখিটি ঠোঁট দিয়ে আলতো করে ফুল ছুঁয়ে দেখছিল, যেন ফুলের ভেতর লুকোনো মধুর স্বাদ খুঁজছে। এই দৃশ্যটা দেখছিল রাশেদ।

রাশেদ শহর থেকে এসেছে। ঢাকা শহরের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, ধোঁয়া আর দৌড়ঝাঁপের জীবন থেকে সে কয়েক দিনের জন্য মুক্তি নিতে এসেছে তার দাদুর গ্রামে। ছোটবেলায় এখানে অনেকবার এসেছে, কিন্তু তারপর পড়াশোনা, চাকরি—সবকিছু মিলিয়ে এই গ্রাম যেন তার জীবনের বাইরে চলে গিয়েছিল।

কিন্তু এবার সে ফিরে এসেছে—কিছুটা ইচ্ছায়, কিছুটা বাধ্য হয়ে।

তার জীবনে যেন সবকিছু হঠাৎ করে থেমে গেছে। চাকরিতে সমস্যার পর সমস্যা, প্রেম ভেঙে যাওয়া, বন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া—সব মিলিয়ে সে যেন নিজের ভেতরেই আটকে গেছে। শহরের ভিড়ে থেকেও সে একা হয়ে পড়েছিল। তাই হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েই সে চলে আসে এই গ্রামে।

দাদু তাকে দেখে খুশি হয়েছিল, কিন্তু খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। শুধু বলেছিল, —“কিছুদিন থাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রাশেদ তখন বুঝতে পারেনি—কীভাবে সব ঠিক হবে?

সেই উত্তর খুঁজতেই হয়তো আজ সে এই শিমুলগাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। পাখিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাশেদের মনে হলো—পাখিটা যেন কিছু বলতে চায়। তার গায়ে হলুদ, কালো আর সাদা রঙের মিশেল; মাথায় লাল ঝুঁটি—অদ্ভুত সুন্দর। ঠোঁট দিয়ে সে বারবার গাছের ডালে ঠোকর দিচ্ছে, তারপর আবার ফুলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

—“তুই কী খুঁজছিস?” নিজের অজান্তেই বলে উঠল রাশেদ। পাখিটা যেন থেমে তাকাল। সত্যিই কি তাকাল, নাকি শুধু রাশেদের কল্পনা—সে বুঝতে পারল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো, —“ওরা খাবার খোঁজে। গাছের ভেতর থেকে পোকা বের করে খায়।”

রাশেদ ঘুরে তাকাল। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে—মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা, চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি। হাতে একটা বাঁশের ঝুড়ি।
—“তুমি কে?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটা হাসল, —“আমি মিতা। এই গ্রামেই থাকি। তুমি নতুন এসেছ, তাই না?”
রাশেদ মাথা নাড়ল, —“হ্যাঁ। অনেক বছর পর এলাম।”

মিতা শিমুলগাছটার দিকে তাকাল, —“এই গাছটা আমার খুব প্রিয়। বসন্ত এলে আমি প্রায় প্রতিদিন এখানে আসি।”
রাশেদ বলল, —“পাখিটা খুব সুন্দর।”
—“হুম,” মিতা বলল, “ওরা খুব পরিশ্রমী। সারাদিন গাছ ঠোকরায়, খাবার খোঁজে। কখনো থামে না।”
রাশেদ একটু হেসে বলল, —“আমাদের মতো না। আমরা থেমে যাই।”

মিতা তাকাল তার দিকে, —“তুমি থেমে গেছ?”
প্রশ্নটা এত সরাসরি ছিল যে রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“হ্যাঁ, হয়তো। মনে হয় কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না।”

মিতা কিছু বলল না। শুধু শিমুলগাছের একটা ফুল ছিঁড়ে হাতে নিল। ফুলটার দিকে তাকিয়ে বলল, —“দেখো, এই ফুলগুলো কত সুন্দর। কিন্তু এরা খুব অল্প সময় থাকে। তারপর ঝরে যায়।”
—“তাই?” রাশেদ বলল।
—“হ্যাঁ। কিন্তু গাছটা কি দুঃখ পায়? না। আবার নতুন পাতা আসে, নতুন ফুল আসে।”

