খুঁজুন
শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ১ চৈত্র, ১৪৩২

‘আব্বাকে খুব মনে পড়ে’

হারুন আনসারী রুদ্র
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৪ এএম
‘আব্বাকে খুব মনে পড়ে’

খুব ছোটবেলায় ভোররাতে মসজিদে ফজরের আজান হয়েছে কেবল। বাসায় বিছানায় উদোম গায়ে শুয়ে ছিলাম সুখনিদ্রায়। হঠাৎ সারা গায়ে হাত বুলানো আদরের পরশ পেলাম। দরদমাখা কণ্ঠে আব্বা বললেন, ‘আহারে, আমার আব্বার একটি গেঞ্জিও নেই গায়ে।’ কথাটি শুনে আমার মাঝে ভালোবাসার কী যেন এক শিহরণ খেলে গেল সারা শরীরে। পিতৃস্নেহের এই স্মৃতি এখনও আমাকে নাড়া দেয়। আমার আব্বার এমন অসংখ্য স্মৃতিতে জড়ানো আমার এ জীবন।

আমার পিতা মওলানা মুয়ীনউদ্দীন আহমেদ তালুকদার (লুৎফুল্লাহ)। পেশায় আইনজীবী ছিলেন। ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ জন্মগ্রহণ করে ১৯৯৮ সালের ১২ মার্চ দিবাগত রাতে ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। আপন রাসুলের মতো জন্ম-মৃত্যুর এমন সাদৃশ্য নিয়ে এসেছিলেন তিনি পৃথিবীতে। মৃত্যুর পরেও গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন তাঁর কর্মময় জীবনের মাধ্যমে।

আজ ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

আব্বা জন্মগ্রহণ করেন তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার কাশিয়ানী থানার মাজড়া ভাট্টাইধোবা গ্রামে। শৈশবে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রকালে মাত্র ৯ বছর বয়সে জন্মদাতা পিতা আব্দুল হামিদ তালুকদারকে হারিয়ে তিনি এতিম হন। নিজের অক্লান্ত প্রচেষ্টা আর মমতাময়ী মায়ের (আমার দাদি) দোয়ায় তিনি সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে কৃতিত্বের সাথে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের পথপরিক্রমাটি ছিল কঠিন আর বন্ধুর। পড়াশোনার খরচ জোগাতে দিনের বেলায় সরকারি চাকরি আর রাতের বেলায় নাইট শিফটে কলেজ করে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন।

একেবারে শৈশবে ফ্রি প্রাইমারি আর পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ষষ্ঠ হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাসের প্রথম রোলধারী ছাত্র হয়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ লাভ করেন। এ কারণে স্কুল শিক্ষকদের বিশেষ নজর ও ভালোবাসা ছিল তাঁর প্রতি। তাঁদের আন্তরিকতায় কৃতিত্বের সাথে ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়ার অদম্য বাসনা নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানীতে। আইএ পাস করার পর এলজি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান সরকারি প্রেসে। এ সময় সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি কর্মস্থলের অনুমোদন নিয়ে জগন্নাথ কলেজে নাইট শিফটে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৫৫-৫৭ সালে বিএ এবং ১৯৫৯-৬১ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হল হতে এলএলবি পাস করেন।

১৯৬৪ সালে ফরিদপুর জেলা আইনজীবী সমিতি এবং ১৯৬৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট অ্যাপিলিয়েট ডিভিশনে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি আরবি মাধ্যমেও মওলানা পাস করেছিলেন।

তরুণ বয়স থেকেই আব্বা কঠোর পরিশ্রমী ও উদ্যমী ছিলেন। নিজ গ্রামে মাজড়া ভাট্টাইধোবা তালুকদার পাড়া ফতেহ আলী মসজিদ ও ঈদগাহ পুনর্গঠনে তিনি নেতৃত্ব দেন। সভাপতি হিসেবে তিনি ঈদগাহ ও মসজিদ সংস্কারের পর সেখানে মেয়েদের জন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভাট্টাইধোবা ছোটখাঁরকান্দি শামসুল উলুম হাফেজিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। বেতনভুক্ত তিনজন স্থায়ী শিক্ষক এবং ফুরকানিয়া বিভাগে ১৫০ জন ও হাফেজি বিভাগে ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মঞ্জুরি লাভ করে। ১৯৬৪ সালে তিনি নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাজড়া ভাট্টাইধোবা জনকল্যাণ সমিতি’, রেজিস্ট্রেশন নং- ১২৯৫/১৯৬৪। এছাড়া সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি পূর্ব খাবাসপুর লঞ্চঘাট জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি ছিলেন।

