‘নিস্তব্ধ রাতের হুতোমপেঁচা’
গভীর রাত। চারপাশে নেমে এসেছে এক রহস্যময় নিস্তব্ধতা। দিনের কোলাহল থেমে গেছে বহু আগেই। গ্রামের ছোট ছোট ঘরগুলো অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু কোথাও কোথাও কুপি বাতির ক্ষীণ আলো টিমটিম করে জ্বলছে। পাখিদের কিচিরমিচির নেই, নেই শিশুদের হাসির শব্দও। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী যেন ঘুমিয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত শান্তির চাদরে।
দূরের বন থেকে হঠাৎ ভেসে এলো শেয়ালের দীর্ঘ হাঁক। শব্দটা রাতের নীরবতাকে আরও গভীর করে তুললো। ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক যেন রাতের বুক চিরে বয়ে চলেছে। বাতাসে লেবু ফুলের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। বাড়ির পেছনের পুরোনো লেবুগাছটার নিচে পড়ে আছে শুকনো পাতা। ঠিক তখনই কোথা থেকে একটি হুতোমপেঁচা ডানা মেলে উড়ে এসে গাছের মোটা ডালে বসলো। তার গোল গোল চোখ অন্ধকার ভেদ করে তাকিয়ে আছে চারপাশে।
রহিম মিয়া বারান্দায় বসে ছিলেন চুপচাপ। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, কিন্তু ঘুম এখন আর সহজে আসে না তার চোখে। কয়েক বছর আগে এই রাতেই তার স্ত্রী আয়েশা পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তারপর থেকে গভীর রাত হলেই তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।
হুতোমপেঁচার ডাক শুনে তার মনে পড়ে গেল সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা। আয়েশা প্রায়ই বলতেন, “রাত যত গভীর হয়, মানুষের মন তত সত্য কথা বলে।” রহিম মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন মেঘের ফাঁক দিয়ে আধখানা চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে উঠোনের ধুলো মাটিতে।
হঠাৎ হালকা বাতাস বয়ে গেল। লেবুগাছের পাতাগুলো কেঁপে উঠলো। রহিম মিয়ার মনে হলো, যেন আয়েশা খুব কাছে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো।
রাত আরও গভীর হলো। ঝিঁঝি পোকার ডাক, দূরের শেয়ালের হাঁক আর হুতোমপেঁচার নিঃশব্দ উপস্থিতি মিলে সেই নিস্তব্ধ রাত যেন রহিম মিয়ার একাকী জীবনের গল্প শুনতে লাগলো। আর তিনি চুপচাপ বসে রইলেন—স্মৃতি, ভালোবাসা আর হারিয়ে ফেলা মানুষটির মায়া বুকে নিয়ে।
লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

আপনার মতামত লিখুন
Array