রাশেদ মৃদু হেসে বলল, —“গাছ তো মানুষ না।”
মিতা মাথা নাড়ল, —“কিন্তু মানুষ গাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।”
সেদিনের পর থেকে রাশেদ প্রায় প্রতিদিন বিকেলে ওই শিমুলগাছের নিচে আসে। আর প্রায় প্রতিদিনই মিতার সঙ্গে দেখা হয়।

মিতা খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু তার কথা গুলো গভীর। সে গ্রামের মানুষ, কিন্তু তার চিন্তাগুলো যেন অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
একদিন রাশেদ তাকে জিজ্ঞেস করল, —“তুমি পড়াশোনা করো?”
—“করতাম,” মিতা বলল, “কলেজ পর্যন্ত। তারপর আর হয়নি।”
—“কেন?”
মিতা একটু থেমে বলল, —“বাবা অসুস্থ। সংসার সামলাতে হয়।”

রাশেদ চুপ করে গেল। শহরে বসে সে অনেক স্বপ্ন দেখেছে—ক্যারিয়ার, টাকা, সফলতা। কিন্তু এখানে এসে সে দেখছে, জীবনের অন্য একটা রূপ আছে—যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই একটা বড় অর্জন।
সেই দিনও কাঠঠোকরা পাখিটা গাছে বসে ছিল। রাশেদ তাকিয়ে বলল, —“ওটা কি প্রতিদিনই আসে?”
—“হ্যাঁ,” মিতা বলল, “ওর বাসা এই গাছেই কোথাও।”
—“ও কখনো ক্লান্ত হয় না?”

মিতা হাসল, —“হয়তো হয়। কিন্তু ও থামে না।”
একদিন দুপুরে হঠাৎ ঝড় উঠল। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। হাওয়া বইতে শুরু করল জোরে। শিমুলগাছটা দুলতে লাগল, ফুলগুলো একে একে ঝরে পড়তে লাগল।

রাশেদ তখন গাছের নিচেই ছিল। সে ভেবেছিল আজ হয়তো মিতা আসবে না। কিন্তু ঠিক তখনই সে দেখল—মিতা দৌঁড়ে আসছে।
—“এই ঝড়ে তুমি এখানে কেন?” রাশেদ চিৎকার করে বলল।
—“গাছটা দেখতে!” মিতা বলল, “ঝড়ে অনেক ডাল ভেঙে যায়।” হঠাৎ একটা বড় ডাল ভেঙে পড়ে গেল মাটিতে। রাশেদ চমকে উঠল।

ঝড়ের শব্দের ভেতরেও সে একটা কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পেল। মাটিতে পড়ে থাকা ডালের পাশে একটা ছোট্ট পাখির বাচ্চা কাঁপছে।
—“দেখো!” রাশেদ বলল।
মিতা দৌঁড়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে তুলে নিল, —“এটা কাঠঠোকরার বাচ্চা।”
রাশেদের বুকটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল। সে উপরে তাকাল—গাছের ডালে সেই কাঠঠোকরা পাখিটা অস্থির হয়ে উড়ছে।

—“এখন কী করব?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মিতা বলল, —“ওকে আবার বাসায় তুলতে হবে।”
—“কিন্তু বাসা কোথায়?”
মিতা চারদিকে তাকাল। তারপর গাছের একটা ফাঁপা অংশ দেখিয়ে বলল, —“ওখানে।”
—“ওটা তো অনেক উঁচু!”
—“তবু চেষ্টা করতে হবে।”

রাশেদ কখনো গাছে ওঠেনি। শহরের মানুষ হিসেবে তার জীবনে গাছে ওঠার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আজ সে দ্বিধা করল না।
মিতা নিচে দাঁড়িয়ে রইল, হাতে পাখির বাচ্চাটা। রাশেদ ধীরে ধীরে গাছে উঠতে লাগল। ঝড়ের হাওয়ায় গাছ দুলছে, হাত পিছলে যাচ্ছে, তবু সে থামল না।

একসময় সে সেই ফাঁপা জায়গাটার কাছে পৌঁছাল। ভেতরে তাকিয়ে দেখল—আরও দুটো বাচ্চা আছে।
—“এখানে দাও!” সে নিচে চিৎকার করল।
মিতা সাবধানে বাচ্চাটাকে উপরে তুলল। রাশেদ সেটাকে নিয়ে বাসার ভেতরে রাখল।
ঠিক তখনই কাঠঠোকরা পাখিটা তার কাছেই এসে বসে পড়ল। খুব কাছে। এত কাছে যে রাশেদ তার চোখ দেখতে পেল।