১৯৭০ সালের মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষকদের অবিরাম ধর্মঘটের ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে সৃষ্ট অচলাবস্থার নিরসনে ওই বছরের ২৬ মার্চ বিকেল ৩টায় ফরিদপুর জেলা সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দের আহ্বানে শহরের অম্বিকা ময়দানে বিরাট জনসভা হয়। তৎকালীন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি খান বাহাদুর মো. ইসমাইল, সম্পাদক কাজী খলিলুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আদেলউদ্দিন আহমেদ, ইমামউদ্দিন আহমেদ, ইত্তেহাদুল উলামা পার্টির খোন্দকার মাওলানা মোহাম্মদ মাওলানা মোবারক আলী, মিয়া মোহন, চিকিৎসক সমিতির ডা. এমএ জাহেদ, ছাত্রলীগের সভাপতি নাসিরুদ্দিন আহমেদ মুসা, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোজাম্মেল হকসহ ফরিদপুরের সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ওই সভায় বক্তৃতা করেন। আব্বা ছিলেন ওই জনসভার অন্যতম একজন বক্তা। ১৯৯০ সালে আব্বার সভাপতিত্বে ফরিদপুরের থানারোডে স্মরণকালের বৃহৎ তাফসির মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ৮৬’র জাতীয় নির্বাচনে তিনি ফরিদপুর-১ আসনে হাফেজ্জি হুজুর সমর্থিত ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ইসলামী ঐক্য আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির ছিলেন তিনি। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম ইসলামী চিন্তাবিদ ও অসংখ্য গ্রন্থের প্রণেতা মাওলানা আব্দুর রহিম সাহেবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন।
ইংরেজিতে তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনায় নির্ভুল ইংরেজিতে লেখা তাঁর আরজির বিশেষ খ্যাতি ছিল। অনেক আইনজীবীকে দেখতাম তাঁর নিকট থেকে জটিল মামলার আরজি লিখে নিতেন।

একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি অসহায়ের সহায়, গরিবের বন্ধু ছিলেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অসহায় মানুষ সহায়-সম্বল ভিটেমাটি হাতছাড়া হয়ে তাঁর নিকট আসতেন সেগুলো পুনরুদ্ধারের আশায়। সকাল হতে রাত অবধি নানা সময়ে মক্কেলদের পাশাপাশি অনেক সমস্যাগ্রস্ত ও সাহায্যপ্রার্থীকে দেখতাম আব্বার কাছে আসতে। এমনও অনেক গরিব মক্কেলকে দেখেছি, যাদের জন্য আব্বা গাঁটের টাকা খরচ করে বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করে দিয়েছেন। আগের দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো ছিল না। দূর-দূরান্ত থেকে মামলার কাজে শহরে আসা গরিব মানুষগুলো উকিলের টাকাই দিতে পারত না। উপরন্তু টাকা খরচ করে তাদের পক্ষে শহরের হোটেলে থাকা ও খাওয়া ছিল অসম্ভব ব্যাপার। এইসব মুসাফির মক্কেলদের জন্য আব্বা নিজ খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন। এমনকি আমাদের জন্য আম্মার রান্না করা খাবার পরিবেশন করে দিতেন অসহায় মক্কেলদের জন্য। অনেককে নিজের কাঁথা-বালিশ দিয়ে রাতযাপনের ব্যবস্থা করে দিতেন। একবার জজ কোর্টে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে হাইকোর্ট থেকে খালাস দেওয়ার পর উচ্ছ্বসিত সেই লোক আব্বাকে ধর্মপিতা বলে সম্বোধন করেছিলেন। এমন অনেক সুখকর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অসহায় মানুষের স্বার্থে আদালতে মামলা পরিচালনার পাশাপাশি তাঁদের প্রকৃত অবস্থা জানতে সরেজমিনে ছুটে যেতেন প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে। ছুটির দিনে কখনো আমাকেও সঙ্গে নিতেন। সেই থেকে আব্বার চরিত্রের এই দিকগুলো আমার মানসপটে এখনো স্মৃতি হয়ে আছে। এভাবে চলার পথে আব্বার হাত ধরে জীবনের প্রথম অনেক কিছু দেখেছি ও শিখেছি। প্রথম রেলে চড়ার অভিজ্ঞতাও আব্বার হাত ধরেই। মনে পড়ে, সে সময়ে ভাটিয়াপাড়া-রাজবাড়ী রুটে চলাচলরত ট্রেন মাঝেমধ্যে লাইনচ্যুত হয়ে পড়ত। একদিন ব্যাসপুর স্টেশনে ট্রেনের জন্য মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর আব্বা আমাকে নিয়ে রাতযাপনের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন পাশের এক পরিচিত মক্কেলের বাড়িতে। সেই মাঝরাতে আব্বাকে বাড়িতে পেয়ে তখনই বাড়ির কর্তা মোরগ জবাই করে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করেন। এসবই এখন হারানো স্মৃতি।

