‘শহরের ফেলে দেওয়া খাবারই যার বেঁচে থাকার ভরসা!’
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে আটটা ছুঁইছুঁই। শহরের ব্যস্ততা তখনও থামেনি। ফরিদপুর শহরের রাস্তাজুড়ে গাড়ির হেডলাইট ছুটে যাচ্ছে একটার পর একটা। দখিনা বাতাসে গরমের ক্লান্তি কিছুটা কমলেও শহরের কোলাহল যেন থামার নাম নেই। দোকানের সামনে মানুষের ভিড়, চায়ের কাপে ধোঁয়া, দূরে কোথাও ভেসে আসছে ভাজাপোড়ার গন্ধ। অথচ সেই একই শহরের এক কোণে, ফরিদপুর জেলা কারাগারের উঁচু দেয়ালের পাশে বসে ছিল এক বৃদ্ধ—নীরব, অবহেলিত, একাকী।
ষাটোর্ধ্ব সেই মানুষটির গায়ে মলিন একটি ছেঁড়া শার্ট। ধুলোমাখা লুঙ্গিটা হাঁটুর কাছে গুটানো। পাশে রাখা একটি পুরোনো বাঁশের টোপলা। মনে হচ্ছিল, সারাদিন হয়তো শহরের অলিগলি ঘুরে কিছু কুড়িয়ে বেড়িয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে লেগেছিল তার হাতে থাকা সেই পঁচা আমটি।
একটি নোংরা কাগজের ওপর রেখে তিনি আমটি খাচ্ছিলেন। না, খাওয়া নয়—চেটে চেটে শেষ রসটুকু তুলে নিচ্ছিলেন। যেন ওই আমটিই তার জীবনের শেষ খাবার। আমি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম, মানুষটা হয়তো লজ্জা পাবে, কিংবা চোখ তুলে তাকাবে। কিন্তু না—তার কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। পৃথিবী যেন তাকে দেখার প্রয়োজনই বোধ করে না, সেও পৃথিবীর দিকে তাকানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
হঠাৎ মনে হলো, কতটা ক্ষুধার্ত হলে একজন মানুষ পঁচা আমের মধ্যেও খাবার খুঁজে নেয়!
আমি ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বৃদ্ধ একবার তাকালেন। সেই চোখে ছিল না কোনও অভিযোগ, না কোনও প্রত্যাশা। ছিল শুধু দীর্ঘদিনের ক্লান্তি। এমন ক্লান্তি, যা শুধু শরীরের নয়—জীবনের।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, কিছু খেয়েছেন?”
তিনি মৃদু হাসলেন। দাঁতহীন মুখে সেই হাসি যেন আরও বেশি কষ্টের লাগছিল। খুব আস্তে বললেন,
“বাবা, পেট যখন জ্বলে, তখন পঁচা আমও মিষ্টি লাগে।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। শহরের আলো তখনও ঝলমল করছিল। দামি গাড়িগুলো পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল দ্রুতগতিতে। হয়তো সেই গাড়ির ভেতরে বসে কেউ রাতের খাবারের মেনু নিয়ে ব্যস্ত। আর এই বৃদ্ধ—একটু খাবারের জন্য পঁচা আম চেটে খাচ্ছেন।
আমরা কত সহজেই খাবার ফেলে দিই। একটু বাসি হলেই ডাস্টবিনে ছুঁড়ে মারি। অথচ এই পৃথিবীতেই কেউ কেউ সেই ফেলে দেওয়া খাবার কুড়িয়ে জীবন বাঁচায়।
সেদিন ফরিদপুর জেলা কারাগারের দেয়ালের পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটিকে দেখে মনে হয়েছিল—কারাগারের ভেতরে বন্দি যারা, তারা হয়তো শাস্তি ভোগ করছে। কিন্তু দেয়ালের বাইরে এই মানুষগুলো? এরা তো প্রতিদিন ক্ষুধা, অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি হয়ে বেঁচে আছে।
লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

আপনার মতামত লিখুন
Array