পাখিটার চোখে ভয় ছিল, উদ্বেগ ছিল—কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বিশ্বাসও ছিল।
রাশেদের মনে হলো—সে যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে।

ঝড় থেমে যাওয়ার পর তারা দু’জন গাছের নিচে বসে রইল। চারদিকে ঝরে পড়া ফুল। লাল-কমলা রঙে ভরে গেছে মাটি।
মিতা বলল, —“তুমি আজ খুব ভালো কাজ করেছ।”
রাশেদ চুপ করে রইল। তার ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি কাজ করছিল।

—“জানো,” সে বলল, “অনেক দিন পর মনে হচ্ছে আমি কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পেরেছি।”
মিতা মৃদু হাসল, —“তুমি সব সময়ই পারো। শুধু নিজেকে বিশ্বাস করতে হয়।”
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। বসন্ত ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগোতে লাগল। শিমুলগাছের ফুল কমে আসতে লাগল, নতুন পাতা গজাতে শুরু করল।
একদিন বিকেলে রাশেদ গাছের নিচে এসে দেখল—মিতা নেই।
সে অপেক্ষা করল। কিন্তু মিতা এল না।
পরদিনও না।

তৃতীয় দিন সে খোঁজ নিতে গেল। গ্রামের মানুষদের কাছে জানতে পারল—মিতার বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

রাশেদের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—মিতাকে সে কতটা মিস করছে।
সেই রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না। তার মনে হতে লাগল—এই গ্রাম, এই গাছ, এই পাখি—সবকিছু যেন মিতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল—সে শহরে যাবে।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হচ্ছিল—সে যেন আবার সেই পুরোনো জীবনে ফিরে এসেছে। চারদিকে দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা।
সে মিতাকে খুঁজে পেল একটা বেঞ্চে বসে।
—“মিতা,” সে ডাকল।
মিতা তাকাল। তার চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত।
—“তুমি এখানে?” সে অবাক হয়ে বলল।
রাশেদ বলল, —“তোমার খোঁজ নিতে এসেছি।”
মিতা কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।
—“চিন্তা করো না,” রাশেদ বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে।”

মিতা মৃদু হাসল, —“তুমিও তো একদিন এটাই বলেছিলে—সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন কি বিশ্বাস করো?”
রাশেদ একটু থেমে বলল, —“হ্যাঁ। এখন করি।”
—“কেন?”
—“কারণ আমি দেখেছি—ঝড়ের পরও গাছে আবার ফুল ফোটে।”
মিতা তাকাল তার দিকে। তার চোখে এবার একটু আলোর ঝিলিক।
কয়েকদিন পর মিতার বাবা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। তারা গ্রামে ফিরে এল।
সেদিন বিকেলে আবার তারা শিমুলগাছের নিচে দাঁড়াল।
গাছটায় এখন আর আগের মতো ফুল নেই। কিন্তু নতুন পাতা এসেছে—তরতাজা সবুজ।
কাঠঠোকরা পাখিটা আবার এসেছে। এবার তার সঙ্গে তিনটা ছোট্ট পাখি—ওর বাচ্চারা।

রাশেদ হাসল, —“ওদের দেখো।”
মিতা বলল, —“ওরা উড়তে শিখছে।”
—“হুম,” রাশেদ বলল, “একদিন ওরাও উড়ে যাবে।”
মিতা বলল, —“সবাইকে একদিন উড়তে হয়।”
রাশেদ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“আমাকেও যেতে হবে।”
মিতা তাকাল, —“শহরে?”
—“হ্যাঁ,” রাশেদ বলল, “আমার জীবনটা আবার শুরু করতে হবে।”
মিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“যাও। কিন্তু মাঝে মাঝে ফিরে আসবে?”
রাশেদ হাসল, —“অবশ্যই।”

বসন্ত শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু রাশেদের জীবনে যেন একটা নতুন ঋতু শুরু হয়েছে।
সে এখন আর আগের মতো ভেঙে পড়া মানুষ নয়। সে জানে—জীবনে ঝড় আসবে, ফুল ঝরে যাবে, কিন্তু আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করা যায়।
আর কোথাও না কোথাও—কোনো এক শিমুলগাছের ডালে—একটা কাঠঠোকরা পাখি তখনও ঠোকর দিয়ে যাবে, জীবনকে থামতে দেবে না।