আমাকে জীবনের প্রথম কবিতার বই উপহার দিয়েছিলেন আমার আব্বা। জেলা জজ আদালতের লাল ভবনের দক্ষিণ পাশের সেই মেহেদি গাছ ঘেরা নয়নাভিরাম ফুলের বাগানের মাঝে প্রতি বছরের ১লা বৈশাখে সকালে অনুষ্ঠানের আয়োজন করত জেলা আইনজীবী সমিতি। আব্বার সাথে ছোটবেলায় বেশ ক’বার গিয়েছি সে অনুষ্ঠানে। একবার ফরিদপুরের দায়রা জজ সাহেব একটি কবিতার বই লিখে প্রকাশ করেছিলেন। ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে পাওয়া সেই বইটি আব্বা আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। এরপর একদিন উৎসাহ দিয়েছিলেন একটি কবিতা লেখার জন্য। সেটি ছিল আমার প্রথম কবিতা লেখা। ধর্মপ্রাণ এই মুসলমানের মধ্যে আমি কোনো প্রকার কুসংস্কার বা গোঁড়ামি দেখিনি। সামাজিক বন্ধন অটুট রাখতে প্রতি বছর পূজার সময় আমাকে হাত ধরে নিয়ে যেতেন ঝিলটুলী মহল্লার হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন প্রবীণ আইনজীবী স্বর্গীয় গৌর চন্দ্র বালা কাকার বাড়িতে। অবশ্য পূজার প্রতিমা দেখতে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সবসময়ই নিরুৎসাহিত ও নিষেধ করেছেন।
দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের কঠোর অনুশীলন করতেন তিনি। চকবাজার জামে মসজিদ ও পূর্ব খাবাসপুর লঞ্চঘাট জামে মসজিদে নিয়মিত তাফসির করতেন। আমাদের লঞ্চঘাট জামে মসজিদে ঈদের দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করতেন। বাসা কিংবা মসজিদে তাঁকে দেখেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুসল্লিদের নিয়ে তাফসিরে নিবিষ্ট থাকতে। গতানুগতিক রাজনীতিকে সমর্থন করতেন না। গ্রামের মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি, একবার গ্রামে ভোটাভুটির জন্য বিরাট সভা হলে আব্বা বলেছিলেন, কেউ নিজে থেকে আগ্রহী হয়ে প্রার্থী হবে না; বরং গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে যাকে প্রার্থী করবেন তিনিই হবেন সকলের প্রার্থী।
আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটি ছিলেন মানবদরদী, সদালাপী, ত্যাগী ও সদাশয় বিনয়ী আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। শিরক ও বিদ’আতমুক্ত ধর্মচর্চার অনুশীলন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

দুনিয়াবি লোভ-লালসা কিংবা ক্ষমতার মোহ তাঁর জীবনে স্থান পায়নি কোনোদিন। নরম বিছানা, আরাম-আয়েশকে পরিহার করে সাদামাটা পাক-পবিত্র জীবনযাপন অবলম্বন করেছেন আমৃত্যু। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সারাটি জীবন কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় করে গেছেন। শেষ জীবনে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হাসপাতালের বেডে অসুস্থ থাকাবস্থাতেও তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করেছেন। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকার সমাজকে আলোকিত করতে, গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, দুস্থ আত্মীয়-স্বজনের কষ্ট লাঘবের বিষয়কে তিনি আপন পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। কখনোই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি; সদা সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে আমি এমন একটি পরিচিত মুখ পাইনি যিনি তাঁর কর্মজীবনের প্রশংসার বাইরে কখনো দুর্নাম করেছেন। রক্তের বন্ধনের বাইরে এসব মানুষকে তাঁর জন্য হৃদয় থেকে দোয়া করতে দেখেছি। আজও তেমন কারো সাথে দেখা হলে একইভাবে আব্বার প্রশংসা শুনি। একজন সন্তান হিসেবে আমার জন্য এটিই পরম সৌভাগ্যের প্রাপ্তি। আব্বার রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে এটিই আমার নিকট সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে পরিগণিত।

ছোটবেলায় শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতাম আরামের ঘুম ছেড়ে আব্বা তাহাজ্জুতের নামাজ আদায় করছেন। এরপর ফজরের নামাজ পড়ে দীর্ঘ সময় কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করতেন। আমাদের কোরআন শেখা আব্বার হাতেই। মামলার কাজে মক্কেলরা বাসায় এলে তাদেরও কোরআন শোনাতেন, ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। সকালে কোর্টে গিয়ে সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বাসায় ফিরে বিকেলে আবারও একইভাবে কোরআন শরিফ নিয়ে তেলাওয়াত করতে বসতেন তিনি। কোরআন তেলাওয়াত কিংবা ধর্মীয় বইপুস্তক পাঠের বাইরে কখনো বেহুদা অবসর কাটাতে দেখিনি তাঁকে। আমাদেরও তিনি নিয়মিত তাগিদ দিতেন নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতের বিষয়ে।

মনে পড়ে, ছোটবেলায় কোনোদিনই ফজরের আজানের পর আব্বা আমাদের বিছানায় ঘুমাতে দিতেন না। যেভাবেই হোক ডেকে তুলতেন। প্রথমে আদর করতেন; না উঠলে পেটাতেন। নামাজ পড়তে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। কোর্টের কাজে ঢাকা গেলে ফেরার সময় বায়তুল মোকাররম হতে নবী-রাসুলদের জীবনীভিত্তিক বইপুস্তক এনে আমাদের উপহার দিতেন। গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.), কবি ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা, কবি কাদির নেওয়াজসহ সমাজ সংস্কারক অন্যান্য লেখকদের লেখা পড়ে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম ছোটবেলা থেকেই। এটি ছিল আমার জন্য দারুণ উপভোগ্য। বাড়িতে বাংলা-ইংরেজি পেপার রাখতেন; স্থানীয় পত্রিকাও রাখতেন। এছাড়া ছোটবেলায় যখন আমার ওপর নামাজ ফরজ হয়নি, তখন নামাজের প্রতি উৎসাহ দিতে প্রতি ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য আমাকে পুরস্কৃত করতেন।

মহান আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ী তাঁর জীবনসঙ্গিনী আমার জন্মদাত্রী আম্মাকেও দেখেছি সাংসারিক কাজের সাথে গুরুত্বের সাথে ধর্মপালনে। জাঁকজমকপূর্ণ লোকদেখানো ইবাদতকে তাঁরা দু’জনেই পরিহার করেছেন সবসময়। বরং ফরজ ইবাদতের বাইরে সন্তর্পণে নফল ইবাদতে নিজেদের নিবিষ্ট রেখে মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে রোনাজারি করেছেন। তাঁদের দু’জনকে দেখে আমার সুরা নূরের ওই আয়াতটির কথাই মনে পড়ে শুধু, যেখানে মহান রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন সচ্চরিত্র পুরুষ স্ত্রী হিসেবে পাবে সচ্চরিত্র নারীকে। আব্বার মতো আম্মাকেও দেখতাম শেষ রাতে আরামের ঘুম হারাম করে কোরআন তেলাওয়াত করতে। সুরা ইয়াসিন পাঠের সময় যখন ‘সালামুন কাওলাম মির-রাব্বির রাহিম’ এই আয়াতটি আসত, আম্মা আয়াতটি তিনবার উচ্চারণ করতেন। আজও যখনই শেষ রাতে ঘুম ভাঙে আমার, আমি যেন আম্মার তেলাওয়াতের সেই শব্দ শুনতে পাই।