বসন্তের সেই উদাস দুপুরটা তাই আর শুধু উদাস নয়—সেটা হয়ে উঠেছে নতুন শুরুর গল্প।

– লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

ফরিদপুরে শিক্ষকদের বহনকারী মাইক্রোবাসে ‘গুলির মতো’ আঘাত, ভাঙল কাঁচ—চরম আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৪১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে শিক্ষকদের বহনকারী মাইক্রোবাসে ‘গুলির মতো’ আঘাত, ভাঙল কাঁচ—চরম আতঙ্ক

ফরিদপুরে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষকদের বহনকারী একটি মাইক্রোবাসে ‘শর্টগানের গুলির মতো’ আঘাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসটির পেছনের কাঁচ ভেঙে যায় এবং কাঁচের টুকরো ভেতরে থাকা শিক্ষকদের ওপর ছিটকে পড়ে। যদিও কেউ গুরুতর আহত হননি, তবে আকস্মিক এই ঘটনায় শিক্ষকরা চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েন।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর শহরের চাঁনমারি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় মাইক্রোবাসটিতে রাজেন্দ্র কলেজের একাধিক শিক্ষক শহর ক্যাম্পাস থেকে বায়তুল আমান ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান, চাঁনমারি ঈদগাঁ মোড় অতিক্রম করার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। মুহূর্তের মধ্যেই মাইক্রোবাসটির পেছনের কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। পরে কাঁচে গুলির মতো একটি চিহ্ন দেখা যায়, যা দেখে তারা ধারণা করছেন এটি কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি হতে পারে।

মাইক্রোবাসে থাকা এক শিক্ষক বলেন, “ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটেছে যে আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাঁচ ভেঙে ভেতরে পড়ে। আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। প্রথমে মনে হয়েছিল বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

আরেকজন শিক্ষক জানান, “আমরা নিয়মিত এই পথে যাতায়াত করি। এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এটি পরিকল্পিত নাকি আকস্মিক—তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।”

এ বিষয়ে রাজেন্দ্র কলেজ শিক্ষক সমিতির সম্পাদক মো. শাহিনুল ইসলাম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “ঘটনার বিষয়টি আমি জেনেছি এবং ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা জরুরি বৈঠক ডেকে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করব।”

কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এস.এম. আব্দুল হালিম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে শর্টগানের গুলির মতো মনে হচ্ছে। তবে নিশ্চিত হতে তদন্ত প্রয়োজন। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

এদিকে কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে জানান, “ঘটনার বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: বাড়তি চাপে মধ্য-নিম্নবিত্ত

দেলোয়ার হোসেন বাদল
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: বাড়তি চাপে মধ্য-নিম্নবিত্ত

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পরপরই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জনজীবনে। জ্বালানির দাম বাড়ানোর একদিন পরেই আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোয় নতুন করে চাপে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।

অন্যদিকে পরিবহন খাতের চালকরা বলছেন, খরচ সামলাতে ভাড়া সমন্বয় ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়ের চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপের কারণে সরকার তেলের দাম সমন্বয় করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তাছাড়া জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির চাপ বাড়ছিল।

সেই চাপ সামাল দিতে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কথা হয় নানা পেশার মানুষের সঙ্গে।

তারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই প্রথমে বাড়ে পরিবহন ভাড়া, এরপর ধাপে ধাপে বাড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। কিন্তু সেই তুলনায় আয় বাড়ে না।
রাজধানীর দোলাইপাড় এলাকার স্থানীয় মোটর পার্টস বিক্রেতা রুবেল বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির খবর আসতেই নিত্যপণ্যের দামসহ নানা রকম জিনিসের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ইচ্ছে করলেই আমরা আমাদের পণ্যের দাম বা কাজের মূল্য হঠাৎ করে বাড়াতে পারি না। ফলে আমাদের মতো মানুষের জীবিকা নির্বাহ করা দুষ্কর হয়ে পড়ে।

ওয়ারী এলাকার এক শিক্ষার্থী বলেন, তেলের দাম যদি বাড়াতেই হতো তাহলে এখন কেন? এখন তো বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমানো হয়েছে। আগে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়ে পর্যাপ্ত তেল বাজারে ছাড়লে সরকারের আয় হতো। হাজার হাজার মানুষকে দীর্ঘ লাইনে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেলের জন্য কষ্ট করতে হতো না। এটা জনগণের সঙ্গে মশকরা ছাড়া কিছু না।

মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের মতো চাকরিজীবীদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। প্রতিবার তেলের দাম বাড়লে অফিসে যাতায়াত খরচ বাড়ে, বাজার খরচ বাড়ে। কিন্তু বেতন তো বাড়ে না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর জুরাইন আশ্রাফ মাস্টার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা আক্তার বলেন, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়ার পরই আমরা চাপে ছিলাম। এখন আবার তেলের দাম বাড়ানোয় দৈনন্দিন খরচ কীভাবে সামলাবো, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

শ্যামপুর জুরাইন বাজারে সবজি কিনতে আসা গৃহিণী মুসফিকা সুলতানা বলেন, তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে আর পরিবহন খরচ বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়ে। বাজারে এলেই এখন ভয় লাগে।

এদিকে কৃষি খাতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন কেরানীগঞ্জের কৃষক মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ খরচ বাড়ে, জমি চাষের খরচ বাড়ে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু আমরা সেই অনুযায়ী ফসলের দাম পাই না।

অন্যদিকে পরিবহন চালকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তাদেরও খরচ বেড়ে যায়, ফলে ভাড়া সমন্বয় করা ছাড়া উপায় থাকে না।

রাজধানীতে চলাচল করা রাইদা বাসের চালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তেলের দাম বাড়লে আমাদের দৈনিক খরচ অনেক বেড়ে যায়। মালিককে জমা দিতে হয় আগের মতোই। তাই ভাড়া না বাড়ালে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়।

অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং চালক মো. সোহেল রানা বলেন, তেলের দাম বাড়লে আমাদের আয় কমে যায়। যাত্রীরা যদি ভাড়া বাড়াতে না চান, তাহলে আমরা কীভাবে গাড়ির খরচ চালাব?

একই ধরনের কথা বলেন সিএনজি অটোরিকশাচালক মো. হেলাল উদ্দিন। তার ভাষ্য, গ্যাস আর তেলের দাম বাড়লে আমাদের ওপর চাপ পড়ে। তখন যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া না নিলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি ধাপে ধাপে কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলে। ফলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর।

তারা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি গণপরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি জোরদার এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমতে পারে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও বাণিজ্য বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুলের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতির এই সময়ে সরকার এখনো নিজ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে দেশে সরবরাহ করছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমেছে, ফলে দাম বেড়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় অতিরিক্ত দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশের সার কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ শিল্প খাতের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এই বিশ্লেষক বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দিতে সরকার উন্নয়ন সহযোগী ও বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ঋণ সহায়তা চেয়েছে। তবে দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ে অনিশ্চয়তা থাকায় সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পথে হাঁটতে হয়েছে।

মোবাশ্বের হোসেন টুটুলের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যয় ও পণ্য পরিবহন খরচ বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে পণ্যের দামে। এতে নির্দিষ্ট আয়ের সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে যেতে পারে, যা ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তৈরি করতে পারে। এতে বিনিয়োগের গতি কমে গিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে উৎপাদন কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আদায়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে পারলে তা সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, স্বল্পমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় সরকার যদি কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি সমন্বয় করতে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে এই মূল্য সমন্বয়ের ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

ফরিদপুরে প্লাস্টিক ও কাপড়ে মোড়ানো ছিল অজ্ঞাত ভ্রূণের লাশ

সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্লাস্টিক ও কাপড়ে মোড়ানো ছিল অজ্ঞাত ভ্রূণের লাশ

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় প্লাস্টিকের কাগজ ও কাপড়ে মোড়ানো ৫ মাস বয়সী গর্ভপাতকৃত এক অজ্ঞাত ভ্রূণের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজার সংলগ্ন একটি ব্রিজের নিচে, মজিবর শেখের বাড়ির সামনে কুমার নদের পাড় থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্লাস্টিক ও কাপড়ে মোড়ানো একটি সন্দেহজনক বস্তু দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা বিষয়টি সালথা থানা পুলিশকে জানায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেটি উদ্ধার করে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান জানান, কে বা কারা ভ্রূণটি সেখানে ফেলে গেছে তা এখনও জানা যায়নি। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় গোলপাড়া মাদ্রাসা কবরস্থানে ভ্রূণটির দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।