একজন মুসলমানের সন্তান হিসেবে আমি বিশ্বাস করি একমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত এই দুনিয়ায় ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নন কেউই। আমার আব্বার জীবনেও কমবেশি ভুলত্রুটি ছিল। আজ এই দিনে আমি একজন গুনাহগার বান্দা হিসেবে আব্বা-আম্মার মানবিক ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁদের রুহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া কামনা করছি। মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে দোয়া করছি যেন আব্বা-আম্মার নেক কর্মকে কবুল করে নেন। তাঁদের ভুলত্রুটির দিকে না তাকিয়ে তাঁর রহিম ও রহমান নামের বদৌলতে তাঁদের প্রতি আখেরাতের ফয়সালার দিনে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যান।

“হে আমার পালনকর্তা, আমাকে এরূপ ভাগ্য দান করুন, যাতে আমি আপনার নেয়ামতের শোকর করি, যা আপনি দান করেছেন আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে এবং যাতে আমি আপনার পছন্দনীয় সৎকাজ করি। আমার সন্তানদেরকে সৎকর্মপরায়ণ করুন, আমি আপনার প্রতি তওবা করলাম এবং আমি মুসলিমদের অন্যতম।”
আমীন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ফরিদপুর।

‘বর্তমান সংসদ দেশের ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৩ পিএম
‘বর্তমান সংসদ দেশের ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা জাতীয় সংসদ আবারও কার্যকর হয়েছে।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেলে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা মোড়ে বিএনপি আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, ১৭ বছরের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অবশেষে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের গণতন্ত্র, রাজনীতি ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সংসদ আবারও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এই সংসদ দেশের ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে।

তিনি আরও বলেন, ভোটারদের হাতের কালি শুকানোর আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছেন, যা বিএনপির জনকল্যাণমুখী রাজনীতির প্রমাণ।

ইফতার মাহফিলে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান মুকুল, যুবদল নেতা তৈয়াবুর রহমান মাসুদসহ জেলা ও উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

আদালতে ‘মিথ্যা প্রত্যয়নপত্র’ দাখিলের অভিযোগ, গণপূর্তের দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ৯:৩৪ পিএম
আদালতে ‘মিথ্যা প্রত্যয়নপত্র’ দাখিলের অভিযোগ, গণপূর্তের দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন

গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আদালতে অসত্য প্রত্যয়নপত্র দাখিল করে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাসিন্দা মো. রকি হাসান।

গত ৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রেরিত ওই আবেদনে তিনি অভিযোগ করেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা—মো. আঃ রহমান (উপ-সহকারী প্রকৌশলী, ই/এম), বর্তমানে ঢাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১০ এ কর্মরত এবং শিরিনা পারভীন (উপ-সহকারী প্রকৌশলী, ই/এম), ফরিদপুরে কর্মরত—তার দায়ের করা একাধিক মামলায় আদালতে অসত্য ও ভিত্তিহীন প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেছেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, যশোরের বিজ্ঞ আমলী আদালতে দায়ের করা পি-৫৭১/২৩ ও পি-৯২৭/২৪ নম্বর দুটি মামলার শুনানির সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তারা ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরযুক্ত একটি প্রত্যয়নপত্র আদালতে উপস্থাপন করেন। ওই প্রত্যয়নপত্রে দাবি করা হয় যে, ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর (শুক্রবার) তারা নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

তবে অভিযোগকারী মো. রকি হাসানের দাবি, বাস্তবে ওই দিন তারা কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং আদালতে দাখিল করা প্রত্যয়নপত্রটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার ভাষ্য, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বারবার এমন অসত্য তথ্য দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করা আইনত গুরুতর অপরাধ এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য বিভাগীয় অপরাধ।

রকি হাসান জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রথমে গণপূর্ত অধিদপ্তরে এবং পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেন। প্রতিকার না পেয়ে পরে তিনি সরকারের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম (GRS)-এও অভিযোগ করেন। যার স্লট ট্র্যাকিং নম্বর ০১৭২০৯৪৪২৬১০০০১।

তবে GRS প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাকে জানানো হয় যে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রকি হাসান বলেন, আদালতে দাখিল করা নথিপত্র ও বিভিন্ন প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যদি সত্যতা অস্বীকার করা হয়, তাহলে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মিথ্যা প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে দুইবার মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তারা ফরিদপুরের স্থানীয় কিছু ঠিকাদারের সহায়তায় তার ওপর বিভিন্নভাবে চাপ ও ভয়ভীতি সৃষ্টি করছেন।

একই ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি যশোর কোতোয়ালী থানাধীন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে সি আর মামলা (CR-১৪৭২/২৫) দায়ের করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য যশোর সিআইডি কার্যালয়ে পাঠায়। পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন।
এ মামলায় ইতোমধ্যে আদালত থেকে সমন জারি হয়েছে এবং পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ নভেম্বর ২০২৫।

রকি হাসান অভিযোগ করেন, গণপূর্ত বিভাগের প্রভাবশালী কর্মকর্তা হওয়ায় অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে আইনি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছেন এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।

এ পরিস্থিতিতে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন তাকে অবহিত করার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত কর্মকর্তারা বলেন, রকি যে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছেন সেগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমাদের হয়রানি করার জন্য তিনি এ অভিযোগগুলো দিচ্ছেন।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আবেদনকারী।

“চেনা কেউ আসবে কি?” ফরিদপুরের বৃদ্ধাশ্রমে নুরজাহান বেগমের অপেক্ষার জীবন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ৮:২৩ পিএম
“চেনা কেউ আসবে কি?” ফরিদপুরের বৃদ্ধাশ্রমে নুরজাহান বেগমের অপেক্ষার জীবন

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে একটু স্নেহ, একটু খোঁজখবর আর প্রিয়জনের পাশে থাকার সুযোগ। কিন্তু সব মানুষের ভাগ্যে তা জোটে না। ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকার ‘শান্তি নিবাস’—যা স্থানীয়দের কাছে বৃদ্ধাশ্রম হিসেবেই বেশি পরিচিত—সেখানে এমনই এক নীরব জীবনের গল্প বয়ে বেড়াচ্ছেন নুরজাহান বেগম।

বয়স তার ৬০ পেরিয়েছে বহু আগেই। জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে সংগ্রাম আর একাকীত্বে। পৃথিবীতে নিজের বলতে তেমন কেউ নেই বলেই শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে। এখানে এখন তার দিন কাটে অপেক্ষায়, স্মৃতির ভেতর ঘুরে বেড়ানো আর মৃত্যুর প্রহর গোনায়।

নুরজাহান বেগমের জন্ম ফরিদপুর জেলা সদরের হারোকান্দিতে। ছোটবেলাতেই জীবনে নেমে আসে দুঃখের ছায়া। যখন তার বয়স মাত্র নয় বছর, তখনই মারা যান তার বাবা আইনউদ্দিন শেখ। বাবার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই কিছুদিনের মধ্যে হারান মাকেও। এত অল্প বয়সে এত বড় শূন্যতা তাকে একেবারেই অসহায় করে তোলে।

এরপর আশ্রয় মেলে বড় বোনের সংসারে। বোনের বাসাতেই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা তার জীবনের স্বাভাবিক পথকে বদলে দেয়। ছোটবেলা থেকেই তার দুই পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকে এবং তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। স্থানীয় ভাষায় যাকে অনেকে “পা ফোলা রোগ” বলে উল্লেখ করেন। এই অসুস্থতার কারণেই তিনি কখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা বা ভারী কাজ করতে পারেননি।

নুরজাহান বেগম নিজেই বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই পায়ের সমস্যায় ভুগছি। হাঁটতে কষ্ট হয়, ব্যথা করে। তাই ভাবতাম, যদি বিয়ে করি তাহলে স্বামীর বাড়িতে গিয়ে কাজ করতে পারব না। কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাইনি। তাই জীবনে বিয়ে করিনি।”

সময়ের সাথে সাথে বোনের জীবনেও পরিবর্তন আসে। বোনের বিয়ে হয়, সংসার গড়ে ওঠে, সন্তান হয়। পরিবারের সদস্য বাড়তে থাকে। সেই সংসারে ধীরে ধীরে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে শুরু করে নুরজাহানের।

তিনি বলেন, “বোনের সংসার হলো, ছেলে-মেয়ে হলো। তখন বুঝলাম আমি যেন ওদের জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছি। কারও ওপর চাপ হয়ে থাকতে ভালো লাগে না। এক সময় আমাকে এই বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসা হয়।”

ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকার শান্তি নিবাস বহু বছর ধরে অসহায় ও নিঃস্ব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। এখানে থাকা অনেকের মতো নুরজাহান বেগমের জীবনেও রয়েছে না বলা অনেক গল্প, কষ্ট আর স্মৃতি।

বৃদ্ধাশ্রমের ছোট্ট একটি কক্ষে তার এখনকার বাস। সেখানে একটি খাট, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো স্মৃতিই তার সঙ্গী।

তবে পুরোপুরি ভুলে যাননি তার আপনজনরা—এমনটাও নয়। মাঝে মাঝে বোনের পরিবারের কেউ কেউ তাকে দেখতে আসে। কখনো ফোন করে খোঁজখবর নেয়। এই সামান্য যোগাযোগই তার কাছে বড় সান্ত্বনা হয়ে আসে।

নুরজাহান বেগম বলেন, “অনেকদিন পর পর ওরা আসে। কখনো মোবাইলে কথা বলে। তখন মনে হয়, এখনও কেউ আছে আমার খোঁজ নেওয়ার।”

বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে প্রায়ই তিনি রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হয়তো মনে মনে আশা করেন—হঠাৎ করেই কোনো পরিচিত মুখ সামনে এসে দাঁড়াবে।

“এই বৃদ্ধাশ্রমই এখন আমার ঘর। এখানেই মাথা ঠুকে বেঁচে আছি। মাঝে মাঝে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। যদি চেনা কেউ আসে,”—কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখে ভেসে ওঠে এক অদৃশ্য শূন্যতা।

এভাবেই দিন যায়, রাত আসে। আর তিনি ধীরে ধীরে গুনতে থাকেন জীবনের শেষ সময়ের অপেক্ষা।

“স্বপ্ন বলতে এখন আর কিছু নেই,”—শান্ত কণ্ঠে বলেন নুরজাহান বেগম। “দিন আসে, রাত যায়। মনে হয় শুধু মৃত্যুর প্রহর গুনছি।”

বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বশীলরা জানান, এখানে থাকা অনেক মানুষের মতো নুরজাহান বেগমও অত্যন্ত শান্ত ও নিরহংকার একজন মানুষ। নিজের কষ্টের কথা খুব কমই বলেন। বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকেন।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবারভিত্তিক সামাজিক কাঠামো এখনও শক্তিশালী হলেও অনেক ক্ষেত্রে অসহায় ও বয়স্ক মানুষেরা পরিবারের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে যাদের শারীরিক অসুস্থতা বা আর্থিক সংকট রয়েছে, তাদের জীবনে এই বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

নুরজাহান বেগমের জীবনও যেন সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি।

তবুও তার চোখে মাঝে মাঝে একটুখানি আশা জ্বলে ওঠে—হয়তো কোনোদিন আবার কেউ এসে বলবে, “চলো, তোমাকে নিয়ে যাই নিজের ঘরে।”

ততদিন পর্যন্ত ফরিদপুরের টেপাখোলার এই শান্তি নিবাসই তার আশ্রয়, সঙ্গী আর জীবনের শেষ ঠিকানা।